বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বিমানের জানালা যে আকাশটা দেখা যাচ্ছে সেটা প্রতিদিনের চেনা সেই স্নিগ্ধ আকাশ নয়। এই আকাশ ধোয়াটে। হাটু দুটো টনটন করছে তার, আরো কতোটা পথ পাড়ি দিতে হবে কে জানে! এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিদায় দিতে এসে ডুকরে কেঁদে উঠে জুই বলেছিল,"ছুটিটা পেয়েই আমি প্লেনে উঠবো। তুমি একা যেতে পারবে তো?"
একা? হ্যা, একাই তো। সত্যিই আজ বড্ড একা হয়ে গেলেন বনলতা।
প্রথম দিনটির কথা আজ খুব বেশি মনে পড়ছে। আজকাল কিছুটা ধূসর হয়ে এসেছে স্মৃতিগুলো। তবুও মনের আকাশে স্পষ্ট সেই অস্থির, চঞ্চল মুখটা। সামনে এসেই তাকে বলেছিল, "তোমার বান্ধবিরা বললো তুমি নাকি গান গাইতে জানো? ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠানে তোমাকে গাইতে হবে। যার গাওয়ার কথা ছিল সে আজকে আসেনি।" কথাগুলো শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেংে পড়ে তার। মফস্বলের স্কুল-কলেজে গান গাওয়া এক কথা, আর ভার্সিটির এতো মানুষের সামনে স্টেজে ওঠা? অসম্ভব! কাঁচুমাচু মুখ দেখে সে রীতিমতো বিরক্ত হয়ে তিনি সেদিন বলেছিল,"সেকি! কথা বলছো না কেন? আমি তোমার নাম লিখে নিচ্ছি। কি নাম তোমার, বলো?
একটু ইতস্তত করে বনলতা বলেছিলেন,"নাম? মানে আমার নাম? বনলতা চৌধুরী।" মুহূর্তেই রাজ্যের ব্যস্ততা আর অস্থিরতা থেমে গেলো। কলমটা কাগজের ওপর আটকে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কৌতুক মেশানো চোখ দিয়ে তাকিয়ে রইলো লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়া মুখের দিকে তারপরেই প্রাণখোলা সেই উদাত্ত হাসি। চোখে হাসি ধরে রেখেই বললো, "বনলতা চৌধুরী। বনলতা সেন নয়? কি সর্বনাশ!" তখন থেকেই বনলতার মনের ভেতরে সর্বনাশের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছিল। ধীরেধীরে সে তার হৃদয় হারিয়ে ফেলে। আর ওই মানুষটাও তাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিল।
ভালোবেসেই বিয়ে তাদের। বিয়ের পর কতোদিন, কতোবার, কতোকিছুই না একই রকমভাবে অনুভব করেছে তারা! একই আনন্দ, একই উচ্ছ্বাস, একই বেদনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। তবে আজ কেন সৃষ্টিকর্তা এইভাবে দুজনকে আলাদা করে দিলেন! বিমানবালা এসে খাবার দিতে চাইলে নিষেধ করলেন বনলতা। কেন যেন অব্যক্ত কান্নায় আর অভিমানে ফুঁসে উঠছে হৃদয়টা বারবার। চোখের সামনে যেন একের পর এক ফেলে আসা স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে।
বিয়েটা দুইবাড়ির কেউ মেনে নেয়নি। সংসার চালাতে চাকরির পাশাপাশি টিউশনি শুরু করেছিল লোকটা। তবুও কি সংসার চলে? বড়ছেলেটার যখন টাইফয়েড ধরা পড়ে ছেলের কষ্ট দেখে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরবে কেঁদেছিল সে, বনলতা দেখে ফেলেছিলেন। দুই ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ, সংসারের খরচ চালাতে দুজনেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তখন সেই দাত চেপে, ঘাড় গুজে কষ্ট সহ্যের দিনগুলোতে, নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সময় কখনোই এতোটা একা একা লাগেনি বনলতার। অথচ এখন সবকিছুই আছে -- অর্থকড়ি, সম্মান, সন্তানদের সাফল্যময় জীবন, ফেলে-ছড়িয়ে খরচ করার মতো সামর্থ্য তবুও হাহাকারে ভরে আছে হৃদয়।
একবার সবাই মিলে কক্সবাজার যাওয়া হয়েছিল। সমুদ্র দেখে ছেলেটার কি আনন্দ! আর মেয়েটা ভয়ে সিটিয়ে ছিল, জোর করে তাকে সমুদ্রে নামাতে হয়েছিল। আর এখন জুইয়ের ফ্লোরিডার বাড়িটার সামনেই সমুদ্র। ছেলেটা বুয়েটে চান্স না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে নেশা করতে শুরু করেছিল। আর এখন সেই ছেলেই মেলবোর্ন থেকে সেখানেই বড় চাকরি করে। ওর প্রাসাদতূল্য বাড়ি আর শানশওকত দেখে যেকেউ অবাক হবে। ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে, যথাবিহিত সম্মানপূর্বক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে যে যৎসামান্য সঞ্চয় ছিল তা দিয়েই তাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটা কেনা হয়েছিল। ছেলে-মেয়ের প্রাসাদের তুলনায় সেটা নিতান্তই কুঁড়েঘর।
তবুও সেই ছোট্ট বাসাটাই ছিল বনলতার কাছে রাজপ্রাসাদ। বনলতা ভেবেছিলেন এই ছোট্ট কুঁড়েঘরেই আবার আগের মতো বই পড়ে, নাটক দেখে, ভালোবেসে, ঝগড়া করে আর গল্পগুজব করেই দুজনের বাকি জীবনটা কেটে যাবে। কিন্তু সেটা আর হলোনা। বাদলের ছেলে হওয়ার পর ফোন করে অনুনয় করে বললো, "মা, তুমি প্লীজ চলে এসো। বাবুর ছয়মাস হওয়া পর্যন্ত অন্তত থেকে যাও।" সেখান থেকে ফেরার পর জুই ফোন করে জানালো যে, "কদিন পরেই লাইসেন্স পরীক্ষা, মেয়েটাকে দেখবে কে? তুমি না এলে আমার পরীক্ষা দেওয়া হবেনা।"
পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটোছুটি শুরু বনলতার। কাছের মানুষটাকে সাথে নিয়ে যেতে চাইলেও দেশের মাটি ছেড়ে অন্যত্র যেতে তিনি নারাজ। স্কাইপে কথা হতো প্রতিদিন, তবুও যেন এক সমুদ্র দূরত্ব দুজনের মধ্যে। আর এখন তো দূরত্বের মাত্রাটা যোজন যোজন বেড়ে গেল। বিমান সবেমাত্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। যাত্রীদের চোখে-মুখে স্বস্তি আর আনন্দের ছাপ। সবাই প্রিয়জনদের কাছে ফেরার আনন্দে মেতে আছে।
বনলতা মুখ নিচু করে চোখ মুছলেন। তাকে যেতে হবে বারডেমের হিমঘরে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে তার একজীবনের ভালোবাসার শেষ প্রহর, তার স্বামী। আজ নিজের হাতেই যবনিকাপতন ঘটবে সেই প্রেমের গল্পের।
SUBORNA AKHTER ZHUMUR
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now