বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
#শেষ_দেখা
কানিজ ফাতেমা নওমি
সদ্য বিবাহিত বউ আমি।প্রথমবার নিজের স্বামীর সাথে অনেক দূরে ভ্রমনে যাচ্ছি। হানিমুনে নয়।২য় বর্ষের পরিক্ষা শেষ হয়েছে দুদিন হলো। হঠাৎ করেই পরিক্ষার মধ্যে দিয়েই পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেলো। শোভনের চাকুরীর সুবাদে ঢাকায়ই থাকতে হয়।কিন্তু, ওর বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। কিছুদিন আগে ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিয়ে তারা আবার গ্রামে চলে যায়। এখন আমি আমার স্বামী শোভনের সাথেই গ্রামে যাচ্ছি। শশুর বাড়িতে। পারিবারিকভাবে বিয়েটা হওয়ায় এখনো দুজনের মাঝে বোঝাপড়া ভালো করে হয়ে উঠে নি। হবেই বা কি করে পরিক্ষার ব্যস্ততার মাঝে বিয়ে হলে কি আর এতো কিছু ভাবা যায়? আমি আবার পড়াশোনা নিয়ে বেশ সিরিয়াস। যাইহোক, আমি শোভনকে একটু জোর করেই বললাম ট্রেনের টিকেট বুকিং করতে। তার প্রধান কারণ হলো, আমি কখনও ট্রেন জার্নি করি নি। এই প্রথম সুযোগ আসলো তাও আবার স্বামীর সাথে। তাই মিস করলাম না।
শোভন বেশ সুন্দর একটা কামড়া বুকিং করলো। আমাকে বসিয়ে দিয়ে একটু বাইরে গেলো শোভন। সারারাত নাকি জার্নি করতে হবে। তাই আগে থেকেই কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। আমি কিছু নিজের পছন্দের খাবারের কথাও বলে দিলাম।
১ সপ্তাহ ধরে শোভনকে দেখছি। মনে হয় একটা ভালো স্বামী পেয়েছি। আমার ইচ্ছেগুলো অনেক গুরুত্ব দেয় ও। আমার পড়নে ছিল বেগুনি রঙের শাড়ী। হাতে মেহেদীর রং এখনও যায় নি। নাকে বেশ উজ্জ্বল একটি ডায়মন্ড নোজপিন। বেশ অন্য রকম সুন্দরী লাগছে আমাকে। অনেকেই ঢ্যাপঢ্যাপ করে তাকিয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে নতুন বউ।
একটু বেশি দেখছে আমার বিপরীত পাশে বসে থাকা মহিলাটি। তরুণী ই বলা চলে। তার কোলে ছিল ছোট্ট একটি বেবি। কি মিষ্টি দেখতে বাবুটা! অনেক কোলে নিতে ইচ্ছে করছে। আমি তো অপরিচিত একজন, আমার কোলে দিবেই বা কেন?
জালানার দিকে তাকিয়ে আছি। আর ভাবছি, আমারও কোনো একদিন..........
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। শোভন এখনো আসছে না কেন?
-"ফারহানের জন্য বেশি করে ডায়পার নিয়ে নিলাম। এগুলো ব্যাগে রাখো।"
গলাটা বেশ চেনা মনে হলো। ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই রীতিমতো আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
-জাহিদ!
এটা কি করে সম্ভব?
জাহিদের সাথে অনামিকার চোখে চোখ পড়তেই। সে ও একই অবস্থা।
-জাহিদ কিছু একটা বলতে গিয়েও মুখ বন্ধ করে ফেললো।
এর মধ্যেই শোভন এসে গেছে।
-অনামিকা,তোমার জন্য আঁচার নিয়ে নিলাম। অনেক দূর জার্নি করতে হবে তো৷ যদি পথে খারাপ লাগে।
একটু কৃত্রিম হাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে আঁচারের প্যাকেট গুলো নিলাম৷
আমি ততক্ষণে ভাবনার সাগরে ডুবে ছিলাম।
ট্রেন চলছে। আমি জালানার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম। সেই পুরনো কথা গুলো। কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই জাহিদকে নিয়ে।
কে এই জাহিদ তাই না? যাকে দেখে আমার হাঁসি মুখটাও গোমড়া হয়ে গেল৷
হবে না কেন? আমার ভিতরটা যে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। আমার শ্বাস নিতেও অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমার হাত- পা গুলো ক্রমশ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। এভাবে দেখা না হলেও তো পারতো।
জাহিদ ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা। আর আমাদের রিলেশন নিয়ে আমার চেয়ে ও বেশি সিরিয়াস ছিল। খুব গোছাল একটা ছেলে। কিভাবে কি করবে? আমাদের স্বপ্নগুলো কিভাবে পূরণ করবে।তা নিয়ে সবসময় চিন্তা করতো৷ আমাদের মাঝে খুনসুটিও ছিল অনেক বেশি। হাস্যকর ব্যাপার গুলো নিয়ে ঝগড়া হতো। জাহিদের আগে থেকেই বেবি খুব পছন্দের। ছোট ছোট বেবিদের ড্রেসের পিক দিয়ে আমাকে বলতো। দ্যাখো, এটা আমাদের বেবির। আমি যদি মুখ ফসকে কখনও বলে ফেলছি। এটা আমার বেবির। তবু্ও ঝগড়া। বেবি কি তোমার একার? আমিও ওকে রাগানোর জন্য বলেই যেতাম৷ হ্যাঁ, আমার একার। ব্যস। তুমুল ঝগড়া। ব্লক পর্যন্ত দিয়ে দিতো আমাকে। আর কখনও নাকি কথা বলবে না আমার সাথে। আগেই বলে রাখি৷ ওর রাগ আর জেলাস টা বেশি ছিল। আমি আর কিছু বলতাম না। কিন্তু, ঘন্টা খানেক পর আবার নিজেই কল দিয়ে করুন স্বরে বলতো," আই লাভ ইউ, সোনা"! আমি পারবো না তোমার সাথে কথা না বলে থাকতে।
আবার সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যেতো।
এই ছেলেটা বড়জোর কয়েক ঘন্টা অভিমান করে থাকতে পারতো।
তবে ছেলেটার বড্ড অভিমান ছিল,একটু কল দিতে দেরি হলে, বা কল কেটে দেওয়ার আগ মূহুর্তে "আই লাভ ইউ" না বললে ও ঝগড়া করতো।
এতো খুনসুটির মাঝেও অনেক ভালো ছিল আমাদের সম্পর্কটা। প্রথম যেদিন আমরা ডেট করতে বের হই৷ ও আমার চেয়ে বেশি লজ্জা পাচ্ছিল। সেই দিন টা ছিল, আমার সবচেয়ে সুন্দর একটা দিন। সারাদিন ঘুরেছি। হাত ধরাও বারণ ছিল। কেননা, বিয়ের আগে এসব ছোঁয়া ছুঁয়ির ব্যাপারগুলো আমাদের দুজনের ই পছন্দ নয়। কিন্তু, তবুও অজান্তেই হাত ধরে ফেলেছিলাম। আর আমি বলেছিলাম,প্লিজ এই হাতটা ছেড়ে কখনও যেও না।
প্রেমটা শারীরিক না হলেও মনের দিক থেকে অনেক গভীর ছিল। তবে সবসময় আমরা দুজন ই দুজনকে নিয়ে অনেক ভয়ে থাকতাম। যেন হারিয়ে না ফেলি।
সে বার জাহিদ আমাকে বলেছিলো, এভাবে প্রেম করা পাপ হয়। এই যে তোমার সাথে কথা বলছি এটাও ঠিক নয়। চলো আমরা গোপনে রেজিষ্ট্রিটা করে ফেলি। যতদিন না আমি ভালো একটা জব পাচ্ছি ততদিন এ বিষয়টা গোপন রাখবে। তারপর, দুই পরিবারকে জানানো হবে। আমি এ বিষয়টা ও গুরুত্ব দেই নি। অথচ, জাহিদের কিছু শর্ত। নিয়ম করে মোবাইলে কথা বলা,কখন কি করছি তা সব কিছুই আগে থেকে জানানো। ইত্যাদি ব্যাপারগুলো পালন করতে গিয়ে সম্পর্কের অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারের ধরা পড়ে যাই। এবং তাদের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হই। হ্যাঁ, আমি একজনকে ভালোবাসি।
বাব-মা সম্পর্কটা খারাপ ভাবে দেখেন নি৷ বরং বলেছিল, যে ই হোক৷ আমাদের সাথে দেখা করাও। জাহিদ শুনে নি সে কথা। অনেক বলেছিলাম। আমার বাবা-মা তো আর অবুঝ না। যে দেখা করলেই এখনই তোমাকে বলবে বিয়ে করার কথা। তারাও বুঝে তোমার চাকুরী নেই।
জাহিদ এটাও বলতো," আমি তোমার বাবা-মায়ের অপছন্দের মতো ছেলে না।" তাহলে না মেনে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
তারপর সেই সময়টা ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়। আমার জীবনের কিছু অব্যক্ত অধ্যায়। এক দিকে জাহিদ আসবে না বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে। অন্য দিকে বাবা-মা চায় না আমি জাহিদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখি। কি বলবে আর? উনারা বাবা-মা তো! ভয়ে ছিল। জাহিদ আমাকে সত্যি ভালোবাসে তো! আর যদি ভালো বেসেই থাকে তাহলে এসে দেখা করতে প্রবলেম কি?
তখন তারা ধরেই নেয়, জাহিদ আমাকে ঠকাচ্ছে।
ছেড়ে দিতে বললেই কি ছেড়ে দেওয়া যায়? আমি তো অনেক ভালোবেসেছি। আমি তো পারছিলাম না ছাড়তে।
-"ফারহানকে একটু ধরো তো" জাহিদ নিজের ছেলেকে কোলে নিলো বউয়ের কাছ থেকে। এখন কেমন প্রাপ্ত পুরুষ দেখায় জাহিদকে। বাবা হয়ে গেছে। এই তাহলে তানজিলা? যার জন্য আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলো? তানজিলা কি অনেক ভালোবাসতো? আমার চেয়ে বেশি খেয়াল রাখতো?
-অনামিকা? কি ভাবছো? মন খারাপ নাকি? অন্য দিকে ফিরে আছো?
.শোভন প্রশ্ন গুলো করে যাচ্ছে। আমি একটু মুচকি হাঁসি দিয়ে নাবোধক বাক্যে জানিয়ে দিলাম। না তেমন কিছু না। আমার বেশ ভালো লাগছে।
অপরদিকে বসে থাকা,জাহিদ।
বারবার ই আঁড়চোখে আমাকে আর শোভনকে দেখছে। হয়তো, আমার মতো করে সেই আগের কথা গুলো ভাবছে।
তারপর.......
-জাহিদের অপেক্ষা করতে করতে একদিন জানিয়ে দিয়েছিলাম। বাবা-মা চায় আমি তোমার সাথে সম্পর্ক না রাখি। ও আক্ষেপ করে নি। বরং বলে দিলো,তোমার জন্য সব হয়েছে। দুনিয়াতে আর কোনো মেয়ে প্রেম করে না নাকি। তারা বছরের পর বছর প্রেম করে বেড়ায়। অথচ, ফ্যামিলির কেউই জানে না। আর তুমি কি করে পারলে এতো অল্প সময়ে সব জানিয়ে দিতে? মিথ্যে বলতে পারলে না?কি এমন হতো? মিথ্যে বললে?
এখন তোমার দোষে তুমি আমাকে হারিয়েছো। এর জন্য তুমি দায়ী। আর আমাদের এমন কিছুই হয়ে যায় নি। তোমার হাতটা ধরেছি শুধু। এর বেশি কিছু তো হয় নি।
প্রতিনিয়ত এই কথাগুলো বলে। আর জাহিদ আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আমি পারি নি ভালো থাকতে। দম বন্ধ হয়ে যেতো আমার। প্রতিদিন না ঘুমিয়ে কান্না করা ছিল আমার রুটিন। এতো কষ্ট আমি কখনও পাই নি। বারবার ফোন দিয়ে জাহিদকে বিরক্ত করতাম। আমি পারছিলাম না ওকে ছাড়া থাকতে। শূন্যতা এতো বেশি ছিল। যে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। আচ্ছা, হাত ধরা ছাড়া আর কিছু হয় নি বলে কি ছেড়ে দেওয়া সহজ? তাহলে আমার ভালোবাসার কোনো দাম নেই?তবুও নিজেকে অপরাধী আখ্যা দিলাম।
জাহিদকে বললাম, তোমার আসতে হবে না৷ দেখা করতে হবে না আমার বাবা-মায়ের সাথে।তুমি সময় মতোই এসো। কিন্তু,সম্পর্কটা ভেঙে দিও না। প্লিজ। আমাকে একা করে ছেড়ে দিও না। আমি পারবো না তোমাকে ছাড়া থাকতে৷ এতো কান্না করতাম, এতো অনুরোধ করতাম। সে কিছুতেই ফিরবে না।
তার কারনও সে আমাকে জানিয়ে দেয়। তার জীবনে অন্য কেউ এসে গেছে।একটা রিলেশন থাকা কালীন অনেকেই নাকি থাকে!কোথায় আমার তো কেউ ছিল না? আর নতুন নাকি অনেক ভালো। অনেক কেয়ারিং, যত্নশীল। সম্পর্কটা নিয়ে অনেক সিরিয়াস৷
ওর কথায়,আমি কখনও সিরিয়াস ছিলাম না। আমি নাকি কখনও তার কথা শুনে চলি নি৷ নতুন নাকি ওয়াশরুমে গেলেও তাকে বলে যায়৷ এতো বেশি ভালো কাউকে পেয়েছে জীবনে৷ আমি তো সবসময় কথা বলতে পারতাম না।সময় দিতে পারতাম না। নতুন অনেক কথা বলে। অনেক সময় দেয়।
যে কেউ বুঝতে পারে, এই কথাগুলো মনের মধ্যে কতটা দাগ কেটে যায়৷ পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল৷ সত্যি এই মানুষটা আজ অন্যের?
-হ্যাঁ, অন্যের ই তো। ওই যে বসে আছে নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে৷ আর পাশেই তার বউ। আজ কেমন সাংসারিক লাগে ওকে। এখন কি আর কথায় কথায় রাগ করে? আচ্ছা, সেই রাগ কি আমার মতো করেই ভাঙায় ওর পাশে থাকা সহধর্মিণী ?
.একটা কথা আছে জানেন তো। কেউ নাকি ভালোবাসলে অনেক বেহায়া হয়ে যায়। নিজের সেল্ফ রেস্পেক্ট বলে নাকি কিছু থাকে না তখন৷ আমার ও তাই হয়েছিলো ৫ বছর আগে।
হাজার অবহেলার পরেও বারবার কল দিয়ে কথা বলার মিথ্যে চেষ্টা করেই যেতাম। মিথ্যে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে কত কি না করেছি। এমনটা ও বলেছিলাম,
-জাহিদ, নতুন কেউ আসছে তো কি হয়েছে? বিয়ে তো করে ফেলো নি! বলে দেও। তোমার প্রাক্তনকে তুমি ভালোবাসো।
সে সরাসরি জানিয়ে দেয়। কেন শুধু শুধু আমার পিছনে পরে আছো? তুমি অনেক ভালো মেয়ে আমার থেকে ভালো কাউকে পাবে তুমি। আমি তোমাকে ধরে রাখতে পারি নি। এটা আমার ব্যর্থতা। আমি তোমাকে বুঝতে পারি নি। তুমি আমাকে এতো ভালোবাসো। প্লিজ, নিজেকে সামলাও। আমি এখন অন্য কারো।
.
পারিনি তখনও সামলাতে। বেহায়ার চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম। নিজেকে তুষ্ট এক বস্তু মনে হতো। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মানুষ আমি। কল দেওয়া, মেসেজ করা চলতেই থাকতো৷ সে অনেক সময়ই বিরক্ত হয়ে ফোন বন্ধ করে রাখতো। কখনও কখনও কেটে দিতো বারবার।
সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন সেই মহীয়সী নারী যার জন্য আমাকে এতো অবহেলা করছো?
একটা ভুলের এতো বড় শাস্তি? কি নাম তার?
নামটি বলেছিল,.....!
-তানজিলা, রুমালটা একটু দেও।
জাহিদ কথাটা তার বউকে ইঙ্গিত করে বলে। অনামিকা কথাগুলো ভাবছে ঠিকই। কিন্তু, তার কান খুব সজাগ। উফফ! জাহিদের কথাগুলো আজও কেমন কানে বাজে। এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছি ওর বলা কথায়।
.
হ্যাঁ,তানজিলা নামটি ই বলেছিল।
-অনামিকা, খারাপ লাগছে খুব তাইনা? আচ্ছা,তুমি চাইলে আমার কাঁধে মাথা রেখে বসতে পারো।
শোভন ছেলেটা এতো খেয়াল কিভাবে রাখে?
সত্যিই খারাপ লাগছে। মাথাটা ক্রমশ ঝিমঝিম করছে। ওর কাঁধে মাথাটা রাখলে একটু ভালোই লাগতো বোধহয়। কিন্তু, জাহিদ! সে বিষয়টা বাজেভাবে নিবে না তো। ওর তো বাজে কথা বলতে একটুও বুক কাঁপে না।
যাইহোক, শোভন আমার স্বামী৷ ওর কথায় আমার কি আসে যায়?
মাথাটা কাঁধে রাখলাম৷ শোভনের একটা বাজে অভ্যাস আছে। ওর বেশি কাছে গেলেই শক্ত করে হাত ধরে রাখে। সামনে হাজারটা লোক থাকলেও তাই করে। বললেই একটা কথা শুনিয়ে দেয়। তুমি আমার বউ, অনা। আমার বউকে আমি হাত ধরবো না তো কে ধরবে?
এই পুরো বিষয়টি বিপরীত পাশে বসে থাকা জাহিদ বেশ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই এমন ভাবে তাকালো। মনে হলো, আমি মস্ত বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছি। অন্য সময় হলে সরিয়ে নিতাম হাতটা। কিন্তু, আজ আর সরিয়ে নিলাম না। তবে, মনকে ও স্থির করতে পারছিলাম না। আমার বডি লেংগুয়েজে কি প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছিলো? আমি এগুলো মানতে পারছি না!
নোংরামি তো ছিল জাহিদের মনে। সেদিন ওর নতুন প্রেমিকার নাম শুনেও বলেছি। শেষ বেলায় তুমি আমার থেকে যেও৷
এদিকে আমার সাথেই পড়াশোনা করতো। এক ছেলে বন্ধু আমাকে নাকি খুব ভালোবাসে। আমার আর জাহিদের ব্রেকআপের কথা শুনে। আমার ক্লাসের পর আমার সাথে কথা বলে। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য উপদেশ দেয়। উপদেশ গুলো খারাপ ছিল না। তবে জাহিদকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছিল বলে, আমার ওকে শত্রু মনে হয়েছিল। আমি রাগ হয়ে ওর সামনে থেকে বের হয়ে আসি। আর বলি, তুই আমার সাথে আর কখনও কথা বলতে আসবি না। জাহিদ ছিল আর জাহিদ ই থাকবে।
জানিনা, ও রাগ থেকেই! নাকি আমাকে পাওয়ার জন্য। ওর সাথে অনেক আগের তোলা একটি ফেল্ফি জাহিদকে পাঠিয়ে দেয়।
ব্যস, এখন তো আমি জাহিদের কাছে একজন ঘৃণার পাহাড়। এমনিতেই এই ছেলেটা খুব সন্দেহ প্রবন। আমার সমস্ত কিছু পার্সওয়ার্ড পর্যন্ত জানতো। তবুও আমাকে অবিশ্বাস করে বসে। আর খুব বাজে কথাও বলে। আমার কোনো কথাই শুনতে চায় না। তুমি একটা খারাপ মেয়ে৷ এই তুমি আমাকে ভালোবাসো। ছি! ভালো হয়েছে তোমাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। ঘেন্না হয় তোমাকে। আমার সাথে ব্রেকাপ হতে না হতেই নতুন কাউকে ধরে ফেলেছো?
-ওই ছেলে তোমার হাত ধরেছিলো তাই না? ওই হাত আমি আর কোনোদিনও ধরবো না।
আমি বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম জাহিদের অদ্ভুত আচরণ দেখে। ভেবেছিলাম ওর কোনো নতুন কেউ নেই। থাকলে এভাবে বলতে পারতো না। ও আজও আমাকে ভালোবাসে। শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এগুলো বলে।
তবে সত্যিই আর হাত ধরা হয়ে উঠে নি। শেষবার যেদিন দেখা হলো, ওর ইচ্ছে ছিল না দেখা করার। অনেক বার আমি রিকুয়েষ্ট করেছিলাম। আমার সাথে দেখা করার জন্য। আমি চেয়েছিলাম। ওকে সবটা বুঝিয়ে বলতে। অনেক রিকুয়েষ্ট এর পর দেখা করেছিল। এক রিকশায় পাশাপাশি বসেও ছিলাম। কিন্তু মনের দুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আমার পাশে বসা মানুষটা আমার আর নেই আমি তখন বুঝতে পারি যখন ওর একটা ফোন আসে। ও বলছিলো, দু একদিনের মধ্যে একটা রেজিষ্ট্রি করবে।কথাটা শুনে একটু অবাক ই হয়েছিলাম। কিসের রেজিস্ট্রির কথা বলছে জাহিদ?
সামনাসামনি দেখা করার পর। ১ঘন্টার মতো জাহিদকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম৷ ওর ভুল বুঝার কারণ গুলো বললাম। কিন্তু, না। সে আমাকে বিশ্বাস করে নি। বরং আমি পাশে থাকা সত্ত্বেও সে তানজিলা নামের মেয়েটির সাথে চ্যাট এ ব্যস্ত ছিল। হ্যাঁ, তাহলে সত্যিই কেউ এসে গেছে।
একটা মেয়ের জীবনে আমি মনে করি এটি অনেক বড় একটা কষ্টের উদাহরণ মাত্র। জানিনা, কিভাবে সেইদিনটা পার করেছিলাম। মনে হলে বুকের ভিতরটা আজও কেমন নাড়া দিয়ে উঠে। অনেক অসহায় ছিলাম সেদিন। মুখ লুকিয়ে কান্না করা। বুকের ভিতরটায় নিশ্বাস আটকে আসছিল বারবার। চোখের পানিগুলো কেমন সস্তা ছিল। না চাইতেই অনবরত ঝরছিল।
আর সবথেকে দামী সারপ্রাইজ তো পেয়েছিলাম সেদিন,২ দিন পর যখন আমাকে মেসেজ করে জাহিদ বললো, আমি বিয়ে করে ফেলেছি। নিজেরাই রেজিস্ট্রি করে ফেলেছি। ওই সে সেদিন রেজেস্ট্রির কথা বলেছিল। তার মানে এই জন্য?
বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মিথ্যে প্রহসন মনে হচ্ছিল সেই মেসেজটা। কেমন যেন থমকে গেলাম আমি। কই চোখ থেকে জল পড়ছে না তো! বেশ কিছুক্ষণ থমকে বসে ছিলাম। মেসেজ এর ফ্লাস লাইটটা বারবার অফ হয়ে যাচ্ছে। আর আমি পূনবায় অন করে দেখলাম মেসেজ টা। তবে কিছু রিপ্লাই করি নি।
বেশ কিছুক্ষণ পর শুধু সজোরে একটা চিৎকার দিলাম। -নায়ায়ায়ায়া। জাহিদ। এটা তুমি কি করলে?
বুক ফেটে কান্না আসছিলো কেন আমার? কেন নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না? জাহিদ আর আমার না। আর কখনও আমার হবেও না। শেষ আশা টুকু ও ফুরিয়ে গেছে। ও এখন অন্য কারো বর। আমি সারাজীবন এর জন্য হারিয়ে ফেললাম জাহিদকে৷
. আচ্ছা? আমি কি অনেক বেশি অন্যায় করে ফেলেছি? যার জন্য এতো বড় শাস্তি আমায় দিলো জাহিদ। আমি অনেক বড় অপরাধী।
সেদিন সারাজীবনের জন্য ব্লক দিয়েছি। অন্য কারো স্বামীকে মেসেজ করা বা তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করার মতো কাজ আমি করি নি কোনোদিন। তবে, নিজেকে স্বাভাবিক করতে বছর দুই এক লেগে গেছে। তবুও কি সেই মানুষটাকে এতো সহজে ভোলা যায়? প্রথম ভালোবাসা।
.
বিগত পাঁচ বছর পর আজ দেখা। সে অনেক বদলে গেছে। সামনে ষ্টেশনে নেমে যাবো আমরা। জানিনা আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা। কথা হবে কিনা তাও জানিনা। হারিয়ে যাবো দুজন দুই প্রান্তে। সে অনেক সুখী। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করেছে। কতটা ভাগ্যবান হলে ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়া যায়। যে পায় শুধু সে-ই জানে এর মর্ম। আমি তো আর পেলাম না। কি করে বুঝবো?
যাইহোক, সে ভালো আছে। আমারও ভালা থাকাটা দরকার। আমারও একটা সুন্দর সুখী পরিবার গড়ে তোলা দরকার। খুব দরকার ভালোবাসার ছোঁয়া পাওয়া। একজন মিথ্যে মানুষকে ভালোবেসে ৫টা বছর নষ্ট করলাম৷ কোথায়? সে তো আমার কথা ভেবে কিছুই নষ্ট করে নি। তার তো সব কিছু পরিপূর্ণ, গোছালো। একদিন যেই স্বপ্ন গুলো সে আমাকে নিয়ে দেখতো। আজ সেই স্বপ্ন গুলোকেই সে অন্য কারো হাত ধরে পূরণ করে যাচ্ছে। হয়তো এটাই নিয়তি। স্বপ্ন বুঁনে একজন আর সে স্বপ্নটা বাস্তবে রুপ দেয় অন্য কেউ।
স্ট্রেশন এসে গেছি। নামার সময় শেষ বারের মতো একবার তার দিকে চেয়ে মনে মনে বললাম। খুব ভালো থেকো।এভাবেই হাসিখুশি থেকো।মুখ ফোসকে কেউ ই কারও সাথে কথা বলি নি৷ কিভাবে বলবো? আমরা দুজন যে আজ দুজন অন্য মানুষের অধীনে।
শোভনের বাহুতে ডান হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে হাঁটছি। স্টেশন থেকে টেক্সি ধরবো৷
হঠাৎ করেই বলে উঠলাম , জানো শোভন। একটা কথা তোমায় বলা হয়নি। ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। এই প্রথম বার শোভনকে ভালোবাসি কথাটা বললাম।
কতটা খুশি হয়েছে তা ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছে।আজ থেকে চেষ্টা করবো শোভনের ভালো থাকা আর ভালো রাখার দায়িত্ব নেওয়ার।
শোভন মুচকি হেঁসে বলে, আমিও ভালোবাসি। তোমার চেয়ে একটু হলেও বেশি ভালোবাসি৷
মন থেকে বলেছি কিনা জানিনা। স্বামী তো বলতে ইচ্ছে হলো তাই বললাম।
সমাপ্ত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now