বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
( সাবধানঃ-সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। গল্পটিতে কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে, তাই অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরা দয়া করে গল্পটি পড়বেন না)
"শ্যাডো অব দ্য ওয়্যারউলফ"
লেখক : গাই. এন. ক্রিস্টি
অনুবাদ : অনীশ দাস অপু
--------------------------
১ ম পর্ব
নভেম্বর চলছে। ঝিরঝিরে বাতাস । ঠান্ডা। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার এই অঞ্চলে শীত তেমন জাঁকিয়ে পড়েনি। সাত নম্বর রোড ধরে এসপেনের অভিমুখে গাড়ি চালাচ্ছে রিকার্ডো বিটি। পাশে ক্যারেন হ্যালোরান। পেছনের সিটে সুবোধ বালকের মতো বসে আছে ওদের পোষা কুকুর টাইগার।
গাড়ি টেহাচাপি পাহাড়ের মাথায় উঠে এল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।
বাতাসে ক্যারেনের চুল উড়ছে। চোখের ওপর থেকে চুলগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিল ও। বড্ড খুশী খুশী লাগছে ক্যারেনকে।
যেদিকে তাকায় শুধুই সবুজের বন্যা। রাস্তার দুপাশে আকাশছোঁয়া রেডউড ট্রি। গাছের পাতাও কাঁপছে বাতাসে। পাহাড়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গেছে রাস্তা।
" দারুণ লাগছে, রিক", বলল ক্যারেন, " কিন্তু রাস্তা তো শেষ হয়ে এল। বাঁকটা ঘুরলেই রাস্তা নামবে নীচের দিকে। এরপর এরপর উপত্যকা। তারপরেই এসপেন। আর একটু এগোলেই আমাদের বাড়িটা। ক্যাজুরিনা।"
" জায়গাটা অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর ", বলল রিকার্ডো, " অথচ জানতামই না, এখানে এমন একটা চমৎকার উপত্যকা আছে।"
" এখান থেকে লস এঞ্জেলেস যেতে আসতে ক্রিসের কোনও অসুবিধাই হবে না", মন্তব্য করল ক্যারেন।
" তবে, ক্রিস অফিস চলে যাবার পর তোমায় তো সারাদিন একা থাকতে হবে, অসুবিধে হবে না?" রিকার্ডো জিজ্ঞেস করল।
" নাহ, অভ্যাস হয়ে যাবে। তুমি মাঝেমধ্যে এসো বেড়াতে। সময় কেটে যাবে।" ক্যারেন বলল।
গাড়ি উঠে এল পাহাড় চূড়োয়। মাইল খানেক চলার পর নেমে যাবে নীচে। সরু একটা নদী বয়ে যাচ্ছে নীচে। সামনে একটা সেতু। ক্যারেন বলল, " গাড়িটা থামাও রিক। জায়গাটা বেশ।"
" তবে বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না", রিক বলল, " ক্রিস চিন্তা করবে। তোমায় একটা বাইসাইকেল কিনে দেব। খেয়ালখুশী মতো বেড়িয়ো। "
" উঁহু, বাইসাইকেল নয়, এসব জায়গায় পায়ে হেঁটে বেড়াতেই ভালো লাগবে আমার।"
দুজনে গাড়ি থেকে নেমে এল। অদূরে ছবির মতো গ্রাম। আছে রেডউড ছাড়াও অনেক রকম গাছ। দেখতে দেখতে গাঢ় হয়ে এল সন্ধ্যা। কিন্তু রাস্তার বা দূরের গ্রামের কোনও বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল না।
" একটা সিগারেট দাও রিক, অনেকদিন খাইনি", ক্যারেন হাত বাড়াল রিকের দিকে।
দুজনেই সিগারেট ধরাল। হাওয়ায় শিরশির করছে শরীর। নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ক্যারেন বলল, " গত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম সিগারেট খাচ্ছি। কিস্যু ভাল্লাগে না। সব যেন কেমন হয়ে গেছে। কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে বড্ড ইচ্ছে করে। "
রিক ক্যারেনের বিষন্ন চোখের দিকে তাকাল। বলল, " কেন, ক্রিসের সাথেই তো সমস্ত কথা শেয়ার করতে পারো। সে তো তোমার স্বামী। সবচেয়ে কাছের আর ভালো বন্ধু।"
ক্যারেন একটু ইতস্তত গলায় বলল, " ঐ ঘটনার পর থেকে ক্রিস যেন কেমন হয়ে গেছে। আমার জন্য ফিল করছে। আমায় ভালবাসছে, আদর যত্ন করছে, কিন্তু কিরকম যেন হয়ে গেছে। " সিগারেটের লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল ক্যারেন।
দুজনেই অনেকক্ষণ নীরব রইল। মাঝেমাঝে অন্ধকারে লাল আগুনের ফুলকি জ্বলে উঠছে। একটু পরে ক্যারেন বলল, " চল রিক, সন্ধে হয়ে গেছে। এবার যাই। তবে চিন্তা কোর না, মনের এ অবস্থা খুব শিগগীর কাটিয়ে উঠব আমি।"
গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল রিক। এখন উৎরাই। ঠান্ডাটা যেন এখন একটু বেশী।
ক্যারেন বলল, " একটা সোয়েটার আনলে ভাল হত। আমরা তো প্রায় এসে গেছি। এটাই তো এসপেন। "
দু একটা বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। ক্যাফে, বার, প্রভিসন স্টোর, পেট্রল পাম্প, নাইট ক্লাব সবই রয়েছে। ক্যারেন এখানে দুই মাসের ছুটি নিয়ে এসেছে।
আলো নেই এতটুকু কোথাও। এই ভর সন্ধ্যাতেই যেন ঘুমিয়ে পড়েছে গোটা গ্রাম। নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে সবকিছু। দু একটা বাড়ি আর দোকানে ম্লান আলো। রাস্তাঘাট গভীর অন্ধকারে ঢাকা।
গাড়ি চালাতে চালাতে এদিকওদিক দেখছে রিকার্ডো।
" রাস্তা ভুল করে ফেলেছ?" ক্যারেন জানতে চাইল।
" তেমনই তো মনে হচ্ছে। একবার মাত্র এসেছিলাম। দু ধারে এত গাছপালা, তার ওপর কোথাও প্রায় আলো নেই।" গাড়ি চালাতে চালাতে বলল রিক।
" গাড়ি থামাও। একটা লোক এদিকে আসছে। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখি।"
হেডলাইট জ্বলছে। লোকটা গাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে। পরনে দু পকেটওয়ালা খাকি শার্ট, একই রঙের প্যান্ট। মাথায় কাউবয়দের মতো হ্যাট। চোখে আলো পড়ায় লোকটা চোখে হাত দিল। রিক গাড়ির হেডলাইটদুটো নিভিয়ে দিল।
লোকটা গাড়ির জানলার কাছে আসতে, ক্যারেন জানলার কাঁচ নামিয়ে প্রশ্ন করল, " এই যে ভাই, ক্যাজুরিনা বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?" হেসে বলল ক্যারেন " আমরা বোধহয় পথ ভুল করেছি।"
জবাবে লোকটা কিন্তু হাসল না। ক্যারেন ভাবল লোকটা তার কথা শুনতে পায়নি। সে গাড়ির আরোহীদুজনকে যেন খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছে।
জানলার কাঁচে হাত রাখল লোকটা। একটু ভেতর দিকে সরে গেল ক্যারেন।
মোটা, কর্কশ গলায় লোকটা বলল, " আপনারা ক্যাজুরিনা বাড়িটা কোন দিকে জানতে চাইছেন?"
" ইয়েস, আমার নাম ক্যারেন হ্যালোরান। আমার স্বামীর নাম ক্রিস। আমরা ওই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি। একবার মাত্র এসেছিলাম। অন্ধকারে ঠিক চিনতে পারছি না।"
লোকটা হ্যাটের কিনারাটা একবার স্পর্শ করল। বোধহয় ক্যারেনকে অভিবাদন জানাল। বলল, " আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দিত হলাম। আমার নাম টেবর ইভান্স। আমি এসপেনের শেরিফ। এখানকার পুলিশ বাহিনীও। এখানে অবশ্য পুলিশের সাহায্য নেবার দরকার পড়ে না।"
কথা বলতে বলতে ক্যারেনের পাশে বসা রিককে লক্ষ্য করছিল শেরিফ।
ক্যারেন পাশে বসা রিককে দেখিয়ে বলল, " ইনি হলেন রিকার্ডো বিটি। আমাদের বন্ধু। লস এঞ্জেলেসে থাকে। আমায় পৌঁছে দিতে এসেছে। আমার স্বামী আগেই ক্যাজুরিনায় এসে রয়েছেন। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।"
মৃদু হাসল টেবর। রিকও জবাবে হাসল।
টেবর বলল, " আপনারা ঠিক পথেই এসেছেন। তিনশ মিটার যাবার পর বাঁয়ে একটা রাস্তা পাবেন। কোণায় একটা লেটারবক্স দেখতে পাবেন। "
" ও হ্যাঁ, লেটারবক্স। মনে পড়েছে। ধন্যবাদ। আশা করি পরে আবার দেখা হবে। চল রিক", ক্যারেন বলল।
" ইউ আর ওয়েলকাম " বলে আবার টেবর হ্যাটের কিনারা স্পর্শ করল। রিকার্ডো গাড়িতে স্টার্ট দিল।
লেটারবক্স থেকে বাঁদিকে খানিকটা এগোতেই বাড়িটা চোখে পড়ল। বাড়ির বাইরের ও ভেতরের সব আলো জ্বালিয়ে রেখেছে ক্রিস।
" চমৎকার "! গাড়ি থেকেই আনন্দে চেঁচিয়ে বলল ক্যারেন, " রাতারাতি বাড়ির চেহারাই বদলে দিয়েছে ক্রিস।"
গেট খোলা। একবার হর্ন বাজিয়ে গাড়িটা ভেতরে নিয়ে এল রিক। ক্রিসের গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে।
" সেদিন কিন্তু বাড়িটা আমার মোটেও ভাল লাগেনি, রিক", গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল ক্যারেন, " দিনের বেলা নিশ্চয়ই আরো সুন্দর লাগবে। বাগানের ওই শান বাঁধান বেদীতে সানবাথ করা যাবে। কি বলো? চমৎকার বাগান!"
গাড়ির শব্দ শুনে ক্রিস বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। ক্যারেন ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, " ডার্লিং! দারুণ! "
ক্রিস রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, " আরে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছ কি? ভেতরে এসো। এসো ভেতরে।"
রিকার্ডো বলল, " আজই আমায় ফিরে যেতে হবে। পরে একদিন আসব।"
" আরে! এদ্দুর এসে এমনি এমনিই ফিরে যাবে? একটা ড্রিংক খেয়ে যাও।"
" ধন্যবাদ । আর দেরী করতে পারব না।"
" কোনও সুন্দরীকে কাবু করে এসেছ নাকি?"
উত্তরে রিক এমনভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল, যাতে হ্যাঁ-ও বোঝায়, না-ও বোঝায়।
" তবে আবার কি!" ক্রিস মজা করে বলল, " এবার যখন একদিন আসবে, তোমার বান্ধবীকেও নিয়ে আসবে। আমাদের একস্ট্রা ঘর আছে। কোনও সমস্যা হবে না।"
" ঠিক আছে। জানা রইল। " রিক বলল, " বুটটা খুলে লাগেজ নামিয়ে নাও।"
ও নেমে এসে হ্যান্ডশেক করল ক্রিস আর ক্যারেনের সাথে। ক্যারেন চুমু খেল রিকের গালে।
" কিছু দরকার হলে ফোন করো। বাই।"
রিক গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।
ওরা দুজনেই যতক্ষণ দেখা যায় রিকের গাড়ির পেছনের হেডলাইটের লাল আলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
ক্যারেন বলল, " ডিনার খেয়ে গেলেই পারত। বেচারা একা।"
ঠোঁট টিপে হেসে বলল ক্রিস, " জোর করে ধরে রাখতে বেচারাকে!"
" সবেতেই তোমার ফাজলামো! " কপট রাগ দেখিয়ে বলল ক্যারেন।
" কিন্তু ও একা, তোমায় কে বলল? তিরিশ বছরের সুদর্শন যুবক। তায় ব্যাচেলর। মোটা টাকা কামাই করে। দামী ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। কত মেয়ে ওর পেছনে ঘুরঘুর করছে। আর তুমি বলছ ও একা?"
" কেন, তোমার হিংসে লাগছে?"
দুজনেই হা হা করে হেসে উঠল।
" চলো ভেতরে চলো।" ক্রিস বলল।
চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল ক্যারেন। সন্ধ্যা এখন গাঢ়, বাতাস বইছে ঝিরঝির, শোনা যাচ্ছে পাখিদের কিচিরমিচির। দূরে দু একটা বাড়িতে মিটমিটে বাতি জ্বলছে। তবে কোনও মানুষের সাড়া নেই। রোম্যান্টিক পরিবেশটা ভালোই লাগল ক্যারেনের।
" এসপেনের রাস্তায় আলো নেই কেন?" জিজ্ঞেস করল ক্যারেন।
" আলো আসেনি এখনো। ল্যাম্পপোস্ট পোঁতা হয়েছে রাস্তায়। হয়ত খুব শিগগীরই আসবে। চলো, ভেতরে যাই।"
দরজার সামনে বেশী পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে। জোরালো পাওয়ারের আলো। কাঠের ভারী মজবুত দরজা। নতুন লাগান রঙ শুকিয়ে চকচক করছে। দরজার গায়ে হাত বোলাল ক্যারেন। রঙটা পছন্দ হয়েছে ওর। হালকা সবুজ।
হঠাৎ দরজায় চোখ আটকে গেল ওর। দরজায় আঁচড়ের দাগ কেন? এটা ব্রাশের দাগ নয়। বেশ গভীর, হাতে লাগে। টাইগার তো এখানে আসেনি। তাহলে আঁচড় কাটল কে? টাইগারের পা অত উঁচুতে পৌঁছবেও না।
ততক্ষণে ক্রিস স্যুটকেস দুটো হাতে নিয়ে হাজির হয়ে গেছে দরজায়।
ক্যারেন জিজ্ঞেস করল, " ক্রিস, এমন সুন্দর রঙের ওপর এভাবে আঁচড় কাটল কে?"
" শেয়াল-কুকুর হবে হয়ত", পাত্তা না দিয়ে বলল ক্রিস।
" আরে না, শেয়াল-কুকুরের থাবার দাগ এত পুরু হয়?"
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দরজায় কাটা আঁচড়টার দিকে তাকাল ক্রিস। বলল, " কি জানি, কিসের দাগ বুঝতে পারছি না।"
" মনে হচ্ছে কোনও বুনো জন্তুর থাবার দাগ। ভালো করে দ্যাখো। "
" দূর! এখানে বুনো জন্তু আসবে কোত্থেকে?"
ঘরে ঢুকল দুজনে।
ঝকঝক করছে খাবার ঘর আর ডাইনিং স্পেস। আসবাব স্বল্প, তবে নতুন রঙ করা। মাথার ওপর জ্বলছে ফ্লোরেসেন্ট বাতি। নীচে কার্পেট। সারা বাড়ি একেবারে তকতকে।
বাগান থেকে ফুল এনে ফ্লাওয়ার ভাস সাজিয়ে রেখেছে ক্রিস। দেওয়ালেও কয়েকটা ছবি টাঙিয়েছে। ক্যারেন নিজেও ছবি আঁকে। শখের শিল্পী।
ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিল ক্যারেন। বেশ বড় বড় রুম। পুরনো আমলের বাড়ি বলেই হয়ত।
ঘুরে ঘুরে একটা ছবির সামনে এসে দাঁড়াল ক্যারেন। নিজেরই ছবি। নগ্ন। রিজেন্ট পার্কের ফ্ল্যাটে কোনওদিন ছবিটা টাঙায়নি। এখানে আসবার সময় ক্রিস নিয়ে এসেছে। ওকে অবাক করে দিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে।
" দেখেছ ক্রিস! কি ফিগার ছিল আমার!" ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল ক্যারেন।
" নিজে এঁকেছ তো তাই। ইচ্ছেমত শরীরের ভাঁজখাঁজগুলো বাড়িয়ে কমিয়ে নিয়েছ।"
" জি না স্যার। হুবহু ফটো দেখেই আঁকা।"
" ফটো দেখে আঁকা? তোমার এমন ফটো তুলল কোন ভাগ্যবান? "
" কেন? লস এঞ্জেলেসে কি স্টুডিয়োর অভাব আছে? সুইমিং চ্যাম্পিয়ন কয়েকজন বন্ধু মিলে তুলেছিলাম।"
" বেশ করেছ। বাড়ি পছন্দ হয়েছে?"
" রুমগুলো খুব পছন্দ হয়েছে। চলো, বেডরুমটা দেখে আসি।"
বেশ বড় বেডরুম। বড় বড় জানলা। জানলার ধারে একটা বড় গাছ। ঘরের মাঝখানে ডাবল বেড খাট। ফুল তোলা চাদর। পায়ের কাছে ভাঁজ করা লেপ। মাথার কাছে দু জোড়া বালিশ। সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে।
পাশেই বাথরুম। নতুন করে বানিয়েছে ক্রিস। বাথটাব থেকে শুরু করে সবই ভাড়া করা। পুরনোটা চালান করা হয়েছে স্টোররুমে। সুগন্ধি স্প্রে করা হয়েছে বাথরুমে।
ডাইনিং, কিচেন, ড্রয়িং --সবকিছুই খুব পছন্দ হল ক্যারেনের। নতুন জায়গা, নতুন বাড়ি। ওর মনেও যেন নতুনত্বের দোলা লাগল।
" বাড়িটা যে তোমার পছন্দ হয়েছে, এই অনেক। তবে রিজেন্ট পার্কের মতো সব সুবিধা তুমি এখানে পাবে না। কিছু কেনাকাটার দরকার হলে শহরে গিয়ে কিনে নিয়ে আসব।" ক্রিস বলল।
" কেমন পাণ্ডববর্জিত জায়গা", ক্যারেন বলল, " লোকজন একেবারেই নেই। তবে এখানে খুব আরামে সানবাথ করা যাবে।"
" অবশ্যই করা যাবে", ক্রিস বলল, " আর এই সময় ড্রাইভিংটাও শিখে নাও। কাজে লাগবে।"
" একটা বাইসাইকেল লাগবে আমার", আবদার করে বলল ক্যারেন।
" পাবে। এখন বসো তো সোফাটার ওপর। কি মনে হচ্ছে না তুলোর গদিতে বসেছ? সোফার গদিটা পালটে দিয়েছি আমি। " বলে ক্রিস একটু হেসে ডাকল, " ক্যারেন!"
" বলো।"
"এবার আমাদের নতুন বাসায় আসাটা সেলিব্রেট করা যাক।"
" ওকে।"
" মার্টিনি দিয়ে।"
" ওকে, তুমি রেডি কর", ক্যারেন বলল, " আমি পোষাকটা বদলে আসি।"
ক্যারেন মহাখুশী। সবই ভাল লাগছে ওর। শীত লাগছে বলে স্কার্টের ওপর চাপিয়ে এল ফ্লানেলের একটা শার্ট।
ফায়ার প্লেসে কাঠে আগুন জ্বলছে। পাহাড়ী জায়গা, তাই সন্ধ্যা ঘনালেই ঝপ করে নেমে আসে ঠান্ডা।
ক্যারেন বলল, " টাইগারকে একটু বাইরে পাঠান দরকার। নইলে ও ঘর নোংরা করবে। "
দরজা খুলে দিল ক্রিস। কিন্তু টাইগার কেন যেন একা একা বেরোতে চাইছে না বাইরে। তাকিয়ে রইল ক্যারেনের দিকে। ক্যারেন বলল, " যা তো টাইগার। বাইরে থেকে একটু ঘুরে আয়। কোনও ভয় নেই।"
টাইগার বেরিয়ে গেল। ক্রিস দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর ফায়ারপ্লেসের আগুনটা একটু উস্কে দিয়ে গ্লাস হাতে নিয়ে বসল।
" চিয়ার্স " ও গ্লাসটা ঠুকে দিল ক্যারেনের গ্লাসে।
" চিয়ার্স।"
" আমাদের জীবনটা এরকম মজায় কেটে গেলে বেশ হতো, তাই না ক্যারেন?" বলতে বলতে ক্যারেনের কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরল ক্রিস।
স্বামীর গালে হালকা একটা চুমু খেল ক্যারেন। হেসে বলল, " এখান থেকে তোমার অফিস যেতে আসতে কি কষ্ট হবে ক্রিস?"
" মোটেও না। এদিকটা একটু দূর হলেও ট্রাফিক জ্যামের ভয় নেই। ফুল স্পিডে গাড়ি চালাতে পারব। বাড়িতেও কিছু কাজ নিয়ে আসব। দুপুরে যখন তোমার কাজ থাকবে না, তখন কিছুটা টাইপ করে দিও। ব্যস।" ক্রিস বলল।
" ওকে, রাজী ", হাসিমুখে ক্যারেন বলল, " তা তোমার একঘেয়ে লাগবে না? রিজেন্ট পার্কে তো ক্লাব ছিল। এখানে তো কিছুই নেই। তোমার সময় কাটবে কি করে?"
" ক্লাবের গুলি মারি। ছ'টা মাস তো এরকম হনিমুন করার মতো জায়গায় দেখতে দেখতে কেটে যাবে। ক্লাবের খরচটাও বাঁচবে",ক্রিস বলল।
গল্প করতে করতে ডিনারের সময় হয়ে এল। ক্রিস জানাল যে সে কাছের শহর হ্যামিল্টন থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে এসেছে।
" শহর আছে আশেপাশে? "
" নিশ্চয়। এখান থেকে দশ মাইল দূরে হ্যামিল্টন শহর।"
" এখানে কিছু পাওয়া যায় না?"
" নিশ্চয়ই। প্রায় সব কিছু। কিন্তু হ্যামিল্টনে গেলে সব কিছু বেছে বেছে কিনে আনা যায়। ড্রাইভিংটা শিখে নাও। রিকের একটা গাড়ি তো পড়েই থাকে। আনিয়ে নেব। আমি না থাকলেও যখন খুশী যে কোনও জিনিস আনতে পারবে।"
" এখানে পোস্ট অফিস আছে ক্রিস?"
" পুরো পোস্ট অফিস না। একটা এজেন্সি আছে। এখানকার চিঠিগুলো দিয়ে যায়, লেটারবক্স খুলে চিঠি নিয়ে যায়। কিন্তু ডেলিভারি দেয় না। জেনারেল স্টোরে গিয়ে আনতে হয় যার যার চিঠি।"
" তবু ভালো, জেনারেল স্টোরে গেলে অন্তত এখানকার লোকের সাথে আলাপ পরিচয় হবে।"
" হ্যাঁ।"
" তোমাদের শেরিফকে কিন্তু বেশ মজার লোক মনে হল।"
" কোথায় দেখা হল?"
" রাস্তায়। তবে আমাদের দেখে খুব খুশী হয়েছে বলে মনে হল না।"
" এখানকার লোকগুলো এরকমই। আমায় এখনো পর্যন্ত কেউ ' হ্যালো'ও বলতে আসেনি", ক্রিস বলল।
কথাবার্তার ফাঁকে ডিনার সেরে নিল ওরা। টেপ রেকর্ডারে চালিয়ে দিয়েছে প্রিয় গান। ডিনারের পর প্লেটগুলো ধুয়ে ওরা দুই গ্লাস বারগান্ডি নিয়ে বসল।
" আমাদের আগে কারা ছিল এই বাড়িতে?" গ্লাসে চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করল ক্যারেন।
" তা জানি না। যাদের কাছ থেকে লীজ নিয়েছি, তারাও কিছু বলেনি। শুনেছি, মালিকরা ব্যবসায়ী ছিল, দূর্ঘটনায় মারা গেছে দুজনেই।"
হঠাৎ কান খাড়া করল ক্যারেন। " ক্রিস, দরজায় কে যেন আঁচড়াচ্ছে!"
বলেই আঁৎকে উঠে ক্রিসকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল ক্যারেন। ক্রিস বলল, " আরে কর কি! ওটা আমাদের টাইগার। "
" ও", লজ্জা পেল ক্যারেন। সত্যিই, টাইগারের কথা একদমই ভুলে গিয়েছিল ও।
ক্রিস উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ভীত সন্ত্রস্ত কুকুরটা কোঁ কোঁ করতে ভেতরে ঢুকল। ক্যারেনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কিছু যেন বলতে চাইল। ভয়ে ভয়ে তাকাতে লাগল দরজার দিকে।
" ক্রিস, টাইগার এমন করছে কেন? বাইরে কিছু আছে নাকি?"
ক্রিস বেরিয়ে গেল। দরজার সামনের আলোতে যতটুকু দেখা যায়, কিছু নেই। তারপর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ক্রিস বলল, " কই কিছু তো দেখছি না।"
কুকুরটাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওরা দুজনে কফি খেতে খেল। দক্ষিণ আমেরিকার শেড গ্রোন কফি। স্বাদই আলাদা।
সোফায় বসে ক্রিস ক্যারেনকে কাছে টেনে নিল। গভীর চুম্বন করল ক্যারেনের ঠোঁটে, কপালে, কানের লতিতে, গলার নীচে। তারপর দুজনে কাপড় পালটে শুয়ে পড়ল বিছানায়।
ক্রিসের মসৃণ উরু ছুঁয়ে গেল ক্রিসের হাত। স্পর্শ করল সেলাইয়ের জায়গাটা। ওখানেই জো থম্পসনের হাতে ধর্ষিতা হবার সময় জো ক্যারেনের উরুর মাংস দাঁতে করে ছিঁড়ে নিয়েছিল। কয়েকটা সেলাই পড়েছে ওখানে। স্টিচের গোড়াগুলো এখনো উঁচু হয়ে রয়েছে।
ক্রিসের হাত ওখানে থেমে গেল। হাত বুলোতে লাগল সেলাইয়ের ওপর।
" ক্রিস, হাত সরাও।"
" কেন ডার্লিং? "
" ওখানে হাত দিলে আমার সেইসব স্মৃতি গুলো মনে পড়ে যায়। আতঙ্কে বুক শুকিয়ে যায় আমার।"
" কেন ওসব স্মৃতি বুকের মধ্যে পুষে রেখেছ? ভুলে যাও ওসব। তোমায় আমি ভালবাসি। আমার বুকে এসো। "
ক্যারেন স্বামীর আরও কাছে সরে এল। কিন্তু শরীর সাড়া দিচ্ছে না। বলল, " এখন ঘুমাও লক্ষ্মীটি। পরে একদিন হবে। চিন্তা কোর না, এই অবস্থা আমি খুবই শিগগিরই কাটিয়ে উঠব। "
ফায়ারপ্লেসের আগুন উসকে দিয়ে বউকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ক্রিস।
কিছুতেই ক্যারেনের ঘুম আসছে না। রাতের নিস্তব্ধতায় কান পেতে আছে। বুকের মধ্যে জো থম্পসনের হাতে ধর্ষিতা হবার সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতির বেদনা। আতঙ্ক।
ক্যারেনের মনে হতে লাগল ও খুব একা। একা এক গহীন অরণ্যের ভেতর শুয়ে আছে। আতঙ্কে ওর হাত পা বরফ হয়ে গেল। ওর মনে হল, ফায়ার প্লেসের আগুন নিভে গেছে, বাইরে শনশন হাওয়ায় কাঁপল গাছের পাতা। ঠিক এইসময়ই কানে এল তীক্ষ্ণ আওয়াজটা। সমস্ত বনপ্রান্তর আর ক্যারেনের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে ডেকে উঠল একটা নেকড়ে।
( চলবে)
--------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now