বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প – ১১
✍️✍️নাফিজ আহমেদ
নিরালা দুপুর। বাড়ির আঙিনায় এক ধরনের নীরবতা নেমে এসেছে। সকলে দুপুরের খাবার শেষে বিশ্রাম নিচ্ছে। আর অল্প সময় পরই রওনা দিতে হবে।
ঘরের এক কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ইমা। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে হালকা অশ্রু। তার মনে কেমন এক বিষণ্ণতার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নেহা আর তানভীর নানাকে ঘিরে হাসি-আড্ডায় মেতে আছে। তালহাও সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে আছে। কয়েকদিন থাকার পর আজ তাদের ফিরতে হবে বোনের বাসা থেকে। মন খারাপ হলেও উপায় নেই—যেতে তো হবেই।
ইমন সাহেব ধীরে ধীরে মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোমল কণ্ঠে বললেন,
—কি হয়েছে মা? মনটা খারাপ নাকি?
ইমা মাথা নিচু করে উত্তর দিল,
—না বাবা, এমনিতেই দাঁড়িয়ে আছি।
—আমরা চলে যাচ্ছি বলে মন খারাপ করছিস?
ইমা চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—না মানে... আর কয়েকদিন থেকে গেলে হয় না বাবা? কত বছর পর তোমাকে পেলাম। ছোটবেলা থেকে তোমার আদর যত্ন পাইনি। এখন এসেই আবার চলে যাচ্ছো!
ইমন সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—দেখ মা, আমরা কি একেবারে চলে যাচ্ছি? আমরা তো নিজেদের বাড়িতে যাচ্ছি। তুইও তো আসবি। আবার দেখা হবে, আবার একসাথে হবো। মন খারাপ করিস না। তুই জানিস, আমাদের বাড়িটা এখন একেবারে খালি পড়ে আছে। কেউ থাকে না। তালহা ঢাকায়, তুইও খুব একটা যাস না। এখন গিয়ে সব গোছাতে হবে, নতুন করে সাজাতে হবে।
ইমা নিঃশব্দে বলল,
—বাবা, সত্যিই আবার সব কিছু সাজাতে পারবা? মাকে ফিরিয়ে আনতে পারবা? আমাদের সবাইকে একসাথে রাখতে পারবা? সেই দিনগুলো কি আর ফিরে আসবে?
মেয়ের কথায় ইমন সাহেবের চোখ ভিজে উঠল। সত্যিই তো—যা চলে গেছে, তা আর ফিরে আসে না। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না; বাস্তবতার মাঝেই চলতে হয় জীবনের পথ।
এমন সময় নাফিজ সাহেব এসে বললেন,
—কি রে ইমন, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস? চল, দেরি হয়ে যাবে তো।
তিনি ইমার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু দেখে এগিয়ে গেলেন। কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—চল মা, সবাই অপেক্ষা করছে।
ইমন সাহেব মৃদু কণ্ঠে বললেন,
—দেখ মা, সব হয়তো আগের মতো আর হবে না। তবে আমি বিশ্বাস করি, তুই সবসময় আমার পাশে থাকবি। তোর নাফিজ কাকা তো বলছে, “থেকে যা কিছুদিন,” কিন্তু নিজের ঘরবাড়ি থাকতে অন্যের বাড়িতে থাকা যায় নাকি? তাছাড়া সেই বাড়িতে তো আমাদের হাজারো স্মৃতি... আমি সেগুলো বুকে নিয়ে বাকিটা জীবন পার করে দেব। তুই অবশ্যই কিছুদিন পর আমাদের বাড়ি এসে থাকবি, বুঝলি?
ইমা চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
ধীরে ধীরে সকলে প্রস্তুত হলো। নেহা আর তানভীর নানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—নানা, তুমি চলে গেলে আমাদের গল্প কে শোনাবে?
নানা হেসে বললেন,
—আমি আবার আসবো রে, তখন আরও গল্প বলবো।
ইতিমধ্যে নুরু মিয়া গাড়ি নিয়ে হাজির। ইমা আগেই বলে রেখেছিল—“আজ বাবা আর কাকারা চলে যাবেন, গাড়ি নিয়ে আসো।”
ইমন সাহেব বিয়াইন সাহেবার কাছে গিয়ে বললেন,
—বিয়াইন, আমার মেয়ে—মানে আপনার মেয়ে ওকে একটু দেখে রাখবেন। ওকে একা থাকতে দেবেন না।
সবাই একে একে গাড়িতে উঠল। বিদায়ের মুহূর্তে চারপাশ ভারী হয়ে উঠল। চোখের কোনে জল, কণ্ঠে নীরবতা। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
ইমা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। নেহা আর তানভীরেরও চোখের পলক পড়ছে না। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেল। ইমা আবারও হারিয়ে ফেলল তার বাবাকে—সাময়িকের জন্য হলেও।
গাড়ি চলছিল গ্রামের মেঠোপথ ধরে। রাস্তার দুই ধারে শিউলি আর কাশফুলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর নাফিজ সাহেব বললেন,
—এই দেখ, ইমন, ওটা তোর হুমায়রাদের বাড়ি।
ইমন চালককে ধীরে চালাতে বললেন। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলেন সেই বাড়ির দিকে। হৃদয়ে কেমন এক টান অনুভব করলেন।
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে এক চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের নারী। সদর দরজা খোলা। রোদে ঝলমল করছে তার মুখ। ইমন সাহেবের দৃষ্টি আটকে গেল সেখানে। বুকের ভেতর কেমন এক আলোড়ন উঠল।
তিনি নিঃশব্দে ভাবলেন—
এই কি তবে হুমায়রা?
তার প্রাণপ্রিয় সেই নারী?
নাকি কেবলই এক মুখ, যা তাকে ফিরে নিচ্ছে অতীতের গভীর স্মৃতির কাছে?
গাড়ি সামনে এগিয়ে যায়। পেছনে রয়ে যায় সেই উঠোন, সেই নারী, আর এক পুরনো ভালোবাসার অব্যক্ত নিশ্বাস...
চলবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now