বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
শঙ্কু সিরিজের প্রথম গল্প *ব্যোমযাত্রীর ডায়রি*-পর্ব ১— সত্যজিত রায়
X
(১)
প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ডায়রিটা আমি
পাই তারক চাটুজ্যের কাছ থেকে।
একদিন দুপুরের দিকে আপিসে বসে পুজো
সংখ্যার জন্য একটা লেখার প্রুফ দেখছি, এমন সময়
তারকবাবু এসে একটা লাল খাতা আমার সামনে
ফেলে দিয়ে বললেন, ‘পড়ে দেখো।
গোল্ড মাইন।’
তারকবাবু এর আগেও কয়েকবার গল্পটল্প
এনেছিলেন। খুব যে ভাল তা নয়; তবে বাবাকে
চিনতেন, আর ছেঁড়া জামাটামা দেখে মনে হত,
ভদ্রলোক বেশ গরিব; তাই প্রতিবারই
লেখাগুলোর জন্য পাঁচ-দশ টাকা করে দিয়েছি।
এবারে গল্পের বদলে ডায়রিটা দেখে একটু
আশ্চর্য হলাম।
প্রোফেসর শঙ্কু বছর পনেরো নিরুদ্দেশ।
কেউ কেউ বলেন তিনি নাকি কী একটা ভীষণ
এক্সপেরিমেণ্ট করতে গিয়ে প্রাণ হারান। আবার
এও শুনেছি যে তিনি নাকি জীবিত; ভারতবর্ষের
কোনও অখ্যাত অজ্ঞাত অঞ্চলে গা ঢাকা দিয়ে
চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছেন, সময় হলে
আত্মপ্রকাশ করবেন। এ-সব সত্যিমিথ্যে জানি না,
তবে এটা জানতাম যে তিনি বৈজ্ঞানিক ছিলেন। তাঁর
যে ডায়রি থাকতে পারে সেটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু
সে ডায়রি তারকবাবুর কাছে এল কী করে?
জিজ্ঞেস করতে তারকবাবু একটু হেসে হাত
নাড়িয়ে আমার মশলার কৌটোটা থেকে লবঙ্গ আর
ছোট এলাচ বেছে নিয়ে বললেন,
‘সুন্দরবনের সে ব্যাপারটা মনে আছে তো?’
এই রে আবার বাঘের গল্প। তারকবাবু তাঁর সব ঘটনার
মধ্যে বাঘ জিনিসটাকে যেভাবে টেনে আনেন
সেটা আমার মোটেই ভাল লাগে না। তাই একটু
বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘কোন ব্যাপারটার কথা
বলছেন?’
‘উল্কাপার! ব্যাপার তো একটাই।’
ঠিক ঠিক। মনে পড়ছে। এটা সত্যি ঘটনা। কাগজে
বেরিয়েছিল। বছরখানেক আগে একটা উল্কাখণ্ড
সুন্দরবনের মাথারিয়া অঞ্চলে এসে পড়েছিল।
বেশ বড় পাথর। কলকাতার জাদুঘরে যেটা আছে
তার প্রায় দ্বিগুণ। মনে আছে, কাগজে ছবি
দেখে হঠাৎ একটা কালো মড়ার খুলি বলে মনে
হয়েছিল।
বললাম, ‘তার সঙ্গে এই খাতাটার কী সম্পর্ক?
তারকবাবু বললেন, ‘বলছি। ব্যস্ত হয়ো না। আমি
গেসলাম ওই মওকায় যদি কিছু বাঘছাল জোটে। ভাল
দর পাওয়া যায়, জান তো? আর ভাবলুম অত
জন্তুজানোয়ার মোলো, তার মধ্যে কি গুটি
চারেক বাঘও পড়ে থাকবে না? কিন্তু সে গুড়ে
বালি। লেট হয়ে গেল। হরিণটরিণ কিচ্ছু নেই।’
‘তা হলে?’
‘ছিল কিছু গোসাপের ছাল। তাই নিয়ে এলুম। আর
এই খাতাটা।’
একটু অবাক হয়ে বললাম, ‘খাতাটা কি ওইখানে…?’
‘গর্তের ঠিক মধ্যিখানে। পাথরটা পড়ায় একটা গর্ত
হয়েছিল জান তো? তোমাদের চারখানা হেদো
তার মধ্যে ঢুকে যায়। এটা ছিল তার ঠিক-মধ্যিখানে।’
‘বলেন কী!’
‘বোধহয় পাথরটা যেখানে পড়েছিল তার খুব
কাছেই। লাল-লাল কী একটা মাটির ভেতর থেকে
উঁকি মারছে দেখে টেনে তুললাম। তারপর
খুলতেই শঙ্কুর নাম দেখে পকেটস্থ করলাম।’
‘উল্কার গর্তের মধ্যে খাতা? তার মানে কি…?’
‘পড়ে দেখো। সব জানতে পারবে। তোমরা
তো বানিয়ে গল্পটল্প লেখো, আমিও লিখি। এ
তার চেয়ে ঢের মজাদার। এ আমি হাতছাড়া করতাম না,
বুঝলে! নেহাত বড় টানাটানি যাচ্ছে তাই–'
টাকা বেশি ছিল না কাছে। তা ছাড়া ঘটনাটা পুরোপুরি
বিশ্বাস হচ্ছিল না, তাই কুড়িটা টাকা দিলাম
ভদ্রলোককে। দেখলাম তাতেই খুশি হয়ে আমায়
আশীর্বাদ করে চলে গেলেন।
তার পর পুজোর গোলমালে খাতাটার কথা ভুলেই
গিয়েছিলাম। এই সেদিন আলমারি খুলে চলন্তিকাটা
টেনে বার করতে গিয়ে ওটা বেরিয়ে পড়ল।
খাতাটা হাতে নিয়ে খুলে কেমন যেন খটকা লাগল।
যতদূর মনে পড়ে প্রথমবার দেখেছিলাম কালির রং
ছিল সবুজ। আর জা দেখছি লাল? এ কেমন হল?
খাতাটা পকেটে নিয়ে নিলাম। মানুষের তো ভুলও
হয়। নিশ্চয়ই অন্য কোনও লেখার সবুজ কালির
সঙ্গে গোলমাল করে ফেলেছি।
বাড়িতে এসে আবার খাতাটা খুলতেই বুকটা ধড়াস
করে উঠল।
এবার দেখি কালির রং নীল।
তারপর এক অদ্ভুত ব্যাপার। দেখতে দেখতে
চোখের সামনে নীলটা হয়ে গেল হলদে।
এবারে তো আর কোনও ভুল নেই; কালির রং
সত্যি বদলাচ্ছে।
হাতের কাঁপুনিতে খাতাটা মাটিতে পড়ে গেল। আমার
ভুলো কুকুরটা যা পায় তাতেই দাঁত বসায়। খাতাও বাদ
গেল না। কিন্তু আশ্চর্য! যে দাঁত এই দু’ দিন
আগেই আমার নতুন তালতলার চটিটা ছিঁড়েছে, ওই
খাতার কাগজ তার কামড়ে কিচ্ছু হল না।
হাত দিয়ে টেনে দেখলাম এ কাগজ ছেঁড়া
মানুষের সাধ্যি নয়।
টানলে রবারের মতো বেড়ে যাচ্ছে, আর
ছাড়লে যে-কে-সেই।
কী খেয়াল হল, একটা দেশলাই জ্বেলে
কাগজটায় ধরালাম। পুড়ল না। খাতাটা পাঁচ ঘণ্টা উনুনের
মধ্যে ফেলে রেখে দিলাম। কালির রং যেমন
বদলাচ্ছিল, বদলাল, কিন্তু আর কিচ্ছু হল না।
সেই দিনই রাত্রে ঘুমটুম ভুলে গিয়ে তিনটে অবধি
জেগে খাতাটা পড়া শেষ করলাম। যা পড়লাম তা
তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। এ সব সত্যি কি
মিথ্যে, সম্ভব কি অসম্ভব, তা তোমরা বুঝে নিও।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now