বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রাহাপ্পুঃ লাভ এট ফার্স্ট সাইট

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রাহাপ্পুঃ লাভ এট ফার্স্ট সাইট (শুভ্র-শৈল্পী ) সুজানা আবেদীন সোনালী "কতদিন কেটে গেল তোমায় না দেখে, কতরাত পার হল তোমায় পাশে না পেয়ে.. মাঝে মাঝে মনে হয় যদি দেখাতে পারতাম, কত ভালোবাসি তোমাকে! যেদিকে তাকাই সেদিকে দেখি, তোমার সেই প্রতিচ্ছবি। মনে পড়ে যায় মেইন স্ট্রিটে প্রথম ভালোবেসে ছিলাম তোমায়...." চারপাশে ইটরঙা লাল দেয়ালের একটা ঘর। ছিমছাম সাধারণ একটা বিছানা। ওতে ফুলতোলা চাদর। বাচ্চাদের দুই একটা খেলনা। ধারাপাতের বই। বিছানার পাশে বেশ বড় একটা বুকসেলফ। সেলফভর্তি দেশী বিদেশী লেখকদের বই। তারপর জানালা। চেয়ারসহ একটা পড়ার টেবিল। তাতে আধ গ্লাস পানি। ল্যাপটপ। একটা সেলফোন। স্ক্রীনে হাসিখুশী এক তরুণী আর কিশোরীর ছবি। দু'জনের চেহারায় কোথায় যেন সূক্ষ্ম একটা মিল আছে। হঠাৎ স্ক্রীনের উপর কার যেন ছায়া পড়ল। কেউ একজন ঝুঁকে আছে ফোনের উপর। এক তরুণী। গান বাজতে থাকা সেলফোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে, হাতে থাকা ডায়েরীর প্যাকেটটা খুললো সে। স্ক্রীনের সেই কিশোরী। এখন অবশ্য অনেকটাই পরিণত সে। ছবির সেই কিশোরীটি আর নেই। রুক্ষতা ফুটে আছে চেহারায়। খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাসে তার এলোমেলো চুলগুলো বারবার মুখের উপর এসে পড়ছে। চোখে খোঁচা দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং সে ধীরেসুস্থে নিজের কাজ করে চলেছে। শান্ত হাতে ডায়েরীটা বের করে, ড্রয়ার থেকে একটা কলম তুলে নিয়ে লিখতে শুরু করেছে কিছু একটা। পুরো মনযোগ দিয়ে। দৃষ্টিতে কত শত আবেগ জমছে এখন! একে একে উঁকি দিচ্ছে স্মৃতিরা।......... *** ...Yay she is the one She is that one of a kind, She is in my dreams In my soul In my mind! In spite she is so close she is so far away! Yay she is the one she is that one of a kind.. প্রিয় ডায়েরী, ওকে আমি কখনওই ভুলিনি। ক..খ..ন..ও..ই না। তবু জানো আজকাল খুব মনে পড়ে? ছোট্ট রাশাকে দেখলে তো রীতিমতো বুকে ধাক্কার মতো লাগে! দম আটকে আসে অবিশ্বাসে। মনে হয়, সে ছোট্ট হয়ে আমার কোলে ফিরে এসেছে! এবার বাঁধন শক্ত করার পালা আমার। কিংবা হয়ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিচ্ছে নতুন করে! যা তখন বয়সের ধাঁধাঁয় পালন করতে পারিনি, তা যাতে এবার অন্তত ফাঁকি দেয়ার অজুহাতে না হারাই.. তাই হয়ত! প্রকৃতি বড্ড নিষ্ঠুর। তাই না? না, আমি তাকে কখনওই ভুলিনি। শুধু আজকাল একটু বেশী মনে পড়ে। বেশী ভাবি তার কথা! একটু বেশী.. তাকে ভাবলে আমার প্রথম যে সেনটেন্স মনে পড়ে তা হচ্ছে, "লাভ এট ফার্স্ট সাইট"! সত্যি। আমি চোখ খোলার পর, প্রথমে আব্বুই কিংবা আম্মুনিকে দেখিনি। এমনকি নিষ্ঠুর ভাবে পিঠ চাপড়ানো ডাক্তারকেও নয়। দেখেছিলাম তাকে। বড় বড় চোখের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা একটা মেয়ে। টুকটুকে লালরঙা ঢাউস সাইজের টাওয়েল দিয়ে প্রাণপণে পেঁচিয়ে ধরে আছে আমাকে। বিড়বিড় করে বলছে, " এটা আমার মুনি। এটা আমার মুনি!" আর কিছুক্ষন পরপর ভয়ার্ত চোখে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছে ছোট্ট তুলতুলে আমি তার আঁকড়ে রাখা বাঁধনে আছি কীনা! অদৃশ্য কোন ফাঁক গলে ধরনী ভ্রমণে চলে যাইনি তো আবার? পুচকে আমি, তার এমন উঁকিঝুঁকি দেখে হুট করেই ভালবেসে ফেলেছিলাম। লাভ এট ফার্স্ট সাইট তো একেই বলে। তাই না? এরপর একে একে দিনগুলো পেরুলো। আমি তাকে ধরে বসতে শিখলাম। হামাগুড়ি দিতে শিখলাম। প্রথম শব্দ বলতে শিখলাম। ভাবছো স্বাভাবিক কোন শব্দ ছিল সেটা? অন্য আর পাঁচ দশটা বাচ্চার মতো? "মা" কিংবা "বাবা"? কিংবা বুবু? নাহ! আমার উচ্চারিত প্রথম শব্দ ছিলো "রাহাপ্পু"! বড় আপু, বপ্পু, বুবু কোনটাই নয়। রাহাপ্পু! কত্তো শক্ত একটা শব্দ! অথচ আমি নাকী অনায়াসেই উচ্চারণ করেছিলাম! এক বিকেলে আম্মুনির বকা শুনে কাঁদতে থাকা কৈশোরের পথে পা বাড়ানো মেয়েটার লম্বা চুল আঁকড়ে ধরে বললাম, "রাহাপ্পুুউউ.." অবাক কান্ড! মেয়েটা তক্ষুনি ফিক করে হেসে ফেলল। চোখ মুছতে মুছতে বলল, "তুই একটা দুষ্টু মুনি তো!" ঠিক তখনই আমি তার কান্নাভেজা হাসি হাসি চোখগুলোর প্রেমে পড়ে গেলাম। ছুঁয়ে দিতে গেলাম সেগুলো কাঁপা হাতে। ফলাফল বেচারীর আরেক দফা কান্না! আর আমি গালে দুই আঙুল পুরে, তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দেখতে লাগলাম। লাল চোখেও সে কত্তো সুন্দর! লাভ এট ফার্স্ট সাইট তখন অবসেশনে পরিণত হচ্ছিল বোধহয়। বাড়ছিলো ক্রমাগতভাবে! তারপর সেই লাল টুকটুকে টাওয়েল পেঁচানো মেয়েটি বড় হলো। ফ্রক ছেড়ে ধরলো সালোয়ার কামিজ। আর হাল ফ্যাশনের ফ্লোরটাচ স্কার্ট। মাঝে মাঝে শখ করে শাড়িও পরে! কিন্তু তাকে "মুনি" বলে আঁকড়ে ধরে থাকা হাতজোড়া তখনও তাদের কাজ ভোলেনি! ঝড়ো বাতাসে ওড়া আঁচল যেমন পাকা হাতে সামলেছে, তেমনি আমাকে সামলে রাখা বাঁধনটাও একচুল আলগা হতে দেয়নি। বরং আরও শক্ত করেছে। খালি চোখে হয়ত দেখতে পাবে না কেউ! কিন্তু আঁকড়ে ধরা টানটা আমি ঠিকই টের পাই। মাঝে মাঝে বেয়াড়া টিনেজারদের মতো মাথার উপর হাত ছুঁড়ি। চেঁচিয়ে বলি, "আমি বড় হয়েছি, রাহাপ্পু! গিভ মি সাম ফ্রিডম!" রাহাপ্পুর সেই একই ভঙ্গী। একই উত্তর। "শশশশ.. তুই এখনো ছোট্ট! আমার বাচ্চা মুনি! পড়ে গেলে যদি ব্যাথা পাস?" এরপর আমার সুন্দর করে আঁচড়ানো চুলগুলোর এলোমেলো হওয়া। সব একই। আর কিছু বলার থাকে? এভাবে প্রেম বেড়ে যায়। বাড়তেই থাকে। সব ঠিকঠাক চলে। আগের মতো। এক নিয়মে। কিন্তু জীবনের পথ সবসময় মসৃণ হতে হবে, এমন তো কথা নেই। ছিল না কখনও। তাই না? চড়াই উৎরাই আসবেই। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কখনওবা বড্ড নিষ্ঠুর হয়ে পড়েন। কিংবা নিজের অজান্তেই আমাদের পরীক্ষাগুলো অসম্ভব করে ফেলেন কোন ইঙ্গিত দেয়া ছাড়াই! আর আমরা ফেল করি তখন, অমনোযোগী ছাত্রের মতন। একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে শুনি, রাহাপ্পুকে বরপক্ষ দেখতে আসবে। পছন্দ হলে আজই বিয়ে। তাই চারপাশে সাজ সাজ রব। আম্মুনি মামীদের নিয়ে সোৎসাহে পিঠা বানাচ্ছেন। কত রং ঢঙের পিঠা! আব্বুই ছুটাছুটি করে এটা সেটা কিনে আনছেন। অকারণেই শব্দ করে কথা বলছেন। তার মুখের হাসি থামছেই না! আমি বুঝলাম না, কেন এত আনন্দ করবে কেউ? বিয়ে মানে তো একটা মেয়ের চলে যাওয়া। পুরোনো পরিবেশ, সম্পর্ক, ভালবাসা এমনকি নিজ স্বত্বাকেও পেছনে ফেলে নতুন কোন এক জীবনের পথে পা বাড়ানো! নতুন নতুন মানুষদের সাথে। তারা বন্ধুভাবাপন্ন নাও হতে পারে! সহযোগীতা নাও করতে পারে! পদে পদে আঘাতও করতে পারে! তাহলে এত আনন্দ কীসের? কী ভেবে? এত হৈ হুল্লোড় করে বিয়ে দেয়া, আবার বিদায়মূহুর্তে মরাকান্না করা! এ ন্যাকামো, তাই নয় কি? গত বছর এলাকার এক আপুর বিয়েতে তো তাই হয়েছিল! আনন্দ উল্লাস করে সাজিয়ে গুছিয়ে আপুটাকে এক বিতিকিচ্ছিরি টাকলু লোকের হাতে তুলে দিলো সবাই মিলে। তারপর কান্না করল! অদ্ভুত নিয়ম, তাই না? শুনলাম বিয়ের পর নাকী মেয়েদের নামও বদলে যায়! তাহলে তার নিজের কী থাকে? কিচ্ছু না! একদমই কিচ্ছু না! সব ভাবনা এক পাশে ঠেলে, রাহাপ্পুর ঘরের দিকে ছুটে গেলাম। কী করছে আমার বোনটা? কীভাবে নিচ্ছে এসব? দরজার বাহির থেকেই দেখলাম, ও জানালার পাশে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে। আমাদের দু' বোনের প্রিয় জায়গাটায়। যেখানটায় বসে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিই। গল্প করি। সেই জায়গাটায় বসে রাহাপ্পু। তার চোখে কেমন শূণ্য আর ভরসা হারানো দৃষ্টি! পায়ে পায়ে এগিয়ে পাশে গিয়ে বসলাম। অদ্ভুত একটা রাগ জন্মাচ্ছিল ভেতরে। মনে হচ্ছিল, সব ভেঙেচুরে ফেলি। এই রাহাপ্পুকে তো আমি চিনি না! আমার রাহাপ্পু এক লড়াকু মেয়ে। এভাবে হতাশ হয়ে বসে থাকার পাত্রী নয়! তাহলে? কেন ও চুপচাপ সব মেনে নিচ্ছে? কেন লড়ছে না? মেয়েদের কি লড়তে নেই? নাকী ও পারিবারিক আবেগের সুতোয় বাঁধা পড়েছে? "রাহাপ্পু.." রাহাপ্পু চমকে তাকালো আমার দিকে। তার গালে কান্নার শুকনো দাগ। মৃদু হেসে বলল, "আমার তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছেরে, মুনি! তারপর সোজা বিলেত! তোকে আর ঝাড়ি দেয়া হবে না।" আমি তার ব্যর্থ কৌতুকে একদম কান দিলাম না। বরং তিক্ত গলায় জানতে চাইলাম, "অরণ্যদার কথা কেন বলছ না বাবাকে?" রাহাপ্পু আবার চমকালো। এবারের চমকের রেশ অনেকক্ষণ ধরে রয়ে গেলো তার চোখে মুখে। কয়েকবার মুখ খুলেও কিছু বলতে পারল না। যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না সে! অনেক চেষ্টার পর বলল, "তোকে ক্কে... বলেছে..." "আমি সেই ছোট্টটি নই, রাহাপ্পু। সব বুঝি। দেখি। টের পাই। হয়ত সারাক্ষণ বইয়ের পাতায় ডুবে থাকি। কিন্তু ঠিকই সব খবর রাখি আমি! অবজার্ভ করি, কীভাবে তোমরা একজন অন্যজনের দিকে তাকাও! কথা বলো, হাসো, মজা করো। সওব আমি দেখি।" "তুই বুঝতে পারছিস না, মুনি। এটা ভালবাসা নয়.." "তুমি বুঝতে পারছো না, রাহাপ্পু! ভালবাসা বা মুগ্ধতা পাপ নয়। বরং এগুলো না থাকাটা পাপ! প্রকৃতি যে মেয়েটাকে এত মায়া দিয়েছে, সে মেয়ে মায়াটা নিজের মাঝে চেপে লুকিয়ে রাখবে এটা কি ঠিক?" রাহাপ্পু আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। কেমন যেন অন্যমনস্ক ভাবে বলল, "পাত্র বাবার খুব পছন্দ। আমি মেনে নিয়েছি। এটা আমার ডিসিশন। আশা করি বাধ সাধবি না!" "কিন্তু অরণ্যদার কথা ভাবো একবার। তুমি তাকে ঠকাচ্ছো না? আচ্ছা.. অন্তত আমার কথা ভাবো! আমি তোমাকে ছাড়া কী করব? কীভাবে ম্যানেজ করব সব? পড়ে যাবো না? আর পাড়ার সেই শুভ্র বখাটে? ওকে ঠ্যাংগাবে কে? আমি তো.." "না। পড়বি না। মাত্রই তো বললি, তুই সেই ছোট্টটি নস! তাহলে আবার এই কথা কেন? আর যদি পড়িস ই, নিজে নিজে উঠতে শিখবি! আমি যেমনটা শিখেছিলাম। শুভ্র বখাটেও তখন পাত্তা পাবে না।" কথাটুকু বলেই রাহাপ্পু উঠে চলে গেলো। আমি বিধ্বস্তের মতো বসে রইলাম সে জানালার পাশে। আমাদের দু' বোনের প্রিয় জায়গাটায়। একা। পরাজিত। বিধ্বস্ত। ঘরের দরজা আটকে দিয়ে বালিশে মুখ চেপে গলা ভেঙ্গে যাওয়া পর্যন্ত চেঁচালাম। চেঁচাতে থাকলাম। চেঁচাতেই থাকলাম.. রাহাপ্পুর সেদিনই বিয়ে হয়ে গেলো। ঘরোয়া আয়োজনে। পাড়ার দুই একজন মুরুব্বী আর বাঘা সব আত্মীয়দের উপস্থিতিতে। অরণ্যদা কিছুই জানলো না! রাহাপ্পু জানায়নি। কিংবা জানার কোন উপায় রাখেনি মানুষটার জন্য! যাইহোক, পরদিন দেশ ছাড়লো রাহাপ্পু। তার জীবনের নতুন মানুষগুলোকে নিয়ে। নতুন সম্পর্কের দোহাইয়ে, নতুন নতুন স্বপ্নের খোঁজে। পেছনে পড়ে রইলাম আমি। বিধ্বস্ত। ক্লান্ত। শূণ্য। সম্পর্কহীন। ভেতরে অসম্ভব যন্ত্রণা। চাপা কষ্ট। বুঝলাম, আমার লাভ এট ফার্স্ট সাইট এখন অতীত। কোথায় যেন সুর কেটে গেছে সম্পর্কের! বদলে গেছে সব। এক নিমেষের ব্যবধানে সতেরো বছরের সম্পর্ক এখন আর নেই! ভেঙ্গে গেছে বালির প্রাসাদের মতো। আমি একা। রাহাপ্পুর মুনি নই আর। সে আমার মালিকানায় অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এরপরের তিন বছর রাহাপ্পুকে দেখিনি আমি কিংবা আমরা কেউই। তীব্র অভিমানের ফাঁদে পড়ে কথাও বলিনি আর! বরং ওর শত চেষ্টাগুলোকে ব্যর্থ করে এড়িয়ে গেছি। অদ্ভুত আবেগ আমার। তাই না? আসলে কেমন যেন থমকে গিয়েছিলাম সেই সময়টাতে! যখন রাহাপ্পু একা রেখে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই হয়ত থেমে গেছি। হাহ! আমি যে আমার প্রাণটাই খুঁজে পাই না আজকাল! বখাটে শুভ্র কিংবা তার বন্ধুরা কেউই আমার ছায়া মাড়ায় না এখন। এড়িয়ে চলে। মুখোমুখি হয় না আর। তবে ঘর ছেড়ে বেরুলে ঠিকই টের পাই, দূর থেকে শুভ্র আমাকে দেখছে। সতর্ক চোখে মাপছে গতিবিধি। ওর অভিব্যক্তি বুঝি আমি। অবাক হয়ে বারবার আবিষ্কার করি, ওকে এখন অরণ্যদার মতো লাগে দেখতে। সেই তাকানোর ভঙ্গী। দাঁড়িয়ে অপলক দেখা। চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা চাপা আবেগ। সীমাহীন মুগ্ধতা! যেমনটা রাহাপ্পুর দিকে তাকালে অরণ্যদার চেহারায় ফুটত! সেই অরণ্যদা! যাকে রাহাপ্পুর নতুন জন্মের পর কেউ আর দেখেনি! কেউ না! এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর একদিন আর সহ্য হলো না আমার। হনহন করে হেঁটে তার লম্বা কাঠামোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেবেছিলাম ও চমকে যাবে। কিন্তু কে জানত, ছেলেটার নার্ভ আমার চেয়ে শক্ত? রাগ বেড়ে গেলো আমার। চেঁচিয়ে জানতে চাইলাম, "কেন? কোত্থেকে পাও এত শক্তি প্রতিদিন? কেন একা ছাড়ছো না আমাকে?" শুভ্র এক পলক আমার দিকে তাকালো। ধীর হাতে নিজের এলোমেলো চুলগুলোকে আরও এলোমেলো করে দিয়ে বলল, "ভালবাসি!" আমার রাগ ততক্ষণে পুরোটাই পড়ে গেছে। এমন একটা উত্তর ই তো ভেবেছিলাম আমি। আশা করেছিলাম। মনে মনে জেনেছিলাম! কিন্তু এভাবে মুখের উপর সেটা পেয়ে যাব, কে জানত? কেমন যেন মিইয়ে গেলাম। ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করলাম, "কেন?" "কারণ গত সাত বছর ধরে তোমাকে ভালবাসা ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখিনা আমি, শৈল্পী!" তারপর সে আলতো করে আমার গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল, "আবেগ চেপে রাখতে নেই। তা সে যেমন আবেগই হোক না কেন! কাঁদো। চেঁচাও। যা ইচ্ছে করো। তবু মনটা হালকা রেখো। ভারী মন কখনও সুস্থতা বহন করে না, বালিকা!" আমি আর কিছু বললাম না। খুঁজেই পেলাম না বলার মতো কোন শব্দ! প্রিয় ডায়েরী, ভাবছো এখান থেকে আমাদের সম্পর্কটা হয়েই গেলো? জোর প্রেম শুরু হয়ে গেলো দু'জনের মাঝে? আমরা স্বাভাবিক প্রেমিক প্রেমিকার মতো হাত ধরাধরি করে বৃষ্টি কিংবা ফুচকাবিলাস করতে লাগলাম? ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম ধানমন্ডি লেক আর রমনা পার্কে? নাহ! আমরা ওসব কিছুই করিনি। তবে মাঝে মাঝে বিষণ্ণ বিকেলগুলোতে যখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে আকাশ পাতাল ভাবি, তখন অত্যন্ত স্বস্তির সাথে টের পাই আমি একা নই। আরেকটা স্বত্বা ঠিক আমার পাশেই চুপচাপ বসে আছে। নীরবতার সঙ্গী হচ্ছে। নিঃশব্দ স্বান্তনা যোগাচ্ছে। ভাবনার ঘোড়া সব তখন নিশ্চিন্তে দৌড়ে বেড়াতে থাকে। আমি চোখ বুজে দেখি তাদের। বিকেলের শেষ রোদটুকু মরে যাওয়া পর্যন্ত। তারপর আমার মনের মধ্যে জেঁকে থাকা আঁধার আকাশেও ঘনায়। ধীরে ধীরে। নিজের ছায়া অদৃশ্য হওয়ার পরে ঘরে ফিরি আমি। কিন্তু দ্বিতীয় ছায়াটা তখনও পিছু ছাড়ে না! নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দে জানান দেয়, আমাকে ভালবাসা ছাড়া সত্যিই আর কোন বিকল্প দেখে না সে! একে কি শুধু সম্পর্ক বা প্রেম বলে অপমান করার অধিকার আছে আমার? বলো তো এতটা অন্যায্য সাহস করা কি আমার উচিৎ? শুভ্রর মুখোমুখি হওয়ার কিছুদিন পর ভয়ংকর অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটলো। আমার প্রাক্তন ভালবাসা ফিরে এলো তার পুরোনো ঠিকানায়। অভিমানের খোলসে আটকে পড়া আমি হয়ত চাইনি ও ফিরুক। কিন্তু মনের কোন এক লুকোনো কোণে ঠিকই প্রার্থনা ছিলো ওর ফেরার। আরেকবার চোখের সামনে প্রিয় মুখটা দেখার। ছুঁয়ে দিয়ে নতুন করে প্রেমে পড়ার। লাভ এট ফার্স্ট সাইট, রিমেম্বার? তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো তার অস্পষ্ট ছায়াটাকে দেখলাম। জানালার পাশে ক্লান্ত ভঙ্গীতে বসেছিল সে। আমাদের দু' বোনের প্রিয় জায়গায়। যেখানটায় ও চলে যাওয়ার পর আর কখনও বসিনি আমি। কক্ষনো না। ভেবেছিলাম শীতল থাকব তার সামনে। বুঝিয়ে দিবো আমি এখন বড় হয়েছি। একা সব করতে পারি। তার মুনি নই আর। সে আমার রাহাপ্পু নয়। কিছুই নয়। কোন অর্থ বহন করে না তার উপস্থিতি! তাকে অন্তত আর দরকার নেই আমার! কিন্তু যখন সে হুড়মুড় করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে চীৎকার করে কাঁদতে লাগলো, তখন আর পারলাম না। গত তিন বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা আবেগরোধী খোলসটা আমার, মূহুর্তের ব্যবধানে ভেঙ্গে চুরমার গেলো! শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাম তাকে। ফিসফিসিয়ে বললাম, "আমার রাহাপ্পু। আমার রাহাপ্পু!" প্রায় দেড় ঘন্টা পর ঘর থেকে ছুটে বের হলাম। পেছন থেকে আম্মুনি আব্বুই হয়ত চেঁচাচ্ছে। একটুও শুনতে পাইনি। অদ্ভুত এক ঘোরে ছিলাম। রাগে সারা গা কাঁপছে আমার। কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। সব ঝাপসা। অস্পষ্ট। বলতে পারব না কীভাবে শুভ্রদের বাসায় গিয়ে পৌঁছালাম! দরজা নক করার আগেই সে ছুটে বের হলো। জানি না কীভাবে টের পেলো ছেলেটা! কোন ধারনা নেই। শুভ্র আমাকে শক্ত হাতে ধরে ছাদে নিয়ে গেলো। রেলিং এ বসিয়ে দিলো সাবধানে। তখনও শক্ত করেই ধরে রেখেছে আমার হাতজোড়া। যেন ছেড়ে দিলেই অদৃশ্য হয়ে যাব চিরদিনের জন্য! খুঁজে পাবে না আর! "ঐ... ঐ জানোয়ারের বাচ্চাটা... দুই দুই বার এবোরশন করিয়েছে রাহাপ্পুর! তার আর তার ফ্যামিলির নাকী ছেলে চাই! এবারও করতে চায়। কত্তো বড় সাহস তার! ভাবতে পারো?" শুভ্র আমার হাতে মৃদু চাপ বাড়ালো। বুঝিয়ে দিলো সে শুনছে। আমি আমাদের হাতের দিকে এক পলক তাকালাম। পরম নিশ্চয়তা টের পাচ্ছি ওর উপস্থিতিতে। "রাহাপ্পুর এবারের প্র্যাগনেন্সিতে অনেক কমপ্লিকেশন আছে। হয়ত আগের দু' বারের জন্য। তবু রাহাপ্পু এই বেবি চায়। আমি ওর মেন্টাল কন্ডিশন দেখেছি। ও অলরেডি অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে! এদিকে চাচারা বাবাকে ফুঁসলাচ্ছে রাহাপ্পুকে ওর হাজবেন্ডের কাছেই..." "অন্যরা কী চায় সেটা কোন অর্থ বহন করে না, শৈল্পী। এখানে অর্থবহ হচ্ছে তুমি আর তোমার বোন কী চাও?" "ওকে আমি ঐ ইলিগ্যাল বাচ্চা জানোয়ারের হাতে আর ছাড়ব না।" এক মূহুর্ত দ্বিধা না করে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম। অনেকটাই সামলে উঠেছি এতক্ষণে। "গুড। তাহলে তোমার ঐ ইলিগ্যাল বাচ্চা জানোয়ারটা আর এই এলাকার ছায়ায়ও ঘেঁষতে পারছে না। সেই চেষ্টা করলে পা হারাবে।" আমি কিছুটা থতমত খেয়ে শুভ্রর দিকে তাকালাম। ওর চেহারায় অদ্ভুত কাঠিন্য। সেখানে রাগ আছে। ঘেণ্ণা আছে। আর আছে নিষ্ঠুরতা। শুভ্র তার বখাটে রুপে ফিরে যাচ্ছে! ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো আমার। "তোমাকে হারাতে চাই না। এটা শুধু মাথায় রেখো।" এটুকু বলেই নিজের পথে পা বাড়ালাম। রাহাপ্পুর এখন আমাকে ভীষণ দরকার যে! এরপর বেশ কিছুদিন খুব কঠিন সময় গেছে আমাদের। প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের তেড়চা দৃষ্টি, হুল ফোটানো প্রশ্ন। আব্বুইর অক্ষম ক্রোধের চাপা প্রকাশ। অনুশোচিত ব্যর্থ চাহনি। আম্মুনির অসহায় মুখ। শুভ্রর রাগী চেহারা। আমাকে দেয়া স্বান্তনা। আর রাহাপ্পুর চাপা কান্না। প্রতি রাতে ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম, রাহাপ্পু জানালার পাশটায় বসে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে। তার কান্নার শব্দে আমারও চোখ ভিজে আসত। প্রাণপণে নিজেকে সামলে তাকে জড়িয়ে ধরতাম। সে বিড়বিড় করে তখন বলতো, "আমার কষ্ট হচ্ছে, মুনি। আমার ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে!" এভাবে দিনগুলো কাটছিলো। শত কষ্টের মাঝে একটাই স্বান্তনা ছিলো, চোখের সামনে রাহাপ্পুর উপস্থিতি। হোক সে পুরোনো বোনটা নয়। তবু.. রাহাপ্পু তো! কিন্তু তারপর এলো সেই কালো দিন। যেদিন আমি আরেকবার প্রাণশূন্য হলাম। হয়তবা চিরদিনের জন্য! রাহাপ্পু ফিরে আসার মাস দু'য়েক পরের কথা। কিছু ক্লাসনোট গুছাচ্ছিলাম আমি। এক ফ্রেন্ড কালেক্ট করে দিয়েছিলাম। অনেকদিন ক্লাস না করার ফলাফল! তখন শেষ বিকেল। রাহাপ্পুর ওষুধের সময় হয়ে আসছিলো দেখে তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সারছিলাম। হঠাৎ রাস্তার দিক থেকে একটা চেঁচামেচির শব্দ কানে এলো। কৌতুহলী হয়ে ছুটে গেলাম। কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছিল ভেতরে। সেই সকাল থেকেই। সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে দেখি আমাদের বাড়ির সামনে বড়সড়ো একটা ভিড় জমে গেছে! অবাক হলাম। কী হচ্ছে এখানে? আমাদের এই শান্ত এলাকায় আগে কখনও তো এমন ভিড় জমেনি! এমনকি সেবার এক সাপুড়ে যখন সাপের খেলা দেখাতে এসেছিল তখনও নয়! তবে কী এমন ঘটছে এখন.... ভাবনাটা সম্পূর্ণ করার আগেই ভিড়ের কেন্দ্র দেখতে পেলাম। অরণ্যদা! এতদিন পর কোত্থেকে এলো এই লোক? কেমন বিধ্বস্ত আর হতচ্ছাড়া দেখাচ্ছে তাকে! মুখভর্তি দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। মনে হচ্ছে কোথাও থেকে আসা শরণার্থী। অরণ্যদার সামনে রাহাপ্পুর জানোয়ার হাজবেন্ড শাহেদ চৌধুরী। হাতাহাতি চলছে তাদের মাঝে। অমানুষটা বারবার আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু অরণ্যদার জন্য পারছে না। পিছিয়ে পড়ে অরণ্যদাকে শাসাচ্ছে সে। নোংরা সব গালি ছুঁড়ছে অনবরত। আমি দারোয়ানের হাত থেকে লাঠি নিয়ে গেটের মধ্যে বিকট শব্দ করলাম। মুখে চেঁচিয়ে বললাম, "থামো সব! কী হচ্ছে এখানে?" চারপাশ পুরোপুরি নীরব হয়ে গেলো। এই সুযোগে অরণ্যদাকে ঠেলে সরিয়ে শাহেদ চৌধুরী এগিয়ে এসে বলল, "শাওন, আমি আমার ওয়াইফের সাথে দেখা করতে এসেছি। কিন্তু এই রাস্কেলটা দিচ্ছে না!" আমি নিজেকে অনেক কষ্টে শান্ত রাখলাম। শীতল গলায় জানতে চাইলাম, "কেন দেখা করতে চাও?" লোকটা আমার এমন আচরণে অবাক হলো কিছুটা। তবে দ্রুত সামলে নিলো নিজেকে। বলল, "সে আমার বিয়ে করা বৌ! তাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি আমি! সিম্পল!" বেশ শক্ত একটা জবাব দিতে যাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু তার আগেই অরণ্যদা হস্তক্ষেপ করল। "সারাহ্ তোমার মতো অমানুষের সাথে কোত্থাও যাবে না!" শাহেদ চৌধুরী অরণ্যদাকে এক নজর দেখল। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, "তুমিই তাহলে তার সেই নাগর, যার কথা ভেবে সে প্রতি রাতে কাঁদত? যাকে.." পরের ঘটনা কারো জন্যই প্রত্যাশিত ছিল না। কেউ কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি, এলাকার সবচাইতে শান্তশিষ্ট আর পড়ুয়া ভদ্র মেয়েটা তার দ্বিগুণ বয়েসী কারো গালে এভাবে কষে এক চড় মারবে! শাহেদ চৌধুরী তার লাল হয়ে যাওয়া গাল এক হাত দিয়ে ধরে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার বুনো দৃষ্টিতে ভয়ংকর কিছু একটার আভাস দেখতে পাচ্ছি আমি। হাতজোড়া মুঠো হচ্ছে। কিন্তু আমি কিছু করার আগেই, কেউ একজন আমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। তার লম্বা কাঠামোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলাম আমি। শুভ্র বেশ শান্ত গলাতেই বলল, "ভুলেও অমন সাহস করো না, বাস্টার্ড! তাহলে এই এলাকা থেকে জ্যান্ত বেরুতে হবে না আর। জানো, আমি না মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি তোমার সাথে জানোয়ারদের এত মিল কেন? তোমার পূর্ব পুরুষ কেউ পাকিজন্মা ছিল না তো?" শাহেদ চৌধুরীর উত্তর কানে আসার আগে, অন্য একটা শব্দ শুনতে পেলাম আমি। ঠিক আমার পেছনেই কে যেন ধুপ করে পড়ে গেলো! চমকে পেছনে ফিরে দেখি রাহাপ্পু! কেমন নিশ্চল হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আর তার চারপাশটা ধীরে ধীরে লাল হচ্ছে... হচ্ছে... অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যাওয়ার আগে রাহাপ্পু আমার হাত আঁকড়ে ধরে বলল, "রাশাকে তোর কাছে রাখিস। একদম শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে।" "রাশা! মানে.." "তোর আর আমার নামের প্রথম অক্ষর। এভাবেই ওর মাঝে থাকব আমরা, মুনি!" এই শেষ। ওর সাথে শেষ কথা বলা। এরপরেরবার ওকে যখন দেখলাম, তখন সে শীতল। আমার শীতল খোলসের চাইতে ভয়ংকর তার সেই শীতলতা। অদ্ভুত কাঁপ ধরিয়ে দেয় শরীরে। আমি কিন্তু কাঁদিনি। প্রিয় ডায়েরী, বিশ্বাস করো! কোন অনুভূতিই হয়নি আমার। কিচ্ছু বোধ হয়নি। তবে জানো ভেতরটা ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল আমার! শব্দ শুনেছি স্পষ্ট! তবু কাঁদিনি। কান্না ই পায়নি। শুভ্র বলে, আমি নাকী ঘন্টার পর ঘন্টা রাহাপ্পুর দিকে অপলক তাকিয়েছিলাম। আর বিড়বিড় করে একনাগাড়ে হিস্ট্রিয়াগ্রস্তের মতো বলেছিলাম, "ইটস মার্ডার! এ পারফেক্ট মার্ডার!" কিন্তু কেউ আমার কথায় কান দেয়নি। শাহেদ চৌধুরী সেদিনই ফিরে গিয়েছিল। তার মেয়ে চাই না! চাইলেও বোধহয় আমি দিতাম!! খুন করতাম বরং ঐ জানোয়ারটাকে। নিজের হাতে। আমাকে ট্রমা থেকে বের করার জন্য শুভ্র, রাশাকে একটা টাওয়েলে পেঁচিয়ে আমার কোলে এনে রাখল। অবাক হয়ে দেখলাম, টাওয়েলটার রঙ লাল। টুকটুকে লাল। আর রাহাপ্পু ছোট্ট রাশা সেজে বড় বড় চোখ মেলে আমাকে দেখছে! ওর চোখে নিষ্পাপ মুগ্ধতা। শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলাম, "ও কি লাভ এট ফার্স্ট সাইট বোঝে?" *** শৈল্পী তার ডায়েরীটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। কষ্টে বুক ভেঙ্গে আসছে তার। বারবার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। এদিকে সেলফোনে তখনও বাজছে গানটা। " জানালার পাশে যখন রাগ করে কাঁদতে, বুঝতে পারিনি জমে কত রাগ সেই বুকে। সময়ের কাঁটা যদি ঘুরিয়ে দিতে পারতাম, দেখতে আমার আদর কীভাবে! জড়িয়ে তোমায় হৃদয়ে রেখে, কষ্টগুলো মুছে দিয়ে, তুমি আমার ভোরেরই আলো, তোমাকেই টেনে নিয়ে.." শৈল্পী ধীর পায়ে গিয়ে বসলো জানালার পাশে। তাদের দু' বোনের প্রিয় জায়গাটায়। যেখানে বসে একটা সময় তারা ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতো। কত শত গল্প হতো তখন! মায়াবতী মেয়েটা হাসতে পারত খুব! ছোটবোনের খুব সাধারণ একটা কথাতেও হেসে খুন হতো। এটা সেই জায়গা। যেখানে বসে সে জীবনের শেষ কয়টা দিন কাটিয়েছে। অন্যরা টের পেয়ে যাওয়ার ভয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদেছে! আচ্ছা স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট এত তীব্র হয়? তাহলে স্বপ্নগুলো ভাঙ্গতে দেয় কেন মানুষ? কেন লড়ে না? কেন হার মেনে নেয় বিনা যুদ্ধে? যুদ্ধ! হ্যাঁ, যুদ্ধ করবে শৈল্পী। রাশার জন্য। নিজের জন্য। শুভ্রকে পাশে রাখার জন্য। শুভ্র শৈল্পী হওয়ার জন্য। সে তার শুভ্রকে অরণ্যদার জায়গায় দেখতে চায় না। কোনভাবেই নয়। শৈল্পী এখন কাঁদছে। সেই জানালার পাশটায় বসে। সেই প্রিয় জায়গাটা! এখানে এত্তো এত্তো স্মৃতি! সব যেন ফিরে আসছে আজ। মায়াবতীর হাসি, কান্না, গন্ধ, সব স্মৃতি। প্রথম ভালোবাসা বলে কথা। কখনও ফুরোয় না। হারিয়ে যায় না। কোথাও না কোথাও ঠিকই ছোট্ট একটা জায়গা খুঁজেপেতে থেকে যায়। শৈল্পী তার সেই ভালবাসার কথা ভেবে কাঁদছে। তার লাভ এট ফার্স্ট সাইট! বড় বড় চোখের সেই মায়াবতীর জন্য জন্মানো তেইশ বছর আগের সেই ভালবাসা! শৈল্পী হাত বাড়িয়ে ডায়েরীটা ছুঁয়ে দেখল একবার। শুভ্রর বুদ্ধি কাজ দিয়েছে। এতদিনের চেপে রাখা আবেগ এবার বুঝি হালকা হবে। বেরুবে লুকোনো জায়গা ছেড়ে। আবেগ চেপে রাখতে হয় না। তা সে যেমন আবেগই হোক। বের করে দিতে হয়। যেভাবেই হোক প্রকাশ করতে হয়। কোমল একজোড়া হাতের স্পর্শে চোখ তুলে তাকালো সে। ছোট্ট রাশা উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার বড় বড় চোখজোড়ায় দুঃখ। তাকে তাকাতে দেখে আধো বুলিতে মেয়েটা জানতে চাইলো, "মামুনি, তুমি কাঁদছো! কেন? তুমি তো কাঁদো না!" শৈল্পী হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নেয়। মেয়েটার গায়ে সেই পরিচিত গন্ধ। পুরোনো কোন এক মানুষের। যেই গন্ধ কখনওই ভোলা সম্ভব নয়। বরং হাজার গন্ধের মাঝ থেকেও আলাদা করা যাবে। ভালবাসা যাবে গন্ধের মানুষটাকে! শৈল্পী ফিসফিস করে বলল, "লাভ এট ফার্স্ট সাইট বুঝিস, বাচ্চাটা? সেটা হচ্ছে.." (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রাহাপ্পুঃ লাভ এট ফার্স্ট সাইট

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now