বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
মাহিনের অভ্যাস ছিল রাতজাগা। তবে সে অন্যদের মতো পরীক্ষার পড়া বা অফিসের কাজ করার জন্য রাত জাগত না। তার রাতগুলো গ্রাস করে নিয়েছিল একটি অদৃশ্য নেশা—স্মার্টফোন।
বিছানায় শুয়ে ঘুম আসতে না আসতেই হাতের কাছে ফোনটা যেন জেগে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীল আলো, টিকটকের পর টিকটক, রিলসের পর রিলস, এক ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা। মাঝে মাঝে সে ভাবে—“আজ আর দশ মিনিট, তারপর ফোনটা রেখে ঘুমাবো।” কিন্তু সেই দশ মিনিট রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যায়।
প্রথম দিকে সে নিজেই বুঝতে পারত না, কেমন ধীরে ধীরে তার জীবনের ছন্দ বদলে যাচ্ছে। সকালের ক্লাসে চোখ লাল হয়ে থাকত, দৃষ্টি ঝাপসা, মনোযোগ শূন্য। শিক্ষক প্রশ্ন করলে মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে যেত, উত্তর খুঁজে পেত না। বন্ধুরা মজা করে বলত, “তুই রাতজাগা প্রজাপতি।” সে হাসি দিয়ে এড়িয়ে যেত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারও খারাপ লাগত।
একদিন বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে সে রাস্তায় বসে পড়ল। পাশ দিয়ে যাওয়া লোকজন সাহায্য করে তাকে টেনে তুলল। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার চশমা নামিয়ে চোখে তাকিয়ে বললেন,
—“তুমি কি রাতজেগে বেশি ফোন ব্যবহার করো?”
মাহিন লজ্জায় মাথা নিচু করল।
—“হ্যাঁ, স্যার… মাঝে মাঝে।”
ডাক্তার হেসে উঠলেন, “মাঝে মাঝে নয়, প্রতিরাতে। তাই তো তোমার চোখ শুকিয়ে যাচ্ছে, মাথাব্যথা হচ্ছে। ব্লু লাইটের প্রভাব এতটা ভয়ংকর হতে পারে, জানো?”
মাহিন কিছুই বলতে পারল না। ডাক্তার আরও যোগ করলেন,
—“তুমি শুধু চোখই নয়, পুরো শরীরকেই ধ্বংস করছো। ঘুম কম হলে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়। তাই তোমার মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠছে। উদ্বেগ আর হতাশা ঘিরে ধরছে। এভাবে চলতে থাকলে ডিপ্রেশন কিংবা হৃদরোগ—সবকিছুর ঝুঁকিতে পড়বে।”
বাড়ি ফিরে মায়ের মুখটা মনে পড়ল। মা প্রায়ই বলতেন, “বাবা, সারারাত ফোনে কী করিস? সকালে চোখ লাল হয়ে থাকে কেন? বইটা তোকে ডাক দেয় না?” তখন সে রেগে যেত, মনে হতো মা তাকে বুঝতে পারেন না। কিন্তু সেদিন ডাক্তাররুম থেকে বের হয়ে আসার পর হঠাৎ করেই মায়ের কণ্ঠস্বর কানে বাজল। মনে হলো মা-ই বুঝতেন সব, শুধু সে নিজেই বোঝেনি।
পরের দিন কলেজে গিয়ে সে খেয়াল করল, বন্ধুরা যখন গল্প করছে, হাসছে, সে তখন চুপচাপ। কারণ তার ভেতর আনন্দ নেই, শক্তি নেই। ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, কিন্তু সে মনোযোগ দিতে পারছে না। মাথা ঝিমঝিম করছে, হাই উঠছে বারবার। সে জানে এর সবই রাতজাগা ফোন ব্যবহারের ফল।
দিনগুলো এভাবেই চলতে থাকে। শরীর দুর্বল হতে থাকে, চোখের তলায় কালি জমে যায়, মনের ভেতর সবসময় অস্থিরতা। এক রাতে ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ ভেতরে ভয় জাগল। সে দেখল, তার নিজের জীবনটা আস্তে আস্তে কেবল পর্দার আলোয় গিলে নিচ্ছে। ফোনের ভেতরের দুনিয়া যেন তাকে কুয়াশার ভেতরে আটকে ফেলছে।
মাহিন ফোনটা নামিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখে তাকিয়ে দেখল ক্লান্ত, নিস্তেজ একটা চেহারা। তার ভেতর থেকে এক অচেনা কণ্ঠ বলল,
—“এভাবেই চললে তুমি অচিরেই এক জীবন্ত মৃত মানুষে পরিণত হবে।”
সেদিন থেকে সে চেষ্টা শুরু করল। রাতের অন্ধকারে ফোনকে আর সঙ্গী না করে বই হাতে নিল, ডায়েরি লিখল। প্রথম কয়েক রাত ভীষণ কঠিন লাগল, ফোনটা হাতছাড়া করতে পারছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, আসল আলো ফোনের স্ক্রিনে নয়, জীবনের ভেতরেই জ্বলে।
কয়েক মাস পর তার চেহারা পাল্টে গেল। চোখের তলার কালি মিলিয়ে গেল, মুখে হাসি ফুটল। পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ল, বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগতে শুরু করল। মা-ও খুশি হলেন।
মাহিন শিখে গেল, রাতজাগা প্রজাপতির মতো ঝলমলে আলোয় ডানা মেলে উড়তে গিয়ে যদি সেই আলোই আগুন হয়ে যায়, তবে ডানাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর জীবন তো শুধু স্ক্রল করা রিলস নয়—এ জীবন হলো হাসি, ভালোবাসা আর নিজের স্বপ্নগুলোকে পূর্ণ করার এক চিরন্তন যাত্রা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now