বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রক্ত
- শুভাগত দীপ
১.
- ডাক্তার সাহেব... সুজয়... ও বাঁচবে তো?
- দেখুন, শান্ত হোন। এখনই কিছু বলা যাচ্ছেনা। রক্ত লাগবে। প্রচুর রক্ত।
- রক্ত তো কোথাও পাচ্ছিনা ডাক্তার সাহেব। শহরের কোন ব্লাড ব্যাঙ্কে ও নেগেটিভ রক্ত নেই। আমরা...
- একজন অন্তত ডোনার যোগাড় করুন। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো উনাকে বাঁচানোর।
- থ্যাংক ইউ ডাক্তার সাহেব। দেখছি কি করা যায়।
হন্তদন্ত হয়ে যুবকটা বেরিয়ে চলে গেলো চেম্বার থেকে। ডাক্তার নাজমুল হুদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চশমাটা খুলে ফেললেন। প্রচন্ড সিগারেটের তৃষ্ণা অনুভব করছেন তিনি। কিন্তু সিগারেট খেতে হলে হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে। এখন যেতে ইচ্ছে করছেনা।
সুজয় নামের এক যুবক আজ বিকেলের দিকে কাঁধে গুলি খেয়ে হসপিটালে এসে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত আসতে আসতেই প্রচুর রক্ত হারিয়েছে সে। সুজয়ের সাথে তার একজন বন্ধু ছিলো। ছেলেগুলোর চেহারা দেখলে মনে হয় কোন রাজনৈতিক দলের ক্যাডার। ড্রাগ এডিক্ট বলেও সন্দেহ করেছিলেন ডাক্তার নাজমুল। পরে প্রমাণও পাওয়া গেলো। রক্ত পরীক্ষা করে তার রক্তে মর্ফিন পাওয়া গেছে। তার সাথে আসা বন্ধুটার রক্তও পরীক্ষা করা হয়েছে। মেলেনি একদম।
অর্ধচেতন সুজয় ধীরে ধীরে তার বাকি চেতনাও হারাচ্ছিলো। ডাক্তার নাজমুল তার ক্ষত ও ফ্যাকাশে শরীর দেখেই বলে দিয়েছিলেন রক্ত লাগবে। ও নেগেটিভ রক্ত হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই। আশেপাশে খোঁজ করলে লোক পাঠানো হলো। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রক্ত এখনো পাওয়া যায়নি। আগামী আধা ঘন্টার মধ্যে রক্ত না পেলে কি হবে বলা যায়না। কারন সুজয় ইতোমধ্যেই প্রচুর রক্ত হারিয়েছে। অক্সিজেন দিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। রক্তও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁধের কিছু লিগামেন্ট। ভালোর মধ্যে একটাই, গুলিটা বের করা হয়েছে। সুজয়ের বন্ধু রক্তের ব্যবস্থা করলেই কাজ শুরু করবেন ডাক্তার নাজমুল। বন্ধুটার নাম উনি ভুলে গেছেন। এবার এলে আবার জেনে নিতে হবে, ভাবলেন ডাক্তার নাজমুল।
চেম্বারের দরজায় নকের শব্দ হলো। ডাক্তার নাজমুল খুলে রাখা চশমাটা পরে নিলেন।
- প্লিজ, কাম ইন।
- স্যার, আঠারো নম্বর বেডের রোগীর রক্ত বন্ধ হয়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। খুব দ্রুত রক্ত দেয়া না হলে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হবে।
- আপনি যান, সিস্টার। আমি আসছি।
- ওকে স্যার।
- ও... শুনুন!
- জি স্যার...
- আমাদের হাসপাতালের স্টাফদের রেকর্ড চেক করুন তো। কারো যদি রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ হয়, তাকে এক্ষুনি হাজির করুন। সে যদি ছুটিতে থাকে তবুও।
- ওকে স্যার। এটা ভালো হবে।
- নূরে আলম সাহেবকে এ কাজে লাগিয়ে দিয়ে আপনি রোগীর কাছে যান। আর উনাকে বলবেন কোন খবর পাওয়া মাত্রই আমাকে যেন জানান।
- জি স্যার।
নার্স চলে গেলে ডাক্তার নাজমুলের সিগারেটের তৃষ্ণা নতুন করে জেগে উঠলো। ডেস্কের পেছনের খোলা জানালাটার কাছে গিয়ে উনি একটা সিগারেট জ্বালালেন। তৃপ্তি নিয়ে কয়েকটা টান দিতেই সাইরেনের শব্দ শোনা গেলো। জানালা দিয়ে হাসপাতালের চৌহদ্দিতে একটা পুলিশ ভ্যান ঢুকতে দেখলেন ডাক্তার নাজমুল। শার্টের ইন ঠিকঠাক করে নিজের সুইভেল চেয়ারে এসে বসলেন তিনি। পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলেন। এটা অবশ্য ডাক্তার নাজমুলের জন্য নতুন কিছু না। মাঝে মাঝেই পুলিশি কেস এসে হাজির হয় নিরুপদ্রব হাসপাতালে। সিনিয়র ডাক্তার হিসেবে তখন তাকেই এসব সামলাতে হয়।
আবারো দরজায় নকের শব্দ হলো। তিনি কিছু বলার আগেই দরজা ঠেলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে তিনজন লোক ভেতরে ঢুকলো। এদের কারো পরনেই পুলিশের ইউনিফরম নেই। ডাক্তার নাজমুল বুঝলেন, এরা সাদা পোশাকের পুলিশ। তিনজনের মধ্যে একজনকে দেখে সিনিয়র মনে হলো। লোকটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বোঝা গেলো। তিনিই প্রথম কথা শুরু করলেন।
- হ্যালো ডাক্তার সাহেব, আমি সাব ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়া।
- হ্যালো। বলুন আপনাদের জন্য কি করতে পারি?
- আমরা এখানে সুজয়ের ব্যাপারে এসেছি। খবর পেয়েছি, একটা গ্যাংওয়ারে কাঁধে গুলি খেয়ে সে আপনাদের এখানে এডমিট হয়েছে। ওর সাথে কি কথা বলা সম্ভব?
- দেখুন ইন্সপেক্টর, সুজয় আসলে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। প্রচুর রক্ত হারিয়ে সে প্রায় চেতনাহীন। রক্তের খোঁজ করা হচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছেনা। এ অবস্থায় কি ভাবে কথা বলবেন ওর সাথে?
- বুঝতে পারছি। তাহলে ওর কাছে একবার নিয়ে চলুন। দেখি কি অবস্থা।
- চলুন। তবে আপনি একা আসলে ভালো হয়। আমি চাইনা এতো লোক একসাথে আমার রোগীকে ঘিরে ধরুক।
- ওকে ডাক্তার সাহেব।
বাকি দুজন সম্ভবত কনস্টেবল। ওদেরকে চেম্বারে বসিয়ে রেখে ডাক্তার নাজমুল ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়াকে নিয়ে সুজয়ের কেবিনের দিকে চললেন। এখনো রক্ত পাওয়া যায়নি বলে একটা চাপা টেনশন বোধ করছেন তিনি।
সুজয়কে যে কেবিনে রাখা হয়েছে, সেখানে মাত্র তিনটা বেড। দুটো আপাতত খালি। এই কেবিনটা মূলত গুরুতর আহত মানুষদের জন্য। ডাক্তার নাজমুল ও ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়া যখন কেবিনে ঢুকলেন, সেখানে দুজন নার্স ছিলো। তারা কিছু একটা নিয়ে চাপা স্বরে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। ডাক্তারের সাথের লোকটাকে দেখে ওরাও মনে হয় বুঝতে পারলো, লোকটা পুলিশ। চুপ করে গেলো দুজন।
সুজয়ের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো আছে। সারা মুখে নানা কাটাছেঁড়ার দাগ। গালে প্রায় সপ্তাহখানেকের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখদুটো আধবোঁজা থাকায় মণির সাদা অংশ চকচক করছে ফ্লুরোসেন্টের আলোয়। বাম কাঁধের মোটা ব্যান্ডেজ ফুঁড়ে রক্তের গোলক দেখা দিয়েছে। সারা শরীর ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। ভালো করে না তাকালে বোঝা কঠিন যে, লোকটা বেঁচে আছে।
- দেখলেন তো ওর অবস্থা, ইন্সপেক্টর সাহেব। এখন কি করবেন?
- রক্ত পাওয়া না গেলে তো ও মরবে। আপনারা শহরের অন্যান্য ব্লাডব্যাঙ্কগুলোতে খোঁজ নিয়েছেন?
- জি। কোথাও ও নেগেটিভ রক্ত নেই।
- কি বললেন! ও নেগেটিভ রক্ত?
- জি ইন্সপেক্টর সাহেব।
- আমার তো রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ।
ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়ার এ কথা শুনে ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন ডাক্তার নাজমুল। তিনি আশান্বিত মুখে ইন্সপেক্টর আসাদুলের দিকে তাকালেন।
- ইন্সপেক্টর সাহেব, তাহলে আপনিই তো ওকে রক্ত দিতে পারেন।
- সেটাই করতে হবে মনে হচ্ছে। যদিও আমি চাইনা এই জানোয়ারটার শিরা-ধমনীতে আমার রক্ত বয়ে যাক।
- দেখুন, ইন্সপেক্টর সাহেব, শত হলেও তো ও একটা মানুষ...
- আপনি জানেননা ডাক্তার সাহেব, কাকে আপনি মানুষ বলছেন। সুজয় একটা জলজ্যান্ত জানোয়ার। কয়েকজন নিরীহ মানুষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে ও। অত্যন্ত ধূর্ত এই জানোয়ার নিজের অপকর্মের কোন প্রমাণ রাখেনা। তার ওপর একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছায়াতলে এসব করে বেড়ায় সে। চাইলেও আমরা ওর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারিনা। এবার বহু কষ্টে ওকে ধরার জন্য ওয়ারেন্ট যোগাড় করেছি। তবুও জানোয়ারটাকে বাঁচাতে মন সায় পাচ্ছেনা।
- কিন্তু আপনার তো কাজ আসামীকে বিচারের মুখোমুখি করা,তাইনা?
- শুধু এ কারনেই তো ওকে রক্ত দিতে বাধ্য হচ্ছি ডাক্তার সাহেব। আপনি দেরি না করে সব ব্যবস্থা করুন।
- থ্যাংকস ইন্সপেক্টর সাহেব।
ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়া ডাক্তার নাজমুলের ধন্যবাদের জবাবে কিছু বললেননা। মনের মধ্যে যেন একটা লড়াই চলছে। অস্থির ভঙ্গিতে বারংবার নিজের আঙ্গুল মটকাতে লাগলেন তিনি। ডাক্তার নাজমুল এদিকে রক্ত নেয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। তাকে সাহায্য করছে সেই নার্স দুজন। কাজ করতে করতেই কথা বলে উঠলেন ডাক্তার নাজমুল।
- ইন্সপেক্টর সাহব, সুজয়কে যে ছেলেটা হাসপাতালে এডমিট করেছিলো, ও কিন্তু সেই গেছে এখন পর্যন্ত দেখা নেই।
- ওকে আর হাসপাতালে দেখতে পাবেন বলে মনে হয়না। কোনভাবে জেনেছে পুলিশ আসছে, সটকে পড়েছে।
- ওর নামটা ভুলে গেছি, ইন্সপেক্টর সাহেব।
- ওর নাম রুমান। এ শহরের আরেক আবর্জনা। ওকে সুজয়ের ডান হাত বা বাম হাত, যেকোনটা বলতে পারেন।
সব প্রস্তুতি শেষ। একজন নার্স এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর আসাদুলের হাতের শিরায় সুঁই ফোটানোর জন্য। পিঁপড়া কামড়ানোর মতো ব্যথা অনুভব করলেন তিনি। আড়চোখে দেখলেন চিকন রক্তের ধারা পাইপ দিয়ে গিয়ে একটা ব্যাগে জমা হচ্ছে। সেখান থেকে আরেক পাইপের মধ্য দিয়ে প্রভাহিত হবে সুজয়ের শরীরে। ইন্সপেক্টর আসাদুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতেও পারলেননা, কতো বড় ভুল আজ তিনি করলেন।
২.
পাঁচ বছর পরের এক বিকেল। সাবেক ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়া বাড়ির ব্যালকনিতে বসে আছেন। সামনের টি-টেবিলে রাখা প্রায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ তাকে টানছেনা। ভ্রু কুঁচকে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাবছেন তিনি। ইচ্ছা করেই রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন তিনি। একনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ আসাদুল সাহেবের সততার গল্প এখনো মুখে মুখে ফেরে ডিপার্টমেন্টে। একটাই ক্ষোভ, সেদিন তিনি সুজয়কে আটক করেও ধরে রাখতে পারেননি। সেই ক্ষমতাবান নেতার অঙ্গুলিহেলনেই মুক্তি পেয়ে যায় সুজয়। তারপর অনেকগুলো দিন তিনি ওর পেছনে দৌড়েছেন, কিন্তু কোন কিনারা করতে পারেননি। একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে রাগে-ক্ষোভে রিটায়ার্ড করেন। কিন্তু সেই হেরে যাওয়ার অনুভূতিটা তাকে কখনোই ছেড়ে যায়না।
মেয়েলি গলায় হাসির শব্দ আসছে রান্নাঘর থেকে। আসাদুল সাহেবের দুই মেয়ে কি যেন নিয়ে খুব হাসাহাসি করছে। ওদের হাসি শুনে তাঁর ভারাক্রান্ত মন একটু শান্ত হয়ে গেলো।
আসাদুল কিবরিয়ার দুই মেয়ে। স্ত্রী মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। বড় মেয়ে আফসারীর বিয়ে দিয়েছেন এক শিপিং মার্চেন্টের সাথে। মেয়েটা বছরে দুই একবার বাবার বাড়িতে আসে। এবার এসেছে একাই। জামাই আবুধাবিতে গেছে ব্যবসায়িক কাজে।
ছোট মেয়েটার নাম দিলারা। মেয়েটার চেহারায় একটা অন্যরকম স্নিগ্ধতা আছে। বিশ বছর পার করে এলেও মনটা এখনো শিশুর মতো। বাংলা কলেজে অনার্স পড়ছে সে। বাড়ির সমস্ত কাজ সে নিজেই করে। বাবার প্রতিও তার অনেক খেয়াল। মাঝে মাঝে আসাদুল সাহেব ভাবেন, তাঁর মৃতা মা ফিরে এসেছেন। কারন, দিলারার চেহারা অনেকটাই তাঁর মৃতা মায়ের মতো।
দিলারার কণ্ঠ শুনে সচকিত হয়ে উঠলেন আসাদুল সাহেব।
- বাবা! আমি আর আপা একটু মার্কেটে যাচ্ছি। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে।
- সন্ধ্যা লেগে যাচ্ছে, দেরি করিসনা মা। এখনই যা তাহলে।
- আচ্ছা বাবা। তুমি চিন্তা কোরোনা। আমরা তাড়াতাড়িই ফিরবো।
- টাকা লাগবে তোদের?
- না বাবা। আজকে আপা স্পন্সর করবে।
উচ্ছ্বসিত কিশোরির মতো দুই মেয়ের চলে চলে যাওয়া দেখলেন আসাদুল সাহেব। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ফুটে উঠলো। এই মেয়েদুটোই তাঁর জগত। এদেরকে ছাড়া তিনি বাঁচতে পারতেননা।
রাত্রি নয়টা বাজতে চললো, মেয়েরা ফিরছেনা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন আসাদুল সাহেব। দিলারার ফোনে ট্রাই করছেন বেশ কিছুক্ষণ ধরে। ওর ফোন বন্ধ কিন্তু আফসারীর ফোনে বেশ কয়েকবার ডায়ালটোন শুনতে পেলেন তিনি। রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে... হঠাৎ রিসিভ হলো। একটা পুরুষ কণ্ঠ শুনলেন তিনি।
- হ্যালো, আফসারী মা...
- ধুশ শালা...
- হ্যালো হ্যালো...
- ফোন কাটতে পারছিনা রে সুজয়.... স্ক্রিণ ও হাত দুটোই ভিজে আছে...
- হ্যালো... আমার মেয়েরা কোথায়? আপনি কে?
- ফোনের গুষ্টি মারি শালা! সব নষ্ট করে দিলো...
- হ্যালো... দেখুন...
ফোনটা কেটে গেলো। মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো আসাদুল সাহেবের। বুঝতে পারলেন কিছু একটা ঘটেছে মেয়েদের সাথে। কিন্তু সুজয়ের নাম করলো কেন ফোনের ওপারের লোকটা! পাশ থেকে একটা লোকের চাপা গলাও শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি। ও-ই কি সুজয়! বদি নামে একজনের নামও শুনলেন। ফোনটা যে রিসিভ করেছিলো, তার নাম কি বদি! হাত পা কাঁপতে লাগলো আসাদুল সাহেবের। ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়লেন তিনি। তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, তাঁর মেয়েরা কতোটা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েছে!
৩.
মেয়ে দুটোকে মরফিন ইঞ্জেকশন দিয়ে অচেতন করা হয়েছে। তাদেরকে একটা বড় চৌকিতে শুইয়ে চৌকির দুই পাশের রেলিংয়ের সাথে দুই হাত ও দুই পা শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। দুজনেরই অর্ধনগ্ন অবস্থা।
সামনে দাঁড়ানো লোকদুটোর হাতে মদের গ্লাস। ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে তারা। কপালে কাটা দাগওয়ালা লোকটা সঙ্গীর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে আরেকটু মদ ঢাললো নিজের গ্লাসে।
- বদি, মালগুলোর মোবাইল দুটো অফ করে রাখ। কাজের সময় কেউ কল দিলে ফিলিংস পাইনা।
- আচ্ছা। নেশা ভালোই হয়েছে, তাইনা? শোয়ানো মাল আর বোতলের মাল দুইটাই জোস।
- বেশি কথা না বলে যা বললাম তাই কর। এমনিই শালীদেরকে এ পর্যন্ত আনতে কালো ঘাম ছুটে গেছে।
- ঠিকই বলেছিস, সুজয়। শালীরা ওই গলি ধরে শর্টকাট না মারলে আজ এমন মাল চাখার সুযোগ হতোনা।
- বদি শোন, তুই কথা বেশি বলিস। এতোক্ষণ কাজ হয়ে যায় কিন্তু।
- লে বাবা! রাগ করিস কেন!
বদি নামের লোকটা মেয়েদুটোর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল দুটো বের করে নেয়। পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে একটা মোবাইল বন্ধ করে। আজকে খুব গরম পড়েছে। কপালের আর ঘাড়ের ঘাম মুছে দ্বিতীয় মোবাইলটা হাতে তুলে নেয় সে। হঠাৎ উচ্চস্বরে রিংটোন বেজে উঠলো ওটার। সেই শব্দে স্তব্ধ হয়ে গেলো দুজন।
অত্যাধুনিক মোবাইলটার কোন ফাংশনই বোঝেনা বদি। কলটা কেটে দিতে গিয়ে রিসিভ করে বসে সে। ওপাশ থেকে ভারী গলায় কেউ হ্যালো হ্যালো করে চলেছে। কলটা এন্ড করতে চাইলো বদি। পারলোনা। ঘামে হাত ও মোবাইলের স্ক্রিণ, দুটোই ভিজে আছে।
- বদি, এখনো কাটতে পারিসনি! তুই শালা আসলেই একটা আবাল!
- আমি কি বসে আছি নাকি! হাত ভেজা...
এদিকে ওপাশের ভারী কণ্ঠটা হ্যালো হ্যালো করেই চলেছে। বদি নার্ভাস ভঙ্গিতে সুজয়কে কৈফিয়ত দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু সুজয়ের নাম উচ্চারণ করে নিজের অজান্তে যে ভুল যে সে করলো, ঠিক একই ভুল সেও বদির নাম উচ্চারণ করে করলো। দুজনের কেউ-ই নেশাগ্রস্ত থাকার কারনে এটা বুঝতে পারলোনা।
চাপা স্বরে গালি দিয়ে উঠলো সুজয় নামের লোকটা। বদিকে কাজটা দেয়াই ভুল হয়েছে। শালা ফোনটা বন্ধ তো করতে পারেইনি, রিসিভ করে ফেলেছে। আরো কয়েকটা গালি দিয়ে উঠলো সে। তারপর ওর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে জোরে এক আছাড় মারলো পুরোনো রাজবাড়িটার দেয়ালে। সব স্পন্দন থেমে গেলো মোবাইলটার। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সুজয়।
ভাগ্যিস ওরা মেয়ে দুটোকে এই পুরোনো রাজবাড়িতে এনেছে! আশেপাশে কোন লোকবসতি নেই। তার কোন গোলমাল হলেও কেউ জানতে পারবেনা। তা না হলে আজ ওই মরার মোবাইলটাই ওদের কম্ম সাবাড় করে দিতো।
- সুজয়, আমি শাড়িওয়ালিকে নিলাম। তুই কামিজওয়ালিকে নে।
- এখনই শুরু করবি?
- সারা রাত কি বোতলের মালই টেনে যাবো নাকি! ওই মালগুলো যে আমাকে অস্থির করে তুলছে!
- ঠিক বলেছিস শালা! আমিও তাহলে শুরু করে দেই।
- আজকে রাতটা আমাদের রে দোস্ত!
দুই নরপশু অস্থির হয়ে নিজেদের পোশাক খুলতে লাগলো। মর্ফিনের প্রভাবে অচেতন দুই বোন জানতেও পারলোনা কি ঘটতে চলেছে তাদের সাথে। তারা এটাও জানলোনা, তাদের চেতনা আর কখনোই ফিরবেনা।
৪.
নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর আফসারী ও দিলারার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গেলো শহরের বাইরের পুরোনো রাজবাড়িটার একটা ঘরে। মেয়েদুটোকে উপর্যুপরি ধর্ষন করে হত্যা করা হয়েছে। সারা শরীরে অত্যাচারের ভয়াবহ চিহ্ন। লাশদুটো ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মিডিয়ার কাছে দেয়া বিবৃতিতে পুলিশ বরাবরই যা বলে তাই বললো। 'দোষীদের গ্রেপ্তার করা হবে অবিলম্বেই।'
রিটায়ার্ড ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়াকে সান্ত্বনা দিতে অনেক লোকজন আসছেন। তাঁদের কারো কথাই তাঁর কানে ঢুকছেনা। চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে তাঁর। এক ফোঁটাও কাঁদেননি তিনি। মাথার ভেতরটা উত্তপ্ত হয়ে আছে। শুধু দুটো নাম বারবার তাঁর মাথায় ঘুরছে। নাম দুটো হলো সুজয় আর বদি।
সেদিনের ফোনকলের ব্যাপারে আসাদুল সাহেব পুলিশকে কিছুই বলেননি। জানেন, কোন ফল হবেনা এতে। কেউ বুঝতেও পারলোনা, তাঁর মাথায় কি চলছে। বুঝতে পারলে শিউড়ে উঠতো। মাঝে মাঝেই তাঁর ঠোটের কোণে ফুটে ওঠা বাঁকা হাসির রহস্য কেউ জানলোনা।
৫.
টলমল করে পা ফেলে হাঁটছে বা হাঁটার চেষ্টা করছে বদি। তার এহেন আচরণ দেখে চৌরাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো কুকুর দুটো মনে হয় বিভ্রান্ত বোধ করছে। তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে তারা। কুকুরগুলোর হল্লায় বিরক্ত হয়ে গোটা কয়েক কুৎসিত গালি দিলো বদি।
গাঁজার নেশাটা আজকে একটু বেশিই ধরেছে বদির। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠছে বারবার। এক কদমও ঠিকমতো এগোতে পারছেনা সে। রাতও অনেক হয়েছে। রাস্তায় কোন জনমানুষ নেই। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখতে চাইলো সে। কিন্তু উজ্জ্বল সাদা আলো ছাড়া কিছু দেখতে পেলোনা।
কুকুরগুলোর চিৎকার কখন থেমে গেছে টের পেলোনা বদি। আসলে ও যে অবস্থায় আছে, তাতে টের পাওয়ার কথাও না। বদির পেছনের অন্ধকার গলি থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এলো বিড়ালের মতো পা টিপে। ল্যাম্পপোস্টের মরাটে আলোর পটভূমিতে লোকটার পুরো কাঠামো কালচে দেখাচ্ছে। তার হাতে শোভা পাচ্ছে লম্বা হাতলওয়ালা একটা কুঠার।
ছায়ামূর্তিটা যখন একেবারে বদির পেছনে এসে দাঁড়ালো, তখন তার উপস্থিতি টের পেলো সে। চিৎকার দেবার জন্য মুখ খুললেও গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোলোনা তার। ছায়ামূর্তিটা ততক্ষণে কুঠারটা মাথার ওপরে তুলে ফেলেছে। বদিকে অবাক করে দিয়ে সেটা সর্বশক্তিতে নামিয়ে আনলো ওর মাথার ওপর। চাঁদির হাড় ভাঙ্গার বিশ্রী শব্দ হলেও নির্জন রাস্তায় সে ছাড়া কেউ শুনতে পেলোনা।
কুঠারটা হ্যাঁচকা টানে বের করে এনে ছায়ামূর্তিটা আবারো গলির মুখে ফিরে গেলো। সেখানে দাঁড়িয়ে মাটিতে পড়ে থাকা বদির দিকে তাকিয়ে রইলো। কাটা মাছের মতো তড়পাচ্ছে বদি। গলা দিয়ে গোঙ্গানীর মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। রাস্তার পিচ ভেসে যাচ্ছে মগজমিশ্রিত রক্তে।
ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রক্তস্নাত ওইটুকু জায়গাকে কালো গহ্বর বলে মনে হচ্ছে ছায়ামূর্তিটার।
একটা কাজ শেষ হয়েছে ছায়ামূর্তিটার। এবার শেষ দেখতে হবে একজনের। সেই একজনের নাম সুজয়।
৬.
বদির ওপর খুব রাগ হচ্ছে সুজয়ের। শালা কিভাবে এমন করতে পারলো ওর সাথে! আজ বিকেলে করা ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি করার সময় বদি ওকে ঠকিয়েছে। এ ব্যাপারে সে একেবারে নিশ্চিত। এমনিতেই ক'দিন আগে মেয়েদুটোকে খুন করার পর থেকে একটা চাপা অস্বস্তি দানা বেঁধে আছে ওর মনের মধ্যে।কোন কাজেই মন বসাতে পারছেনা। এর আগে ওর কখনো এমনটা হয়নি।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পুরোনো শ্মশানটার পাশ দিয়ে হাঁটছিলো সে। এপাশটা খুবই অন্ধকার। তবে শর্টকাট হয় বলে এটাই সে সবসময় ব্যবহার করে আসছে। গরমের দিন, সাপখোপ থাকতে পারে ভেবে পকেট থেকে কেন্ট লাইটারটা বের করলো ও। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে লাইটারের পেছনের টর্চটা জ্বালিয়ে সামনে এগোতে থাকলো। নিজের ডেরার অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। বিছানাটা যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে ওকে।
লাইটারের টর্চের আলোয় রাস্তার একপাশে পড়ে থাকা কি যেন চকচক করে উঠলো। কৌতুহল নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো সুজয়। কাছে গিয়ে ভালোভাবে দেখার জন্য উবু হলো সে। একটা কানের দুল। সোনার বলেই মনে হচ্ছে। খুশি হয়ে উঠলো ও। বুঝতেও পারলোনা, রাস্তার ওপাশের গুদামঘরের আড়াল থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসছে। কানের দুলটা পরখ করা অবস্থাতেই টের পেলো, ওর পিঠে তীক্ষ্ণ কিছু একটা বিঁধলো। গালি দিয়ে পেছনে ঘুরতেই দুলে উঠলো সুজয়ের পুরো পৃথিবী। জ্ঞান হারানোর আগে দেখলো সিরিঞ্জ হাতে একটা কালচে কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মুখ দেখা না গেলেও চোখদুটো যেন গনগনে আগুনে জ্বলছে।
৭.
ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে আসতে লাগলো সুজয়ের। মাথার ভেতরে ভোঁতা একটা ব্যাথা। সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করলো চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায়। ওকে এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যে একচুলও নড়ার ক্ষমতা নেই ওর।
ঘরের মধ্যে একটা ফাইভ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। গুমোট একটা পরিবেশ। ঘরের বন্ধ দরজাটা ঠেলে একজন লোক ঢুকলো। সোজা এসে দাঁড়ালো সুজয়ের সামনে। ফাইভ ওয়াটের আলোতেও সুজয় তাকে চিনতে পারলো। এই লোকটাই তাকে একসময় নিজের রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলো। আবার এই লোকটাই জোঁকের মতো পেছনে লেগেছিলো তার বিচার করার জন্য। অকুতোভয় সাবেক পুলিশ ইন্সপেক্টর আসাদুল কিবরিয়াকে চিনতে ওর এতটুকুও ভুল হলোনা। লোকটার গমগমে কণ্ঠ শুনে আগেও অস্বস্তি হতো ওর। আজ আতঙ্ক বোধ করলো।
- আমাকে চিনতে পারছো, সুজয়?
- জি...কিন্তু আমাকে বেঁধে রেখেছেন কেন?
- তোমাকে শুধু বেঁধেই রাখিনি, ন্যাংটা করে বেঁধে রেখেছি।
- শুওরের বাচ্চা...
- চোপ! একদম কথা বলবিনা জানোয়ারের বাচ্চা! একেবারে ছুলে বিটলবন লাগায়ে দেবো!
আসাদুল সাহেবের এই মূর্তি দেখে এবার প্রথমবারের মতো সত্যিকার ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো সুজয়ের ভেতরটা। আসাদুল সাহেব হেঁটে ঘরের এককোণায় রাখা ওয়ার্ডরোবের কাছে গেলেন। ড্রয়ার খুলে দুটো জিনিস বের করে আনলেন। জিনিসদুটো নিয়ে আবারো সুজয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি।
- তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো।
- আমি দেখতে চাইনা। আমাকে যেতে দিন, প্লিজ!
- দেখতে তো তোমাকে হবেই।
- না!
- খানকির বাচ্চা! আমি যা বলি তুই তা-ই করবি এখন! করবিনা?
- জি... জি... করবো...
- তাহলে এটা দেখ...
আসাদুল সাহেব সুজয়ের সামনে একটা ছবির ফ্রেম বাড়িয়ে ধরলেন। ছবিটার দিকে তাকিয়ে সুজয়ের মুখ ভয়ে বিকৃত হয়ে গেলো। দুজন তরুণী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাদের মুখভর্তি হাসি। এই মেয়েদুটোকেই ও আর বদি কিছুদিন আগে ধর্ষন করে হত্যা করেছে। তাহলে কি, আসাদুল সাহেবই এদের...?
- কি, চিনতে পারলি?
- স্যার! বিশ্বাস করুন,আমি জানতামনা...
- আমাকে স্যার বলিসনা। আমার তোর মতো ছাত্র লাগবেনা।
- স্যার প্লিজ...
- ওদেরকে যখন মারছিলি,খুব মজা পাচ্ছিলি, তাইনা?
- স্যার...
- শুওরের বাচ্চা! এই পৃথিবীতে ওরাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিলো। তুই আর বদি জানোয়ারটা সেটাও শেষ করে দিয়েছিস!
- স্যার... আমাকে মাফ করে দিন... আমাকে পুলিশে দিন...
- পুলিশে দেবো! আবার যাতে বেরিয়ে এসে আমার নাকের ডগা দিয়ে ঘুরতে পারিস!
- স্যার...
- তোকে আমি মুক্তি দেবো। আমার মেয়েদুটোর কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিস। যদিও ওরা তোকে ক্ষমা করবেনা।
- প্লিজ... না...
আসাদুল কিবরিয়া সুজয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মুখে লাগিয়ে দিলেন টেপ। হিস্টিরিয়াগ্রস্থ রোগীর মতো কিছুক্ষণ কাঁপতে দিলেন তাকে। তারপর ড্রয়ার থেকে বের করা বাউয়ি নাইফটা বের করে উপর্যুপরি কোপাতে লাগলেন তাকে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগলো সদ্য তৈরি হওয়া ক্ষতস্থানগুলো থেকে। মুখ বন্ধ থাকায় অদ্ভুত স্বরে গোঙ্গাতে লাগলো সুজয়। কিন্তু কোন ভ্রুক্ষেপ নেই আসাদুল সাহেবের। শরীরের সব জায়গায় স্ট্যাব করে চললেন তিনি অবিরত। চোখ মুখ ও পরনের সমস্ত পোষাক রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে তাঁর।
একসময় শান্ত হলেন তিনি। থেমে গেছে সুজয়ের চাপা গোঙ্গানী ও কাঁপাকাঁপি। মাংসের মোরব্বায় পরিণত হয়েছে সে। নিথর রক্তাক্ত মোরব্বা। রক্তের পুকুর সৃষ্টি হয়েছে চেয়ারটার চারপাশে। রক্ত পড়ার টপ টপ শব্দও শোনা যাচ্ছে।
পরিশিষ্ট...
রক্তে ভেজা হাতটা জানালার পর্দার সাথে মুছে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেন আসাদুল কিবরিয়া। ফোন করলেন পুলিশ স্টেশনে। ওপাশ থেকে কেউ ফোন রিসিভ করলো।
- হ্যালো, পুলিশ স্টেশন...
- আমি আসাদুল কিবরিয়া বলছি।
- বলুন স্যার... এতো রাতে... আমরা তো কেসটা নিয়ে এখনো কাজ করে যাচ্ছি। আজকালের মধ্যেই খুনী ধরা পড়বে।
- তার আর দরকার নেই।
- কেন স্যার? হঠাৎ এই কথা?
- আমি আমার মেয়েদের খুনী বদি ও সুজয়কে কিছুক্ষণ আগে খুন করেছি। বদির লাশ চৌরাস্তার মোড়ে পাবেন। আর সুজয়ের লাশ আমার বেডরুমে। চলে আসুন।
ওপাশ থেকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আসাদুল সাহেব কলটা কেটে দিলেন। তিনি অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে সুজয়ের শরীর থেকে পড়া রক্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। এ রক্ত ও নেগেটিভ রক্ত। এ রক্ত তাঁর নিজের রক্ত।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now