বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ প্রতিম দাস,
অনুবাদ গল্প, কল্পবিজ্ঞান, চতুর্থ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, পূজাবার্ষিকী।
******************★*****************
এ কাহিনি আমার ছোটবেলার। সেদিন বুঝিনি স্বপ্ন সম্রাট আমাকে কী বলেছিলেন? বড় হয়ে অনুভব করেছি সে কথার মর্মার্থ। ছোটবেলায় আমি খুবই স্বপ্ন দেখতাম। সে সব স্বপ্নের সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যেতাম যে প্রায় দিনই বিছানা থেকে পড়ে যেতাম। নানা রকম স্বপ্ন দেখতাম। তার কোনওটাই আমার মনে নেই। কিন্তু টানা সাতদিন ধরে দেখা একটা স্বপ্নের খুঁটিনাটি এখনও আমার মনে গেঁথে বসে আছে। আজ আপনাদের আমি সেই সাতদিনের থুড়ি, সাতরাতের কাহিনি শোনাব।
প্রথম রাত
মাসখানেক আগে একটা গল্প শুনিয়েছিল মা। তাতে ঘুমপরিদের দেশের কথা ছিল। সে গল্প শোনার পর থেকে প্রায় রাতেই ঘুমপরিদের রাজকুমারী তার বেশ কয়েকজন পরিচারককে পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে। যাতে আমি ঠিকঠাক ওদের দেশে পৌঁছতে পারি। কিন্তু কিছু না কিছু ঘটনায় বারবার আমার ঘুম ভেঙে গেছে। শুধু তাই নয় প্রায় প্রত্যেকবার আমি বিছানা থেকে চাদর-টাদর জড়িয়ে নীচে পড়ে গিয়েছি। চেঁচিয়ে উঠেছি। যা শুনে আমার বাবা-মা ছুটে এসেছেন। ভেবেছেন, কী যে হয় ছেলেটার? মনে মনে নিশ্চিত বলেছেন, মনে হচ্ছে একবার ডাক্তার দেখানো দরকার।
অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও রাতের খাওয়া সেরে নিজের ঘরে এসে টানটান করে পাতা সাদা চাদরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মনে মনে বললাম, ‘একবার। যে করেই হোক একবার আমাকে ওই দেশে যেতেই হবে। ঘুমপরিদের প্রাসাদটা আমি দেখতে চাই। দেখতে চাই ওই দেশের রাজকুমারীকেও। কী ভালোই না হবে তাহলে! হে ভগবান, কেন বারবার ওইদেশে পৌঁছনোর আগেই আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে?’
সেদিন রাতেও ঘুমপরিদের দেশের রাজকুমারী তার এক বিশেষ সংবাদবাহককে দিয়ে দারুণ একটা খবর পাঠালেন আমার কাছে। মাথার ওপর ঝুঁটি বাঁধা লাল চুলের লম্বা রোগা সেই সংবাদবাহকের নাম লম্বকর্ণ। মুখে আকর্ণদন্তবিস্তৃত বন্ধুত্বসুলভ হাসি। পরনে হালকা বেগুনি রঙের কোট। তার ওপর চওড়া জ্যাকেট। সবুজ রঙের প্যান্ট আর একই রঙের বুট। মাথায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশিই লম্বা একটা হ্যাট।
‘এই যে গবলু,’ মিষ্টি করে লম্বকর্ণ বলল, ‘রাজকুমারী নিজে আমাকে পাঠিয়েছেন এই আমন্ত্রণপত্রটা তোমাকে দেওয়ার জন্য!’
লম্বকর্ণর এগিয়ে ধরা এনভেলপটা নিলাম আমি। ভেতরে একটা টিকিট এবং সঙ্গে ঘুমপরি রাজ্যের রয়্যাল বক্স অফিসের ছাপ লাগানো। ‘এটা আমার জন্য?’ অবাক হয়ে বললাম।
‘হ্যাঁ। তোমার জন্য। রাজকুমারীর মনোরঞ্জনের জন্য এক বিশেষ ক্রিকেট খেলার আয়োজন করা হয়েছে। এটা তারই টিকিট। স্টেডিয়ামে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন রাজকুমারী। খেলা শেষে আমি তোমাকে হিজ হাইনেসের সঙ্গেও দেখাও করিয়ে দেব।’
‘ক্রিকেট ! উউউওওও! কী যে বলব ভেবেই পাচ্ছি না!’
লম্বকর্ণ আমার হাত ধরে এমন এক সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল যার অস্তিত্ব কিছুক্ষণ আগেও এই ঘরে ছিল না। ‘দারুণ একটা খেলা হবে বুঝলে। আমিও অপেক্ষায় আছি ওটা দেখার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আমন্ত্রিত একাদশ আসছে। ওদের মোকাবিলা করবে বিশ্বজয়ী কপিলদেবের দল। এই মুহূর্তে বিশ্বক্রিকেটে সেরা দুই দল।’
আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে হাততালি মেরে বললাম, ‘দারুণ ব্যাপার তো! ইস, বাবাই যদি সঙ্গে আসতে পারত।’
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমরা পৌঁছলাম একটা নিচু ছাদওয়ালা সুড়ঙ্গের ভেতর। এপাশে ওপাশে কিছুটা ব্যবধানে একটা মশাল লাগানো আছে দেওয়ালে। তার অনুজ্জ্বল আলোয় ভালো বোঝা যাচ্ছে দু’পাশের দেওয়াল ও ছাদে মণিমুক্তোর দারুণ সব নকশা করা আছে।
‘এই পথ আমাদের ঘুমপরিদের দেশে নিয়ে যাবে। বেশি না, মাত্র এক হাজার মাইল পথ। তারপর আরও পাঁচশো মাইল গেলেই ওখানকার স্টেডিয়ামে পৌঁছে যাব। চিন্তা নেই, সময় খুব একটা লাগবে না !’
অনেকটা সময় ধরে আমরা হেঁটেই চললাম। চারদিকের অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। ক্লান্তিও বোধ হচ্ছিল খুব। এক সময় থেমে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘ইয়ে, মানে আমরা আদপেই কি পৌঁছতে পারব?’
লম্বকর্ণ হাসল, ‘দাঁড়িও না গবলু, চলো চলো ! তুমি কি আমাদের রাজকুমারীর মনে দুঃখ দিতে চাও? চাও না নিশ্চয়ই? আমাদের দেশের সবাই জানে উনি তাঁর প্রিয় বন্ধুকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।’
আমরা আরও একশো মাইল পথ হেঁটে গেলাম, তারপর আরও একশো। মাইলস্টোন দেখে বুঝতে পারছিলাম। তারপর দেখতে পেলাম, আমদের সামনে এক শ্বেতপাথরের চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে। লম্বকর্ণ জানাল, আমরা ওদের রাজ্যে পৌঁছে গিয়েছি। বাতাসে তাজা অজানা ফুলের গন্ধ পেলাম।
‘জলদি চলো, গবলু! জলদি!’ আমাদের আরও পাঁচশো মাইল যেতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই!’
‘আমি তো যত জোরে পারছি হাঁটছি!’
দু’পাশে গাছের সারি দিয়ে সাজানো চওড়া রাজপথ ধরে আমরা হেঁটে চললাম। ওখানকার অদ্ভুত সব সাজপোশাকে সজ্জিত অধিবাসীরা তাদের রাজকুমারীর নতুন বন্ধুকে স্বাগত জানাচ্ছিল চিৎকার করে। আমরা পার হয়ে এলাম এক বিশাল ভবন। লম্বকর্ণ বলল, এখানে এই রাজ্যের সমস্ত বিবাদ বিসম্বাদের মীমাংসা হয়। আরও কিছুটা সময় হাঁটার পর লম্বকর্ণ হাত তুলে বলল, ‘ওই দেখো! জাদু মায়া স্টেডিয়াম!’
‘বাহ! দারুণ ! কিন্তু আমি আর হাঁটতে পারছি না। কী করে যাব অতটা?’
‘গবলু, টিকিটটা হারিয়ে ফেলোনি তো? সঙ্গে আছে নিশ্চয়ই?’
এনভেলপটা তুলে ধরে দেখিয়ে বললাম, ‘এই যে আমার কাছেই আছে।’
‘বেশ বেশ। ওটা তোমার সামনের ওই নীল উর্দি পরা মানুষটাকে দাও। তাহলেই আমরা ভেতরে ঢুকতে পারব। খেলা এক্ষুনি শুরু হয়ে যাবে!’
চোখের নিমেষে নীল উর্দি পরা লোকটা কোথা থেকে এল রে বাবা ! এনভেলপটা এগিয়ে ধরতেই বদলে গেল চারপাশ।
জাদু মায়া স্টেডিয়ামের মতো বড় কিছু আমি এর আগে দেখিনি। শ্বেতপাথরে বাঁধানো পথ দিয়ে এগিয়ে গেলাম সেই জায়গার দিকে, যেখানে ঘুমপরিদের রাজপরিবার এবং তাঁদের আমন্ত্রিত মানুষদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা আছে। ওখানে পৌঁছে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম মাঠের পুরো দৃশ্যটা।
‘উউওওও! কী দারুণ! এরকম সবুজ ঘাস আমি আগে কখনও দেখিনি!’
‘গবলু, এদিকে এসো।’ লম্বকর্ণ ইশারা করে দেখিয়ে দিল রাজকুমারীর পাশের আসনটা।
ছবির বইয়ে যেমন আঁকা থাকে ঠিক তেমনই সুন্দরী আর মিষ্টি দেখতে রাজকুমারী বললেন, ‘এই যে এখানে চলে এসো। তাড়াতাড়ি। তোমার অপেক্ষাই করছিলাম। ক্রিকেট খেলা ভালো লাগে নিশ্চয়ই? দারুণ একটা খেলা হবে আশা করছি!’
আমি দু’হাত জুড়ে নমস্কার জানালাম রাজকুমারীকে। তারপর গিয়ে বসলাম ওঁর পাশে। তাকালাম মাঠের দিকে। খেলা শুরু হতে চলেছে। ‘আরে, ওইতো ব্যাট হাতে রেডি গাভাসকার! তার মানে ভারতীয় একাদশ ব্যাট করবে! বাবাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় উনি। ইস, এটা যদি উনি দেখতে পেতেন !’
রাজকুমারী চোখের সামনে তুলে নিয়েছিলেন ফিল্ড গ্লাস। বললেন, ‘গাভাসকারের সঙ্গে ওপেন করছেন শ্রীকান্ত।’
‘শ্রীকান্ত দারুণ ব্যাট করেন। আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মজা দেখাবেন উনি!’
জোয়েল গার্নার অনেক দূর থেকে ছুটে এসে বল করলেন। শ্রীকান্ত সপাটে ঘোরালেন তাঁর ব্যাট। ব্যাটে বলে সংঘর্ষ হতেই সেটা ধেয়ে আসতে শুরু করল আমাদের দিকে।
‘আহা, দারুণ ব্যাপার!’ লাল চকচকে বলটা দেখতে দেখতে আমি বলে উঠলাম।
রাজকুমারী ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘মনে হচ্ছে ওটা আমাদের গায়ে এসেই লাগবে!’
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘চিন্তা নেই, আমি ক্যাচ ধরে নেব।’
মাঠ থেকে বিন্দুসম ধেয়ে আসা লাল বলটা ক্রমশ বড় হতে থাকল। বড়, বড়, বড় আরও বড়। প্রথমে তরমুজের মতো, তারপর একটা বাড়ির মতো— তারপর দেখলাম গোটা স্টেডিয়াম ঢেকে যাচ্ছে ওটার আকারে— ওটা ধেয়ে আসছে খুব জোরে…
‘সর্বনাশ! কী হবে? ওটা তো আমাদের চিড়েচ্যাপ্টা করে দেবে! বাঁচাও!’
এরপরেই আমি বুঝতে পারলাম বিছানার চাদর জড়িয়ে বিছানা থেকে আবার মেঝেতে পড়ে গিয়েছি। দরজা খুলে ঢুকল বাবাই। আর্ত চিৎকারটা শুনেই ছুটে এসেছেন উনি।
‘ধুসসসসস! পুরো খেলাটা দেখতেই পেলাম না!’
‘বিছানায় উঠে পড়ো গবলু। আর স্বপ্ন দেখাটা একটু কমাও!’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now