বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রুমমেট

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Rajkumar Roychoudhury(guest) (০ পয়েন্ট)

X রুমমেঠ রাজকুমার রায়চৌধুরী ১ ভবতারণ ভাদুড়ি একটা সমস্যায় পড়েছেন ৷ ওনার কথা সবাই উড়িয়ে দিচ্ছে ৷ উড়িয়ে দেবার ই কথা ৷ একটা লোক যদি বলে তার বাড়িতে একটা লোক বাস করছে যার চেহারা ভবতারণ বাবু দেখেন নি ছায়া পর্যন্ত না, কোন কন্ঠস্বর এখনো পর্যন্ত শোনেন নি, লোকে তো বলবেই এটা ওর মানসিক বিকার৷ ভবতারণ বাবু নিতান্তই সাধারণ মধ্যবিত্ত লোক ৷ সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন ৷সরকারী চাকরী ৷গেজেটেড অফিসার ছিলেন ৷ ষাট পেরোবার এক বছর আগেই স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন ৷পেনসন ছাড়াও ভালো রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পেয়েছেন ৷ঘুরে বেড়ানো 'বই পড়াবিশেষ করে কল্প বিজ্ঞান ফ্যান্টাসি আর হরর বই পড়তে আর এসব বিষয়ে সিনেমা দেখতে ভালো বাসেন ৷ এক মাত্র সন্তান তাঁর মেয়ে বৃষ্টি হায়দ্রাবাদে থাকে| স্ত্রী গত বছর মারা গেছেন ৷ লিভারে ক্যানসার হয়েছিল ৷ভবতারণ উত্তর কোলকাতার একশহর তলিতে ছোট একটা বাড়ি কিনেছেন ৷একতলায় একটা ছোট ঘর আর রান্না ঘর ছাড়া ও একটা হল ঘর আছে ৷ দোতলায় দুটি শোবার ঘর ৷একচিলতে বারান্দা আর ছোট একটা ড্রইং রুম ৷ এক বন্ধুর বাড়ি ছিল এটা তাই সস্তায় পেয়েছেন ৷ ৷ মেয়ে একা কোলকাতায় এলে দোতলায় একটা ঘরে থাকে ৷ ভবতারণ বাবু খুব গোছালো লোক৷ ৷তিন দিন অন্তর বিছানার চাদর বালিস ঘরের পর্দা পাল্টান ৷ উনি মেয়ে কে উনি এ বিষয়ে এত দিন কিছু বলেন নি ৷ ২ বৃষ্টি আজই কোলকাতায় এসেছে অফিসের কাজে ৷দু দিন থাকবে ৷বৃষ্টি তো ভবতারণ বাবুর সন্দেহ শুনে হেসেই উড়িয়ে দিল ৷বলল যে দিন রাত ফ্যান্টাসী আর আজগুবী গল্প গুলো যে সব গাঁজাখুরী কল্পবিজ্ঞানের নামে চলছে ওই গুলি পড়ে ওনার মাথায় এসব ঢুকেছে ৷ ভবতারণ বাবু বললেন যে উনি একটা এই রকম একটা গল্গ পরেছেন সত্যি কিন্তু সেই গল্গে লোকটা নিজের একটা ডুপ্লিকেট কে নিজের ঘরে দেখতে পেত " " তুমি তো এসব কিছু দেখনি ৷ কি করে বুঝলে আর একটা লোক তোমার ঘরে বাস করছে৷তুমি তো বাউলদের ওই গানটা শুনেছো ""তোমার ঘরে বাস করে কয় জনা " তুমি তো বলবে দুই জনা ৷ " বৃষ্টি নিজের রসিকতায় নিজেই হাসে ৷ ভবতারণ বাবু বললেন "শোন আমার ব্যাপারটা এত সূক্ষ যে কেউ বিশ্বাস করবেনা কেন আমার মনে হচ্ছে এই বাড়িতে আর একজন বাস করছে " " কি সূক্ষ ব্যাপার শুনি" "শোন তুই যে ঘরে আজকে থাকবি কালই সে ঘরের বিছানার চাদর পাল্টাতে গিয়ে দেখছি চাদর টা টান টান নেই ৷কেউ যেন শুয়ে ছিল আর উঠে বিছানা গুছিয়েছে কিন্তু আর আগের অবস্থায় আনতে পারেনি " " বাপরে আজ আমার বিছানায় আর একজন শোবে ! বৃষ্টি কপট ভয়ের ভান করে ৷ " শোন এটা হাসি ঠাট্টার ব্যাপার নয় ৷ তুই বরং আমার ঘরে শো ৷আমি নিচে শোব " " তা না হয় শুলাম কিন্তু আর কি সূক্ষ ব্যাপার দেখেছো শুনি " "কাল মাঝ রাত্রে উঠে ফ্রীজ থেকে একটা জলের বোতল বার করেছি জল খাব বলে ৷দেখি বোতলের জলের লেভেল আধ ইন্চি কমে গেছে ৷ তুইতো জানিস এ ব্যাপারে আমি কিরকম পিটপিটে৷ তোর মা কতবার এই নিয়ে আমায় কথা শুনিয়েছে ৷" বৃষ্টি এবার হো হো করে হেসে উঠল ৷ এবার থেকে হোমিওপ্যাথির ঔষধের মত বোতলে লে বেল মেরে রেখো৷ সিরিয়াসলি, বাবা তোমার একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিৎ ৷আমার এক বন্ধুর বাবা ডঃ নব প্রসাদ নন্দী খুব নামকরা ডাক্তার ৷আমার মনে হয় তোমার একবার ডঃ নন্দীর কাছে যাওয়া দরকার ৷বলতো কালকেই দেখা করার ব্যবস্থা করতে পারি ৷ ভবতারণ বৃস্টির কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ৷মেয়ের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই ৷ওনার মনে পড়ে গেল বেশ কিছু দিন আগের কথা ৷বৃস্টির তখন বয়স ছয় বছরের মত ৷প্রত্যেক দিন রাত্রে বাবা গল্প না বললে মেয়ে ঘুমোবে না ৷ ভবতারণ বাবুর স্টকে খুব বেশী গল্প ছিলনা ৷আর ছ বছরের মেয়ের পড়ার মত বই ও বাড়িতে বেশী ছিল না ৷ উনি প্রত্যেক মাসে বাচ্চাদের জন্য লেখা প্রচুর কমিকস ' ফ্যান্টাসি আর ভূতের গল্প কিনে আনতেন ৷ বৃস্টির সবচেয়ে পছন্দ ছিল টিনটিনের কমিকস৷ ভবতারণ বাবু নিজে বই গুলি পড়ে বৃস্টি যাতেবুঝতে পারে সে ভাবে গল্গ গুলি বলতেন ৷ গল্গ শুনতে শুনতে ই বৃস্টি ঘুমিয়ে পড়ত ৷ ওনার স্ত্রী নন্দি তা বলত আদর দিয়ে দিয়ে উনি বৃস্টিকে বাঁদর করে তুলছেন ৷ ভবতারণ বাবু জানতেন এ সব কথার কথা ৷নন্দিতা কখনই যা ভাবে তা বলত না ৷ও আসলে পছন্দই করত ভবতারণ বাবু রোজ বৃস্টিকে গল্প শোনান বলে ৷নন্দিতা গান আর বই দুটোরই পোকা ছিল ৷ বৃস্টি মেধাবী ছাত্রী ছিল৷ কমপিউটার সায়েন্সে এম টেক করে একটা বড় আই টি কোম্পানীতে চাকরী পেয়ে হায়দ্রাবাদে চলে যায়৷ ওখানেই ওর সুণ্দর বলে একটি ছেলের ওর আলাপ হয় ৷পরে বৃস্টি বাবা মার সঙ্গে সুন্দরের পরিচয় করে দেয় ৷সুন্দরকে ভবতারণবাবু ও নন্দিতার ভাল লাগে ৷ ফলে বৃস্টির সঙ্গে সুন্দরের বিয়ে হওয়াথতে কোন জটিলতা হয়নি ৷সুন্দর ও কমপিউটার সায়েন্সে এম টেক করে | পরে ,,৷৷৷৷৷৷৷বৃস্টির কোম্পানীতে কিছু দিন চাকরী করে আমেরিকাতে পিএইচডি করে একটা বিদেশী ব্যান্কে চাকরী প৷য়৷ কিছু দিন ব্যাঙ্গালোরে ছিল তার পর বৃস্টির সঙ্গে বিয়ের পর হায়দ্রাবাদের একটা সফট ওয়ার ডেভালাপমেন্ট কোম্পানীতে চাকরী পায় ৷ ওদের কোন ছেলে মেয়ে এখনো হয় নি ৷ ৷ভবতারণ বাবুর আশা মরবার বেশ কিছু দিন আগেই নাতি নাতনীর মুখ দেখতে পারবেন ৷ ৩ ভবতারণ বাবুর সন্দেহ টা বেশ দানা বেঁধেছে ৷ বৃস্টি যাবার সময় বাবাকে একটা কিন্ডল দিয়ে ছি ৷ বেশ কিছু আধাভৌতিক প্যারানরমাল ,হররের বই বৃস্টি আপলোড করে দিয়েছিল ৷ এর মধ্যে একটা গল্গের নাম শুনে ভবতারণ বাবুর পড়বার ইচ্ছে হল ৷ গল্পটির নাম আ্যবানডনড বা পরিতক্ত ৷ ভবতারণ বাবু অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করেন না ৷ নিজে বিজ্ঞানের ভালো ছাত্র ছিলেন ৷ ইচ্ছে ছিল বায়ো কেমিস্ট্ হওয়া ৷ কিন্তু পারিবারিক অবস্থার জন্য ওনার একটা চাকরীর দরকার ছিল ৷ কেন্দ্রীয় একটি সংস্থাতে সহজেই মোটামুটিএকটা ভালো চাকরী পেয়ে যান ৷ কিছুদিন ভূপালে থাকার পর ভুবনেশ্বরে বদলী হন ৷ ভুবনেশ্বরে থাকার সময়ে নণ্দিতারা সঙ্গে ওনার বিয়ে হয় ৷ বৃস্টির জন্ম ও ভুবনেশ্বরেই হয় ৷ বৃস্টি উড়িয়া ও তেলেগু ভালই জানে ৷ ভবতারণ বাবু র বই পড়ার নেশা আছে ৷নানা বিষয়ের উপর পড়াশুনা করেছেন ৷ তবে হালকা কিছু পড়তে ইচ্ছে করলে রহস্য রোমান্চ ও অলৌকিক বিশেষ করে প্যারানরম্যাল বিষয়ের উপর লেখা গল্গ উপন্যাস পড়েন রোল্ড ডাল ও জর্জ সিমেননের লেখা ওনার খুব পছন্দ ৷নিছক ভূতের গল্প ওনার অত ভালো লাগেনা ৷ কিন্তু " abandoned " গল্পটা পড়ে ওনার মনে হল লেখায় মুন্সিয়ানা থাকলেও মূলত এটি ভূতের গল্গ ৷ক্যারেলিনা বলে একটি মেয়ে লস এন্জেলেসে থাকে ৷ একটা ছোট কোম্পানি তে কাজ করত ৷ কিন্তু সে ছাঁটাই হয় ৷াযে ফ্ল্যাটে সে থাকত তার ভাড়া না দিতে পারায় ফ্ল্যাট ছাড়তে বাধ্য হয় ৷ ওর এক বন্ধু ওকে একটা খুব সস্তায় থাকার একটা জায়গার সন্ধান দেয় ৷ ক্যারোলিনা ওখানে থাকতে শুরু করে ৷ কিছু দিনের মধ্যেই বুঝতে পারে বাড়িটা haunted. রোজ রাত্রে ও দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে ৷প্রচুর লোক জনের আসা যাও য়ার শব্দ , একটি মেয়ের আর্তনাদ ৷রোজই একই স্বপ্ন দেখে ৷একদিন ক্যারোলিনা বাড়িটা ছেড়ে যাবার চেস্টা করে ৷কিন্তু তখন জানতে পারে এ বাড়ি সে কোনদিন ছেড়ে যেতে পারবেনা কেননা সেও একজন অশরীরি বাড়ির বাসিন্দা হয়ে গেছে ৷ এরকম একটা গল্গ ভবতারণ বাবু লিখেছিলেন কলকাতার একটি মেস বাড়ি নিয়ে কিন্তু ছাপান নি মনে হয়েছিল যথেস্ট মৌলিক নয় ৷ অবশ্য ভবতারণ বাবুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই সব গল্গের কোন সম্পর্ক নেই ৷ভবতরণ গল্পটা পড়াশেষ করে কিন্ডল টা ওনার একটা বইএর তাকে ১০১ আর ১০২ নংবই এর ফাঁকে রেখে দিয়ে ছিলেন ৷ এটা ওঁর স্পস্ট মনে আছে ৷কিন্তু পর দিন কিন্ডল টা খুঁজতে গিয়ে দেখলেন ওটা ১১০ নং আর ১১১ নং বইএর মাঝখানে আছে ৷ ভবতারণ বৃস্টির কথা ভাবলেন ৷সত্যিই কি ওনার ডিমেন্সিয়া হয়েছে ৷ কিন্তু ওনার দৃঢ় বিশ্বাস ওনার বাড়িতে আর একজন বাস করছে ৷ হয়ত তার শারীরিক কোন উপস্থিত নেই কিন্তু মানসিক উপস্থিত আছে ৷কেউ ওনার পারসোনালিটি বদল করার চেস্টা করছে ৷ এর পর যা ঘটল তাতে ভবতারণ বাবুর সন্দেহ আরো ঘনীভূত হল ৷ উনি একটি অনুষ্ঠানে যাবার জন্য আলমারি থেকে সাদা পান্জাবী বার করেছিলেন ৷ চান করে ফিরে এসে দেখেন বিছানার উপর একটা হলুদ পান্জাবী রাখা ৷ এটা উনি ধরেই নিয়েছিলেন ওনারই ভুল সাদা ভেবে হলুদ পান্জাবী টাই আলমারী থেকে বার করেছিলেন ৷কিন্তু হলুদ পান্জাবী দেখে হঠাৎ ওনার শৌভিকের কথা মনে পড়ে গেল ৷ হলুদ রং শৌভিকের খুব প্রিয় ছিল ৷শৌভিক ছিল ওনার মামাতো ভাই ৷ভবতারণ বাবুদের ও শৌভিকদের বাড়ি ঘটনাচক্রে একদম পাশা পাশি ছিল ৷দুজনে একই সঙ্গে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়তেন ৷দুজনে ছিল হরিহর আত্মা ৷ অথচ বাহিরের দিকথেকে দেখতে গেলে দুজনে দুটি ভিন্ন চরিত্র ৷ শৌভিক প্রায় সব রকম খেলায় পারদর্শী ছিল ৷ হলিহুডের মার পিটের ছবি দেখতে ভাল বাসত ৷আর ভবতারণ ছিলেন কিছুটা অন্তর্মুখী ৷তাস দাবা খেলতেন বিদেশী উপন্যাস পড়তেন ৷ ৷ওনার আর একটি শখ ছিল থিয়েটার দেখার শৌভিক ওনাকে জোর করে খেলার মাঠে নিয়ে যেত৷ আমেরিকান ডিটেকটিভের গল্গ পড়া , হরর ছবি দেখা ও উনি রপ্ত করেছেন শৌভিকের কাছ থেকে ৷আবার শৌভিক কে উনি ধরে বেঁধে থিয়েটার দেখতে নিয়ে যেতেন ৷ থেকে ৷মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে এক ট্রেন দুর্ঘটনায় শৌভিকের মৃত্যু হয়৷ ভবতারণ ও শৌভিক দুজনে ই একই সঙ্গে এক কামরায় ছিলেন ৷ দুজনেই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে হাজারীবাগ গিয়েছিলেন ৷ শৌভিক একটা বিদেশীব্যান্কে কাজ করত ৷ ওই ব্যান্কের একটা হলি ডে হোম আছে হাজারীবাগে৷ ওঁরা দুজনে ওখানেই উঠেছিলেন ৷কয়েক দিন খুব মজাতেই কেটেছিল ৷ ফেরবার সময়ে এক জায়গায় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়৷পাঁচ জন ঘটনা স্থলেই মারা যায় ৷ তার মধ্যে শৌভিক একজন৷প্রায় কুড়ি জন গুরুতর ভাবে আহত হয় ৷ ভবতারণ গুরুতর আহত হয়ে প্রায় একমাস হাসপাতালে ছিলেন ৷শৌভিকের মৃত্যু ভবতারণ বাবুকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল ৷ পরে কোলকাতার নাম করা সাইক্রিয়াটিস্ট ডাঃ পরিমল রায় চৌধুরীর চিকিৎসা তে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেন ৷ শৌভিকের একটা ভালো প্রমোশন হওয়ার কথা ছিল ৷কিন্তু মৃত্যু এসে সব তছনছ করে দিল ৷ শৌভিকের বাবা প্রণব বাবু খুব শক্ত মনের মানুষ ৷এতবড় শোকেও চোখের জল ফেলেননি ৷ কিন্ত শুভু র মা ( ওটাই শৌভিকের ডাক নাম ছিল) প্রতিমা প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন ৷ ভবতারণ বাবু না থাকলে বোধ হয় সত্যি উন্মাদ হয়ে যেতেন ৷শৌভিকের মৃত্যুর পর ভবতারণ বাবুকে উনি আঁকড়ে ধরে ছিলেন ৷ শৌভিকের বোন রত্না তখন কলেজে সবে ঢুকেছে ৷ রোজ রাত্রে শৌভিকদের বাড়িতে ভবতারণ খেতেন ৷মাঝে মাঝে রাত ও কাটাতেন ৷ ভবতারণ ও রত্নাকে শৌভিকের মা ঙ্চক্ষে হারাতেন ৷ শৌভিকের মৃত্যুর পর কোন রকমে আরো দশ বছর বেঁচে ছিলেন ৷ কিন্তু ছেলের শোক ভিতর টাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল ৷ হয়ত রত্লার একটা ভাল বিয়ে দেওয়া অবধি বেঁচে ছিলেন ৷ রত্না ও বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে ৷ কেমিস্ট্রিতে এম এসসি পাশ করে একটি সরকারী স্কুলে চাকরী পায় ৷ পরে ভবতারণ বাবু ও শৌভিকের সহপাঠী রণিতের সঙ্গে রত্নার বিয়ে হয় ৷ রণিত ইন্জিনিয়ারীং পাশ করে একটি বিদেশী কম্পানী তে জয়েন করে ৷ কতদিনকার কথা ৷রত্না এখন একটা সরকারী স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ৷ রণিত চাকরী থেকে অবসর নিয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে একটা কনসাল্টিং ফার্ম খুলেছে ৷ওদের একমাত্র সন্তান অনন্যা ব্রাসেলসে থাকে ৷একটা ডাচ কম্পানিতে কাজ করে ৷বাবার মত অনন্যা ও কেমিক্যাল ইন্জিনিয়ার ৷এখনও বিয়ে করেনি ৷ হলুদ পান্জাবী টা দেখে ভবতারণ বাবুর মনে পুরোনো স্মৃতি গুলো যেন সিনেমার প্লে ব্যাকের মত ফিরে এল আর শৌভিকের স্মৃতি ক্ষত চিহ্ণের মত চাড়া দিয়ে উ ৪ ভবতারণ বাবু ভাবলেন বৃস্টি হয়ত ঠিক কথাই বলেছে ৷উনি ওনার এক বন্ধুর কাছ থেকে ডঃ নন্দীর ফোন নাম্বার টা নিয়ে একটা appointment ও করে ফেললেন ৷বৃস্টি মিথ্যে বলেনি৷ ডঃ নন্দীর সত্যিই খুব নাম ডাক৷ ওনার এক বন্ধুর ছেলে একবার গভীর অবসাদে ভুগছিল ৷ডঃ নন্দীর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে ৷এখন দিল্লীতে একটা ভালো কম্পানীতে চাকরী করে ৷ সোমবার সকাল নটায় ভবতারণ বাবু ডঃ নন্দীর চেম্বারে হাজির হন ৷ এর আগে বৃস্টির সঙ্গে ফোনে কথা হয় ৷বৃস্টি বলেছে উনি যেন সব কিছু খুলে বলেন ৷বৃস্টি জন্মানোর অনেক আগেই শৌভিকের মৃত্যু হয় ৷কিন্তু বাবা কে দেখে রত্না বুঝতে পারত বাবা এখন ও ওই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি ৷ বৃস্টি বোধ হয় ডঃ নন্দীর মেয়েকে বাবার কথা বলে রেখেছিল ৷ ভবতারণ বাবুকে খুব বেশী অপেক্ষা করতে হলনা ৷ ডঃ নন্দীর চেম্বার টা বেশ আধুনিক ৷" বসবার চেয়ার গুলো খুবই দামী মনে হয় ৷ ঘরে দুটো পেন্টিং আছে ৷ একটা যামিনী লায়ের আর একটা গনেশ হালুই এর ৷দুটোই অরিজিনাল এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশনেই ৷" সিনেমায় যেরকম দেখায় পেশেন্ট শুয়ে আছে আর ডাক্তার প্রশ্ন করে যাচ্ছে সে রকম কোন কিছু ডঃনন্দীর করলেন না ৷ঘরে সব চেয়ার গদীওয়ালা৷ ডঃ নন্দী নিজে এরকম একটা চেয়ারে বসে উল্টো দিকের চেয়ারে ভবতারণ বাবুকে বসতে বললেন ৷দুজলনের মাঝ খানে একটা মাঝারী সাইজের একটা আয়তাকার আকারের টেবিল ৷ ডঃ নন্দী বললেন যে ওনার মেয়েকে বৃস্টি ভবতারণ বাবুর সমস্যা শুনেছেন ৷কিন্তু উনি ভবতারণ বাবুর বাবুর মুখ থেকে সব শুনতে চান ৷ ভবতারণ বাবু সমস্ত খুলে বলেন ৷ হলুদ পান্জাবী টা দেখার পরঞঞূ শৌভিকের শোক টা যে আবার চাড়া দিয়ে উঠল সেটা ও বললেন ৷ "এই পান্জাবী টা কত পুরোনো ৷ ডঃ নন্দী যে প্রশ্ন টা করবেন ভবতারণ বাবু তা আন্দাজ করেই এসেছিলেন প৷ বললেন শৌভিক মারা যাওয়ার বেশ কয়েকদিন আগেই কেনা ৷শৌভিক অবশ্য হাজারীবাগ যাওয়ার আগে আর একটা হলুদ পান্জাবী কিনেছিল ৷ এটা ও আমায় জন্মদিনে গিফট দিয়েছিল ৷আমি হলুদ রং খুব একটাপছন্দ করি না তবু ওর পাল্লায় পরে একটা বিয়ে বাড়িতে এটা পরে গিয়েছিলাম ৷ ও খুব খুশী হয়েছিল ৷ " কিন্তু কেন আপনার মনে হচ্ছে আপনার বাড়িতে আর একজন থাকছে অথচ আপনি কিছুই দেখতে পারছেন না ৷বিছানায় সূক্ষ ভাঁজ বা জলের বোতল থেকে অতি সামান্য জল উধাও হওয়া এগুলি সামান্য ঘটনা ৷আপনি যতই গোছানো লোক হন এরকম ভুল এই বয়সে খুব স্বাভাবিক ৷ আর হয়ত শৌভিকের স্মৃতি আপনাকে হলুদ পান্জাবীটার কথা মনে করে দিয়েছিল ৷ আপনি সম্সূর্ণ সুস্থ ভবতারণ বাবু ৷ তবে কয়েকটা ব্লাড টেস্ট আর একটা সি টি স্ক্যান করিয়ে নিতে পারেন ৷ যদিও আমার মনে হয় এসব দরকার নেই ৷ রাত্রে ঘুম না এলে একটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি খাবেন ৷ তবে রোজ খাবেন না ৷" ডঃ নন্দী চেম্বার দেখে ভবতারণ একটা হসপিটালে ফোন করে ডঃ নন্দী যেসব টেস্ট করার কথা বলেছিলেন সেগুলি যাতে কাল ই করা যায় তার ব্যবস্থা করলেন ৷ হসপিটালের একজন ডাক্তারের সঙ্গে ওনার পরিচিতি আছে ৷কোন সমস্যা হবেনা কিন্তু মনটা খচ খচ করতে লাগল ৷ ওনার যে পারসোনালিটি আস্তে আস্তে বদলে যাচ্খে একথা কি করে ডঃ নন্দীকে বোঝাবেন৷ ৬) এর পর যে ঘটনা ঘটল তাতে ভবতারণ বাবুর কোন সন্দেহ থাকলা না যে ওনার কোন ডিমেন্সিয়া হয় নি ৷রাত্রে ঘুম আসছেনা ৷ ভাবলেন টি ভি তো কোন ইংরেজী থ্রীলার দেখবেন ৷ কিন্তু হঠাৎ মনেহল স্পোর্টস চ্যানেল গুলিতে কি দেখাচ্ছে দেখা যাক ৷ একটা চ্যানেলে ম্যানচেস্টার সিটি +৩ও তার চির প্রতিদ্বন্দী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাচ হচ্ছে ৷ভবতারণ বাবু শৌভিকের কাছ থেকে ইংল্যান্ডের বড় ফুটবল টিম গুলির নাম শুনে ছিলেন ৷শৌভিক ছিল ম্যানচেস্টার ইঈনাইটের অন্ধ ভক্ত ৷ ও বলত পৃথিবীর তাবৎ বড় ফুটবলার কোন না কোন সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেছে ৷এই সব খেলোয়াড়দের সমস্ত রেকর্ড শৌভিকের মুখস্থ ছিল ৷ তখন টিভিতে খেলা দেখার এত সুযোগ ছিল না ৷কিন্তু যখনই কোন নামকরা বিদেশী টিমের খেলা হত শৌভিক রাত জেগে দেখত ৷ ভবতারণ বাবু ফুটবলের অন্ধ ভক্ত নন৷ কিন্তু উনি মন্র মুগ্ধের মত খেলা দেখতে লাগলেন ৷ হঠাৎ দেয়ালে ঝোলা ক্যালেন্ডারের দিকে ওনার চোখ যায় ৷আজকের দিনটা লাল কালিতে দাগ দেওয়া ৷বহু বখর আগে ঠিক এই দিনেই হাজিরীবাগের ট্রেন দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ৷ক্যালেন্ডার থেকে আবার টিভির উপরে চোখ ফেরান ৷হাফ টাইমের ঠিক একমিনিট আগে ম্যান চেস্টার ইউনাইটেডের একজন মিডফিল্ডার ফ্রিকিকে একটা অসাধা রণ গোল করল ৷ উত্তেজনায় ভবতারণ বাবু সোফা থেকে লাফিয়ে উঠলেন ৷ ঠিক শৌভিক যে ভাবে লাফাত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড গোল দিলে ৷ ৭ বৃ স্টির এক সম্পর্কের পিসতুতো ভাই সমরেশ৷ সমরেশকে ও বলেছিল সময় পেলে ভবতারণ বাবুর খোঁজ নিতে ৷যদিও ও রোজ ই প্রায় বাবাকে ফোন করে ৷তবে ইদানিং বৃস্টি লক্ষ্য করেছে বাবা বেশী কথা বলেন না ৷ হুঁ হ্যাঁ করে সেরে দেন আর ওনার বাড়িতে আর কোন ব্যক্তির উপস্থিতির কথা ও আর বলেন না ৷ বৃস্টির মনে হল হয়ত ডঃ নন্দীর চিকিৎসা ফল দিয়েছে ৷ কিন্তু ওর মনে একটা অসস্তি বোধ হচ্ছে ৷বাবা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছেন ৷ বৃস্টির কেন যেন মনে হচ্ছে নিজের মেয়েকে ও বোধ হয় চিনতে পারছেন না ৷সমরেশ কে তাই তাড়া দেয় ৷ শিগগিরি যেন বাবার সঙ্গ দেখা ৷করে ৷ সমরেশ রবিবার সকাল দশটাই চলে এসেছে ৷ওর বাড়ি থেকে বাসে ভবতারণ বাবুর বাড়ি পনের মিনিটের পথ ৷ বাড়িতে এসে বেল টেপে ৷ ভবতাবরণ বাবু নিজেই দরজা খোলেন ৷ সমরেশ প্রথমে গাবু মামাকে দেখে চিনতে পারেনা ৷গাবু ভবতারণের ডাক নাম ৷ বলল " মামা তুমি কি গোঁফ একেবারে ছেঁটেই ফেললে " " গোঁফ ? ভবতারণ বাবু নাকের নীচে হাত বোলান ৷" ও হ্যাঁ ছেঁটে ফেলেছি" মামার হাব ভাব সমরেশের কিরকম মনেঅ হল ৷" মামা আমি সমরেশ 'চিনতে পারছোতো ? মামা তুমি ঠিক আছোতো ? " ঠিকই আছি ৷কোন সমস্যা নেই ৷ আচ্ছা তুমি কি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলা দেখো? " সমরেশ অবাক হয় ৷গাবু মামার ফুটবলে খুব একটা আগ্রহ কোন দিন দেখেনি ৷" মাঝে মাঝে দেখি ৷ তবে বারসিলোনার সব খেলা দেখি শুধু মেসির খেলা দেখার জন্য ৷ কিন্তু মামা তুমি কি এখন রেগুলার ফুটবল খেলা দেখ ৷ বৃস্টির মুখে শুনেছি তোমার এক মামাতো ভাই শৌভিক কাকু খুব ভাল ফুটবল খেলতেন ৷" সমরেশের কথা শুনে ভবতারণ বাবু চুপ করে থাকেন ৷ ভাবগতিক দেখে " পরে আসব " বলে সমরেশ কেটে পড়ে ৷তিনি যে আর ভবতারণ নন একথা বললে সমরেশ কি বিশ্বাস করত ৷আর এই ছেলেটাই যে সমরেশ তিনি কি করে জানবেন ৷ একেতো জীবনে কোন দিন দেখেন নি -*----------------------*----------------*


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রুমমেট

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now