বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ২য় পর্ব
X
(১ম পর্বের পর থেকে)
৪।
একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে, জীববিজ্ঞানীরা
যখন প্রথম ক্লোন মানবশিশু জন্মদানের
দ্বারপ্রান্তে, আমেরিকা যখন ইরাক আক্রমনের
দ্বারপ্রান্তে, সিডনি যখন মাতছে ১২,৬০০
ক্রীড়াবিদের ক্রীড়ানৈপূন্যে, ঠিক সেরকম একটা
সময়ে আমার জগত খুব সুনির্দিষ্ট দুই ভাগে ভাগ
হয়ে গেল। তার একটা ভাগের নাম অন্তু।
জীবনে প্রথম প্রথম তখন নারীকে ইভটিজিং এর
বস্তু বাদে অন্য কোন একটা ব্যাপার মনে হতে
শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আপাতদৃষ্টিতে বিরক্তিকর
দিনগুলোতে হঠাৎ ভাল লাগার হাওয়া লাগল। কোনদিন
ক্লাস শেষে, কোনদিন ক্লাস বাঙ্ক করে
অন্তুকে বাইকের পিছনে চড়িয়ে চলে যাওয়া
হতো অদ্ভূত অদ্ভূত জায়গায়। তারপর হিসাবহীন
সময় কাটত। আমাদের একটা নিয়ম ছিল। সাথে কোন
ঘড়ি থাকবে না, ফেরার কোন তাড়া থাকবে না।
কোন কোন দিন নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সন্ন্যাসী
হয়ে যেতাম দুজন সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় ফিরতাম।
আমাদের প্রিয় জায়গা ছিল পদ্মাপাড়। জনবহুলটা নয়,
সুনশান নীরব সিমলা পাড়। মহিলা অন্তুর মধ্যে
একজন মহিলা এরিস্টটল বসবাস করত। সেই মহিলা
এরিস্টটল কিছুক্ষন গল্প করত, কিছুক্ষন জ্ঞান দিত।
বেশিরভাগ সময়ই নীরব থাকত। নীরবতা ভাঙলে
অদ্ভূত অদ্ভূত সব তত্ত্ব দিত। কিছু তত্ত্ব নিম্নরুপঃ
(১) এমিবা তত্ত্বঃ মাধ্যমিকে সাধারন বিজ্ঞান বইতে
জেনেছিলাম পৃথিবীর প্রাচীনতম জীব এমিবা।
সেই এককোষী পেটুক এমিবা আজ খেতে
খেতে পদ্মা নদী বানিয়ে ফেলেছে। পদ্মা
আসলে বিরাট আকৃতির এক এমিবা। যে ঢেউগুলো
আমরা দেখি সেগুলো আসলে তার ক্ষনপদ। বিশাল
এমিবার মাঝে মাঝে ক্ষুধা লাগলে সে
পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় দু’একটা মাছ ধরা ট্রলার
খেয়ে ফেলে।
এখানে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। বিশাল এই পদ্মা
জাতীয় এমিবা নির্বাচনে কোন এমিবা কেন্দ্র
থেকে মূল্যবান ভোট দেয়? রাজশাহী,
নাটোর, পাবনা নাকি কুষ্টিয়া? প্রশ্ন শেষ হবার
আগেই এরিস্টটল পরবর্তী তত্ত্ব আবিস্কারে
উদাস হয়ে যাওয়ায় জানা হয়নি।
(২) লেডিস ফার্স্ট তত্ত্বঃ প্রাচীনকালে কোন
এক রাজ্যে এক প্রজা রাজকন্যাকে ভালবেসে
ফেলেছিল। রাজকন্যাও বাঁধভাঙ্গা প্রেমের টান
উপেক্ষা না করতে পেরে প্রজাকে যুগপৎ
ভালবেসে ফেলে। তাদের ভালবাসা চলতে লাগল।
অনেক সুখের মুহূর্ত কাটাবার পর মহাজাগতিক নিয়মে
দুঃখ এল। রাজপরিবারে জানাজানি হয়ে গেল। অতঃপর
প্রেমিক-প্রেমিকা সিদ্ধান্ত নিল একসাথে বাঁচতে না
পারলেও একসাথে মরা সম্ভব। তারা সুউচ্চ পাহাড়চূড়ায়
উঠল আত্মহুতি দিতে। রাজকন্যা প্রথমে আত্মহুতি
দিতে গেলে প্রেমিক তাকে থামিয়ে দেয় সহ্য
করতে না পেরে। কথা হয় প্রেমিক আগে লাফ
দিবে। অতঃপর প্রেমিকা। কথা অনুযায়ী পাহাড়
থেকে লম্ফ দিয়ে আত্মহুতি প্রেমিক তাদের
প্রেমকে অমর করে ফেলল। রাজকন্যা এরপর
ভাবল প্রেম তো অমর হয়েই গেছে, এখন শুধু
শুধু একটা এক্সট্রা জীবন নষ্ট করা অপচয়। সে
পরিবারে ফিরে গিয়ে বিবাহ করল। সুখে শান্তিতে
বসবাস করতে লাগল। প্রেমিকের অতৃপ্ত আত্মা
এসে এক সন্ন্যাসীকে গুরুত্বপূর্ন তত্ত্ব দিয়ে
গেল। “ নারীকে প্রথমে সুযোগ দাও।“
(৩) বাঘ তত্ত্বঃ এটা এক লাইনের তত্ত্ব। মশা
আসলে একটা বাঘ। ছোট সাইজের বাঘ। হালুম না
করে পিন পিন করে। মশা যে বাঘ তার বড় প্রমান
হলো মশাও বাঘের মত মানুষের রক্ত খায়। রয়েল
বেঙ্গল টাইগারের গায়ে হলুদ-কালো স্ট্রাইপ
থাকে আর রয়েল বেঙ্গল মশার গায়ে সাদা-
কালো স্ট্রাইপ থাকে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম সাদা
কালো স্ট্রাইপ তো জেব্রার থাকে। তাহলে মশা
জেব্রা নয় কেন অথবা মশা ভ্যাম্পায়ার নয় কেন?
সে উড়িয়ে দিয়ে জানাল ভ্যাম্পায়ার বলে কিছু নাই।
সব গুজব।
ক্ষনজন্মা এই রমনী যখন ইতিহাস, ভূগোল কিংবা
জীববিজ্ঞানের কালজয়ী তত্ত্বগুলো আমার
কাছে উন্মোচন করত, ভারত-বাংলাদেশ
সীমান্তের পাশ ঘেঁষা সিমলা পাড়ে জলজ বাতাসেরা
তখন নিঃশব্দে সখ্যতা করত কাশফুলের সাথে।
পদ্মার বুক চিরে সীমান্তরক্ষীদের স্পিডবোট
ছুটে যেত মাঝে মাঝে। রুক্ষ বাতাসের দল
সীমান্তের তারকাটায় ধাতব শব্দ তুলত। সে ধাতব
শব্দে মিশে আছে অনেক করুন আর্তনাদ। যেটা
আমি শুনতে পেয়েছিলাম সে বিকাল থেকে
অনেককাল পরে। অদৃশ্য ছিন্নভিন্ন ধর্ষিতা পতাকাটা
দৃষ্টিগোচর হয়েছিল বহু পরে। সে ব্যাপার নিয়ে
অন্য আরেকদিন বলা যাবে।
৫।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমার হৃদয় যে দুভাগে
ভাগ হয়ে গিয়েছিল তার একভাগে মহিলা
এরিস্টটলের বিস্তৃতির কথা বলেছি। অন্য যে
অর্ধাংশ, সেটা জুড়ে ছিল ছাত্র রাজনীতি। ২০০০
সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি
ঘোষনা করা হয়। হল কমিটি থেকে পদোন্নতি
পেয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাই। তৃতীয়
বর্ষের ছাত্রের কেন্দ্রীয় জেলা কমিটিতে
অবস্থান অনেককে ঈর্ষান্বিত করে, অনেককে
করে বিচলিত। আমার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।
প্রস্তর যুগের অস্ত্রের জায়গা দখল করে
দূরপাল্লার অস্ত্র।
ডিসেম্বর মাসে ছাত্রদের কথা বলার জন্য হলের
বরাদ্দ হলের একমাত্র ল্যান্ডলাইন অলিখিত নিয়মে
আমার হয়ে যায়। হলের বাকি ছাত্রজনতা
টেলিফোনে বাসায় দু’মিনিট কথা বলার আশা
আজীবনের মত ছেড়ে দেয়। ডিসেম্বর এবং
জানুয়ারী মাস ছিল আমার এবং অন্তুর
“টেলিযোগাযোগ মাস”। আমার প্রচন্ড রাজনৈতিক
ব্যস্ততা, পরীক্ষা সব মিলিয়ে দিনে সময় কাটানো
সম্ভব হতো না একসাথে। রাতে কথা হত অবিরাম।
মহিলা এরিস্টটল সামনা সামনি চুপচাপ হলেও
টেলিমাধ্যমে বেশ স্বতস্ফূর্ত। একদমে ঘন্টা
দুয়েক কথা বলে ফেলতে পারেন। আমি সচরাচর
আবহাওয়াগত কষ্টের ক্ষেত্রে কম সহনশীল।
তবে মহিলা এরিস্টটলের সাথে কথা বলার জন্য
ডিসেম্বরের কনকনে শীত আর হলের বারান্দার
কমান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত মশার কামড় সহ্য করে নিতাম
কিভাবে যেন। মাঝরাতে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, নিরবতা
চেরা ট্রেনের হুইসেলের সাথে রিনঝিন কন্ঠ
মস্তিষ্কে বিভিন্ন অচেনা অজানা হরমোনের
নিঃসরন ঘটাতো।
মহিলা এরিস্টটলের দার্শনিক প্রতিভা সম্পর্কে
জানতাম। এছাড়াও সে যে বিস্তর প্রতিভার অধিকারিনী
এটা আমি না জানলেও পুরো ভার্সিটি জানত। সে
বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যগোষ্ঠীর সবচেয়ে পরিচিত এবং
জনপ্রিয় অভিনেত্রী এটা জেনেছিলাম বিজয় দিবস
নাট্যোৎসবে। এছাড়াও তার ছয় তারের সুরযন্ত্রে
বিশেষ পারদর্শিতা এবং সঙ্গীতে জাতীয় পুরস্কার
রয়েছে। তথ্যগুলো জানার পর বুঝলাম আমাদের
সম্পর্কটা আসলে সুষম নয়। তার কাছে আমার সকল
অর্জন শ’বার বলা হয়ে গেছে। অথচ তার কোন
অর্জন সম্পর্কে আমার জানা নাই।
ফেব্রুয়ারী মাসটা ছিল সম্পর্ক সুষম করার মাস। তার
সকল অর্জন সম্পর্কে জানতে গিয়ে নতুন তথ্য
বের হলো। স্কুলে সে এথলেটিক্স করত।
২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন। অদ্ভূত ব্যাপার হলো
আমি নিজেও স্কুলে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন
ছিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারী অনেকে মালা বদল
করে, আমরা মেডেল বদল করলাম। সম্পর্কটা
একসময় অতি সুষম হয়ে গেল। লেডি এরিস্টটল
কাম লেডি লেনন কাম লেডি মারিয়ান জোন্সের
ক্ষুদ্র বপুর প্রতিটা কোষ এতটা পরিচিত হয়ে গেল
যে সকালে তার সাথে দেখা হলে, রাতে তাকে
ঠিক কতগুলো মশা কামড়েছে বুঝে ফেলতে
লাগলাম।
১৬ই ফেব্রুয়ারী অন্তুকে বাইকের পিছনে
বসিয়ে আনন্দ ভ্রমনের সময় বাইক উলটে আমার
ডানহাতের টারসাল-মেটাটারসাল কি যেন হেন তেন
ভেঙ্গে ফেললাম। অন্তু অলৌকিকভাবে অক্ষত
থাকে। মাস দেড়েক লাগে আমার ঠিক হতে।
তিনদিন হাসপাতালে ছিলাম মাথায় চোট লেগেছে
আশঙ্কায়। এই তিনদিন বেশিরভাগ সময়ই চেতনা ছিল
না। যতবারই জেগেছি দেখেছি কপালে ছোট
একটা হাত রেখে বিষন্ন বদনে একজন বসে
আছে। আমি কবি হলে নিশ্চয় গোধুলী রঙ লাগা
ঐ বিষন্ন ফোলা ফোলা গালটা নিয়ে লিখতাম।
ইচ্ছে হত আরো দু-চারটা হাড় ভেঙ্গে যাক,
মেয়েটা আরো বিষন্ন হয়ে যাক, গোধুলীটা
আরো লালচে হয়ে যাক। আমার পরিবারের কঠিন
তিরস্কারের পরও মেয়েটা তিনদিন আমার কেবিন
ছেড়ে যায়নি। আমার মা মেয়েটা সম্পর্কে পরে
আমার কাছে খোঁজ নেন। ঢাকায় বাড়ি শুনে খুশি
হয়ে বলেন, “ভালই তো দেখতে”।
২০০১ সালে “সাম্প্রতিক ঘটনাবলী” বিষয়ে বেশ
দূর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। অনেকটা এখনকার
গ্রামীনফোন ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা ইন্টারনেট
এক্সপ্লোরার ব্রাউজারের মত শ্লথ গতিতে দুনিয়ার
যাবতীয় সংবাদ আমার কাছে আসত। আমাকে এবং
অন্তুকে নিয়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কুৎসা রটে
আছে। কয়েকটা হোটেলের নাম
স্পেসিফিকভাবেও নাকি শোনা যেত। জানতে
দেরি হয়ে গেল। জানলাম যেদিন অন্তু রাস্তায়
বাজে মন্তব্য শুনে কাঁদতে কাঁদতে হলে ফিরল।
বিছানার নীচ থেকে ফুটখানেক আকৃতির ধারালো
অস্ত্র সে রাতে বের করে মন্তব্যকারীর
কাঁধে ধরে বলেছিলাম, “আবার বল”।
মন্তব্যকারীর হার্টের থেকেও দূর্বল ছিল তার
ব্লাডার। জুনিয়র রুমমেটদের সামনে মন্তব্যকারী
লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করল।
৬।
ঘন্টাখানেক হয়ে গেল সিমলা পাড়ে বসে আছি।
অথচ নতুন কোন তত্ত্ব আসেনি। চিন্তার বিষয়।
লক্ষনটা বিশেষ ভাল না। নীরবতা ভাঙলাম আমি। গলা
খাঁকারি দিয়ে বললাম,
-কিরে, কিছু বলবি না?
- হ্যাঁ বলব।
- ওকে, শ্যুট।
- মাংসের কেজি কত করে?
- আশ্চর্য, আমি জানব কিভাবে !
- কসাই মাংসের নাম না জানলে ব্যবসা চলবে
কিভাবে? দেশের আর্থ-সামাজিক খাতে প্রভাব
পড়বে না?
-কসাই কে?
-রামদা চা-পাতি হাতে ঘুরো আর কসাই চিনো না।
তাড়াতাড়ি মাংসের দাম বলে ফুটো এখান থেকে।
- শুকরের মাংস ফ্রি আফা। আমার দোকানে
আমন্ত্রন রইল।
মহিলা দার্শনিক ঠোঁট উলটে গম্ভীর রুপ ধারন
করে আবার উল্টোদিকে ফিরে বসে রইলেন।
- বারবার ঐদিকে ফিরে বসছিস কেন? অ্যাম আই ঠু
হ্যান্ডসাম টু স্টেয়ার এট?
- নাহ, কালো মানুষের দিকে তাকাইলে আমার
চোখে ব্যাথা হয়।
- আমার কালো হওয়ার পিছনে ইতিহাস তোকে
বলেছি?
-নাহ।
- তাহলে শোন। সৃষ্টিকর্তা যখন আমাদের
জেনারেশন তৈরী করছিলেন তখন বৃহত্তর
রাজশাহী আর ঢাকা পাশাপাশি লাইনে ছিল। খুলনা
লাইনের সব মেয়েগুলো আমার পিছে লাইন
মারলেও ঢাকা লাইনের অপ্সরীরা খুব ভাবে ছিল।
তার মধ্যে দেখি কালো পেত্নির মত এক
মেয়ে কাঁদছে। তখন আমি সৃষ্টিকর্তাকে
রিকোয়েস্ট করলাম যে, “ রব, আমার ড্যাশিং লুকটা
না হয় পুওর গার্লটাকেই দাও। আমার তো
অন্তরাত্মাও ড্যাশিং। ছেলে তো, পুশিয়ে নিব।
সৃষ্টিকতা বললেন, “হে বান্দা, তোমার উড বি
প্যারেন্টস তো তোমার নাম ঠিক করে
ফেলেছে। এখন রঙ পরিবর্তন করলে মেয়ের
নামও পরিবর্তন হয়ে তোমার নাম হয়ে যাবে”।
আমি বললাম, “ব্যাপার না রব। তোমার সৃষ্টি মেয়ে,
তুমি তো চিনোই। চেহারার জন্য নামটা সয়ে
নিবে।“
আমার ইতিহাসজ্ঞান তরুনীর বিশেষ পছন্দ হলো
না। সে আরো কিছুক্ষন চুপ করে থেকে
অবশেষে মুখ খুলল।
-আচ্ছা তুই ওকে মারতে গেলি কেন। ও
আমাকে যা বলার বলেছে। তোকে তো কিছু
বলে নাই?
- তোকে বলা মানেই আমাকে বলা।
- মানে কি? তোর সাথে আমার সম্পর্ক কি?
- আসলে সম্পর্ক ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আমি মনে
করি আমার তোর সম্পর্ক একটা বিশাল পরিকল্পনার
অংশ। একসময় আদম-হাওয়া এই সম্পর্ক পালন
করেছে, এরপর কালের বিবর্তনে হেলেন-
প্যারিস, গ্রীক সভ্যতায় সামারাস-এঞ্জেলা নামে
কেউ, রোম সভ্যতায় মালদিনি-মনিকা, লংকান সভ্যতায়
মুরালিধরন-চিত্রাঙ্গদা টাইপের নামের কেউ না
কেউ পালন করে এসেছে। আমরা আসলে একটা
বিশাল চেইনের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। অনেক দায়িত্ব
আসলে তাই।
- জ্বী না, আমরা এ ধরনের কোন চেইনের
অংশ না।
অতঃপর কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তার বহু কষ্টে
চেপে রাখা “প্রভাষক” প্রতিভা উগলে দিল।
- আচ্ছা তোরা যারা পলিটিক্স করিস, তারা
ভায়োলেন্সে এমন কি হিরোইজম খুঁজে পাস?
আজ তুই একজনের সাথে ভায়োলেন্স করবি,
সে ঘাপটি মেরে পড়ে থেকে পাঁচ বছর পরে
তোর পরিবারের সাথে ভায়োলেন্স করবে। এটা
হলো চেইন, তোর মুরালিধরন-জয়সুরিয়া কোন
চেইন না। কেন মহাত্মা গান্ধীর মত রাজনীতিবিদ
হতে পারিস না? অহিংস?
- নাহ, মহাত্মা ডুড খুব ভেজিটেবল ছিল। তোকে
বলা হয়নি মহাত্মার জন্মদিন আর আমার জন্মদিন একই
দিনে, ২রা অক্টোবর। বিগ ডুড আমার থেকে
বছর শয়েকের বড়, এই যা। অবশ্য আমার গুরু উনি
নন। আমার গুরু ক্ষুদিরাম। বাঘের মত সাহস নিয়ে
বোমা মারত। উফ, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, মাস্টারদার
নাম শুনলে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়।
- তোর মত গর্ধভের মুখে এঁদের নাম মানায় না
নালায়েক। প্রীতিলতার মত হতে হলে তোকে
শিশুকাল থেকে সাধনা করতে হবে, কাউকে
আদর্শ মানতে হবে। উনি যেমন মেনেছিলেন
ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈকে। তোর মত গর্ধভ আর
কতলকে যারা জেহাদ ভাবে সেসব মুসলিমের
মাঝে কোন পার্থক্য নাই। দে, দু একটা টুইন
টাওয়ার আরো ধ্বসিয়ে দে।
অবশেষে রনক্লান্ত দিয়ে লৌহমানবী মার্গারেট
থেচারের কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, “আর নয়
সশস্ত্র হানাহানি”।
প্রতিজ্ঞাটা যেদিন ভাঙলাম সেদিন দুজন মানুষের
জন্মদিন ছিল। একজন চট্টগ্রামের ধলাঘাটের
মেয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অন্যজন পুরাতন
ঢাকার সব্যসাচী নারী অন্তু। দিনটা ছিল ৫ই মে।
গোপনে দ্বিতীয়জনের “সারপ্রাইজ বার্থডে
পার্টি” পরিকল্পনা করছিলাম। প্রদীপের আগুন
নিভে যাওয়ার আগে যেমন দপ করে শেষবারের
মত জ্বলে ওঠে, তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ছাড়ার
আগে তেমন মহড়া দিচ্ছে। ক্যাম্পাসে বিরাট হাঙ্গামা
হলো। আমি আমার দামি ডেজার্ট ঈগল গান নিয়ে
শো ডাউন দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।
সেদিন দুপুর আড়াইটায় ক্যাম্পাসে দুটো লাশ পড়ল।
পুলিশের কাছে ধরা পড়ে আমার জায়গা হলো
মতিহার থানায়। আমি মেয়র ভাগ্নে। থানায় বেশিক্ষন
থাকার কথা না। বস্তুত থানায় নিয়ে যাওয়াই একটা ভুল
ছিল। সে ভুল ভাঙ্গাতে গিয়ে বুঝলাম ভুল করে
ফেলেছি। বেড়ধক মার খেয়ে জ্ঞান হারালাম।
আসলে সময়টা খারাপ ছিল। সরকার পরিবর্তনের
ট্রানজিশন পিরিয়ডে পুলিশের থেকে বড় বাপ যে
আর কেউ নাই এটা ঠেকে শিখলাম।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং মাথায় আঘাতের ক্ষত নিয়ে যখন
জ্ঞান ফিরল তখন আমার কাঁচভাঙ্গা হাতঘড়ির রেডিয়াম
কাঁটাগুলো সময় জানান দিচ্ছে রাত পৌনে বারোটা।
আর মাত্র ১৫ মিনিট পর ৬ই মে আসবে। মহিলা
এরিস্টটলকে আমার জানানো হবে না আমাদের
সম্পর্কটাকে কোন প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের
হেলেন-প্যারিসের সম্পর্কের সমতূল্য সম্পর্ক
ভাবি না আমি। বিশেষ কিছু ভাবি। ক্ষতস্থানের ব্যথা,
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় পরাবাস্তব জগতে চলে গেলাম। সে
জগতে ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈ সোনালী
কেশরওয়ালা ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে শত্রুদূর্গ
আক্রমন করতে। সুরক্ষিত দূর্গের দরজা ভাংতে
যখন সে কোমরের বেল্ট থেকে বোমা
উন্মুক্ত করছে তখন তার মুখটা হয়ে গেল
কৃষ্ণকলি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মত। বোমা
মেরে শত্রুদূর্গের ফটক উড়িয়ে দিতেই কিভাবে
যেন আমার হাজতের কুঠুরীর দরজাটা উড়ে যায়।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার শঙ্কিত নয়নে ছুটে এসে
আমার হাত ধরে বলে, “মাস্টারদা, ক্যাপ্টেন
ক্যামেরন ফিনিশড। এবার আমার স্ট্রবেরি
ফ্লেভারের এমিবা আকৃতির কেক দিন”।
আমি একহাতে পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল,
অপরহাতে বিদ্রোহিনী রমনীর ছোট হাত ধরে
বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকি। কেকটা যে অর্ডার করা
হয়নি।
(চলবে)
-নাজমুস সাকিব অনিক
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now