বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।।।।।।।।।।।।।।।
বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে,সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে।বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রকিব মাছের খালই হাতে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে।রকিবের মা জমিলা বেগম খড়ে ছাওয়া বারান্দার নিচে বসে পালং শাক কুঁটছিলেন,রকিবকে উঠানেদেখে জোড়ে ডাক দিলেন-
- ও বাজান! তাড়াতাড়ি খালই নিয়ে আয়,বেলা যে বয়ে যায়,রান্দন লাগবো তো,মাঠে যাবি কহন?
- আর মা কয়ো না,দ্যাশে আহাল লাগছে।ইয়াহিয়া যেদিন থাইক্যা গদিতে বইছে আল্লাহ যেন্ দ্যাশটার উপ্রে গজব ফ্যালাইছে।নাইলে বিলে মাছ পাওয়া যাব না ক্যান? যে মাছ পাইছি তাতে একবেলাতেই টানাটানি পড়ব।
- ক্যা রে বাজান! আয়ুব খান রে সরাইয়্যা বলে ভালা সরকার গদিতে বইছে?
- না মাজান।এইডা আরেক শয়তান।আয়ুব্বা রে যেমনে সবাই মিল্যা নামাইছি,এইডারেও নামাইতে হইব।দেখতাছো না,শেখ মুজিব ভোটে জিতছে তাও জানোয়ারের দল গদি ছাড়ে না।
- হ বাজান,কী দিনকাল আইলো,নিজের সোয়ামী শ্বশুড়ের ভিটা,বাপের ভিটা ছাইড়া সবাই ওই পাড়ে যায়তাছে। জীবনের মায়া বড় মায়া রে বাজান।
- ইয়াহিয়া নাকি এই দ্যাশের সম্পদ চায়,মানুষ চায় না।হালা রক্তচোষা।
- বাদ দে।খাওন দাওন সাইরা মাঠে যা।
- খেত লাগাইয়া ফায়দা নাই।সব ওরা পুইড়া দিবো।
রাগে গদগদ করতে করতে রকিব আবার বিলের দিকে গেল।
বিলে বসে দুর আকাশে তাকিয়ে আছে রকিব।মজিদ মিয়া পাশের মাটির রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জোড়ে হাঁক ছাড়লো_
- ও রকিব, মাঠে যাইবা না?
- শুইন্যা যাও এদিকে।
মজিদ এসে রকিবের কাছে বসে জিজ্ঞেস করল-
- কী হইছে?
- দ্যাশের খবর কী?
- গতকাইল শেখ মুজিব ঢাকায় মিটিং এ স্বাধীনতার ডাক দিছে। সবাইরে এক হবার কইছে,এইবার কিছু একটা হইবই।হয় মরমু না হয় স্বাধীনতা আনমু।যাইগা রে।
সন্ধ্যায় রকিব মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরে দেখে পাশের বাড়ির অজিমের মা তার মায়ের সাথে বসে পান চিবুচ্ছে।জমিলা বেগম রকিব কে ডেকে পাশে বসালো।-
- বাবা আমার ত বয়স হইছে।কবে মইরা যাই! ঘরে নতুন বউয়ের মুখ দেখবার খুব ইচ্ছা।তর্ চাচী একটা ঘর আনছে।কালকে যাইবার চাই।
রকিব কিছু না বলে উঠে গেল। পরদিন পাশের গ্রামে নিয়াজউদ্দিনের মেজো মেয়ে রুমি খাতুন কে দেখতে জমিলা বেগম আর রকিব গেল।
বড় গৃহস্হ পরিবার। উভয় পক্ষের পছন্দ হওয়ায়,বিয়ের দিন ধার্য হল ১লা বৈশাখ।
বাড়িতে ফেরার পথে রকিবের বন্ধু নাসিমের থেকে শুনতে পেলো,সদরে নাকি প্রাইমারী স্কুলে পাক বাহিনী ঘাটি গড়ছে।
কয়েকদিন পর থেকে আশেপাশের গ্রামে অভিযান শুরু করল।এরই ধারাবাহিকতায় তারা নিয়াজউদ্দিনের বাড়িতে হামলা চালায়।
নিয়াজউদ্দীন, তার স্ত্রী, ৬ বছর বয়সের ছেলেকে হত্যা করে।রুমি ও তার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যায়।ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।এইরকম তান্ডবলীলা তারা সারা গ্রামব্যাপী চালায়।
রুমির খবর রকিবের কানে পৌঁছলে সে যেন পাথরের মত শক্ত হয়ে যায়।এত স্বপ্ন ছিল চোখে- বর সেজে বিয়ে করতে যাবে,মার নতুন বউ দেখার আশা পূরণ করবে।সব শেষ হয়ে গেল।তার মার চোখ থেকে পানি ঝরে পড়ল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রকিবের মা রকিব কে বিছানায় না পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো।বৃদ্ধা তার একমাত্র কলিজার টুকরাকে না পেয়ে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল।
এদিকে রকিব রাতের আঁধারে পাশের গ্রামে নাসিমের বাড়িতে মুক্তি ক্যাম্পে পৌঁছে।সেখানে গিয়ে সে নসিম, মজিদ মিয়া, মজিদ মিয়ার ছোটভাই হারুণ,প্রাইমারী স্কুলের গণিতের শিক্ষক হামিদুর রহমান সহ আরও অনেককেই দেখতে পেল।মজিদ মিয়া রকিবকেঘরে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল।সবার চোখেমুখে যেন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।কারও মা বাবা হারানোর বেদনা, কারও বা স্ত্রী সন্তান হারানোর বেদনা,কারও বা রকিবের মত স্বপ্নের রাজকন্যাকে অকালে স্বপ্নেই হারিয়ে ফেলার বেদনা।সময় এসেছে এসব অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়ার।
রকিব হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে স্টেন গানের দিকে।এই ক্যাম্পের কমান্ডার হাবিলদার রজব আলী রকিব কে কাছে ডেকে বলল
-রকিব,জয় এবার আমরা আনবোই,আমরা সবাই ওদের চাকর হয়ে ছিলাম,এবার অধিকার আদায়ের পালা।
রকিব বলল- হুম।
পরদিন থেকে রকিব ট্রেনিং শুরু করল।
জৈষ্ঠের ১৩ তারিখ।পাক বাহিনী সদর থেকে উত্তর দিকে তিন কিলোমিটার দূরে গ্রামে অভিযান চালাবে।মুক্তিক্যাম্পে গেরিলা বাহিনীর পরিকল্পনা হয়ে গেছে।
গেরিলা বাহিনীর পূর্ব দলে আছে রকিব, নসিম সহ দশজন ও নেতৃত্বে হামিদুর রহমান।তারা মাটির রাস্তার পূর্বে আধা কিলোমিটার দূরে খালের পানিতে কচুরিপানার ঝোপ দিয়ে অপেক্ষা করছে।বড় জীপের আপয়াজ শুনে,প্রথমেই হামিদের নির্দেশে জীপের সামনে গ্রেনেড ফেলল রকিব।সবাই অতর্কিত গুলি ছুড়ল।প্রথম গাড়ি জ্বলে গেল।পেছনের দুটি গাড়ি থেমে গেল।পাক সেনারা গাড়ি থেকে নেমে সামনে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগুলো।গেরিলা বাহিনীও গুলি ছুড়ছে।পাক সেনারা প্রায় কাছাকাছি দেখে রকিব হাতে গ্রেনেড নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে ছুড়ল।এতে তিন সেনা শেষ।রকিব আরও হিংস্র হয়ে স্টেন গান চালাল,এতে সামনের আরও দুই সেনা নিহত,হঠাৎ একটি গুলি রকিবের বাম পায়ে লাগে।রকিব পড়ে যায়।কিন্তু সে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়,। হাটুর উপর ভর কর আবারও গুলি চালায়। আবারও এক সেনা নিহত, অন্য সেনার পায়ে গুলি লাগে সে পেছনে দৌড় দেয়।কিন্তু গাছের আড়ালে গিয়ে আবার সে গুলি ছুড়লে তা রকিবের বুকে এসে বিঁধে।রকিবের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।কিন্তু গ্রাম টিকে সে হানাদার মুক্ত করে।
১৬ ই ডিসেম্বর,বাংলাদেশ পায় স্বাধীনতা,একটি পতাকা।কিন্তু রকিবের মা আজও ভেজা চোখে পথ চেয়ে থাকে।
এভাবেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম,যার পেছনে আছে রকিবের মার মত অনেকের সন্তান হারানোর বেদনা,অনেকের অনেক স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা,রুমির মত অনেক মা বোনের ইজ্জতের বলিদান।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now