বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সহজিয়া সুখ
------------------------
লিখেছেন - রাহনুমা কুমকুম
***
সাদা শার্টটায় একটা ছোট্ট লাল বিন্দু তৈরী হল। ছুঁচ ফুটে গেছে হাতে, রওশন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আঙুলের কোল জুড়ে ক্রমশ বড় হতে থাকা লাল বৃত্তটার দিকে। কেমন তীক্ষ্ন একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে ভেতর.. আরো ভেতরে.. এখন ভুগাবে কিছুদিন। অল্পতে আর সারেনা কিছু। ডায়বেটিস আছে ওর, আনকন্ট্রোলড। সরিয়ে রাখলেন শাহেদের শার্ট, বোতাম গলানো সুঁচ। সেদিনই হঠাত পেটের কাছের বোতামটা ঐ টুপ করে খসে পড়ল। আয়নায় দাঁড়িয়ে তখন অফিসের জন্য তৈরী হচ্ছিলেন শাহেদ। "রশু দেখ দেখ ভুড়িটা কেমন বেড়েছে আমার.. বোতাম লাগাতেই চট করে ছুটে চলে আসল.." বোতাম হাতে ভুড়িওয়ালা স্বামীর অসহায় অভিব্যক্তি! রওশন ফিক করে হেসে দিলেন "কতবার বলি একটু সকালে হাঁট। সারাদিন শুধু টেবিল চেয়ারে বসে থাকা আর রুগী দেখা। ভুড়ি তো বাড়বেই। এখন এটা বদলে ফেল, বোতাম পরে লাগিয়ে দিব।"
সন্ধ্যারাত। চেম্বার শেষ করে ফিরতে ফিরতে শাহেদের সাড়ে নটা মত বাজবে। সরকারী হাসপাতাল থেকে অবসর নিয়ে যেন আরো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষটা। কাজের সাথে সখ্য নতুন। দিনরাত শুধু রোগী নিয়ে পড়ে থাকে। "রশু তুমি খেয়ে নিও" যাওয়ার আগে বলে যায় প্রতিদিন। কিন্তু এতো বছরের পুরোনো অভ্যাস.. একলা কি ভাত রোচে মুখে?
ও বাড়ির ছোট ছেলেটার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে, মা বকেছে হয়তো। ওদের টিভিটাও চলছে একা তারস্বরে! শুধু তার ঘর ফাঁকা.. নিশ্চুপ। একটামাত্র ছেলে অভি ঢাকায় থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকালো সবে। ফেরার কথা এখনো বলছেনা কিছু, সত্যিই তো এই মফস্বলে ফিরে কি করবেটা ও? তিনিও কখনো আশা করেননি, ছেলে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেবে মার আঁচলের নীচে। তবু ফাঁকা লাগে.. তবু কিছু চাওয়া আবেগসর্বস্ব বুকের কাছে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে..
সেবার ওর বিয়ের জন্য তোড়জোর করতেই ছেলে দেখি আর আগের মত না না করছেনা! কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন একদিন "অভি বাবা তোর কি কোন পছন্দ আছে?" - "ইয়ে মানে.. হ্যাঁ মা, ওর নাম আদৃতা। একসাথে পড়তাম আমরা.. ঘরোয়া টাইপ মেয়ে মা, নরমসরম। দেখো তোমার ঠিক পছন্দ হবে।" একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে চোখ নামিয়ে নেয় অভি! হাসেন রওশন। ছেলের মাথার সামনের চুলগুলো নিয়ে ইলিবিলি কাটেন। "আয় বাবা রাজপুত্তুর সাজিয়ে তোকে বিয়ে দিয়ে দিই।" লাজুক হেসে মার বুকে মুখ গোঁজে অভি, সেই ছোট্টটার মত। "বাবাকে বলবে তো মা.." - "আরে হ্যাঁ বলব তো বটেই। আজকেই বলব।"
তার ছোট্ট ছেলেটার নাকি দু'মাস পরে বিয়ে! সেই যে তুরতুর করে কতদূর হেঁটে এসেই হাত পা ছড়িয়ে বসে যেত! অভিকে হাঁটা শেখাতে কত যে পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে, অনেক দেরীতে শিখেছে ও। সারাদিন শুধু সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে ডাকতেন "অভিইইই বাবা আয় আয় আয়" বলে পিছিয়ে যেতেন.. আর এলোমেলো পা ফেলে প্রানপনে মাকে ছুঁতে চাইতো অভি.. তারপর কতদূর এসেই ধপাস! না না পড়বার আগেই তো ছুটে গিয়ে বুকে জড়িয়ে নিতেন..
দ্রুত মোবাইল টিপেন রওশন। রিং হচ্ছে.. ওয়েটিং.. ধরছেনা অভি। বার দুই চেষ্টা করে রেখে দিলেন ফোন। হাসলেন আপনমনে "সেই মেয়েটা.. কি জানি নাম.. হ্যাঁ বোধয় আদৃতার সাথে কথা বলছে অভি" বয়সটা কি রঙীন না ওদের.. পছন্দ করা মানুষের সাথে বিয়েও হচ্ছে। আহা সুখে থাকুক ওরা.. কি ভেবে চোখ যায় নিজের বিয়ের ছবিটার দিকে, দেয়ালে বাঁধানো। আঁচল দিয়ে ধুলো মুছে নেন। বাসর রাতে ঘোমটা টানা জড়সড় মুখ.. শাহেদের নাম আর এক পলক দেখা পাসপোর্ট সাইজ ছবিটা ছাড়া কিচ্ছু জানতেন না তখন। কথা হয়নি একবারও। অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত রওশন.. সে রাতে শাহেদ নাকি এসেছিলেন দুইটারও পরে, কি এক ইমার্জেন্সী পেশেন্ট সামলে। এদিকে রওশন তখন ঘুমে অতল, ফুলেল বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে! কি বিশ্রীভাবেই না ঘুমাতেন সেই বাচ্চা বয়সে! একআধটু ডাকাডাকি আর মৃদু ধাক্কা দিয়ে ব্যর্থ হয়ে শাহেদও পরে ঘুমিয়ে পড়েন বিছানার এক কোনায় ঝুলতে ঝুলতে! সকালে উঠে তো সব দেখেশুনে রওশন পুরো ভ্যাবাচেকা.. তার বেচারা স্বামী বিছানার কোনা থেকে পড়ে যাচ্ছে প্রায়.. তাড়াতাড়ী দুহাতে ধরে সোজা করে শোওয়ান তাকে.. আর তখনই মুচকি হেসে চোখ মেলেন শাহেদ "বউ কেমন আছ? ঘুম ভাল হল তোমার?!"
হ্যাঁ কাজপাগল এই মানুষটার বউপাগল হতে দেরী হয়নি একটুও। আর আস্তে আস্তে যত জেনেছেন ওকে, কি এক মায়ায় জড়িয়ে গেছেন রওশন.. আরো আরো গভীরে..
"শাহেদ, কখন আসবে তুমি? সাড়ে নয়টা বেজে গেছে তো.." - "এইতো বের হয়ে গেছি চেম্বার থেকে। খেয়েছ রশু?" "না ইনসুলিন নিয়ে নিয়েছি। তুমি আসলেই খেতে বসব।" - "কি যে কর না তুমি? কতবার বলি খাওয়াটা টাইমলি খেয়ে ফেলবে.. এখন যদি জ্যামে পড়ি, আর দেরী হয়? না খেয়ে বসে থেকোনা কিন্তু.. হুট করে আবার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে যাবে।" "আচ্ছা বাবা আচ্ছা.."
ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন নিত্যনতুন রোগ এসে ক্ষয়ে দিচ্ছে তার শরীরটাকে.. ক্রমশই। জীবন সায়াহ্নে এখন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন মাত্র কদিন আগে.. লাল ফিতে চুলে বিনুনী বাঁধার সেই ছোট্টকালের বান্ধবীটাকে যখন দুমাসের মাথায় কেড়ে নিল এসে ক্যান্সার.. ঠিক তখন। নীলিমা, নীলুটা চলে গেল তাকে ছেড়ে। চালতার আচার বানিয়ে পাঠানোর জন্য ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান করবে না আর কেউ ফোনের ওপাশ থেকে। স্বামীর সাথে সাময়িক ঝগড়া এসে নিয়মমাফিক স্যুটকেস হাতে দাঁড়াবেনা আর সদরদরজায়! কাঁচুমাচু করে বলবেনা "রশু থাকতে দিবি.. অল্প কদিন?"
হঠাত একদিন শুনলেন ছেলে আর মেয়ে-মেয়েজামাই নীলুকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গেছে ট্রিটমেন্ট করাতে। রোগটা নাকি শক্ত ভীষন। ফিরে আসলে দেখতে গেলেন। বিছানায় শুয়ে আছে.. না নীলু কোথায়? ও তো একটা কঙ্কালসার শরীর শুধু! কোটরের চোখ, ভাঙা গাল.. শুধু জ্বলজ্বলে চোখে মনি দুটো একা ধুঁকছে যেন, লড়ে যাচ্ছে.. কি অবিশ্বাসেও বাঁচার আশায়! বিদায়ের আগে শক্ত করে জড়িয়ে দুহাতে নীলু বলছিল "রশু, মনে পড়ে কলেজের ঐ পুকুরপাড়ে শেষ সিঁড়িটায় পা ডুবিয়ে বসে বসে, আমি তুই রোজ গল্প করতাম.. আলতা ধোয়া লালচে জলে ফুল ছিড়তাম.. হুঁউউ মনে পড়ে? তুই আনমনে কত গান গাইতি.. প্লিজ গা না আবার.. ঐ যে ঐ গানটা.. 'আয় আরেকটিবার আয়রে সখা প্রানের মাঝে আয়.. মোরা সুখের দুখের কথা কব প্রান জুড়াবে তায়'..
আমাকে শোনা রশু.. জানিনা আবার কখন সে সুযোগ হয়.. জানিনা আমি কোথায় হারাই..."
রশু গাইছিলেন দু'চোখ বুজে.. বুকের কাছে শক্ত হয়ে দলাপাকানো কষ্টগুলো আর পারছিলনা বাঁধ মানতে.. কন্ঠ কাঁপছে.. চোখ জ্বালা জ্বালা.. হঠাত গাইতে গাইতে ফুঁপিয়ে উঠেছিলেন.. নিদারুন অস্ফুটে..
টুপ টুপ করে এবার বিষাদ অশ্রুতে ডুবে গেল শাহেদের শার্ট। রওশন উঠে দাঁড়ালেন। আহা পুরানো সেই দিনের কথা.. ভোলে কি কেউ! কখনো কি ভোলা যায়? নীলুর চলে যাওয়া তাকে আরো কঠিন করে দিয়ে গেছে.. প্রস্তুত করে দিয়ে গেছে যেকোন সময় যেকোন কিছুর জন্য। জীবনের প্রতি অন্যরকম মমতায় তবু ভরে গেছে মন.. এখন একাকীত্বেও বাঁচেন রশু প্রান ভরে, টুকরো টুকরো খুশীর রেশে.. তার শোবার ঘরের বারান্দা ছোঁয়া হাসনাহেনায়, নীল জোছনায়.. বাঁচেন মুগ্ধতায়.. টবের ফুলগাছগুলোর সাথে একা একা কাটে গল্পদুপুর, পুরনো বইয়ের আবছা মলাটে নাক ডুবিয়ে কত না নতুন বন্ধুত্ব হয়.. আছে বেলা অবেলার বৃষ্টির ঘ্রান, কফির মগে টুং টাং কিছু উষ্ণ সময়.. ফোনের ওপাশের কেউ আপন ভীষন.. কখনো নীলাকাশ জুড়ে নিঃসঙ্গ চিলের উড়ান আর নীচে রোজ ফেরিওয়ালাটার একঘেয়ে কিছু বিষন্ন গান..
কিংবা কখনো ঘামেভেজা কাজের দিনে, কোমরে আঁচল জড়িয়ে ঘোরতর সংসারী মন! ছেলেটা আসছে.. সিদ্দিকা কবীরের বই পড়ে হোক নতুন রান্না। শাহেদ চিবোন "না না রশু খাওয়া যাচ্ছে, বেশ ভালই খাওয়া যাচ্ছে.. শুধু লবন দাও নি এই যা!" ধেত্তেরী.. বলে জিভ কেটে ফের রান্নাঘরে ছুট!.. অভি আর শাহেদ। কত ব্যস্ত ওরা। তবু যতটুকু এই কাছে পাওয়া যায় বাড়ালে দুহাত.. কাটিয়ে তো দিলেন জীবন, কাটবে বাকিটাও। ঘরে নতুন বউ আসছে, ছেলে চলে যাচ্ছে দূরে! যাক.. কাউকে কি বেঁধে রাখা যায়?
- "হ্যালো মা.." "হ্যাঁ বাবা তোকে ফোন করেছিলাম একটু আগে। দুবার বোধয়.." (একটু কি অভিমানী শোনায় তার গলা?) - "দেখেছি মা। শোননা.. টিকেট বুকিং দেওয়া নিয়ে একটু ঝামেলা হচ্ছিল, ভাবলাম কথা শেষ করে একবারে তোমাকে ফোন দেই।" "কিসের টিকেট? বাড়ি আসবি সেটার?" - "না মা, বাড়ি তো আসব। তারপর প্ল্যান করেছি আমি তুমি আর বাবা মিলে কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসব কদিনের জন্য। সারাদিন বাসায় থেকে বোর লাগেনা তোমার? আর বাবা? সারাদিন বাসায় না থেকে আর এতো এতো রোগী দেখে কি বোর লাগেনা বাবার?! চল তো চল.." "ভাল করেছিস বাবা। আমারও না কেমন বদ্ধ বদ্ধ লাগছিল.. খোলা আকাশ ছুঁতে চাইছিলাম.. আর সাগর দেখিনা কতদিন! তবে ঐ টিকেটের লোকটাকে তুই আবার ফোন কর.." - "কেন!" "না আরো ক'টা এক্সট্রা টিকেট লাগবে। আদৃতাকে বলনা আমাদের সাথে যেতে.." - "কি বল মা.. এভাবে আমাদের সাথে.. বিয়ের পরে নাহয় যাবে কখনো.." লাজুক হাসল অভি। "আরে পুরো কথা শোন রে পাগল.. ওর বাবা মাকেও বল, আমরা দুই ফ্যামিলি একসাথে গিয়ে ঘুরে আসি। কি জানিস তো.. আমার বেশী বেশী ভাল লাগবে তখন।" - "সত্যি মা?!" "দেখ কান্ড, ছেলে আমার এক কথাতেই কেমন খুশী হয়ে গেছে!"
হেসে ফোন রাখলেন রওশন। চেনা পদশব্দে সচকিত মন.. শাহেদ এসে গেছে। বরাবরের মতই কলিংবেলে হাত রাখার একটু আগেই খুলে দেবেন দরজা। হাসিমুখ দেখা যাবে শাহেদের "আচ্ছা প্রতিবার তুমি কিভাবে টের পেয়ে যাও!"
বেঁচে যাওয়া এই সময়গুলো.. যতদূর চোখ যায় মন্দ তো নয়। অতৃপ্তি ভরপুর, তবু মুঠোয় নিয়ে আলতো জীবনে চাইলেই দেখ সহজিয়া সুখ..
------------------------O---------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now