বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রক্তে লেখা হাসি

"যুদ্ধের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। বরিশালের আকাশে তখনো যুদ্ধের ধোঁয়া ভাসছে। নদীজলে কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে সাঁতার কাটছে মৃত্যু আর আশার গল্প। এমন সময় দূর থেকে ভেসে আসে এক লোকের কণ্ঠ— “এই যে ভাইসব, গুলি বৃষ্টি পড়তাছে, তবুও মাছি থামছে না মুখে!” লোকটার নাম হেমায়েত উদ্দিন। গালে বুলেটের দাগ, মুখে দাঁতের অর্ধেক নাই, তবুও হাসিটা এমন যে—যুদ্ধের ময়দানে কেউ মরে গেলে মনে হতো, হেমায়েতের হাসি তার আত্মাকে বিদায় জানিয়ে দিলো। কেউ কেউ বলতো, হেমায়েতের গালের বুলেটের দাগ নাকি তাঁর “দ্বিতীয় মুখ”। কারণ সেই দাগ দিয়ে নাকি তিনি যুদ্ধের গন্ধ শুঁকতে পারেন। কৌতূহলী এক তরুণ একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো— “স্যার, গালে বুলেটের দাগ আছে, ব্যথা পায় না?” হেমায়েত উত্তর দিয়েছিলেন— “ব্যথা? আমি ব্যথার প্রেমে পড়ছি রে ভাই, ও তো এখন নিজের লোক!” কিন্তু এই হাসির পেছনে ছিলো এক পাহাড় সমান কান্না। একদিন যুদ্ধের মাঠে খবর এল—রাজাকাররা তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছে। স্ত্রীকে ধর্ষণ করার হুমকি দিয়েছে। হেমায়েত তখন সীমানার ওপারে গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছেন। খবরটা পেয়ে রাতের অন্ধকারে নদী পেরিয়ে চলে এলেন। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দেখলেন—স্ত্রী সতীত্ব বাঁচাতে গলায় দড়ি দিয়েছে। পাশে নিথর পড়ে আছে তাঁর দুই সন্তান। সেই মুহূর্তে গ্রামের বাতাসটাও যেন থেমে গেল। হেমায়েত নিঃশব্দে বসে থাকলেন অনেকক্ষণ। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা চুড়ির ভাঙা টুকরোটা হাতে নিয়ে বললেন, “তুমি চলে গেলে, কিন্তু আমি ফিরবো... দেশ স্বাধীন না করা পর্যন্ত না।” সেই থেকে হেমায়েত হয়ে গেলেন আগুন। তিনি গড়ে তুললেন এক গেরিলা বাহিনী—পাঁচ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। কেউ কৃষক, কেউ ছাত্র, কেউ আবার গ্রাম্য দর্জি। কারও কাছে বন্দুক নেই, কারও কাছে গ্রেনেড নেই—তবুও হেমায়েত বললেন, “বাঁশও অস্ত্র, যদি হাতে সাহস থাকে।” এই বাহিনী পরে পরিচিত হয় “হেমায়েত বাহিনী” নামে। তারা ছিলো বাতাসের মতো—দেখা যেতো, ধরা যেতো না। রাতের অন্ধকারে ওরা এমনভাবে হানা দিতো যে পাকিস্তানি সেনারা সকালে নিজেদের ক্যাম্পেই ‘আল্লাহু আকবার’ বলে দৌড়াতো। এক রাতে মাদারীপুরে হেমায়েত বাহিনী পাকসেনাদের ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন হেমায়েতকে দেখে চিৎকার করে ওঠে, “তুমি কে?” হেমায়েত তখন হাতের কাঁঠালপাতা দিয়ে মাথার ঘাম মুছছিলেন, বললেন— “তোমার দুঃস্বপ্ন!” এরপর যে গুলি বর্ষণ শুরু হলো, সেটা থামলো শুধু নদীতে আগুন লেগে যাওয়ার পর। একদিন সম্মুখ যুদ্ধে বুলেট ঢুকলো হেমায়েতের গালে। আটটা দাঁত উড়ে গেল, রক্তে মুখ ভেসে যাচ্ছে। সৈনিকরা চিৎকার করছে, “স্যার, আপনি বসুন!” হেমায়েত রক্তমাখা মুখে হাসলেন, বললেন, “বসলে পাকিস্তান বসে যাবে!” এবং অজ্ঞান হওয়ার আগ পর্যন্ত গুলি চালাতে থাকলেন। সেই রাতে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন অল্পের জন্য। ডাক্তার যখন বলল, “দাঁত আটটা নাই,” তখন হেমায়েত হেসে বলেছিলেন, “তাতে কী? কামড়ানোর ইচ্ছেটা তো এখনো আছে।” তার সৈনিকরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকত “বুলেট-গাল স্যার”। যুদ্ধের সময় যখন নতুন মুক্তিযোদ্ধারা ভয় পেত, তিনি বলতেন— “ভয় পেও না ভাই, পাকিস্তানিরাও মানুষ—তাদেরও ঘাম হয়, শুধু লজ্জা নাই।” একবার এক রাজাকারকে ধরে ফেলেছিল তাঁর বাহিনী। রাজাকার চিৎকার করে বলল, “আমাকে মাইরো না ভাই, আমি এখন ভালো মানুষ!” হেমায়েত শান্ত গলায় বললেন, “ভালো মানুষ হলে তো তোরে আবার জন্ম দিতাম।” এমনই ছিল তাঁর রসিকতা—রক্তের ভেতরও হাসি। তাঁর এই হাসিই ছিল অস্ত্রের চেয়ে ভয়ংকর। পাকিস্তানিরা বলতো, “হেমায়েতের বাহিনী গুলি ছোঁড়ে না, গালাগালি ছোঁড়ে—তাতেই আমরা মরছি।” তবে তাঁর হাসির পেছনে যে দুঃখ ছিল, সেটা কেউ বুঝতে পারতো না। একবার একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “স্যার, যুদ্ধ শেষ হলে আপনি কী করবেন?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “স্ত্রীর কবরে ফুল দিবো, তারপর হাসবো—কারণ সে জিতেছে, আমি বেঁচে আছি।” অবশেষে ডিসেম্বর এলো। দেশ স্বাধীন হলো। পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করল। মানুষ আনন্দে কাঁদছে। হেমায়েত তখন নিঃশব্দে নদীর ধারে বসে আছেন, হাতে তাঁর স্ত্রীর ভাঙা চুড়ির টুকরো। বললেন, “তুমি দেখছো তো? আমরা পেরেছি।” গ্রামবাসী তাঁকে বীর বিক্রম উপাধি দিলো। কেউ বলল, “স্যার, আপনি ইতিহাস।” হেমায়েত হেসে বললেন, “ইতিহাস আমি না ভাই, আমি তো শুধু ইতিহাসের মজার ফুটনোট।” বাড়ি ফিরে তাঁর পুরনো দোচালা ঘরে গিয়ে দেখলেন—ছাদের এক কোণে পাখির বাসা। সেখানে ছোট ছোট ছানা কিচিরমিচির করছে। তিনি হেসে উঠলেন, বললেন, “দেশ বেঁচে আছে মানে তো পাখিরাও হাসে।” তারপর একটা দাঁতহীন হাসি ছুঁড়ে দিলেন আকাশে। মনে হলো, সেই হাসির আলোয় পুরো বরিশাল ঝলমল করছে। আজও কেউ যদি বরিশালের নদীপাড়ে গিয়ে জলে মুখ রাখে, মাঝে মাঝে শোনা যায় এক অদ্ভুত কণ্ঠ— “ভয় পেও না ভাই, যুদ্ধ শেষ হলেও সাহস শেষ হয় না!” সে কণ্ঠ হেমায়েতেরই—যে মানুষ বুলেট খেয়েও হাসত, শোককে শক্তিতে বদলে দেশকে স্বাধীন করেছিলো, আর প্রমাণ করেছিলো— বীরেরা শুধু যুদ্ধ করে না, হাসতেও জানে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রক্তে লেখা হাসি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now