বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পঃ রুকিতার গ্রামের বাড়ি
(রহস্য)
__________________
......
১
রাশেদ দাদুর বাড়ি এলো প্রায় বছর দশেক পর।
নীলু ব্যাপারটা মনে করিয়ে দেবার পর ও ভালমতো হিসাব
করে দেখলো আসলেই তো তাই! পুরো দশ বছর কেটে
গেছে,অথচ মনে হচ্ছে এই সেদিনের ঘটনা ও স্কুল থেকে
ফিরে দাদুর সাথে মাছ ধরতে গেছে রাজপুকুরে কিংবা
জামালদের সাথে দল বেঁধে টইটই করে ঘুরে বেড়িয়েছে
নন্দীপুরের ক্ষেতখামার বন-বাদাড়ে।
নীলুও অনেকদিন পর এসেছে, তবে ওর মত পাক্কা দশ বছর
পর না। মাঝখানে কয়েকবার এসেছে ও। ওরা দুইজন
একসাথে এ গ্রামে বড় হয়েছে। কৈশোরেই প্রেমে
পড়েছে, সেটা নিয়ে দুই পরিবারে বহু হাঙ্গামা হয়েছে।
রাশেদের বাবা ওকে ঠেঙ্গিয়েছে পর্যন্ত। নীলুকে অবশ্য
বেশি যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে। ওর ভাই প্রায়ই চুলের
মুঠি ধরে বলতো, লজ্জা করে না, কাজিনের সাথে প্রেম
করিস! পুরো দুনিয়ায় যে এটা ইনসেস্টের মত জানিস না।
তারপরও নির্জন ব্রীজের পাশে, কাশবনে, টিলার ধারে
বহুবার ওদের একসাথে দেখা যাওয়ার ঘটনা কমেনি। ওই
বয়সটা ভয়ংকর, হৃদয় থাকে অবারিত প্রান্তরের মত, আর
সেখানে কেউ ঠাঁই নিলে সেটা ভরে থাকে কানায়
কানায়। বুদ্ধিশুদ্ধিতে সেয়ানা হয়ে উঠবার পর প্রেমটা
হয়ে উঠে অনেক হিসাব নিকাশের, বাজারের ফর্দের মত
সামর্থ্য আর চাহিদার টানাপোড়েনের মিমাংসা।
রাশেদ যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় পড়বার জন্য গ্রাম ছাড়ে
সেদিন বাকিরা ভেবেছিলো তরুণের নতুন জগতে
উন্মোচনের মাধ্যমে অযাচিত ও দীর্ঘ কলহপূর্ণ এ সম্পর্কের
পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে এই বিবাদমান দুই পরিবার স্বস্তি
লাভ করবে। কিন্তু সকলের যেটা জানা ছিল না, শহরে
যাত্রার বহু আগেই রাশেদ নীলুর উন্মুক্ত বুকে যেসব
স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছিল, সেসব তাদের আজীবনের জন্য
দায়গ্রস্থ করে রাখবে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর কয়েকমাস পরই
রাশেদ যখন নীলুকে বিয়ে করার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে,
তখন ওদের পরিবারের কারো কারো জন্য বিস্ময়কর হলেও,
এই বেলা কেউ আর আপত্তি করবার মত অবিমৃষ্যকারিতা
দেখালো না। ততদিনে অবশ্য নীলুরাও শহরে চলে এসেছে,
চলে এসেছে রাশেদের পরিবারও। তাই রাশেদের আর
দাদুবাড়ি যাওয়া হয়ে উঠলো না, সত্যি কথা বলতে সেই
গ্রামের বাড়ি আর ছিলও না, ওর বন্ধু বান্ধবরা কেউ নেই,
আত্মীয়-স্বজনরাও নেই বললেই চলে। রাশেদের কোনদিন
মনেই হয়নি ওখানে যাওয়া যেতে পারে।
নীলু পুকুরপাড়ে রাশেদের হাত জড়িয়ে ধরে বলল, এই পুকুরে
তোমার সাথে এভাবে বসতে পারবো কখনো ভাবতে
পেরেছিলাম ওই বয়সে?রাশেদ নীলুর কথার
ছেলেমানুষীটুকু পুরোপুরি উপভোগ করে কানের কাছে মুখ
ঠেকিয়ে বলল, তাহলে অন্যকারো কথা ভেবেছিলে
নাকি? ওই যে জামান ছেলেটা, তোমার ভাইদের খুব পছন্দ
ছিল যাকে। নীলু রাশেদের এসব কথায় কপট রাগের
প্রতিক্রিয়া দেখায় সচরাচর, কিন্তু আজ তেমন কোন
প্রতিক্রিয়া হল না।
-দাদু নেই, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি খেয়াল
করেছিলে আমাদের সম্পর্কটা একমাত্র দাদুর কাছেই বৈধ
ছিল, বাকি সবাই যে কা-টাই না করলো তুমি ঢাকা
যাওয়ার আগে আগে।
-হুম, হি ওয়াজ আ গ্রেট ম্যান। তার ছেলেরা তার
ধারেকাছের পার্সোনালিটিও পায়নি। লোকটা অনেক
কষ্ট পেয়ে মারা গেল, খাদ্যনালীর ক্যান্সারে মরার
চেয়ে ইনজেকশান দিয়ে বিষ পুশ করে মারা অনেক
মানবিক।
-কি যে বলনা তুমি। এসব কথা বলতে আছে! আচ্ছা চল উঠে
পড়ি, কাপড়-চোপড় গোছাতে হবে।
গতপরশুদিন ওরা এসেছিল গ্রামে, ওদের দাদুর লাশ কবরস্থ
করতে, লোকটা ঢাকার এক হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ভুগে
দুদিন আগে সমস্ত ভোগান্তির ইতি টেনে ধরলো। আজকে
ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। রাশেদ আর নীলু
বিকেলের শেষ রোদে স্মৃতিরোমন্থন আর দীর্ঘায়িত
করলো না, বাড়ির পথে রওনা হল।
-তুমি খেয়াল করেছো নীলু, দাদু একটা অদ্ভূত জীবন পার
করেছেন!
-অদ্ভূত?
-হ্যা, তাতো বটেই। প্রথম জীবনে খুব ফূর্তিবাজ লোক
ছিলেন, গান-বাজনা করতেন, ছবি আঁকার শখ ছিল, একসময়
নাকি জাদুবিদ্যাও শিখতে চেয়েছিলেন, কার কার শিষ্য
হিসেবে থেকেছেন। গ্রামদেশে কয়জনের এসব শখ থাকে
বলো!
-হুম, তাতো বটেই। তাছাড়া পড়াশোনা সামান্য জানলেও
তার বই পড়ার যে পরিধি ছিলো সেটা বিস্ময়কর, দাদুর মত
অত বই আমাদের আর কেউ পড়েছে কিনা আমার সন্দেহ
রয়েছে। আর প্রথম বয়স বলছো কেন, অসুখ হওয়ার আগেও
তো প্রায়ই বাড়ি ছেড়ে পালাত, কই কই যে থাকতো কে
জানে, তারপর হঠাৎ একদিন হাজির হত। পুরোই পাগলাটে
লোক একটা!
বলতে বলতে ওরা বাড়ির সীমানায় চলে আসে। নি:স্তব্দ
বাড়ি, মৃতের জন্য যত আয়োজন তা ফুরিয়েছে, রয়ে যাওয়া
অবশিষ্ট শোক বাতাসে জমে কেমন এক থমথমে আবহ
চারপাশে। দূর-দূরান্ত থেকে যারা সৎকার উপলক্ষে
এসেছিল, তারা অধিকাংশই ফিরে গেছে। ব্যাগট্যাগ
গুছিয়ে যাবার ঠিক আগমুহূর্তে রাশেদ দাদুর রুমে একবার ঢু
মেরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ঢুকতেই একটা জিনিস ওর
চোখে পড়লো যা গত দুইদিনে পড়েনি। দাদুর আলমারির
পাশে রোল করা পোস্টারের মত একটা ভারী মোটা
কাগজ, কাগজটা ও আগ্রহ নিয়ে খুলতেই দেখলো তেল
রঙের একটা ছবি। ওর মনে আছে এই ছবিটার কথা, অনেক
আগে থেকেই আছে। তবে সেটা দেয়ালে ঝোলানো ছিল।
কেউ হয়তো নামিয়ে রেখেছে এরমধ্যে। যৌবনে দাদুর
আঁকাআকির বাতিক থাকলেও সেটাতে খুব একটা পারদর্শী
হতে পারেননি বলে একসময় ছেড়ে দেন। কিন্ত তার
সংগ্রহে কিছু ভাল আঁকা ছবি ছিল বিভিন্ন চিত্রকরের।
আস্তে আস্তে সবগুলি নষ্ট হয়ে যায়। এই একটাই বোধহয়
এখনো টিকে থাকে, একটা মেয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গি করে
এক মেঠো পথে দাঁড়িয়ে, মেয়েটার চোখ বড় বড়, যে
এঁকেছে খুব ভালো এঁকেছে, ব্যাকগ্রাউন্ডটা
ও সুন্দর, শ্যামল-পাহাড়ী একটা গ্রাম, যেন স্বপ্নপুরী।
রাশেদের মনে হল দশ বছর আগে ও যে ছবিটা দেখেছিল
এটা সেই একই ছবি না, ভাল ভাবে সংরক্ষরণ না করলে
সময়ের সাথে সাথে ছবি কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়, সেরকম
কিছু কি হয়েছে? যদিও ছবিটা এখনো নতুনের মত
জ্বলজ্বলে। কোথাও কোন পরিবর্তন হয়েছে যেটা ও ধরতে
পারছে না। সাথে সাথে ও নীলুকে ডাক দিল।
নীলু ওর কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, চল এক কাজ
করি, ছবিটা এখানে থাকলে হয়তো হারিয়ে যাবে, আমরা
সাথে করে নিয়ে যাই, এত সুন্দর ছবিটা। তাই স্থির হল,
নিয়ে যাওয়াই ভাল। অন্তত দাদুর উন্নত রুচির এই নমুনাটা
সংরক্ষিত থাকুক ওদের বাড়িতে। যদিও রাশেদের মনের
খচখচানি থেকে গেল।
ঢাকা ফিরে আসবার পর ঠিক তিনদিন পর এক রাতে রাশেদ
বুঝতে পারলো ছবির পরিবর্তনটা কোথায়। এই ছবিটা ঘিরে
ওর একটা আলাদা অনুভূতি ছিল সেটা ও ভুলে গেছিলো
একদমই। সেভেন কি এইটে পড়বার সময় দাদুর দেয়ালে
ঝোলানো এ ছবির প্রতি একটা কারনে ও আকর্ষণ বোধ
করতো। চোরা দৃষ্টিতে প্রায়ই ছবির কিশোরী মেয়েটার
দিকে চেয়ে থাকতো, মেয়েটিকে নিয়ে সম্ভাব্য সকল
পরিণতির ফ্যান্টাসিতে ভুগতো। কারণটাও সুনির্দিষ্ট
ছিল, সেসময়ে ছবির মেয়েটির বয়স ওর ধারনামতে প্রায়
ওর সমানই ছিল । অসম্ভব নির্মল মুখের সমবয়সী এক
কিশোরী দাঁড়িয়ে এক মেঠো পথে- এই দৃশ্যকল্পটা ওকে
হরণ করতো, আশেপাশে কেউ না থাকলে প্রায় নিষ্পলক
চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকতো ও।
নীলু ঘুমিয়ে ছিল, সেই ফাঁকে রাশেদ নন্দীপুর থেকে
নিয়ে আসা প্যাকেটবন্দি ছবিটা আবার বের করলো, করে
বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলো ছবির এ মেয়েটি মোটেও সেই
আগের কিশোরী নয়, পঁচিশ থেকে ত্রিশের কোঠায় বয়স
এমন এক নারী। খুব অসম্ভব কল্পনা হলেও রাশেদ নিশ্চিত
হলো ওদের সবার মত এই ছবির মেয়েটারও বয়স বেড়েছে,
কিশোরী থেকে যুবতী হয়েছে। এর কি ব্যাখ্যা হতে পারে
সেটা ওর মাথায় এল না। নাকি এটা সেই একই ছবি নয়, দাদু
হয়তো নতুন করে কাউকে দিয়ে আঁকিয়েছে। গ্রামের
বাড়ির কাউকে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করবে
মনস্থির করে ও প্যাকেটবন্দী করে আবার ছবিটা ফেলে
রাখলো।
পরদিন ও অফিস থেকে ফিরে দেখলো ড্রয়িংরুমের
দেয়ালে ছবিটা ঝোলানো। বুঝলো নীলু নিশ্চয়ই আজকে
ঘর সাজাতে গিয়ে কাজটা করেছে। ছবিটার কারণে
অবশ্য ঘরটিতে অপূর্ব এক সৌকর্য চলে এসেছে । গতরাতের
ওর যে উপলব্ধি হয়েছে সেটা ও নীলুকে জানালো না,
হয়তো এটা নিয়ে অহেতুক হাসাহাসি করবে বা আরও যেটা
খারাপ হতে পারে হইচই লাগিয়ে সবাইকে রহস্য উদঘাটনে
লাগাবে, তাতে মাঝখান দিয়ে ওর কিশোর বয়সের
ফ্যান্টাসি প্রকাশ হয়ে এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে
পড়তে হবে। আজকে অফিসে বসেই ও একটা ব্যাখ্যা দাঁড়
করিয়েছে , হয়তো ওর দাদু কোন বিচিত্র খেয়ালে রঙ-তুলি
দিয়ে ছবিটাকে ক্রমান্বয়ে সংশোধিত করেছে, ছবিটা
তেলরঙে আঁকা, এবং এখনো বেশ জ্বলজ্বলে, তাই একদম
উড়িয়ে দেয়ার মত চিন্তা নয়।
রাশেদ খেয়াল করলো আজও ছবিটির দিকে তাকালে ওর
হৃদয়ে এক অচেনা অনুভূতি হচ্ছে, মেয়েটির চোখে চোখ
পড়লে ও বিব্রতবোধ করে, হয়তো কৈশোরের সে আকর্ষণ
কোনভাবে ওকে এখনো তাড়া করছে-যেটার জন্য ওর খুব
অস্বস্তি হতে থাকে। অনুভূতিটা দিনকে দিন বাড়তে
থাকে, একসময় এত অসহ্য হয়ে উঠলো যে রাশেদ একবার
ভাবলো ছবিটা নামিয়ে রাখবে। মেয়েটা ওর কল্পনায়
সত্যিকারের রক্তমাংসের কেউ হয়ে উঠছে যেন।
নিজেকে ওর পার্ভাট মনে হয়।
একদিন রকিব এল বাসায়। রকিব রাশেদের পুরনো বন্ধু,
কলেজ জীবনের। পেশায় অনকোলজিস্ট, ওর দাদুর
চিকিৎসার সময় অনেক সাহায্য করেছে, ও যে
হাসপাতালে কাজ করতো সেখানে ভাল ব্যবস্থা করে
দিয়েছিল। ও ড্রয়িংরুমের ছবিটা দেখে বলল, ‘এটা
কোত্থেকে যোগালি, আগে দেখিনি তো! দারুণ ছবি তো!’
রাশেদ থেকে ছবির উৎসের ব্যাপারে জেনে ও হঠাৎ
চিন্তিত গলায় বলল, ‘তোর দাদুর ছবি! আচ্ছা, ছবির এই
মেয়েটির ব্যাপারে তোর দাদু কি কোন অবসেশনে
ভুগতো?’
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বলল,‘কিসব আজে বাজে কথা বলছিস!’
রকিব নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলল, ‘না আসলে
ছবিটার কথা জেনে আমার একরাতের কথা মনে পড়ে
গেল। যে রাতে তোরা কেউ ছিলি না ওয়ার্ডে, ওনার
শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো, আমি গিয়ে নেবুলাইজ করলাম। একটু
থাতস্থ হবার পর উনি আমাকে বললেন, ডাক্তার সাব, বাড়ি
যেতে পারবো কবে?
আমি বললাম, এখন তো যেতে পারবেন না, আপনার শরীর
ভাল হোক!
তিনি বললেন, রুকিতার জন্য টেনশন লাগছে। একলা একলা
বাড়িতে পড়ে আছে।
নামটা অদ্ভূত বলে এখনো মনে আছে।
রুকিতা কে? জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, আমার ঘরে
তৈলচিত্রে থাকে। তবে একলা রাখা বিপজ্জনক। যুবতী
মেয়ে, আর খুব আনচান স্বভাবের, খেয়াল করে রাখতে হয়।
এরপর আর কথা চালাইনি। কারন বুঝতে পারছিলাম তিনি
অপ্রকৃতিস্থ হয়ে আছেন।
রকিবের কথা শুনে রাশেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা
শুরু হল। রকিব কোন মজা করছে কিনা বুঝতে পারলো না। এই
ছেলেটা মাঝেমধ্যে কিছু অসুস্থ মজা করে, সেরকম কিছু
হতে পারে। সে যাই হোক, ও ঠিক করলো ছবিটা আর রাখা
যাবে না। অন্তত দেয়াল থেকে সরিয়ে আবার বাক্সবন্দী
করতে হবে। নীলুকে কিছু একটা বলে বোঝাতে হবে।
কালকে ছুটির দিন আছে, সকাল সকাল কাজটা করতে হবে।
২
শেষ রাতে রাশেদের কোন কারনে ঘুম ভেঙে যায়।
ওর নাম ধরে কি কেউ ডাকলো? নাকি স্বপ্ন দেখছিলো?
ঘড়িতে তখন মধ্যরাত পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। নীলুর হাত
ছাড়িয়ে রাশেদ উঠে বসে। কোন এক অচেনা আকর্ষণে
ড্রয়িং রুমে ও ছবিটার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়ায়,
তারপর নিজের অজান্তে ও ছবির মেয়েটির গালে হাত
রাখে, খসখসে কাগজের মত অনুভূত হল না, বরঞ্চ মনে হচ্ছে
পেলব কোন কিছুতেই ও স্পর্শ করেছে। তখন খাঁটি জহুরীদের
মত ও ছবির মেয়েটির প্রতিটি অঙ্গের উষ্ণ কোমলতা
যাচাইয়ে নিয়োজিত হয়। ওর মনে হল, ওর স্পর্শে মেয়েটা
ধীরে ধীরে সজীব হয়ে উঠছে। তারই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ
রাশেদ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে নিজেকে সঁপে দেয় এই
অপার্থিব অভিজ্ঞতায়, ছবিতে ও মুখ ঘষতে থাকে
মেষশাবকের মত, তাতে ধীরে ধীরে যেন নিরাভরণ হতে
থাকে ছবি, ওর মনে হয় একজোড়া হাত ওর গলা জড়িয়ে
ধরে রাখে এমনভাবে যেন তাতে হারিয়ে ফেলবার ভয়
মিশ্রিত। রাশেদের মনে হয়, নীলুও কখনো এতটা
আবেদনময়ী হয়ে উঠতে পারেনি ওর কাছে।
পাশের রুমে বিচিত্র এক আওয়াজ শুনে নীলু উঠে বসে
বিছানায়। মনে হল রাশেদের গলা। রাশেদকে পাশে না
পেয়ে যখন ভাবলো হয়তো বাথরুমে ও, তখনই আবার
আওয়াজটা শোনে, মনে হচ্ছে রাশেদ যেন খুব মৃদু স্বরে
হাসছে। পা টিপে ও পাশের রুমের দিকে রওনা দেয়।
গিয়ে দেখে সে ঘরেও কেউ নেই। নীলু রাশেদের নাম ধরে
ডেকেও কোন সাড়া পায় না। বাথরুমগুলো চেক করে
দেখে, কোথাও নেই। হঠাৎ ও ভড়কে যায়। এই গভীর রাতে
রাশেদ কোথায় যেতে পারে। রাশেদ কি নিশি পাওয়া
মানুষের মত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোথাও গেল?
হঠাৎই ওর ড্রয়িংরুমের ছবিটার দিকে চোখ পড়ে। সাথে
সাথে ওর মাথার পেছন দিয়ে ভয়ের এক শীতল শ্রোত বয়ে
যায়।বিপরীত দেয়ালে ভর দিয়ে ও বসে পড়ে মেঝেতে।
ছবিতে সেই মেয়েটি নেই, অপূর্ব পাহাড়ি একটি গ্রামীণ
পথের দৃশ্য শুধু। আর সে নরম মাটির পথে দুই জোড়া পায়ের
ছাপ, আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেছে দূরে!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now