বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্বপ্নবৃত্ত
-সুষ্ময় রায়।
১.
নদী। নদীর পার ঘেষে একটা রাস্তা। রাস্তার
একপাশে সারি ধরে বেঞ্চ বসানো। অনেকেই
এখানে এসে বসে থাকে। রাস্তার অপর পাশে সারি
ধরে বিল্ডিং। রেস্টুরেন্ট, গয়নার দোকান, শপিং মল
ইত্যাদি।
রেস্টুরেন্টের একটা টেবিল। টেবিলটায় খাবার
রাখা। মাঝখানে একটা ফুলদানি। ফুলদানিতে রয়েছে
তাজা গোলাপ। টেবিলটা ঘিরে তিনজন বসে আছে।
একটা ছোট পরিবার। সবাই খুব আনন্দ করে
খাচ্ছে। উইকেন্ড এ সবাই মিলে আনন্দ করছে।
রেস্টুরেন্টটার অন্য কোণায় কয়েক বন্ধু বসে
আনন্দ করছে। তাদের দেখেই মনে হচ্ছে
তারা অনেক আনন্দে আছে। ওয়েটারকে
ডেকে কি যেন দিতে বলল। ওয়েটারও হাসি মুখে
তাদের অর্ডার নিয়ে চলে গেল। আবার তারা ব্যাস্ত
হয়ে পড়ল নিজেদের হাসি তামাশা নিয়ে।
রেস্টুরেন্টটার পাশে একটা গয়নার দোকান। এক
দম্পতি গয়না কিনছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে
তাদের নতুন বিয়ে হয়েছে। তারা অনেক
আনন্দে আছে।
রেস্টুরেন্টটার সামনে এক লোক বেলুন বিক্রি
করছে। একটা মেয়ে তার বাবার কাছে বায়না
করছে বেলুন কিনে দেবার জন্য। মেয়েটির
বাবাও সন্তানের এই আবদার মেনে নিল। একটা নয়,
এক ডজন বেলুন কিনছে সে।
বেলুন কিনতে থাকা এই বাবা-মেয়ে কে দেখে
আমার নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল।
আমার নিজের মেয়ে। যাকে আমি ছেড়ে চলে
এসেছি। আমি আসলে কখনোই সংসারী টাইপ মানুষ
নই। আমি নিজের মত চলতে ভালোবাসি। সংসার বা
পরিবার নামে কোন বৃত্তে আমি বন্দি হয়ে
থাকতে পারি না।
আমাকে দায়িত্ব জ্ঞাণ শেখায়। সেই দিনকার
মেয়ে, ওর ভাগ্য ভাল যে আমি ওকে বিয়ে
করেছি। ওকে খাওয়াচ্ছি, পড়াচ্ছি। তারপরেও নাকি
আমাকে পরিবারের সাথে থাকতে হবে। এমন
করলে কার ভালো লাগে। আমার প্রচন্ড রাগ
উঠে গিয়েছিল। তাই ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে
দেই। খাটের সাথে লেগে ওর মাথা ফেটে
গিয়েছিল। গলগল করে রক্ত পড়ছিল। কিন্তু আমি
ওকে ধরিনি। আমি ওভাবেই ওকে ফেলে চলে
এসেছি।
আসার সময় আমার মেয়েটা আমার হাত ধরে
বলেছিল, “যেও না বাবা।” আমি ওর চোখের
দিকে চেয়েছিলাম। কিচ্ছু বলতে পারিনি। এক
ঝটকায় ওর হাত ছাড়িয়ে এসে পরেছি। তারপর
এখানে এই নদীর পারে এসে বসে রয়েছি।
পথচারীদের কেউ কেউ আমার দিকে অদ্ভুদ
দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তাকানোরই কথা। কারণ আমি মদ
খেয়ে নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছি।
২.
আমি আমার অতীতের কথা ভাবছি। এমন সময় আমার
মনে হল সব কিছু কেঁপে উঠল। ভূমিকম্প। আমি
উঠে দাড়ালাম। কি করব বুঝতে পারলাম না।
রেস্টুরেন্টের ছাদে একটি বিলবোর্ড লাগানো
ছিল। সেটা ভেঙ্গে পড়ল। সরাসরি বেলুন কিনতে
থাকা ওই বাবা-মেয়ের উপর। মারা গেল তারা।
একে একে বিল্ডিংগুলো ধ্বসে পড়তে লাগল।
রেস্টুরেন্টের সেই ছোট পরিবার, তরুণ
ছেলের দল, গয়নার দোকানের দম্পতি, সবাই মারা
গেল। এমন সময় আমার পরিবারের কথা মনে পড়ল।
তারা বেচেঁ আছে তো?
আমি ছুটতে শুরু করলাম। এমন ভুমিকম্প এর আগে
কখনো হয় নি। আমি ছুটছি। কিন্তু টাল সামলাতে পারছি
না। রাস্তা-ঘাট ঠিকমত মনে করতে পারছি না। মদ
খাওয়াটা উচিত হয়নি।
অনেক কষ্টে বাড়ির সামনে এসে পৌছালাম। কিন্তু
কোথায় বাড়ি। সব ধুলো হয়ে পড়ে আছে। আমি
কি স্বপ্ন দেখছি? আমার স্ত্রী-কণ্যা ওরা কি মারা
গেছে? বুঝতে পারছি না। আমার প্রচন্ড কষ্ট
হচ্ছে। মেয়েটার মুখ বারবার ভেসে উঠছে। যদি
আমি নেশা না করতাম, তাহলে হয়ত এমনটা হত না।
৩.
একে একে বিল্ডিংগুলো ধ্বসে পড়তে লাগল।
সবাই মারা যেতে লাগল। এমন সময় আমার পরিবারের
কথা মনে পড়ল। আমি ছুটতে শুরু করলাম। এমন
ভুমিকম্প এর আগে কখনো হয় নি। ভাগ্যিস মদ
খাইনি। ভাগ্যিস বোতলটা হাত থেকে পড়ে
ভেঙ্গে গিয়েছিল। নেশাগ্রস্থ হলে এখন টাল
সামলাতে পারতাম না।
অনেক কষ্টে বাড়ির সামনে এসে পৌছালাম। কিন্তু
কোথায় বাড়ি। সব ধুলো হয়ে পড়ে আছে।
আমার মেয়েকে দেখলাম তার মায়ের লাশের
কাছে বসে আছে। আমার মেয়ে আমাকে
দেখেও দেখল না। যেন আমি ওর কেউ না।
আমার খুব কষ্ট হতে লাগল। বুকের ভেতর
থেকে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠছে। ভুল
করেছি। স্ত্রীকে না হয় ফেলে এসেছিলাম।
কিন্তু মেয়েটাকে আমার সাথে নিয়ে আসলে
হয়ত এমনটা হত না।
৪.
রেস্টুরেন্টটার সামনে এক লোক বেলুন বিক্রি
করছে। আমার মেয়ে আমার কাছে বায়না করল
বেলুন কিনে দেবার জন্যে। আমিও খুশি মনে ওর
আবদার মেনে নিলাম। আমি বেলুনওয়ালাকে বললাম
এক ডজন বেলুন দিতে। একটার বদলে এক ডজন।
আমার মেয়ে খুব খুশি হল। ওর হাসিমুখটা দেখে
আমার মনে হল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী
ব্যাক্তি।
এমন সময় আমার মনে হল সব কিছু কেঁপে উঠল।
ভূমিকম্প। আমি কি করব বুঝতে পারলাম না। আমি
হতবিহবল হয়ে পরলাম। আমার মেয়েও ভয়
পেয়ে গিয়েছে। আমি ওকে কোলে তুলে
নিলাম। কোনদিকে যাব? কি করব? আমি সিদ্ধান্ত
নিতে পারছি না।
হঠাৎ মনে হল উপর থেকে কিছু একটা ভেঙ্গে
পড়ছে। আমি উপরে তাকালাম। দেখলাম আমার
সামনের বিল্ডিংয়ের উপর থেকে একটা বিলবোর্ড
ভেঙ্গে পড়ল। বিলবোর্ডটা একদম আমাদের
দিকে আসছে। তারপর.........
৫.
ঘুম ভাঙতেই সাইরেনের শব্দ কানে এল। আমি
কোথায়? মনে করতে পারছিনা। আমি আশে পাশে
তাকালাম। একটা সাদা রুম। চারপাশে অনেক যন্ত্রপাতি
ছড়ানো। খেয়াল করলাম আমার মাথায় কিছু একটা
লাগানো। তারপর একটা লোক এসে সেটা খুলে
নিল। জিনিসটা দেখতে হেলমেটের মত। কিন্তু
সেটা থেকে অনেকগুলো তার বেরিয়ে
এসেছে। আমি লোকটার দিকে তাকালাম। সে
আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি চিনলাম তাকে। এ
আমার বন্ধু, রাশেদ।
“সৈকত, তুই ঠিক আছিস?” রাশেদ বলল।
“হ্যাঁ, ঠিক আছি।” আমি বললাম। কিন্তু আমি এখনোও
বুঝতে পারছি না আমি এখানে কেমন করে এলাম।
“তোর সব মনে আছে তো?”
“মানে? কি মনে থাকবে? আর আমি এখানে এলাম
কি করে?” আমি ভুরু কুচকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তোর তাহলে এখনো মনে পরেনি। মনে
করার চেষ্টা কর। সব মনে পড়বে।”
রাশেদ কি মনে করার কথা বলছে? আমি এখানেই
বা কি করে এলাম? বুঝতে পারছিনা। ল্যাব রুম,
মেশিনপত্রের ছড়াছড়ি, হেলমেটের মত জিনিস,
কি এইগুলো। যতদূর মনে পরে আমি বাড়ি থেকে
আমার স্ত্রী-র সাথে ঝগড়া করে বেরিয়ে
এসেছিলাম। এক মিনিট। মনে পড়েছে। আমার সব
মনে পড়েছে। আমি কেন এখানে এলাম? কি
করে এলাম? সব মনে পড়েছে।
“কি? এবার সব মনে পড়ল।” হাসি হাসি মুখ করে
বলল রাশেদ।
৬.
আমার সব মনে পড়ে গেছে। আমি আমার
স্ত্রী’র সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে
বেরিয়ে আসি। খাটের সাথে লেগে ওর মাথা
ফেটে গিয়েছিল। আমি ওভাবেই ওকে ফেলে
চলে এসেছি। তারপর মদ খেতে খেতে রাস্তা
দিয়ে হাটছিলাম। বেশি খাইনি। রাশেদের গাড়ির ধাক্কায়
মদের বোতলটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে
গিয়েছিল। তারপর, রাশেদ আমাকে তার বাড়িতে
নিয়ে আসে।
আমি রাশেদকে সবকিছু খুলে বলি। আমি ওকে বলি
যে আমি সংসার বা পরিবার নামক শেকলে বন্দি হতে
চাই না।
“তুই কি তোর স্ত্রী-সন্তানকে একটুও
ভালোবাসিস না?” রাশেদ আমাকে জিজ্ঞেস
করেছিল।
“না। আমি ওদের সহ্য করতে পারি না”
“ভুল। তুই আসলে ওদের অনেক ভালোবাসিস।”
“না। আমি ওদের ঘৃণা করি। আমি ওদের ভালোবাসি
না।” আমি বললাম।
“তুই প্রমাণ চাস?” রাশেদ কি প্রমাণ দেখাবে?
“হ্যাঁ, প্রমাণ চাই” আমি রাজী হলাম।
“তাহলে আয়”
তারপর রাশেদ আমাকে তার ল্যাবরেটরিতে নিয়ে
গেল। রাশেদ একজন বড় বিজ্ঞানী। ও আমাকে
স্বপ্নবৃত্ত নামে একটা যন্ত্র দেখাল। বলল এই
যন্ত্রের মাধ্যমে নাকি আমি প্রমাণ পেয়ে যাব
যে আমি আমার পরিবারকে কতটা ভালোবাসি। রাশেদ
আমাকে একটি হেলমেট পড়তে দিল। এই
হেলমেটের মাধ্যমে আমার মস্তিষ্কের সাথে
‘স্বপ্নবৃত্ত’ যন্ত্র কাজ শুরু করবে।
প্রথমে ভুমিকম্পে নিজের পরিবারে মৃত্যু। তারপর
ভুমিকম্পে আমার স্ত্রী’র মৃত্যু। তারপর ভূমিকম্পে
নিজের মৃত্যু। এই সবই স্বপ্নবৃত্তের প্রোগ্রাম।
আমি এখন সত্যিই বুঝতে পারছি যে আমি আমার
পরিবারকে কতটা ভালোবাসি। এবার আমি বাসায় ফিরে
যাবো। আমার স্ত্রী আর মেয়েকে সরি বলব।
আমি আর কখনোও তাদের ছেড়ে যাব না। কথা
দিলাম।
৭.
রেস্টুরেন্টের একটা টেবিল। টেবিলটায় খাবার
রাখা। মাঝখানে একটা ফুলদানি। ফুলদানিতে রয়েছে
তাজা গোলাপ। টেবিলটা ঘিরে তিনজন বসে আছে।
একটা ছোট পরিবার। সবাই খুব আনন্দ করে
খাচ্ছে। উইকেন্ড এ সবাই মিলে আনন্দ করছে।
এই তিনজনের একজন আমি, একজন আমার
মেয়ে, আর অন্যজন আমার স্ত্রী। আমরা সবাই
খুব আনন্দে আছি। আমি খুব আনন্দে আছি। আমার
মত সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
‘স্বপ্নবৃত্ত’ যন্ত্রটি হয়ত ভবিষ্যৎ দেখতে পারে।
আমি এমনটাই তো স্বপ্নে দেখেছিলাম।
রেস্টুরেন্টের অন্য কোণায় একদল তরুণ মিলে
মজা করছে। রেস্টুরেন্টের সামনে এক লোক
বেলুন বিক্রি করছে। একটা মেয়ে তার বাবার
কাছে বায়না করছে বেলুন কিনে দেবার জন্য।
মেয়েটির বাবাও সন্তানের এই আবদার মেনে
নিল। একটা নয়, এক ডজন বেলুন কিনছে সে....।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now