বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বিস্ময়কর এক স্থানে তোপকাপি প্রাসাদের গোল্ড রিসোর্ট অতিথিশালা।
অতিথিশালার ডুপ্লেক্স কটেজের দু’তলার পূর্ব দিকের একটা ইজি চেয়ারে আধ-শোয়া অবস্থায় আহমদ মুসা। তার স্থির দৃষ্টি সামনে, এক খণ্ড সাগরের বুকে। মর্মর সাগর, বসফরাস ও গোল্ডেন হর্নের মিলিত স্থান এটা। এই সাগর শুধু পানির নয়, স্মৃতিরও এক সমুদ্র, তোপকাপি প্রাসাদের মত গৌরবেরও সাগর এটা। ইউরোপ বিজয়ী মুসলিম সেনাবাহিনীর কলতানে মুখরিত ছিল এই সাগর। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ, সুলতান সুলায়মান, সুলতান বায়েজিদের মত জগত বিখ্যাত দিগ্বিজয়ী মুসলিম রাষ্ট্রনায়করা হর্ন-বসফরাস-মর্মরকে হয়তো এভাবেই দেখেছেন।
নিজেকে স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছিল আহমদ মুসা।
একটি ট্রেতে করে দুই গ্লাস ফলের রস ও একটি বাটিতে বাদাম নিয়ে বারান্দায় প্রবেশ করল জোসেফাইন।
আহমদ মুসাকে সালাম দিয়ে ট্রেটা দুই ইজি চেয়ারের মাঝখানের টি-টেবিলে রেখে পাশের ইজি চেয়ার এ বসল জোসেফাইন।
সালামের জবাব দিয়ে আহমদ মুসা ইজি চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘আহমদ আবদুল্লাহ কোথায়?’
‘লতিফার সাথে পেছনের বাগানে।’ বলল জোসেফাইন।
‘লতিফার সাথে ভাব হয়েছে কেমন? কিছুক্ষণ আগে আমার কোলে উঠে তো বিদ্রোহ করল।’
‘ওটা বিদ্রোহ ছিল না, ছিল তোমার কোলে থাকার ওঁর আকাঙ্ক্ষা। তোমাকে সব সময় পায় না, পেলে আর ছাড়তে চায় না।’ বলল জোসেফাইন।
‘তোমাকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছি, এখন আবার বাচ্চাকেও কষ্ট......।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হলো না। জোসেফাইন আহমদ মুসার মুখে হাত চাপা দিল। বলল, ‘এ প্রসঙ্গ থাক। জেফি জিনার তখন শেষ হয়নি। কিছু ভাবলে?’
‘জেফি জিনা নিজেকে আহমদ মুসার স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়েছেন, এটা সে সময়ের জন্যে খুব স্বাভাবিক ছিল। স্ত্রী পরিচয় না দিলে তিনি আমাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারতেন না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সে সময়ের জন্যে ওটা খুব স্বাভাবিক ছিল অবশ্যই। কিন্তু একজন মেয়ে নিজেকে অন্য কারও হৃদয় অত্যন্ত বড় না হলে, অসম্ভব আন্তরিক না হলে বান্ধবীর স্বামীকে ঐ অবস্থায়ও নিজের স্বামী বলে পরিচয় দেয়া সম্ভব নয়। আর তার সাথে আমার পরিচয়ও তেমন নয়। আসলে তার মত এমন কাউকে আমি জীবনে দেখিনি, তিনি এসেই যে আমাকে জয় করে নিয়েছেন। আমি তাকে কতোটা ভালবেসেছি জানি না, কারণ তার পরীক্ষা কখনও হয়নি। কিন্তু তিনি আমাকে অসম্ভব রকম আপন করে নিয়েছেন।’ জোসেফাইন বলল।
‘তুমি ঠিক বলেছ জোসেফাইন। তিনি সত্যিই অসাধারণ একজন। কিন্তু আমার সাথে তার দেখা হলো না। তিনি কি বান্ধবীর স্বামীকে এড়িয়ে চলছেন? সংজ্ঞাহীন একজনকে নিয়ে এসে, তার সংজ্ঞা না ফিরে আসতেই চলে যাওয়ার অর্থ এটাই।’ আহমদ মুসা বলল।
জোসেফাইনকে একটু বিব্রত দেখালো। এই চলে যাওয়াটা তার কাছেও স্বাভাবিক মনে হয়নি। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘জেফি জিনা একজন শ্বেতাঙ্গীনি হলেও ইসলামের বিধি-বিধান আন্তরিকভাবে মেনে চলেন। হতে পারে বিনা প্রয়োজনে বান্ধবীর স্বামীর মুখোমুখি হওয়াকে ঠিক মনে করেন না।’
‘হতে পারে। কিন্তু বলত, আমার উচ্চতা, ওজন, আইডি মার্ক, ইত্যাদি তথ্য তিনি কিভাবে জানলেন? এতো সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি গণক এমন দাবি নিশ্চয়ই করবেন না।’
‘এ বিস্ময় তো আমারও। জেফি জিনা টেলিফোন করলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এ কথা। সে হেসে বলেছল, ‘এটা আল্লাহরই একটা সাহায্য। এ সাহায্য এমনভাবে ওঁর জন্যে আসবে, এটা আল্লাহর তরফ থেকেই ব্যবস্থা হয়েছিল।’ বলল জোসেফাইন।
‘এটা জবাব বটে, কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয় না।’ আহমদ মুসা বলল।
জোসেফাইন উত্তর দেবার আগেই টি-টেবিলে রাখা আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিল আহমদ মুসা। কল অন ও লাউডস্পিকার অন করে দিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল কণ্ঠ, ‘আসসালামু আলাইকুম। থ্যাংকস গড, আপনাকে পেয়েছি স্যার। আমি খুব বিপদে।’
‘বলো সাবাতিনি। কি ঘটেছে, কি বিপদ?’ আহমদ মুসা বলল। হাতের চায়ের কাপটি টি-টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা।
ওপ্রান্ত থেকে সাবাতিনির কণ্ঠ, ‘আজকেই আমাকে রোমেলী দুর্গে যেতে হবে সেই কাজের জন্যে।’
‘হ্যাঁ, আজ প্রধান বিজ্ঞানী আন্দালুসির সাপ্তাহিক অবকাশে বাসায় যাবার কথা। কিন্তু তুমি বিপদ ভাবছো কেন?’
‘বিপদ নয় কেন? ধরা পড়ে গেলে হয় জেলে যেতে হবে, নয়তো গুলী খেয়ে মরতে হবে। আর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ওরাও ছাড়বে না।’
‘ছাড়বে না বলছো কেন? ওরা কি তোমাকে কোন থ্রেট করেছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘থ্রেট ওইভাবে করেনি তবে বলেছে, সহজ কাজটা তোমাকে পারতেই হবে। মনে রেখ, আমাদের কোন প্রোগ্রামে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই কিন্তু। এই কথা থ্রেট ছাড়া আর কি!’
থামল সাবাতিনি মুহূর্তের জন্যে। বলে উঠল আবার, ‘স্যার, শখের বশে গোয়েন্দা হতে চেয়েছিলাম। এমনটা হবে ভাবিনি। মনে হচ্ছে আমাকে তারা তাদের কর্মী মনে করছে। তাদের লোকদের মতই আমাকে ডিল করছে। কিন্তু আমি ওদের লোক নই, ওদের কোন পয়সা আমি নেই না। আমার খুব ভয় করছে স্যার।’ কান্নাভেজা কণ্ঠ সাবাতিনির।
‘কোন ভয় নেই। তুমি ঠিক সময়ে রোমেলী দুর্গে যাও, সাহসের সাথে কাজটা করবে। যাই ঘটুক আমি দেখব। তোমার কোন ক্ষতি হবে না।’ আহমদ মুসা বলল সান্ত্বনার সুরে।
‘কিন্তু আপনি কোথায়? কিভাবে আমাকে দেখবেন। তাহলে আপনি রোমেলী দুর্গে আসুন।’ আকুল অনুরোধ ঝরে পড়ল সাবাতিনির কণ্ঠে।
‘আমার উপর আস্থা আছে?’
‘আছে স্যার। একশ ভাগের বেশি।’
‘তাহলে যাই ঘটুক, মনে করবে আমি তোমার পাশে আছি। শোন, তোমার প্রফেসর আলী আহসান বেগভিচ এখন কোথায়?’
‘মানে এখন বর্তমানে?’
‘হ্যাঁ ’
‘তিনি ছুটিতে যাচ্ছেন। আজই ছুটি নিয়েছেন। টিচার্স কোয়ার্টার থেকেও বেরিয়ে এসেছেন। তিনি তার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন বসফরাসের ওপারে ফাতিহ পাশা পার্ক এলাকায় একটা বাড়িতে।’
একটু চিন্তা করল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার কাজের জন্যে সে রিভলবারটা তিনি তোমায় দিয়ে দিয়েছেন?’
‘না দেননি। আমি এখন সেখানে যাচ্ছি। ওটা দেবার জন্যে তিনি ডেকেছেন।’
‘কিভাবে যাবে, চিনবে কি করে?’
‘ঠিকানা দিয়েছেন স্যার এইমাত্র।’
‘কি ঠিকানা?’
‘ফাতিহ পাশা পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ পাশ বরাবর রাস্তার ওধারে ২৯৫ নাম্বার বাড়ি। আমাকে বলা হয়েছে, বাড়িটির গেটের শীর্ষ ফলাগুলোর মধ্যে ডান থেকে নাম্বার শিষ ফলা স্পর্শ করে গেটবক্সের সামনে গিয়ে দাড়াতে হবে, মিনিট খানেকের মাঝেই একজন বেরিয়ে এসে একটা গিফটবক্স দিয়ে যাবে।’
‘আর কোন পরামর্শ দিয়েছেন তিনি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। যদি ধরা পড়ে যাই আমি। তিনি বলেছিলেন, আমাদের কোন লোক ধরা পড়ে না। যদি বোঝ তুমি ধরা পড়ছ তাহলে তোমার রিভলবারের ট্রিগার-রিং এর মাথার উপরে একটা লাল বোতাম আছে, তাতে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে জোরে চাপ দেবে। সংগে সংগে খবর আমাদের কাছে পৌঁছে যাবে। রোমেলী দুর্গ থেকে তোমাকে আমরা সংগে সংগেই উদ্ধার করে ফেলব।’ থামল সাবাতিনি।
লাল বোতামের কথা শুনতেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। সাবাতিনি থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘সাবাতিনি খবরদার, ভুলেও লাল বোতামে চাপ দেবে না।’
‘কেন?’ প্রশ্ন সাবাতিনির। তার কণ্ঠে ভয়।
‘ওতে ‘পয়জন পিস’ আসে।চাপ দেবার সংগে সংগেই তোমার মৃত্যু হবে। ভয় করো না, লাল বোতামে চাপ না দিলে তোমার কোন ক্ষতি হবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
সাবতিনি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। পরে কম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। আমাকে বাঁচালেন। স্যার, আমার বাসায় এমন মৃত্যু দেখেছি। মনে পড়ছে আমার। ওরা এতবড় বিশ্বাসঘাতক, এতবড় খুনি স্যার। আমি তার অনুরোধে শখের বসে কাজ করছি, কোন বিনিময় তো ওদের কাছে নেইনি।’ কান্নায় ভেঙ্গে পড়া সাবাতিনির কণ্ঠ।
আহমদ মুসা কিছু বলবার আগেই সাবাতিনির কণ্ঠ আবার শোনা গেল, ‘আমি যদি ওদের এই কাজ না করি, করবো না আমি।’
‘ওদের এই কাজ না করেও তুমি বাঁচতে পারবে না। তোমার আব্বা-আম্মার উপরও বিপদ নেমে আসবে। ওদের নিষ্ঠুরতার কোন সীমা নেই। তার চেয়ে শোন, ওরা যেভাবে বলছে কাজটা করে দাও, শুধু লাল বোতামে চাপ দেয়া ছাড়া। কাজটা ঠিকভাবে করেছ, সেটা ওদের খুবই দরকার আর এটা তোমার বাঁচার জন্যে দরকার। আমাদের জন্যেও খুব দরকার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আগের দুটো বুঝলাম, আপনাদের কেন দরকার সেটা বুঝলাম না স্যার।’ সাবাতিনি বলল।
‘ওরা হেলিকপ্টার ফলো করবে এবং বিজ্ঞানীর বাড়ি যাবে। ওদেরকে এভাবে আমরা দিনের আলোতে আনতে চাই।’
‘বুঝেছি স্যার। ব্যাপারটা চোরের উপর বাটপারি।’ বলল সাবাতিনি। তার কণ্ঠ এবার হালকা।
থেমেই আবার বলে উঠল সাবাতিনি, ‘ওদের নয় স্যার, আপনার নির্দেশেই আমি এ কাজ করবো।’
‘ওয়েলকাম সাবাতিনি। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। ওখানে তোমার ধরা পড়ার কোন ভয় নেই, ওদিক থেকে তোমার ক্ষতি হবে না। আমার উপর নির্ভর করতে পার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আমার পরিচিত দুনিয়ার মধ্যে আমি সবচেয়ে আপনার উপরই নির্ভর করি। আপনি বললে আমি বোধহয় আস্থার সংগে আগুনেও ঝাপ দিতে পারি।’
‘এমন অন্ধ নির্ভরতা ঠিক নয় সাবাতিনি। আল্লাহর পরে নিজের বিবেককেই মনে করতে হবে সবচেয়ে বড়। যাক, শোন, প্রফেসর আলী আহসান বেগভিচের কোন আইডি মার্ক আছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘তার মাথায় একটা চুলও নেই। তাই তিনি সবসময় লাল তুর্কি টুপি পড়ে থাকেন। চোখ দুটো তার তীরের মত তীক্ষ্ণ। খুব অস্বস্থিকর চোখের দৃষ্টি। বোধহয় এটা আড়াল করার জন্যে গোল্ডেন কালারের ডীপ সানগ্লাস পরেন। তার বাঁ কানের নিচে একটা ক্ষতচিহ্ন আছে। ফেস মেকআপ দিয়ে ওটাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেন না। আর......।’
সাবাতিনিকে আর এগুতে দিল না আহমদ মুসা। তার কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আর দরকার নেই সাবাতিনি। তোমাকে ধন্যবাদ।’
‘ধন্যবাদ স্যার। আমি ওখানে যাত্রা করছি স্যার। ওখান থেকেই রোমেলী দুর্গে আসবো। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওকে সাবাতিনি। ওয়া আলাইকুম সালাম। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।’
বলে আহমদ মুসা কল অফ করে মোবাইল রেখে দিল।
মোবাইল রাখতেই জোসেফাইন বলল, ‘তুমি তাকে আশ্বাস দিলে, কিন্তু মেয়েটি উভয় সঙ্কটে। একদিকে মৃত্যু, অন্যদিকে পুলিশে ধরা পড়ার ভয়। কেন তুমি তাকে এমন বিপদের মুখে ঠেলে দিলে?’
‘তুমি জান, মেয়েটি আগেই ওদের ট্রাপে পড়েছে। ওদের ইচ্ছে মত না চললে, তাকে ওরা বাঁচতে দেবে না।
আমি তাকে ও তার পরিবারকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি।’
‘কিভাবে?’
‘সাবাতিনি ওদের দেয়া দায়িত্ব পালন করবে, তাতে সে ও তার পরিবার বাঁচবে। মনে করেছিলাম, ওকে গ্রেফতার করাব। কিন্তু তা করলে শত্রুরা তাদের বর্তমান প্রোগ্রাম পাল্টে ফেলবে। আমরা ওদের ফাঁদে ফেলার সুযোগ হারাব। অন্যদিকে সাবাতিনিকে ওরা কোন সন্দেহ করতে পারবে না। তার ও তার পরিবারের কোন ক্ষতি হবে না। সে বাইরে থাকলে আরেকটা উপকার হবে, শত্রুদের সম্পর্কে জানার সে একটা মাধ্যম হবে।’
‘কিন্তু মেয়েটিকে এই বিপদজনক কাজে ব্যবহার করা তোমাদের ঠিক হবে না। তোমার উপর মেয়েটির সীমাহীন আস্থা।’
‘আমি জানি জোসেফাইন। আমার বা আমার মিশনের জন্যে তাকে ব্যবহার করিনি। আমি তা করি না। আমার ভার আমিই বহন করি। আজ তাকে আমি চাপ দিয়ে রোমেলী দুর্গে যে পাঠালাম, সেটা তার ও তার পরিবারের ভালোর জন্যেই। প্রফেসর আলী আহসান বেগভিচের ঠিকানা ও আইডি জানায় আমার উপকার হয়েছে, কিন্তু তাতে তার ক্ষতির কোন সম্ভাবনা নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
জোসেফাইন একটু এগিয়ে এসে আহমদ মুসার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আমার গর্ব যে, তোমার এই সুবিচারবোধ অন্য যে কারো চেয়ে বেশি।’
আহমদ মুসা কাঁধ থেকে জোসেফাইনের হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘আল্লাহর বান্দাদের তো উচিত নিজের সুবিধার চেয়ে অন্যের অসুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়া। সুন্দর ও শান্তির সমাজ, যা আল্লাহ চান, এভাবেই গড়ে উঠতে পারে।’
বলেই আহমদ মুসা এক হাত দিয়ে মোবাইলটা আবার তুলে নিল।
‘জেনারেল মোস্তফাকে ব্যাপারটা জানিয়ে দেই!’ বলে আহমদ মুসা একটা কল করল।
ওপারে জেনারেল মোস্তফার কণ্ঠ পেয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা, সাবাতিনি রোমেলী দুর্গে যাচ্ছে। বিজ্ঞানী মিঃ আন্দালুসির হেলিকপ্টারের টেকঅফ ক’টায়?’
‘এখন থেকে দুঘণ্টা পর ঠিক বেলা দশটায়। এই মাত্র আমি সব খোঁজ নিলাম সব ঠিক আছে। আপনি যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই কাজ হবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘প্রোগ্রামের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে জেনারেল মোস্তফা। সাবাতিনিকে তার কাজ শেষ করে নীরবে চলে যেতে দিতে হবে। আচ্ছা বলুন তো, অভিজাত সিজলি বা বিয়েগ্ল এলাকায় কোন ভিআইপির বাড়ি কি খালি আছে?’ আহমদ মুসা বলল।
জেনারেল মোস্তফা একটু চিন্তা করে বলল, ‘হ্যাঁ, সুইচ কনসুলেটের একটা ভাড়া নেয়া বাড়ি খালি হয়েছে। সুইচ কনসাল আঙ্কারায় বদলী হয়ে গেছেন। নতুন কেউ সহসা আসছেন না সম্ভবত। ওরা বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। বাড়িটির নাম ‘ওয়েসিস’।’
‘তাহলে ব্যবস্থা করুন, হেলিকপ্টার ঐ বাড়িতেই ল্যান্ড করবে। বাড়িতে জনাব আন্দালুসির একটা নেমপ্লেট লাগিয়ে দিন।’
‘বুঝেছি মিঃ খালেদ খাকান। বাড়িটাকে আন্দালুসির বাড়িতে পরিণত করতে হবে। চাকর-বাকর, কুক, ড্রাইভার সবাই হবেন গোয়েন্দা, এই তো। সাবাতিনিকে গ্রেফতার করতে নিষেধ করছেন কেন? ওদিক থেকে তার কোন ভয় নেই? কিংবা ওদিকের সাথে এই দরজা আরও খোলা রাখতে চান?’
‘দু’টোই। আয়েশা আজীমার মৃত্যুর পর সাবাতিনি ছাড়া আর কোন মাধ্যম আমাদের হাতে নেই। আরেকটা কথা জেনারেল, আজ দুপুর বারটার দিকে আমি ফাতিহ পাশা পার্ক এলাকায় একটা বাড়িতে যাব। পার্কের পূর্ব-দক্ষিন এলাকায় হবে বাড়িটা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি যখন যাবেন, তখন সেটা নিশ্চয়ই ছোট ব্যাপার নয়?’
‘টার্গেটটা বড়। ধরতে পারলে ভালো। এ জন্যে বিষয়টা আপনাকে জানালাম। ঐ এলাকায় আপনার কিছু লোক থাকতে পারে।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু অতবড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল আপনার উপর দিয়ে। আজকেই কি আপনার বের হওয়া উচিত?’
‘কিন্তু দেরি করা যাবেনা। সে ইতিমধ্যেই জায়গা চেঞ্জ করেছে। কর্মস্থল থেকে সে ছুটিও নিয়েছে। সে আবারও জায়গা বদলাতে পারে। আর আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে। আমাদের লোকরা পার্কের ঐ এলাকায় থাকবে। যদি দরকার হয়, তাহলে আমাদের সিকিউরিটির প্রথম নাম্বারটায়, যা আপনার মোবাইলে আছে, টেলিফোন করে জিরো নাইন জিরোতে কল করবেন, তাহলে পার্ক এলাকার টিম লিডারকে পেয়ে যাবেন।’
‘ধন্যবাদ জেনারেল।’
‘ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম।’ ওপার থেকে টেলিফোন রেখে দিল জেনারেল মোস্তফা কামাল।
আহমদ মুসা টেলিফোন রাখতেই জোসেফাইন বলে উঠল, ‘তোমাকে যেতে বাধা দেব না, কিন্তু বসফরাস ব্রীজ হয়ে ওপারে যাও আমার মন তা মেনে নিতে পারছে না। তুমি বোট নিয়ে ওপারে যাও।’
‘ওয়াটার ওয়েকে তুমি নিরাপদ মনে করছ কেন?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘ওরা জানে তুমি এখানে আছো। নিঃসন্দেহে বলা যায় ওরা সম্ভাব্য সকল সড়কপথের উপর চোখ রাখছে।’ বলল জোসেফাইন।
‘এ ভয় যদি তুমি কর, তাহলে সব রুটেই ভয় আছে। কারণ আমি গোল্ড রিসোর্টের তোপকাপি প্রাসাদ এলাকা থেকে বের হলেই ওরা খবর জানতে পারবে। এর ফলে সড়ক পথ কিংবা পানি পথ যে পথেই যাই ওরা খবর পেয়ে যাবে। সেদিন যে আমি বসফরাস ব্রীজে আক্রান্ত হলাম, সেটা তারা আয়েশা আজীমার বাড়ি থেকে বের হবার পরই জানতে পারে। তবে সেদিন ওরা যে সুযোগ পেয়েছিল, আজ তা পাবে না। সেদিন আমি শুধু অসতর্ক নয়, সামনের দৃষ্টিটা থাকলেও আমি নিজেকে নিজের মাঝে হারিয়ে ফেলেছিলাম।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এমন তো তোমার হয় না। কি ভাবছিলে তুমি।’
‘আয়েশা আজীমার কাহিনী ও ডঃ বাজের জন্যে তার অকপট স্বীকারোক্তি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আয়েশা আজীমা শুধু নিজেকেই কুরবানী দেয়নি, তার স্বজাতির ষড়যন্ত্রকেও খানিকটা প্রকাশ করে দিয়েছে। এভাবে আচ্ছন্ন থাকার কারণেই আয়েশা আজীমার বাড়ির ড্রাইভার, দারোয়ান ও কাজের লোকদের কেউ যে বাড়ির ঘটনা বাইরে সংগে সংগেই পাচার করতে পারে, সে কথা তখন মনেই আসেনি আমার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আসলে তোমার মনটা খুব সেনসিটিভ, খুব নরম। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর ‘রাহমান’, ‘রহিম’ পরিচয়টাই সৃষ্টি জগতের জন্যে সবচেয়ে বড়। মহান আল্লাহ নিজেই তার সম্পর্কে কুরআন শরীফে বলেছেন, ‘দয়াকে তোমার প্রভু তার জন্যে কর্তব্য হিসেবে ঠিক করেছেন।’ মানুষের মধ্যেও দয়া দেখাতে আল্লাহ বেশ ভালোবাসেন। আর তোমার মধ্যে দয়ার প্রকাশ আমাকে বেশি গর্বিত করে। যাক, আরেক......।’
কথা শেষ করতে পারল না জোসেফাইন। তার কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলল, ‘তাহলে আমার কঠোরতা নিশ্চয়ই তোমাকে দুঃখিত করে?’
গম্ভীর হলো জোসেফাইন। বলল, ‘তোমার কঠোরতা আইনের পক্ষে, নীতির পক্ষে, একেই বলে সুবিচার। মজলুমের পক্ষে দাড়িয়ে, সুবিচারের পক্ষে দাড়িয়ে যে কঠোরতা, তা মানবতা ও দয়া থেকেই উৎসারিত। এটা দয়ার উন্নততর রূপ। ইসলামের শান্তি আইনের কঠোরতা মানুষ ও মানবতার প্রতি অপার ভালোবাসা থেকেই নির্ধারিত।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। তুমি কিন্তু দার্শনিক হয়ে যাচ্ছ। যাক, বল, তুমি কি যেন বলতে যাচ্ছিলে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ও আচ্ছা, আমার একটা কৌতূহল, বসফরাসের অস্বাভাবিক ঐ উচ্চতা থেকে কিভাবে লাফিয়ে পড়েছিলে। আমি অবাক হচ্ছি, তোমার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। অন্যদিকে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলে কিভাবে।’ বলল জোসেফাইন।
‘পানির কাছাকাছি পৌঁছেও আমি ডাইভিং-এর নিয়ম অনুযায়ী দুই হাত সামনে ছড়িয়ে দিয়ে দুই বড় জাহাজের মাঝ দিয়ে পড়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, সরাসরি পানি যেন আমি পেয়ে যাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য, শেষ মুহূর্তে একটা কার্গো ফেরির প্রান্ত ঘেঁষে ছিটকে পড়ে আরেকটা বোটের পেটে বাড়ি খেয়ে পড়ি পানিতে। সৌভাগ্য হলো, কার্গোতে নরম কিছু বোঝাই ছিল এবং আরেকটা সৌভাগ্য হলো, অতবড় উচ্চতা থেকে নিচে পড়বার যে বেগ তা কার্গো বোট ও অন্য যে বোটের পেটে ধাক্কা খেয়েছিলাম সেই বোট এবং বসফরাসের পানি এই তিনের মধ্যে বণ্টন হওয়ায় আমি বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে যাই। কার্গোর নরম লাগেজে ধাক্কা খেয়ে পেছনে পড়ার আঘাত দু’হাত দিয়ে সামলে নেই, কিন্তু ছিটকে পড়া পাঁজরটা বোটের পেটে সরাসরি ধাক্কা খেয়ে যায়। হয়তো এই আঘাতেই আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। তবে সংজ্ঞা হারাবার আগে সর্বশক্তি দিয়ে পানিতে ভেসে উঠতে সমর্থ হই। সম্ভবত পেছনের বোটের লোকেরা এই অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে।’
থামল আহমদ মুসা।
মাথার পাশেই দাঁড়িয়েছিল জোসেফাইন। আহমদ মুসার মাথা বুকে টেনে নিয়ে বলল, ‘যা ঘটেছে সেটা মিরাকল। আল্লাহ তোমাকে নিজ হাতে বাঁচিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।’ আবেগে ভারী হয়ে উঠেছে জোসেফাইনের কণ্ঠ।
‘অবশ্যই জোসেফাইন, আল্লাহই রক্ষা করেছেন। কি ঘটেছে আমি বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কিভাবে ঘটেছে, তা আমি জানি না। আমার নিজের উপর কিংবা কোন কিছুর উপরই আমার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সব কিছুর নিয়ন্ত্রক যিনি তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করেছেন।’
থামল আহমদ মুসা। পরক্ষনেই আবার বলল, ‘তুমি ওয়াটারওয়ে ব্যবহার করতে বলেছ। ভালো পরামর্শ তোমার। ফাতিহ পাশা পার্কের এলাকাতেই রয়েছে একটা ফেরিঘাট। একটাই অসুবিধা হবে গাড়ি থাকবে না, গাড়ি ভাড়া করতে হবে।’
‘অসুবিধা নেই। ফেরিঘাটে একটা গাড়ি রাখতে বলতে পার।’ বলল জোসেফাইন।
‘তাহলে যে আবার ফিরতে হবে ব্রীজ হয়ে।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘অসুবিধা হবে না। গাড়িটা আবার কোন ঘাটে রেখে আসবে।’ বলল জোসেফাইন। গম্ভীর কণ্ঠ তার।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘রিভলবার চালাবার মত বুদ্ধিতেও তুমি একদম গোয়েন্দা হয়ে পড়েছ। ধন্যবাদ জোসেফাইন।’
‘বেশি প্রশংসা কিন্তু বিপরীত অর্থও বুঝায়’ বলে আহমদ মুসার পিঠে একটা কিল দিয়ে জোসেফাইন চায়ের কাপ নিয়ে দ্রুত চলে গেল ঘরের দিকে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now