বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ- শেষ পর্ব (সম্পূর্ণ)
X
তৃতীয় এবং শেষ পর্বঃ
৭।
সেবার আমার ক্ষমতাধর মামাও আমাকে জেল
হাজতে চালান হওয়া ঠেকাতে পারলেন না। একমাস
হাজতবাস করে যখন আমি চৌদ্দশিকের বাইরে পা
রাখলাম তখন পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন
এসেছে। সিনেমার নায়ককে পার্শ্ব-অভিনেতা
বানিয়ে দিয়ে দৃশ্যপটে নতুন নায়কের আবির্ভার
ঘটেছে।
আমার একটা বিশাল সমস্যা হলো আমি বর্তমানে বাঁচি।
অতীত বা ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা সময়ের অপচয়
মনে হয়। বিশেষ কোন ব্যক্তিগত নীতি যে তা
নয়। আসলে এই অতীত-ভবিষ্যতের জটিল ভাবনা
আমার অলস মস্তিষ্কে খুব চাপ ফেলে। ধরাটা এবার
খেলাম সেখানেই।
অন্তুর অতীতটা বেশ জটিল ছিল। সে প্রথম
বর্ষ-সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি প্রেমঘটিত
জটিলতার কারনে। বিগত একমাসে সে সকল
জটিলতার বরফ কেটেছে। তার পূর্বপ্রেম তার
জীবনে ফিরে এসেছে। আমার থেকে পাঁচ
বছরের বড় একজন। বর্তমানে ছয় অংকের
বেতনের চাকরি করছেন। সবচেয়ে অবাক হলাম
এটা জেনে যে ভদ্রলোকের সাথে অন্তুর চার
বছরের প্রেম ছিল। অন্তু আমাকে কখনো কিছু
বলেনি ! ভদ্রলোক এতদিন বাদ রাজশাহী ফিরে
এসেছেন একটা কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার
হিসাবে। ভদ্রলোকের বিয়ের উত্তম সময়
চলছে।
আমি এখনকার ফেসবুকের Lonely Insomniac
Dreamboy আইডিধারী চাপা স্বভাবের
ছেলেদের মত ছিলাম না। সরাসরি অন্তুর কাছে
গিয়ে ব্যাখ্যা চাইলাম। অন্তু জানালো এখানে ব্যাখ্যা
দেয়ার কিছু নাই। তার পুরাতন প্রেম সে কখন
PAUSE থেকে PLAY করবে এটা নিতান্তই তার
ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তাছাড়া আমি তার থেকে
বয়সে ছোট। কিভাবে সম্ভব?
পরবর্তী তিনটা মাস আমি নরকসম যন্ত্রনায় কাটালাম।
দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। দিনে দুই প্যাকেট
সিগারেট শেষ করে ফেললেও কেউ মানা করত
না। শুক্রবার বাসায় ফোন দিয়ে কেউ জুম্মার
নামাজে যাবার কথা মনে করিয়ে দিত না। সিমলা
পাড়ের অবাধ্য বাতাসে কোন চেনা গন্ধ ছিল না।
আমার হাত ভাঙ্গার সময়ে যে অন্তু তিনদিন আমার
কপাল থেকে হাত সরায়নি সে আজ হঠাৎ আমাকে
ছুঁতে ইতস্তত করে। যে হাতের প্রতিটা রেখা,
শিরা-উপশিরার গতিপথ আমার মুখস্ত। আমি তাকে এবং
তার ভদ্রলোক প্রেমিককে নিয়ে তার কাছে
আপত্তিকর প্রশ্ন করা শুরু করলাম। নেশা শুরু করলাম।
নিজে প্রচন্ড কষ্ট পেতাম, সর্বোচ্চ চেষ্টা
করতাম সেও যেন কোনভাবেই সুখে না থাকতে
পারে। অদ্ভূত ব্যাপার হলো সে এতকিছুর মাঝেও
ভদ্রলোককে নিয়ে কিভাবে যেন সুখে থাকত।
আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। বরং সর্বোচ্চ
চেষ্টা করেছে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু “ অন্তু
শুধু এবং শুধুই আমার জন্য নয়” এই সার্বিক ধারনাটা আমি
মেনে নিতে পারি নি।
তিনমাস মানবেতর জীবনযাপনের পর আমার
জীবনযাত্রার কিছুটা পরিবর্তন আনল জাতীয়
নির্বাচন। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত হয়ে সব ভুলে
গেলাম। ২০০১ সালের ২রা অক্টোবর আমার দল
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতার সাথে সরকার গঠনের
যোগ্যতা অর্জন করল। আমার মামা সাংসদ নির্বাচিত
হলেন। সে রাতে বিজয়োল্লাস শেষে হলের
রুমে ফিরে দেখি টেবিলের উপর একটা কেক
রাখা। উপরে লেখা, “শুভ জন্মদিন ক্ষুদিরাম”। আমি
স্থির হয়ে কেকটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে
রইলাম। অতঃপর দুহাতে নিয়ে গিয়ে প্যাকেটসহ
ডাস্টবিনে ছুড়ে মারলাম।
৮।
অন্তুর সাথে আমার পরবর্তী যেদিন কথা হয়
তারিখটা ছিল ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৩। রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ’৯৮ ব্যাচ স্মরনকালের সেরা
“র্যাগ-ডে” আয়োজন করেছিলাম সেবার। রঙে
রঙে কাউকে চেনার উপায় ছিল না।
ডিপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায় সুজন আর
ইকবালকে রঙে চুবিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছিলাম। হঠাৎ
করে দু’গালে নরম স্পর্শে কেউ রঙ মেখে
দিল। সারা দুনিয়ায় আমি দুইজন নারীর ঘ্রান চিনতাম।
আমার মা এবং অন্তু। এটা কোন বিশেষ সুনন্ধী
কিনা জানিনা, কিন্তু চিনতাম এই ঘ্রান। চোখ বন্ধ করে
ক্লান্ত বিকেলে যখন ছাদে পায়চারি করা বিষন্ন
কোন তরুনীর কল্পনা করতাম, এই ঘ্রানটা পেতাম।
চিন্তায় হারিয়েছিলাম। এর মাঝে হাতদুটো অজানা
রঙে আমার দু’গাল রাঙ্গিয়ে দেয়। স্তব্ধ হয়ে
দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই গোধুলী বিকেলে হঠাৎ
আমার সময় বিভ্রম হলো। ডিপার্টমেন্টের
চত্ত্বর, টং এর চায়ের আড্ডা, সিমলা পাড়, কাজলার
ধুলোভরা ফুচকা...হঠাৎ করে সময় থেমে গেল
আমার কাছে। সত্যিই চলে যাব? নতুনেরা এসে সব
নিয়ে নিবে?
হিসেব না রাখা নিরবতাকালের পর হঠাৎ একজোড়া
দূর্বল মুঠিবদ্ধ হাত আমার বুকে আঘাত হেনে
কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, “ ঐ কুত্তা, ঐ কুত্তা, তুই
কি আজকেও কথা বলবি না?” । অদ্ভূত ব্যাপার অন্তুর
মুখের দিকে তাকিয়ে আমার যে অনুভূতি হলো
তার সাথে প্রেম ভালোবাসা, ঘৃনার কোন মিল
নেই। জীবনে প্রথমবারের মত তাকে আমার
পরম বন্ধু মনে হল। মনে হলো এরকম বন্ধু
আমার জীবনে আসে নি আর।
পাঠক, আমার প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছিল অনেক কথা
বলি। বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে নিয়ে হলেও
একবার শক্ত করে অন্তুকে জড়িয়ে ধরি।
কোনটাই করা হয়নি। শুধু সে রাতে অন্তু রাজশাহী
ছেড়ে যাবার সময় বাসে উঠার আগ মুহূর্তে হাতে
বিশাল এক চিঠি ধরিয়ে দিলাম। চিঠির শেষ লাইন ছিল,
“...দেখা হবে সে জন্মে কিংবা অন্য কোন
ধরায়, যেখানে আমরা দুজনে ভালুক হবো।“
জীবন আসলে একটা বৃত্তের মতন।
অনেকগুলো বিন্দু নিয়ে বৃত্তের পরিধি। আমি
অন্তুর জীবনের হাজার বিন্দুর মধ্যে মাঝারি মানের
এক গুরুত্বপূর্ন বিন্দু। আর আমার বৃত্তের
কেন্দ্রটা অন্তু। অন্তুর বৃত্তের কেন্দ্র
ম্যানেজার সাহেব। আসলে ম্যানেজার সাহেবের
সাথে অন্তুর কাহিনীও এক বিরাট মহাকাব্য। পুরোটা
শুনেছি পরে। আইএমডিবি টপ রেটেড মুভিগুলোর
মত টুইস্টে ভরপুর। সে প্রেমেরও সৌন্দর্য্য
ছিল। সম্ভবত আমারটা থেকে বেশি। আমি অন্তুর
প্রেমে অন্ধ থাকার কারনে সৌন্দর্য্যটা দেখতে
পাইনি। আজো পাই না। চারবছর পর আমার ঠিকানায়
অন্তুর বিবাহের ইনভাইটেশন কার্ড আসে। আমি যাই
নি।
৯।
পাঠক, এই নবম পরিচ্ছদটা বলার জন্যেই মূলত আট
পরিচ্ছদের এত বিশাল ভূমিকা। আট নম্বর পর্যন্ত যার
পড়তে ধৈর্য্য পেয়েছেন এবং মোটামুটি সন্তুষ্ট
হয়েছেন তারা ঘুমিয়ে যান। আমি পাঠক হলে তাই
করতাম। আর যারা ডিসটার্বড হতে চান তারা এই
পরিচ্ছদটা পড়ুন।
অন্তু জীবন থেকে হারিয়েছে, বিশ্বজগত
থেকে হারায়নি। বরং বাংলাদেশ নামক ছোট এই ব-
দ্বীপে সে তার অস্তিত্ব বেশ ভালভাবে জানান
দিয়ে থাকে। তাকে সবাই এখন সাবিহা নামে চিনে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেয়া
অভিনেত্রী। দিনে এক লক্ষ টাকা। ২০১৯ সালে
বিখ্যাত পরিচালক রাগীব শাহরিয়ারের পরিচালনায় তার
অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র “শঙ্খচিলের ডানায়” কান
চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার
জিতেছে। ছবিতে অন্তু সেই বড়বোনের
চরিত্রে অভিনয় করেছে যে তার মুক্তিযোদ্ধা
ছোটভাইকে রাজাকার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচাতে
স্বেচ্ছায় সম্ভ্রম বিসর্জন দেয়। হুলস্থূল কান্ড।
শোনা যাচ্ছে শক্ত সুপারিশ করেছেন মৃত্যুসজ্জায়
থাকা হলিউড পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ। বিদেশী
চলচ্চিত্র সেকশনে অস্কার জিতে যাওয়ার সম্ভবনা
আছে।
আমার কথা না জানাই ভাল ছিল। তবুও পরিস্থিতি বর্ননা
করতে বলি। সময়মতো পাল্টি দিতে পারার বিরল গুন
থাকার কারনে আমি রাজনীতিবিদ হিসাবে বেশ সফল।
দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের সরকারের
সাথেই কাজ করেছি। ভারতের সাথে ২০১৪ সালে
একটা চুক্তি করতে আমাকে পাঠানো হয়েছিল।
সেখানে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীকে মিডিয়ার সামনে
গালি দেবার কারনে দু-দেশের কুটনৈতিক
সম্পর্কে বেশ প্রভাব পড়েছিল। মিডিয়ায় তখন
থেকেই আছি। সবচেয়ে বেশি মিডিয়ায় এসেছি
ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে স্ক্যান্ডাল সম্বলিত খবর
হয়ে। আমার বর্তমান বিরোধী দল, আমার দল,
দেশের জনগন সকলে আমাকে প্রানভরে ঘৃনা
করে। কিন্তু সবাই কোন না কোন ভাবে বাঁধা
আমার কাছে। আগামী নির্বাচনে মন্ত্রীত্ব পাব
বলে ধারনা করা হয়। এর মাঝেও আমার মুষ্টিমেয়
সমর্থক আছে। ফেসবুকে সার্চ দিলে আমার
নামে ফ্যান পেজ পাওয়া যায়। সুতরাং বুঝতেই
পারছেন আমিও বেশ পরিচিত মুখ।
অন্তুর সাথে আমার যোগাযোগ হয় বছরখানেক
আগে। তখন “শঙ্খচিলের ডানায়” শ্যুটিং চলছে।
ওর স্বামী বেশ আগেই মারা গিয়েছিল। স্বামী
মারা যাবার এক বছর পর্যন্ত সে অভিনয় করেনি
শোকে মুহ্যমান হয়ে। আমি জানতে পেরে
বিশেষ কষ্ট পেলাম না। খুশি খুশি লাগল। খুশি ভাবটা
লুকাতে ব্যর্থ হলাম।
মূলকথায় আসি। আগামীকাল আমাদের বিয়ে।
আমাদের দুজনের। একসাথে। একে অপরকে।
যে অদ্ভূত কারনে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অভিনয়
ছেড়ে দিবে, সে অদ্ভূত কারনেই আমি
রাজনীতি ছেড়ে দিব। অস্কার-মন্ত্রীত্ব-
পরিচিতি-ক্ষমতা এসব হঠাৎ খুব তুচ্ছ লাগছে। আমরা
দুজনেই বড় ক্লান্ত। এখন এই মুহুর্তে আমরা
চট্টগ্রামের একটা লোকাল বাসে বসে আছি
ছদ্মবেশি কাপড়ে। হারিয়ে যাচ্ছি পাহাড়ের
উদ্দ্যেশ্যে। যে পাহাড়চূড়ায় প্রীতিলতাকে পিঠে
নিয়ে ওঠার কথা দিয়েছিলাম দেড় যুগ আগে। কথা
দিয়েছিলাম মেঘ ছোবার। ঝর্নার পানিতে একসাথে
ভেজার। এরপর যাব আলাস্কা, শ্বেত ভালুকের
সাথে দেখা হওয়া বাকি। অনেক কিছু করা বাকি পাঠক,
অনেক কিছু।
**রাজশাহীর সাথে আমার পরিচয় সাড়ে তিন বছর
আগে। তারপর থেকে রাজশাহী প্রানের শহর।
রাজশাহীকে নিয়ে চর্চাটা তাই অধিকারের মধ্যেই
ধরলাম। রাজশাহীবাসী ফ্যাকচুয়াল এবং জিওগ্রাফিকাল
ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।**
কেমন লাগল জানান এবং রেটিং দিন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now