বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ১২ঃ
।। মীনা হারকারের ডায়েরী।। ১১ সেপ্টেম্বর।।
এসে পড়েছে ইলিনা। আমি আর জোনাথন লন্ডনে গিয়ে
স্টেশন থেকে রিসিভ করেছি ওকে। বাড়ির সবচেয়ে বড়
গেস্টরুমটায় উঠেছে ও। বেশ ভাল লাগছে মেয়েটা আসায়।
হোক অল্পসময়ের জন্য, তবু তো ভাল, একজন সঙ্গী
পেলাম। জোনাথন অফিস চলে গেলে আমি তো একেবারে
একা হয়ে যাই, কথা বলবারও কেউ থাকে না। লন্ডন থেকে
এক্সেটার আসার পথে গাড়িতে একেবারেই চুপচাপ ছিল ইলিনা।
কুশল বিনিময়ের পরে খুব একটা আর কথা বলেনি। আমরা ভাবলাম -
লম্বা জার্নির কারণে ক্লান্ত বেচারি, তাছাড়া বাবার মৃত্যুর শোক
এখনো সম্ভবত কাটিয়ে উঠতে পারেনি- তাই আর বিরক্ত করিনি
ওকে। এখানে এসে বিশ্রাম আর খাওয়া দাওয়ার পর অবশ্য সতেজ
হয়ে উঠেছে ; আমাদেরকে খুলে বলেছে ওর বাবার মৃত্যুর
ঘটনা। কাঁদেনি খুব বেশী, কথাও বলেছে সহজ ভঙ্গিতে....আশা
করছি খুব শীঘ্রি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। মিঃ এমিল কোভাক্সের
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারে আলোচনাতেও চরম অনাগ্রহ লক্ষ্য
করেছি ইলিনার মধ্যে। সংক্ষেপে শুধু বলেছে, সঙ্গে
কোনও গুরুজন ছিল না বলে বাবা'র লাশটার সব দায়িত্ব সে
'যেকেলি' কৃষকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে এসেছে। যা করার
ওরাই করবে। ইলিনার কথাবার্তা শুনে মনে হলো ওখান থেকে
এক অর্থে যেন পালিয়ে এসেছে মেয়েটা....পিতার
শেষকৃত্যের ভার সামলাতে চায়নি। ওকে দোষও দিতে পারছি না
এজন্য। অল্পবয়সী একটা মেয়ে....বিদেশ বিভুঁইয়ে সম্পূর্ণ
নিঃসঙ্গ.....এই পরিস্থিতিতে ওর কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ
আশা করা যায় না। ইলিনা'কে জানিয়েছি, এখনও পর্যন্ত ওর চাচা মিঃ
আন্দ্রে কোভাক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি
আমরা। ভ্যান হেলসিং, মিঃ কোভাক্সের শেষ একটা চিঠি
পেয়েছিলেন কিছুদিন আগে - তাতে প্রফেসর কোভাক্স
লিখেছিলেন, মিকোলাসকে নিয়ে তিনি হারমানস্টাডের কাছাকাছি
এলাকা থেকে অনুসন্ধান শুরু করতে চলেছেন। ওঁরা এখন ঠিক
কোথায়, তা কেউই বলতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে
হচ্ছে, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে
প্রফেসর কোভাক্সের জন্য।
ইলিনা শুতে চলে যাবার পর পার্লারে বসেছিলাম আমি আর মিসেস
অ্যালিস সিউয়ার্ড....মানে ডাঃ সিউয়ার্ডের স্ত্রী। গল্প করার ফাঁকে
উঠে এল আমাদের নতুন অতিথির প্রসঙ্গ। ইলিনা এসে পড়ায় এবার
নিজের বাড়িতে ফিরে যাবেন অ্যালিস; বললেন, " কুইন্সি'কে
ছেড়ে যেতে হবে ভেবে খারাপ লাগছে। ইলিনা ওকে
সামলাতে পারবে কি না কে জানে!" " ওসব নিয়ে চিন্তা করবেন না
তো!" বললাম আমি, " আপনার নিজেরও তো সংসার আছে।
স্বামী সংসার ছেড়ে আর কতদিন এখানে পড়ে থাকবেন?"
মিসেস সিউয়ার্ড বললেন, " জানি। কিন্তু কুইন্সি'র জন্যও মন কেমন
করছে। ইলিনা নিজেই তো একটা বাচ্চা মেয়ে। দুঃখ কষ্টে কাতর
হয়ে আছে। তার ওপর ওর কাঁধে বাচ্চাটার দায়িত্ব চাপানো..... " "
তাতে কি!" আমি বললাম, " ইলিনা তো একা নয়, আমিও আছি এখানে।
দুজনে সামলে নিতে পারব যেভাবে পারি। আপনি এমনিতেই
যথেষ্ট করেছেন"। কথাটা জোর দিয়ে বললেও মনে মনে
একটু যে শঙ্কা অনুভব করিনি, তা নয়। মিসেস সিউয়ার্ডের ওপর
যেভাবে নির্ভর করেছি এতদিন, সেটা ইলিনার বেলায় সম্ভব হবে
না। সত্যি বলতে কি, অ্যালিস সিউয়ার্ডকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি
আমি....অত্যন্ত বিশ্বাস করি। মনে মনে তাঁকে আমি বড় বোনের
আসনে বসিয়েছি। তাঁর কাছে খুঁজে পাই অটল পাথরের মতো
অবলম্বন। উনি চলে গেলেই অবলম্বনটা হারাব আমি, খারাপ লাগাটাই
স্বাভাবিক। ১৪ সেপ্টেম্বর।।
মিসেস সিউয়ার্ড চলে গেছেন। ইলিনাও চমৎকারভাবে আমাদের
সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। কুইন্সি'র সঙ্গে ওর বেশ
খাতির হয়ে গেছে এর মধ্যে.....নিয়মিত সঙ্গ দিচ্ছে,খেলছে,
ঘুম পাড়াচ্ছে। কুইন্সি'ও ধীরেধীরে ভক্ত হয়ে উঠছে ওর।
দু'জনকে একসঙ্গে দেখতে বেশ লাগে।
আমিও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছি ইলিনার সঙ্গে। লুসি'র পর সত্যিকার অর্থে
কোনও বান্ধবী ছিল না আমার এতদিন। কিন্তু এবার বুঝি তেমন একটা
বান্ধবী পেতে চলেছি আমি। আশাবাদী হয়ে উঠছি। অবশ্য লুসি
আর ইলিনা'র মধ্যে আকাশ আর পাতালের তফাত। লুসি ছিল হাসিখুশী,
প্রাণোচ্ছল ; কিন্তু ইলিনা রীতিমতো গম্ভীর একটা মেয়ে।
তারপরেও ওর সঙ্গে কথা বলবার সময় অদ্ভুত এক আনন্দে
ছেয়ে যায় হৃদয়।
কেন এমন বোধ করি কে জানে!
১৬ সেপ্টেম্বর।।
চমৎকার একটা দিন কাটল আজ। জোনাথন অফিসে চলে গেলে
কুইন্সি'কে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আমি আর ইলিনা। আমাদের
বাড়ির খুব কাছেই রয়েছে গ্রাম্য এলাকা, সেখানে অবারিত প্রকৃতি।
আবহাওয়াও ছিল চমৎকার.... খুব গরম নয়, আবার খুব ঠান্ডাও নয়।
সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল প্রকৃতি, গাছপালার ফাঁক দিয়ে
আসছিল শরীর - মন জুড়নো হাওয়া। বুনো ঝোপঝাড়ে ফুটে
ছিল রঙবেরঙের ফুল।
গীর্জার কাছে একটা কুঁড়েঘরে থেমে চা পান করেছি আমরা,
গল্প করেছি। তারপর বাড়ি ফেরার পথে গীর্জার পাশ দিয়ে যাওয়ার
সময় হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুরোধ করে বসল ইলিনা। গীর্জা
সংলগ্ন গোরস্থানটা একবার দেখতে চায় ও। অবাক হলাম প্রথমটায়।
তারপরে ভাবলাম,বোধহয় সদ্যপ্রয়াত বাবা'র কথা ভেবেই ও
দেখতে চাইছে। ওর এই সামান্য অনুরোধ রক্ষা করায় তেমন
কোনও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু রাস্তা থেকে গোরস্থানের দিকে
তাকিয়েই দমে গেলাম। কতকাল ধরে যে জায়গাটার পরিচর্যা করা
হয় না, কে জানে! অযত্নে অবহেলায় ঘাস আর আগাছার জঙ্গল
সৃষ্টি হয়েছে ওখানে। তার মাঝ থেকে মাথা উঁচু করে
রেখেছে পুরনো পুরনো সব কবরফলকের সারি....বয়সের
ভারে কালচে রঙ ধারণ করেছে ওগুলো, গায়ে শ্যাওলার
আস্তর। গোরস্থানের পুরোটাই ছায়ায় ঢাকা...তাকালে কেমন
একটা অশুভ অনুভূতি হয়। কুইন্সি'র জন্য এমন পরিবেশ মোটেও
ভ্রমণের উপযুক্ত নয়। তাই যতটা সম্ভব ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান
করলাম ওর অনুরোধটা। ইলিনা মনে মনে মনঃক্ষুণ্ণ হলো কিন্তু
কিছু করার ছিল না আমার।
যা হোক, বাড়ি ফেরার পথে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল ও।
হাসিমুখে কথা বলল, হাঁটল চপল পায়ে। উজ্জ্বল সূর্যালোকে ওর
চেহারায় রক্তের আভা দেখতে পেলাম। ফ্যাকাসে ভাবটা
কেটে যাচ্ছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ভাল লাগল। বাবা'কে
হারানোর শোক ধীরেধীরে কাটিয়ে উঠছে মেয়েটা।
বাড়ি ফেরার পরে ঘুমোতে পাঠালাম কুইন্সিকে। কিছুতেই শুতে
যেতে চাইছিল না ও, কিন্তু ভুলিয়ে ভালিয়ে ইলিনা ঠিকই বিছানায় নিয়ে
গেল ওকে। ইলিনা যেন জাদু করেছে কুইন্সিকে; ওর কথা
কিছুতেই ফেলতে পারে না আমার ছেলে।
সন্ধেটা বেশ উপভোগ করলাম আমরা। ডিনারের পর চা নিয়ে
বারান্দায় বসেছিলাম আমি, ইলিনা আর জোনাথন। গল্প করতে
করতে উপভোগ করছিলাম সূর্যাস্ত। অস্তগামী সূর্যের ছটায়
রাঙা হয়ে উঠেছিল আমাদের বাড়ির সামনের বাগান। সেদিকে
তাকিয়ে মন ভরে গেছে অদ্ভুত এক আনন্দে।
রাতে শোয়ার জন্য যখন বিছানা ঠিকঠাক করছিলাম, তখন আমার কামরায়
এল ইলিনা। জোনাথন শুয়ে পড়লে আয়নার সামনে বসেছিলাম
দুজনে, চুল আঁচড়ে দিয়েছি একে অন্যের....ঠিক যেভাবে লুসি
আর আমি পরস্পরের চুল আঁচড়াতাম। ক্ষণিকের জন্য ফিরে
গিয়েছিলাম পুরনো সেই দিনগুলোয়। হাসিঠাট্টা আর গল্প করে
চুল আঁচড়েছি আমরা। ইলিনার চুলগুলো আমার চেয়েও বেশী
ঘন কালো....আর..... আর যেন একটু বেশীই লম্বা। যাকে
বলে দীঘল কালো চুল.....
আগে এই ব্যাপারটা তো খেয়াল করিনি! ২২ সেপ্টেম্বর।।
গত কয়েকদিন ডায়েরী লিখিনি....লেখার মতো
উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেও'নি এ ক'দিনে। আজ ডায়েরী
খুলে বসেছি স্রেফ একটা স্বপ্নের কথা লিখব বলে। যদ্দূর
সম্ভব বর্ণনা করছি পুরো ঘটনা....কল্পনার রঙ না মিশিয়ে। গত কিছুদিন
ধরে রাতে ঘুমোনোর আগে ইলিনা আর আমার--পরস্পরের
চুল বেঁধে দেয়া আর গল্প করাটা অলিখিত এক রীতিতে পরিণত
হয়েছে। গত রাতে লক্ষ্য করলাম, ওকে অন্যান্য দিনের
চাইতে যেন বেশী সুন্দর লাগছে, গালে গোলাপি আভা। চুল
আঁচড়ানোর ফাঁকে ও হঠাৎ আমার হাত ধরে বলল, " মাদাম মীনা!
আমি যে আপনার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব
না। এখানে আশ্রয় দিয়ে আমার বিরাট উপকার করেছেন আপনি,
সুখী করে তুলেছেন আমাকে। কারণ এই বাড়িতে আমি
স্বাধীন.... আগে কোনওদিন এমন স্বাধীনতা পাইনি আমি"। কথাটা
বলেই আমায় জড়িয়ে ধরল ও, চুমু খেল আমার গাল আর ঘাড়ে।
চমকে উঠলাম, ওর এই আবেগটা ঠিক স্বাভাবিক মনে হলো না।
ভদ্রভাবে ওর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম আমি।
বললাম, " এভাবে বোলো না ইলিনা। তুমি এখানে আসায় আমরাও খুব
খুশি....তোমার মতো একজন সঙ্গীরই দরকার ছিল কুইন্সি'র।
যতদিন খুশী এখানে থাকতে পারো, আমাদের কোনও আপত্তি
নেই। চাইলে পাকাপাকিভাবেও থেকে যেতে পারো....মানে,
তোমার চাচা যদি রাজি হ'ন, আর কি। এখন তো উনিই তোমার
অভিভাবক। আমাদের দরজা তোমার জন্য সবসময়েই খোলা
থাকবে। " এ'কথা শুনে চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে শুরু করল
ইলিনার। সুন্দর মুখশ্রী আরও সুন্দর দেখাল ক্রন্দনরত অবস্থায়।
আমাকে বারবার ধন্যবাদ জানাল ও। শেষ পর্যন্ত আমি যখন বিছানায়
শুতে এলাম, জোনাথন তখন ঘুমিয়ে পড়েছে....সারাদিনের
পরিশ্রমে ক্লান্ত সে। জাগালাম না ওকে, তার বদলে বালিশে মাথা
রেখে এটা সেটা ভাবতে লাগলাম। ঘুম আসছিল না কেন যেন।
হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠলাম। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না কিন্তু
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করলাম কিসের যেন উপস্থিতি। বাদুড় বা
পাখি জাতীয় কিছু....পরিষ্কার শুনলাম ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
জোনাথনের মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখলাম
না....একেবারে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে। ব্যাপারটা আমার মনের
ভুল বলে সন্দেহ হলো, উঠে বসলাম, স্থির হয়ে রইলাম
কিছুক্ষণ। কিন্তু না, আবার শোনা গেল সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now