বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্বর্গ বিলাপ—সুপণ শাহরিয়ার

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X কায়কোবাদ হাসছে, কণ্ঠে প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে কায়কোবাদ হাসছে। তার সে হাসির শব্দ অনুরণিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিক। সচকিত হয়ে উঠছে স্বর্গের মৃদুমন্দ বাতাস। হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ালো শাহীনা। তার চোখে-মুখে, কণ্ঠে গভীর উদ্বেগ। উদগ্রীব হয়ে সে জিজ্ঞেস করলো— ‘ভাইয়া, কী হয়েছে তোমার?’ জবাব দিলো না কায়কোবাদ। সে তখনো হাসছে একইভাবে। ‘ভাইয়া, তুমি এমন করছো কেনো?’ শাহীনার কণ্ঠ তখনো উদ্বিগ্ন, তখনো উদগ্রীব। স্বাভাবিক— আজ অব্দি কায়কোবাদকে সে হাসতে দেখে নি কখনো। এবং কাঁদতে না দেখলেও দেখেছে চুপচাপ, বিষণ্ন। এবং সেই নিয়ে যখনই সে অভিযোগ তুলেছে, কায়কোবাদ বিমর্ষকণ্ঠে বলেছে একটাই কথা— ‘১ হাজার ১৭৫ জন মরে গেলো— বাঁচাতে পারলাম না।’ শাহীনা সঙ্গে সঙ্গে বলেছে— ‘কী বলো এসব! তুমি না থাকলে মরে যাওয়া মানুষের সারিতে আরো অন্তত ৩০ জন যোগ হতো। তুমি একাই তো বাঁচিয়েছিলে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে। তাহলে? আশ্চর্য— বাঁচাতে পারলে না কীভাবে বলো, ভাইয়া!’ শাহীনার সে কথা কানে না তুলে কায়কোবাদ বলেছে— ‘তোকেও তো বাঁচাতে পারলাম না রে।’ শাহীনার কণ্ঠ ততোক্ষণে ভারী হয়ে এসেছে। সে বলেছে— ‘বাঁচাতে তো চেয়েছিলেই। আমাকে বাঁচাবে বলে ৮ তলা থেকে সুড়ঙ্গ করতে করতে ৩ তলা পর্যন্ত তুমি নেমেওছিলে। কিন্তু আর তোমার এগোনো হলো না। ড্রিলের নির্দয় আগুন ধরে নিলো তোমাকে। পুড়ে গেলে তুমি। পুড়ে গেলো তোমার আমাকে বাঁচানোর আশ্বাস। পুড়ে গেলো তোমার আরো আরো মানুষকে বাঁচানোর স্বপ্ন। পুড়ে গেলো তোমার সোনার সংসার, স্ত্রীর সুখ, দুই শিশুর ভবিষ্যত। পুড়ে গেলো। পুড়ে গেলো।’ পরপরই শাহীনাকে বুকে টেনে নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে কায়কোবাদ বলেছে— ‘তোরও আর বাঁচা হলো না। মরে গেলি তুই। মরে গেলো তোর সব গতানুগতিক স্বপ্ন, আটপৌরে সাধ। মরে গেলো তোরও দেড় বছরের ছোট্ট বাচ্চাটার ভবিষ্যত। মরে গেলো। মরে গেলো।’ . কায়কোবাদ সেইভাবেই হাসছে তখনো। তার কোনোদিকে খেয়াল নেই। শাহীনার উদ্বেগ আরো বাড়লো। বাড়লো কণ্ঠের তার অস্থিরতাও। কায়কোবাদের খুব কাছে সরে গেলো সে, এবং তার একটা হাত খপ্ করে ধরে ফেললো তারপর। বেশ একটা ঝাঁকি দিয়ে বললো, ‘ভাইয়া, তুমি এমন করছো কেনো? কী হয়েছে তোমার?’ কায়কোবাদ এবার খেয়াল করলো শাহীনা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করছে। হাসিটা থামিয়ে একটু ইতস্তত করে সে বললো, ‘কীক্…কী?’ ‘বলছি তুমি এভাবে হাসছো কেনো?’ ‘খুব একটা হাসির ঘটনা ঘটেছে জানিস!’ ‘হাসির ঘটনাটা কী?’ “ঘটনাটা হলো গুলশান ১-এর ডিএনসিসি মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানীরা আগুনের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া তাদের পণ্য সমূহ অপেক্ষাকৃত কম দামে বেচে দিচ্ছে। অনেক অনেক ক্রেতার ভিড় জমেছে সেখানে। ভিড় করেছে বিভিন্ন মাধ্যমের সাংবাদিকরাও। বিক্রেতাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কিনে-টিনে একেকজন ক্রেতা বেশ আগ্রহ নিয়ে টিভি-ক্যামেরা বা পত্রিকা-সাংবাদিকদের মাউথপিসের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। সানন্দে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে। সেখানে প্রশ্ন আর উত্তরগুলো ছিলো প্রায় একই রকম। ক্রেতাদের একজনকে প্রথমে জিজ্ঞেস করা হলো— ‘আচ্ছা, এতোকিছু কেনাকাটা করতে পেরে আপনার কেমন লাগছে?’ জবাবে প্রায় উল্লসিত হয়ে সে বললো— ‘এইসব কেনাকাটা করতে পেরে আমি আজ খুবই আনন্দিত।’ তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো— ‘সবসময় কেনাকাটা করে আপনি কি এমন আনন্দিত হন?’ সে বললো— ‘না। আমি আজ কেনাকাটা করে দুইটা কারণে আনন্দিত— সবসময় তো আর কেনাকাটা করে জিততে পারি না, আজ জিতেছি, যেমন: যে জিনিস আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় আগে কিনেছি, ঠিক সেই জিনিস আজ মাত্র পাঁচশ টাকায় কিনতে পেরেছি; এছাড়া আরো একটা কারণে আমি বেশি আনন্দিত।” বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলো কায়কোবাদ। হাসি হাসি মুখে সে শাহীনার দিকে তাকালো— শাহীনা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। তারপর সে বললো, ‘আর একটা কোন্ কারণে সে বেশি আনন্দিত— জানিস কী কারণটা সে বললো?’ শাহীনা জিজ্ঞেস করলো— ‘কী কারণ বললো, ভাইয়া?’ কায়কোবাদ বললো, “সে বললো, ‘ক্ষতিগ্রস্ত, বিপর্যস্ত এই মানুষগুলোর কাছ থেকে কেনাকাটা করে তাদেরকে সাহায্য করতে পারছি। এই দুর্দিনে মানবিক দায়বোধ থেকে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছি। এটাই সবচে’ আনন্দের। আমিও তো মানুষ— আর মানুষ তো মানুষের জন্য।” কথাগুলো বলেই কায়কোবাদ পূর্বের মতো প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে হাসতে থাকলো আবার। সেই সাথে একনাগাড়ে বলে যেতে থাকলো— “মানুষ তো মানুষের জন্য”; “মানুষ তো মানুষের জন্য;”…। তারপর হঠাৎ একসময় হাসি থামিয়ে শাহীনার দিকে তাকালো। দেখলো শাহীনা তখন মুখ উঁচু করে হা হয়ে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। শাহীনাকে সে জিজ্ঞেস করলো— ‘আমাকে বলতে পারিস— আড়াই হাজার টাকার জিনিস মাত্র পাঁচশ টাকায় কিনে ক্রেতা কি তার সাহায্যের হাত নিয়ে পায়ের উপর ভর দিয়ে বিক্রেতার পাশে দাঁড়ায়, না মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে পায়ের নিচে ফেলে বিক্রেতাকে পিষে দাঁড়ায়?’ তারপর জবাব পাবার অপেক্ষা না করে আবার সে হাসতে থাকলো। একই সাথে বলতে থাকলো— “মানুষ তো মানুষের জন্য”; “মানুষ তো মানুষের জন্য”। এবং তারপর হঠাৎই সে একদম থেমে গেলো। মুহূর্তে স্বর্গের পরিবেশ জুড়ে নেমে এলো নিশ্ছিদ্র নীস্তব্ধতা। কিছুক্ষণ পর শাহীনা টের পেলো তার শ্রদ্ধেয় ভাইটা কাঁদছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে, গুমরে গুমরে কাঁদছে। একদিন রানা প্লাজার অন্ধকার গহ্বর থেকে মুক্ত করে মানুষকে পৃথিবীর আলোয় এনে হাসতে চেয়েছিলো যে মানুষটা, সেই মানুষটা, সেই মহাপ্রাণ ইজাজ উদ্দিন কায়কোবাদ আজ পৃথিবীর মানুষেরা তাদের নিজেদের আভ্যন্তরীণ অন্ধকার গহ্বরে বন্দী হয়ে আছে দেখে কাঁদছে। বিপর্যন্ত মানুষের পাশে সাধারণ মানুষগুলো তাদের এই অন্ধকার নিয়ে দাঁড়াবে দেখবে বলেই কি সে প্রাণ দিয়ে গিয়েছিলো সেদিন? . . ।। পূর্বঘটনা ।। বিধ্বংসী ঝড় বয়ে গেছে কোথাও? উড়ে গেছে মানুষের ঘরের চাল? ঝরে গেছে ক্ষেতের ফল-ফসল? মরে গেছে গৃহপালিত পশু-পক্ষি? —সে চলে যায় দেখতে। ধ্বসে পড়েছে কোথাও কোনো ভবন? নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে মানুষ? আহাজারীতে ছেয়ে গেছে অঞ্চল? —সে তড়িঘড়ি পৌঁছে যায় সে অঞ্চলে। প্রকাণ্ড আগুন লেগেছে কোনো প্রতিষ্ঠানে? দগ্ধ হয়েছে, ভেতরে আটকে পড়েছে কেউ কেউ? উদ্ধারকর্মীর তোড়জোড়ে, অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে বিষণ্ন হয়ে উঠেছে বাতাস? —সে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যায় সেখানে। তখন তার বুকের ভেতরটা ছটফট করে, ছটফট করে— যদি একজন বিপর্যস্ত মানুষকেও সে একটু সাহায্য করতে পারতো! কিন্তু তা কি আর সম্ভব? —দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া পৃথিবীর মানুষদের জন্য কোনোকিছু করার ক্ষমতা মৃতদেরকে দেয়া হয় না। তারপরেও, নানা স্থানের নানান দুর্ঘটনার সংবাদে তার একদমই মন টেকে না স্বর্গে। সে ছুটে চলে যায় পৃথিবীর মাটিতে। কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখতে দেখতে তার বুকের ভেতরটা গভীর বিষাদে ভরে ওঠে প্রবল— তাতে কী? সেদিন যখন গুলশান ১ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেট আগুনে পুড়ে গেছে শুনলো— সে আর দাঁড়াতে পারলো না একমুহূর্তও, চলে গেলো পৃথিবীতে। সেখানে পৌঁছেই সে দেখলো পুড়ে যাওয়া মার্কেটটার চারপাশের ফুটপাথ জুড়ে অনেক মানুষের ভিড়। ভিড়ের কাছাকাছি হতেই দেখলো নানা রকম পণ্য সাজিয়ে বসে আছে বিক্রেতারা। আগুনের হাত থেকে যেগুলো পণ্য বাঁচানো সম্ভব হয়েছে, বিক্রি করছে তারা সেগুলোই। কোথাও দেখা গেলো বাচ্চাদের খেলনা, প্লাস্টিকের ফুল, বাহারী তোয়ালে ইত্যাদি সাজিয়ে বসে আছে কেউ । কোথাও আবার দেখা গেলো বাচ্চাদের সাইকেল, রিকশা— এসব সাজিয়ে বসে আছে কেউ। কোথাও বা নানা রকমের ঘড়ি, ব্রেসলেট ইত্যাদি সাজিয়ে বসে আছে কেউ। ক্রেতারা দাম-দর করছে, পছন্দ হলে, দামে-দরে মিলে গেলে নিয়ে নিচ্ছে। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে ক্রোকারিজের জিনিসপত্র সাজিয়ে বসে থাকা এক বিক্রেতার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো কায়কোবাদ। একটা ডিনার সেট পছন্দ করেছে এক লোক। লোকটা হয়তো সেটটা নেবে। বিক্রেতাকে সে জিজ্ঞেস করলো— ‘ভাই, এটার দাম কতো?’ বিক্রেতা বললো, ‘দাম তো ৩ হাজার টাকা— আপনি দেড় হাজার টাকা দেন।’ ‘কী বলেন, ভাই! গায়ে আগুনের আঁচ লেগেছে দেখা যাচ্ছে— এটা তো দেড় হাজারে বেচতে পারবেন না আপনি। আমার এটা পছন্দ হয়েছে। কম-সম করে বলেন— নিয়ে যাই।’ ‘আচ্ছা ভাই, আপনি ১ হাজার টাকা দেন। সব তো শেষ হয়ে গেছে আগুনে— এখন এটা আসলেও অনেক।’ ‘না, ভাই— হয় না এই দামে। আমি পাঁচশ টাকা দিচ্ছি। দিয়ে দেন— নিয়ে যাই।’ ‘এটা কেমন কথা বললেন, ভাই— একটা ডিনার সেটের দাম মাত্র পাঁচশ টাকা!’ ‘হ্যাঁ, মাত্র পাঁচশ টাকা দেবো। দেবেন?’ একটু চিন্তা করলো বিক্রেতা। তারপর বললো, ‘আচ্ছা, দেন।’ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তার ভেতরের অনেকগুলো নোট থেকে বেছে বেছে একশ টাকার ৫টা ময়লা, নেতানো নোট বের করে এগিয়ে দিয়ে জিনিসটা নিয়ে চলে গেলো ক্রেতা লোকটা। কায়কোবাদ সঙ্গে সঙ্গে বিক্রেতা লোকটার দিকে তাকালো। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো প্রচণ্ড— বিক্রেতা লোকটা কাঁদছে! তার চোখ দুটোর সাদা অংশ ভরে উঠেছে টলমল করা জলে! . . --------------------------- রচনা-সহায়তা: তুহিন অর্ণব --------------------------- ---------------------------------------------- দাহকালের ধ্বণি— স্বর্গ বিলাপ । সুপণ শাহরিয়ার ২২ এবং ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ . ========================== *খবর ১: “২১ ঘন্টার আগুনে ধ্বংস হয়ে গেলো গুলশান ১-এর ডিএনসিসি মার্কেট” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ জানুয়ারি ২০১৭); *খবর ২: “কম দামে জিনিসপত্র বেচে দিচ্ছে গুলশানের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা” (প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি ২০১৭); *খবর ৩: মাছরাঙা টেলিভিশনের সকালের খবর (৯ জানুয়ারি ২০১৭); *কায়কোবাদ এবং শাহীনা: রানা প্লাজার দুর্ঘটনা দ্রষ্টব্য


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ স্বর্গ বিলাপ—সুপণ শাহরিয়ার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now