বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সাঁকোর ওপারে সংসার

"সত্য ঘটনা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। খালের ধারে বস্তিটা যেন শহরের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অচেনা দ্বীপ। তিনশ গজ জায়গা জুড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘরের সারি, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া কালচে পানির খাল। চারপাশে কোলাহল, অথচ ভেতরে যেন অনন্ত নিঃসঙ্গতা। এখানে প্রায় সত্তর জন মানুষের বসবাস। তাদের যাতায়াতের ভরসা একটাই—নিজেদের হাতে বানানো বাঁশ আর কাঠের সাঁকো। বজলু মিয়ার চোখে সেই শুরু দিনের ছবি এখনো জ্বলজ্বল করে। প্রায় পঁচিশ বছর আগে যখন তিনি প্রথম টিনের ঘর তুললেন খালের তীরে, তখন চারদিক ফাঁকা। কোথাও হলুদের জমি, কোথাও ঝোপঝাড়। মানুষের বসতি ছিল না। পরে নবাব আলী এসে পাশেই ঘর তুললেন। তাদের দু’জনের হাত ধরেই বস্তির শুরু। খালের ওপারে যাওয়া-আসার কষ্টে একদিন বাঁশ জোগাড় করে ছোট্ট সাঁকো বানালেন। তখন তারা ভাবেননি, সেই সাঁকোই একদিন গোটা বস্তির জীবনরেখা হয়ে উঠবে। আজ সেই খাল জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এগারোটি সাঁকো। সাতটি বাঁশের, চারটি কাঠের। প্রতিটি সাঁকো একেকটি পরিবারের ইতিহাস। কেউ দুই বছর ধরে এখানে থাকেন, কেউ আবার কুড়ি বছরেরও বেশি। কারো টিনের ঘর বানাতে যত টাকা খরচ হয়, তার চেয়ে বেশি টাকায় বানাতে হয়েছে সাঁকো। নাজমুল ইসলাম, বয়স ত্রিশের কোঠায়, পেশায় দিনমজুর। সংসারের টানাটানির ভেতরেও এক প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে বানিয়েছেন কাঠের সাঁকো। মেহগনি কাঠ, বাঁশ, সিমেন্টের খুঁটি—সব মিলিয়ে গিয়েছিল প্রায় বিশ হাজার টাকা। নাজমুল হাসিমুখে বলেন, “এত খরচ করার ক্ষমতা ছিল না, তবু করতেই হইছে। কারণ সাঁকো ছাড়া তো ঘরে ফেরা যায় না। আমরা চাইলে সরকারি ব্রিজে যাইতে পারতাম, কিন্তু সেটা এত দূর, প্রতিদিন সেই ঘুরপথে কার সাধ্য!” তার সাঁকো একটু প্রশস্ত। ভ্যানগাড়িও চলাচল করে। কিন্তু সমস্যা হলো, অন্য পরিবারগুলো সবসময় ব্যবহার করতে পারে না। মাঝে মাঝে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধে। কেউ জোর করে পার হয়, কেউ নিষেধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বস্তির নারী বিরিন খাতুনের জীবনের গল্প আরও গভীর। তার স্বামী ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালান। সেই ভ্যানই সংসারের রুটি-রুজি। কিন্তু ভ্যান আনতে হলে খালের ওপারে ভরসা ছিল না কোনো পথের। অবশেষে তারা ঋণ করে বানালেন কাঠের সাঁকো। দুই কাঠমিস্ত্রী টানা দুই দিন কাজ করল। মেহগনি কাঠ, বাঁশ, সিমেন্টের খুঁটি—সব মিলিয়ে দাঁড়াল প্রায় দশ হাজার টাকা। বিরিন বলেন, “ভ্যানটা যদি আঙিনায় আনতে না পারতাম, তবে প্রতিদিন রাতভর দুশ্চিন্তা হইত। এখন অন্তত ভ্যান বাড়ির সামনে রাখা যায়।” শিশুরা কিন্তু এসব নিয়ে ভাবে না। বিকেল নামলে খালের ওপর সাঁকোতেই তাদের রাজ্য। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ঝাঁপ, বাঁশের ফাঁক দিয়ে নিচে দেখা যায় কালো পানির ঢেউ। পা পিছলালেই বিপদ, তবুও ভয়হীন হাসিতে ভরে ওঠে চারদিক। সাঁকোগুলো যেন শিশুদের খেলার সাথী। কিন্তু সাঁকো মানে কেবল আনন্দ নয়; সাঁকো মানে বিরোধও। কেউ কাউকে পার হতে দেয় না, কেউ আবার জোর করে ওঠে যায়। একদিন এক নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো ভেঙে পড়ল, তখন সবাই মিলে নতুন বাঁশ কেটে মেরামত করল। প্রতিবার বর্ষায় বাঁশ পচে যায়, আবার নতুন খরচ, নতুন পরিশ্রম। তবুও থামে না সাঁকো বানানো। কারণ সাঁকো মানেই ঘরে ফেরা। খালটি বয়ে গেছে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে। এর শুরু পদ্মার শ্যামপুর এলাকায়, শেষ ফলিয়ার বিল। মাঝপথে তিনটি সরকারি সাঁকো আছে—গণির মোড়ে, মোহনপুরে আর গ্রিজ ফ্যাক্টরির পাশে। কিন্তু বস্তির মানুষ সেগুলো ব্যবহার করে না। ঘুরপথে যেতে গেলে তাদের হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তাই প্রত্যেকেই নিজস্ব সাঁকো বানিয়েছে, নিজের মতো করে। এই বস্তির মানুষজন দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী। কেউ ভ্যান চালায়, কেউ রিকশা, কেউ দিনমজুরি। সংসারের সামান্য আয় থেকেও তারা সাঁকো বানানোর জন্য টাকা জোগাড় করে রাখে। কারণ টিনের ঘর ছাড়া বাঁচা যায়, কিন্তু সাঁকো ছাড়া নয়। খালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি সাঁকো আসলে একটি পরিবারের ইতিহাস। বজলুর বাঁশের সাঁকো বস্তির শুরুর গল্প বলে, নাজমুলের কাঠের সাঁকো ভাগাভাগি করা কষ্টের কথা মনে করায়, বিরিনের প্রশস্ত সাঁকো সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের কথা বলে। খালের কালো পানি বয়ে যায় উত্তরমুখী, কিন্তু তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এসব সাঁকো যেন প্রতিদিনের জীবনের প্রতীক। প্রতিটি বাঁশ, প্রতিটি কাঠের তক্তা যেন মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তির সাক্ষী। ভেঙে যায়, আবার গড়ে ওঠে। হার মানে না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সাঁকোর ওপারে সংসার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now