বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ভূতের গল্প
সহযাত্রী
কোন কাজ সময় মতো শুরুও শেষ না করতে পারার জন্য আমার বেশ বদনাম আছে। আর এর জন্য কেউ আমাকে কোন দায়িত্ব দিয়ে খুব একটা শান্তিতে থাকতে পারেনা। আমি নিশ্চিন্তে থাকলেও যে দায়িত্ব দেয় কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেশ টেনশনে থাকতে হয়। বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলে তো আর কোন কথাই নাই । সুতারাং কাজটাজ নিয়ে আমাকে খুব একটা টেনশন করতে হয় না , যার কাজ তারই আরেকটা
কাজ হয়ে যায় আমাকে মনে করিয়ে দেয়া । বেকারদের সবাই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবে । আমার বেলাতেও তার কোন হেরফের নেই । যখন যার যেমন ইচ্ছে হুকুম দিয়ে যাচ্ছে , আর আমি তা পালন করে যাচ্ছি । ঠিক মতো করতে পারলে ভাল , তা না হলে আমি পৃথিবীর সবচাইতে অপদার্থদের সরদার । টুকটাক লেখা লেখি ছাড়া আমি তেমন কিছু একটা করি না । দু’একটা পত্রিকাতে কবিতা টবিতা লিখি । ইদানিং ব্লগেও লেখালেখি শুরু করেছি । ভূতের গল্প লিখে সবার কাছে মোটা মুটি একটা অবস্থা করে নিয়েছি । যদিও আমি নিজে কখনও ভূত দেখিনি । আর ভূতে বিশ্বাসও করিনা । তবে মনে বড়ো খায়েশ নিয়ে আছি যদি কখন ভূতরা দয়া পরবস হয়ে দেখা দেয় , তবে আমি তাদের নিয়ে লিখেটিখে একেবারে মহালেখক হয়ে যাই ।
আমি থাকি পুরান ঢাকায় বোনের বাসায় । দুলাভাই বড় ব্যবসায়ী । বেশ হোমরা-চোমরা মানুষ । আমায় গৃহপালিত প্রাণির মতো বেশ স্নেহ করেন । সকাল বিকাল খোঁজ খবর নেন । হাত খরচ দিয়ে সাহায্য করেন । আমার মতো , দুলাভাইরা ও দু’ভাই বোন। ওনার বড় বোন লুবনা আপা , আমি যাকে মাথা খারাপ আপা বলে ডাকি , থাকেন চিটাগাং । লবনা আপুর স্বামীর তেলের ব্যবসা । বেশ ধনী মানুষ । ধনী মানুষের সেবা যত্নের জন্যও মহান আল্লাহতালা পৃথিবীতে অনেকে কিছু পাঠান । যাদের কাজই হচ্ছে। শুধু ধনী মানুষদের সেবা যত্ন করা। নিজেকে আমার মাঝে মাঝে সেই শ্রেণীর মনে হয়। যাই হোক এসব বলে কয়ে কোন লাভ নেই । সবই হচ্ছে কপাল ! কিনলাম গাই হইল আবাল অবস্থা ।
রাত বাজে প্রায় দশটা ।
আমি কমলাপুল রেল স্ট্রেশনে রিকসা থেকে নামলাম । গন্তব্য চিটাগাং লুবনা আপার বাসা। দুলাভাই বোনের জন্য মাথা ঠান্ডা করার ঔষুধ নিয়ে এসেছেন , চায়না থেকে । আমি তা নিয়ে যাচ্ছি । ট্রেন ছাড়ার কথা সাড়ে দশটায় । আমি আজ বেশ সময় মতো আসতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করলাম । না , যাক এ কাজটা অন্তত ঠিক মতো শেষ হবে । একটা সিগারেট কিনে ধরালাম । পকেট থেকে টিকিটটা বেড় করে দেখলাম ট্রেন ছাড়ার সময় এর জায়গায় সাড়ে দশটা লেখা । মোবাইলে ঘড়ি দেখলাম – ৯টা ৫৫ মিনিট ।
সিগারেট শেষ করে প্লাটফমের দিকে এগুলাম । প্লাটফমটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো । লোকজন খুব একটা নেই । দু’একজন বেঞ্চিতে বসে ঝিমুচ্ছে । আমি আবার ঘড়ি দেখলাম , দশটা বাজে । আরো ত্রিশ মিনিট সময় আছে । কিন্তু ট্রেন কৈই ?
সাধারনত ট্রেন ছাড়ার আধা ঘন্টা আগে লোকজনের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার কথা । কিন্তু এখানে দেখছি ট্রেন ও নাই ,যাত্রী ও নাই । হরতাল টরতাল না তো?
আমি পায়চারি করতে লাগলাম । ঘড়িতে দশটা ১৫ বাজার পরও কোন ট্রেনের দেখা নেই। আজব তো । আমার ক্যামন জানি সন্দেহ হলো , পকেট থেকে টিকিটা বেড় করে আবার দেখলাম। আজকের তারিখ ইতো লেখা রয়েছে । তা হলে ? ঘটনা কি !!
আমি টিকিট কাউনন্টারে চলে এলাম । প্রায় সব গুলো কাউন্টার খালি । একটাতে একজন বসে কম্পিউটারে কার্ড খেলছে । আমি টিকিটা এগিয়ে দিয়ে বললাম ,- ভাইজান ট্রেন কখন ছাড়বে ?
লোকটা কম্পিউটার থেকে চোখ না সড়িয়েই বললো -কোন ট্রেন ?
আমি টিকিটটা দেখিয়ে বললাম এটা ।লোকটা টিকিটা নিয়ে একবার দেখে বললো – এ ট্রেন তো আরো এক ঘন্টা আগে ছেড়ে গেছে। বলেন কি ? আমি চমকে উঠলাম । কিন্তু ট্রেন ছাড়ার সময় তো সাড়ে দশটায় ।
সাড়ে দশটা না ; ভাল করে দেখেন ।
লোকটা টিকিটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো । চোখে মুখে র্স্পষ্ট বিরক্তি । যেন এই
মূর্হুতে আমি পৃথিবীর সব চাইতে বিরক্তি কর কোন প্রাণি । আমি টিকিটটা আবার দেখলাম, আবচ্ছা আলোয় আমার কাছে লেখাটা সাড়ে দশটাই বলেই মনে হলো ।
ভাই সাড়ে দশটাই তো লেখা? আমি আগের চেয়ে নরম সুরে বললাম ; লোকটা এবার ফোনে কারো সাথে কথা বলছে । আমার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বললো । মনে মনে নিজের ভাগ্যটাকে গাল মন্দ শুরু করলাম । কৈ ভেবে ছিলাম কোন সুন্দরী সহযাত্রীর পাশে বসে গল্প করতে করতে চিটাগাং যাবো ! না এখন রাগে দু:খে নিজের মাথার সব চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে । নিজেকে হঠাৎ খুব অসহায় মনে হলো । মনে হলো আসলেই আমি এ পৃথিবীতে চলার জন্য একজন অক্ষম মানুষ । মনে মনে বললাম হে বিধাতা আমাকে কেন পাঠালে তোমার এ মহা বিশ্বে, আর পাঠালে যদি কেন যোগ্য করে পাঠালে না? বুক চিড়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস বেড় হয়ে এলো ।
লেখা পড়া জানেন? লোকটা ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো । চোখে মুখে আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি ।
-সরি বুঝলাম না ভাই। আমি অবাক হয়ে বললাম ।
জিজ্ঞেস করছি পড়া লেখা জানেন ?
জ্বি জানি। রসায়নে এমএসসি করেছি , ঢাকা ভারসিটি থেকে। আপনি কতো দূর করেছেন? আমি যতোটুকু সম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখে উল্টো জিজ্ঞেস করলাম ।
সময়টা দেখে পড়তে পারেন না যে, সাড়ে নটা লেখা আছে।
আমি আবার টিকিটটার দিকে তাকালাম । কিন্তু আমার কাছে মনে হলো সাড়ে দশটাই লেখা ।
এমন সময় আরেক জন হেংলা পাতলা লোক ঢুকলে কাউন্টারে।
কি মতিন ভাই, কি হইচ্ছে ? হইচই কেন ! লোকটা একটা বুথে বসতে বসতে বললো ।
আরো দেখ না, সাড়ে নটায় যে ট্রেন ছেড়ে গেছে সেটার জন্য উনি এখন এসেছে ।
ভাই আপনি ট্রেন ফেল করেছেন। নতুন আসা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো ।
আমি বুঝলাম এদের সঙ্গে কথা বলে পারা যাবে না, তাই অনেকটা কম্পোমাইজের সুরে
বললাম – আমার খুব আর্জেন্ট কাজ আছে, আজ চিটাগাং যেতেই হবে । আমার চোখে মুখে অনুনয় ঝরে পরতে লাগলো ।
রাতে আর কোন ট্রেন নাই; ভোর সাড়ে সাতটায় আছে। সেটায় চলে যান ।
কিন্তু ভাইজান আমাকে কাল ভোরে যে করে হোক চিটাগাং পৌঁছাতেই হবে। কিছু একটা ব্যবস্থা করুন প্লীজ ।
স্যার কি রাতে চিটাগাং যাবে মতিন ভাই ?
হু! যাবে। আগের লোকটা উত্তর দিলো ।
দেখেন দেড়টার সময় আমাদের একটা স্পেশাল ট্রেন যাবে চিটাগাং । আপনি চাইলে যেটায় ব্যবস্থা করে দিতে পারি ।
প্লিজ ভাই, দেননা ব্যবস্থা করে ; আমার অনেক উপকার হবে ;
তয় , ভাড়া পরবে পাঁচশ টাকা ।
আমি বললাম- কোন ব্যাপার না , আমি রাজি ।
ঠিক আছে , কম্পাটমেন্টে গিয়ে বসেন, আমি ট্রেন ছাড়ার আগে আপনাকে ডেকে নেবো।
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাঁচা গেল। যতো মুশকিল ততো আসান। আমি আকাশের দিকে মুখ করে আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম ।
দুই …………….
স্যার ; আসেন ট্রেনে ছেড়ে দেবে । বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম , হঠাৎ
কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে তাকালাম । কাউন্টারের সেই হেংলা মতো লোকটা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। এতো কাছ থেকে দেখে লোকটাকে আরো বেশি রোগা মনে হলো।
সবাই উঠে গেছে, বড় সাহেব আসলেই রওনা ট্রেন দেবে। চলেন স্যার ।
এ ট্রেন চিটাগাং যাবে তো ? আমি আবারো কনফারর্ম হবার জন্য জিঞ্জেস করলাম ।
কি যে বলেন না স্যার , অবশ্যই চিটাগাং যাউব , এখন তারাতারি চলেন ।
আমি ব্যাগটা নিয়ে উঠে পরলাম ।
ট্রেনটা ছোট , সিটগুলো মুখোমুখি বসানো ; দেখেই বোঝা যায় বেশ আরামদায়ক । আমার ভাল লেগে গেল। মনে মনে বললাম, উপড় তলার মানুষরা সব সময় আরামে থাকে। আমি কি কখনও উপড় তলার মানুষ হতে পারবো? নিজের চিন্তার ধরন দেখে নিজেরই হাঁসি পেল। লকারে ব্যাগটা রেখে আমি বাপাশের একটা সিটে বসে পরলাম । মনেমনে ভাবলাম আর কেউ না উঠলে শুয়েও যাওয়া যাবে। ঘড়ি দেখলাম , রাত দেড়টা বাজে। জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে দেখলাম পুরো প্লাটফমটা ক্যামন ভূতরে হয়ে আছে ,কোন লোকজন নেই ।
এখানে সেখানে দু’একজন কাথা মুড়ি ঘুমাচ্ছে। দেখে বুঝাই যায় না প্রতিদিন হাজার
হাজার মানুষ এখান দিয়ে আসা যাওয়া করে। শত শত দু:খ,কষ্ট ভালবাসা বুকে নিয়ে।
হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাষ বেড় হয়ে এলো ।
আস্তে আস্তে ট্রেনটা চলতে শুরু করলো । আমি বাহীরে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম । সবকিছু ক্যামন পেছনে চলে যাচ্ছে। অনেকটা আমাদের জীবনের মতো । সব কিছু হারিয়ে যায় কালের গহর্ব্বরে । মিনিট বিশেক চলার পর ট্রেনটা থামলো কোথাও । আমি বুঝতে পাললাম না কোথায় থেমেছে ।
মনে হলো ঢাকার আশে পাশে কোথাও। ব্যাগ নিয়ে সার্ট প্যান্ট পরা একজন মাঝ বয়সি লোক উঠলো । চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকালো অনেকটা পরিচিতের মতো । তারপর এগিয়ে এসে ব্যাগটা রেখে ধপ করে আমার মুখোমুখি বসে বললো- ক্যামন আছেন ? কোথায় যাচ্ছেন ? আমি বেশ অবাক
হলাম। আমি চিনতে পারলাম না। কোথাও দেখেছি তা ও মনে পড়লোও না। আমার কপাল কুচকে গেল। আমি ছোট্র করে বললাম ভাল। আপনি ক্যামন আছেন? শেষের কথাটা ভদ্রতা রক্ষার জন্য বললাম ।
আর ভাল, যে দিন কাল পড়েছে, তাতে টিকে থাকাই দায়। লোকটা ফোস করে বললো।
আমি কিছু না বলে জানালার দিকে ঘুরে বসলাম । ট্রেনটা খুব জোরে চলতে শুরু করেছে। ঠান্ডায় হাওয়ায় চোখ বুঝে আসতে চাইছে। লোকটা একটা বই বেড় করে বসেছে। আমি সিটের হাতলে মাথা রেখে শুয়ে জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে রইলাম ।
কোথায় যাচ্ছেন তা তো বললেন না ?
চিটাগাং। আমি কথা না বাড়াবার জন্য ছোট্র করে উত্তর দিলাম। অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলাঠা ঠিক না। লোকটা মনে হয় আমার মনোভাব বুঝতে পারলো। মৃর্দু হেসে বললো –
আমি কিন্তু আপনাকে চিনি ?
আমি বেশ অবাক হয়ে আগের চেয়েও বেশি কপাল কুঁচকে লোকটার দিকে ভাল করে তাকালাম। ক্লিন সেইভ গোলগাল মুখমন্ডল আর চোখ নাক ছাড়া অন্য অন্য এমন কিছুই দেখতে পেলাম যে লোকটাকে আমার কাছে পরিচিত বলেমনে হবে ।
আমার যদি ভুল না হয় – আপনি “আমার কবিতা” নামে ব্লগে লিখেন, ঠিক বলেছি না?
এবার আমি বেশ চমকে উঠলাম। আরে এ বলে কি। এতো দেখি কোন ব্লগার ভাই ।
কিন্তু, আমি তো আপনাকে চিনলাম না ভাই। আমি শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বললাম।
আমাকে চিনবেন না। আমি কোন ব্লগার নই। তবে আমার মেয়ে ব্লগার। সেই লেখেটেখে। আমি শুধু সময় পেলে মাঝে মাঝে পড়ি। আপনার ভূতের গল্পগুলো আমার মেয়ের খুব প্রিয়। আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। তারপরও লজ্জাবনত চোখে বললাম – তাই নাকি। আমি হেসে ফেললাম, মনে মনে বেশ খুশি হয়ে উঠেছি। এর চাইতে বড় প্রাপ্তি একজন লেখকের কাছে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না ।
জ্বি, আপনার প্রতিটি ভূতের গল্প আমার মেয়ের কাছে প্রিন্ট করা আছে, সময় পেলেই
পড়ে। প্রতি শুক্রবার অপেক্ষায় থাকে আপনার নতুন কোন গল্পের জন্য। আমার লজ্জা পাবার পরিমান বেড়ে গেল।
আরে বাস! বলেন কি। আমি কি সব আবল তাবল; যা তা লিখি, তা আবার কারো কাছে ভাল লাগে নাকি। কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি ভাবে ?
বারে, ব্লগে আপনার ছবি দেয়া আছে না। লোকটা হেসে বললো।
তা আপনার মেয়ে কি নামে লেখে?
আপনিও ওকে চিনবেন ; ওর নাম নিসা । আপনার অনেক গল্পের নায়িকার নাম নিসা , তাই
না?
ও আচ্ছা! হ্যা; আমি তো ওনাকে চিনি। আমার অনেকগুলো গল্প বেশ মনোযোগ দিয়ে
পড়েছে। কিন্তু অনেক দিন ব্লগে আসছেন না।
ব্লগে না আসলেও আপনার গল্পগুলো কিন্তু বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ে ।
আমি ধন্য হলাম, আমার নাম সাখাওয়াত হোসেন বলে আমি লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম ।
আমি মোজাম্মেল হোসেন । আপনার সঙ্গে মিলিত হতে পেরে খুব ভাল লাগল । মোজ্জামেল সাহেব আমার হাতটা ধরতেই আমি চমকে উললাম । মনে হলো এক টুকরো বরফ কেউ আমার হাতে চেপে ধরলো। এতো ঠান্ডা কারো হাত হয় নাকি ?
আমি কোন মতে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম – আমারও খুব ভাললাগলো।
আচ্ছা আপনি বই বেড় করছেন না কেন?
জ্বি ব ! আমি মৃদু হাসলাম, তারপর বললাম – চাইলে-ই তো হয় না। তবে ইচ্ছে আছে,
আল্লাহ চাইলে বেড় করবো ।
যদি কিছু মনে না করেন আমার মেয়ের জন্য যদি একটা অটোগ্রাফ দিতেন। মোজাম্মেল
সাহেব অতি বিনয়ের সঙ্গে বললো। এবার আমি সত্যি সত্যি চমকে উঠলাম। আমার মনে লজ্জা। আমার গাল চোখ মুখ নাক গলে মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে। না, না আমি এতো বড় লেখক এখনও হয়ে উঠতে পারিনি।
তার মানে অট্রোগ্রাফ দেবেন না ।
না, না দেবো না কেন ।
তাহলে এখানে কিছু লিখে একটা অটোগ্রাফ দিন প্লিজ । মোজাম্মেল সাহেব আমার দিকে
একটা ঔষুধ কম্পানীর প্যাড আর কলম এগিয়ে দিয়ে বললো।
আমার হাতে আবার ও ঠান্ডা হাতের র্স্পশে পুরো শরীর শিউরে উঠলো । কলমটাকে মনে হলো ফ্রিজ থেকে বেড় করে আনা হয়েছে। আমি কাঁপাকাঁপা হতে লিখলাম – প্রিয় নিসাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা সহ ভালবাসা – “আমার কবিতা” তারপর ছোট্রো করে সাইন করে দিলাম ।
আচ্ছা সাখাওয়াত সাহেব , আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন? মোজাম্মেল সাহেব খুব সিরিয়াস ভাবে জিজ্ঞেস করলেন ।
আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না। হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলাম।
কি হলো কিছু বলছেন না যে? আপনি কি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করেন? ভূত প্রেতদেখেছেন
কখনও?
আমি একটু থেমে সময় নিয়ে বললাম – বিশ্বাস করিনা। আসলে ভূত বলে কিছু নেই।
আমাদের অনুভুতির খুব সূক্ষ্ন একটি ভীতিকর অংশের নামই হচ্ছে ভূত। তা ছাড়া আমরা মানুষ ও জীব যন্তুদের মস্তিস্কে কিছু সেল বা কোশ রয়েছে যেখানে কোন ঘটনার পরিপেক্ষির ভীতি কর অনুভুতির জন্ম হয় অ আসলে সেটাই ভৌতিক ভীতি বা ভূতের ভয়।
তারমানে আপনি ভূতে বিশ্বাষ করেন না?
জ্বি ,আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা। আসলে সবটাই অনুভুতির ব্যাপার। আমি বেশ বিজ্ঞের
মতো বললাম।
দেখেন; বিশ্বের সব জাতি কিন্তু ভূতের ভয় করে। আমেরিকা, লন্ডনে এমন অনেক বাড়ী আছে যেগুলো ভূতের ভয়ে খালি পরে আছে । মোজাম্মেল সাহেব রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন ।
আপনার কথা সত্যি। কিন্তু প্রকৃত খোঁজ নিয়ে দেখবেন এগুলো আসলে সবটাই রিউমার। আমি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে পাইনি যে, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে সে ভূত দেখেছে ।ভূত টুত বলে আসলে কিছু নেই ।
তাহলে আপনি এসব ভৌতিক কাহীনি লিখেন কেন?
আর ভাই, এটা তো আমাদের বিনোদনের একটা অংশ মাত্র। এর বাহীরে কিছু না। আমি হাসতে হাসতে বললাম। তারপর একটু থেমে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম – আচ্ছা আপনি কি কখনও ভূত দেখেছেন ?
মূর্হুতে মোজাম্মেল সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। একটা র্দীঘশ্বাস ফেলে বললেন সে কথা পরে হবে ।
দেখলেন তো আপনিও উত্তর দিতে পারলেন না। আসলে ভূত বলে কিছু নেই। যদি থাকতো, তবে এতো দিনে মানুষের সঙ্গে আপোষ-রফা করে আমাদের সমাজেই প্রকাশ্যে বসবাস করতো।ঈদে-র্পাবণে আমরা যেতাম ভূতের বাসায় বেড়াতে ওরাও আসতো আমাদের বাসায়। হা হা হা হা আমি হাসতে লাগলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব আমার হাসিতে মনে হলো একটু বিরক্ত হয়ে , পেছনে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বললেন – কিন্তু আমি ভূতে বিশ্বাস করি লেখক সাহেব !
তাই নাকি ?
তো কেন বিশ্বাস করেন। ভূত দেখেছেন নিশ্চই? আমি একটু ঝুকে অনেকটা ফিসফিস করে জিঞ্জেস করলাম ।
মোজ্জাম্মেল সাহেব এবার হাসলেন। হাসির মানেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। তবে
কেন যেন আমার বিরক্ত লাগলো, কোন কিছুতে বিশ্বাস করতে হলে চোখে দেখতে হয় , না দেখে বিশ্বাস করা যায় না, আমি যখন কথাগুলো বলছিলাম ঠিক সেই সময় খুব শব্দ করে পাশ দিয়ে একটা ট্রেন উল্টো দিকে চলে গেল ।
এটা কোন যুক্তি হতে পারে না লেখক সাহেব। এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা না দেখেও বিশ্বাস করি ।
- যেমন ? আমি কপাল কুচকে নাচিয়ে উদাহারন চাইলাম ।
যেমন ধরেন – বাতাস , যেমন ধরেন সৃষ্টিকর্তা । এরকম অসংখ্যা উদাহারণ আছে , ক’টা চাই আপনার ?
উ–প—স । আমি পিছিয়ে গেলাম। না আপনার সঙ্গে যুক্তিতে পারছি না। বলে আমি রন
ভেঙে দিলাম।
তারমানে কি আপনি ভূতে বিশ্বাস কললেন? মোজ্জামেল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন।
না। না। কখনওই না। ভূত বলে কিছুই নেই। সবই মানুষের কল্পনা। আমি একটু জোড়েই বলে উঠলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব হাতের বই প্যাড ব্যাগে ডুকাতে লাগলেন। আমি বেশ অবাক হয়ে
জিঞ্জেস করলাম – নেমে যাবেন নাকি ?
হা।
এখানে কোথায় নামবেন ?
সামনে কালিগন্জ ট্রেন থামবে ।
বুঝলেন কিভাবে যে ট্রেন কালিগন্জ চলে এসেছে ?
মোজ্জামেল সাহেব আবারও হাসলেন। ট্রেন কিন্তু থামলো না ; চলতেই থাকলো। আমি
বাহীরে তাকিয়ে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না ।
তিন…………….
আমি হাতের কলমটা নাড়াচাড়া করতে করতে মোজ্জাম্মেল সাহেবের ব্যাগ গোছানো দেখছি।
ব্যাগ গোছানো শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- তাহলে চলি লেখক সাহেব ।
আমি উঠে হাত মেলাবার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম, মনে মনে শিউরে উঠলাম ঠান্ডা
হাতের স্পর্শ পেতে হবে ব । কিন্তু মোজ্জাম্মেল সাহেব হাত না মিলিয়ে, আসি বলে,
সামনে পা বাড়ালেন। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম । হঠাৎ করে আমার হাত থেকে কলমটা পরে গেল, আমি বসে মোজ্জালেম সাহেবের দিক থেকে চোখ না সড়িয়ে বসে কলমটার জন্য হাতাতে লাগলাম, মোজ্জাম্মেল সাহেব তখন পৌচ্ছে গেছেন দরজার কাছে, হঠাৎ আমার চোখে গেল মোজ্জাম্মেল সাহেবের পায়ের দিকে – সঙ্গে সঙ্গে আমি ভয়ে আতকে উঠলাম , মোজ্জাম্মেল সাহেবের পা দুটো আমার দিকে ঘুরানো, অথচ তিনি দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। এটা কি করে হয়, শরীরটা সামনের দিকে অথচ পায়ের পাতা দুটো পেছনের দিকে। আমি কি করবো বুঝতে পারলাম না। ভয়ে সিটের দিকে চেপে গেলাম।
মোজ্জাম্মেল সাহেব দরজার কাছে দাঁড়াতেই দরজাটা আপনা আপনি খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কামরাটায় এক রাশ ঠান্ডা হাওয়া এসে ডুকলো, ভয়ে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। মোজ্জাম্মেল সাহেবের মাখুটা আস্তে আস্তে তার ঘাড় বেঁকে আমার দিকে গুরে গেল, আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, না, না এ হতে পারে না।
মোজ্জাম্মেল সাহেব মুখ হাসি হাসি করে বললেন – কি ভূতে বিশ্বাস হয় না? বলেই উনি চলন্তে ট্রেন থেকে বাহীরে হেঁটে গেলেন।
আমি ভয়ে ভয়ে জানালার কাছে গিয়ে মোজ্জাম্মেল সাহেবকে দেখার জন্য বাহীরে তাকালাম, কিছু চোখে পরলো না।
হঠাতই মোজ্জাম্মেল সাহেব জানালায় কাছে
উদয় হয়ে বিকট শব্দে হেসে উঠলেন – হাঅঅঅঅঅঅঅ।
আমি ভয়ে চমকে দিয়ে, চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালাম ।
লিখেছেন : মুহাম্ম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন
(পুর্বে প্রকাশিত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now