বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ১ম পর্ব

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X গল্প শুরুর আগে কিছু কথা বলা দরকার। ফেসবুকে আমার একটা ছোটবোন আছে যার সাথে কখনো দেখা হয়নি। ফেসবুকে সাক্ষাত হয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাক্ষাত হয়ে বানিয়ে ফেলা টাইপ বোন না, প্রয়োজনে থাপড়ানো টাইপ ছোটবোন। যখন রেগুলার লিখতাম তখন সে আবদার করেছিল তার নাম যেন আমি কোন গল্পের নায়িকাকে দেই। কেউ নাকি তার নামে গল্পের নায়িকার নাম দেয় না। আমি এ গল্পে দিলাম। আমার আরেকটা সীমাবদ্ধতা, আমি গল্প প্রথম পুরুষ বাদে লিখতে পারি না। তাই গল্পটা লেখা আমার জন্য বেশ অস্বস্তিকর ছিল। সুতরাং এই প্রি- নোট এর মর্মার্থ আশাকরি সবাই বুঝবেন। ** ১। কিছু কিছু দিন থাকে আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীনভাবে শুরু হয় এবং খুব বেশি গুরুত্ব ছাড়াই শেষ হয়। কিন্তু জীবনের বৃহত্তর ছবিতে স্থায়ী দাগ রেখে যায়। ১৯৯৮ এর সেই বিকেলটা অনেকটা সেরকম একটা দিনের বিকেল। ব্রাজিল ফুটবল দলের কট্টর সমর্থক হিসাবে মনটা সেদিন বিশেষ উদাস। আগের রাতেই স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে বিশ্বকাপ খুইয়েছে দলটা। আমার বাজির ট্রাম্পকার্ড রোনালদো নামক তরুন টেকো ছেলেটা ফাইনালে বাচ্চাদের মত বমি করে ভাসিয়েছে। গোল্ডেন বুটটাও উঠেছে ডেভর সুকার নামক বালকান (ক্রোয়েশিয়ান) ভদ্রলোকের হাতে। হঠাৎ করেই একটা বিশেষ দলের সমর্থকরা চেহারায় “হে হে আমি ফ্রান্সের সমর্থক” লেখা অদৃশ্য প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমস্যা সেটা না। সমস্যা হলো বন্ধু নামক শ্যালকপুত্র প্রতীকের কাছে বাঁজিতে হেরে দুই লিটার বাইকের জ্বালানি খরচ মিটিয়ে বজলুর দোকানে বসে অল্প চিনি কড়া লিকারের চা খাচ্ছি। অদ্ভূত দৃশ্যটা দেখলাম সেরকম এক সময়ে। মোমরঙ্গা চামড়ার ছোটখাট গড়নের এক নীলবসনা, স্প্রিন্টার বেন জনসনের রেকর্ড গতি অল্প ব্যবধানে ভেঙ্গে একটা দৌড় লাগিয়েও বাস ধরতে পারল না। হাততালি দেবার মত দৃশ্য। মোমমূর্তি বাস মিস করে পুতুলের মত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একবার ডানে দেখছে, একবার বামে দেখছে, অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়ে হতাশ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। উপভোগ্য দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্য আসলে একা উপভোগ করা সম্ভব না। দলবল লাগবে। আজকে দলবল নাই কোন। তাই নিজেও খানিকটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। হতাশার মনোমুগ্ধকর এই ম্যাচে স্কোর যখন বখাটে ছেলে ১- নীলবসনা ১ তখন হুট করে নীলবসনা কেঁদে দিয়ে ধারাভাষ্যে পরিবর্তন এনে ফেলল। কান্নাকাটির কারন অবশ্য যথেষ্ট যৌক্তিক। কারন রাস্তার অপর প্রান্ত হতে রামদা, চাপাতি, রিভলবারে সুসজ্জিত হরতাল সমর্থনকারী দল ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে এগিয়ে আসছে বানের জলের মত। আমজনতা যে যেভাবে পারে চিপাগলিতে ঢুকে পড়ছে। মোমমূর্তি আক্ষরিক অর্থে মূর্তি হয়ে গিয়ে বর্নালীর চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার নালায়েক বিবেক এই অসাবধান মুহূর্তে “নারীকে সর্বদা যে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা থেকে বিরত থাকিবে” এই মূলমন্ত্র ভুলে গেল। বাইকটা তিন কিকে চালু করে নীলবসনার পাশে গিয়ে বললাম- -আপু, কই যাবেন? -কেন, আপনি জেনে কি করবেন?-শংকিতার জবাব। -শুনেন আপু। নষ্ট করার মত সময় নাই। এখানে এখন ঐতিহাসিক ক্যাচাল হবে। ২০৯৮ সালে বাচ্চারা সমাজ বইতে “বর্নালীর ক্যাচাল” নামে চ্যাপ্টার পড়বে। কোথায় যাবেন বলেন। বাইকে পৌঁছে দিচ্ছি। -আশ্চর্য, আমি আপনাকে চিনি না। আপনার বাইকে কেন উঠব ? -ভাল কথা, রামদা-চাপাতি হাতে লোকগুলাকে চিনেন? এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে বৃহত্তর রাজশাহীর চল্লিশ কোনায় আপনার চল্লিশ টুকরা পাওয়া যাবে। নীলবসনা এতে বেশ ভড়কে গেল। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, - এই লোক, আপনার কথাবার্তায় তো আপনাকে সন্ত্রাসী লাগে। এভাবে কথা বলেন কেন আমার সাথে? নীলবসনা আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই খুব কাছে বিকট শব্দে একটা ককটেল ফুটল। ব্যাপারটা বেশ ভাল হলো। নীলবসনা তড়াক করে বাইকে উঠে বসল। উঠে বলল- -এই লোক, চলেন তাড়াতাড়ি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আমি অবাক হয়ে পিছনে তাকালাম। -আরে তাকিয়ে আছেন কেন? তাড়াতাড়ি চালান। ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বাইক ঘুরিয়ে হেতেম খাঁ মোড়ের দিকে রওনা হলাম। রাস্তায় বিশেষ কথা হলো না। আশা করছিলাম নায়কোচিত এই মুহূর্তটা অন্তত কোন বন্ধু দেখে ফেলুক। বন্ধুমহলে দাম হালকা পাতলা বাড়ে তাহলে। কেউ দেখল না। পথে শুধু একজোড়া বাক্য বিনিময় হলো। -এই হরতালের দিনে মেয়ে মানুষ বাইরে বের হয়েছেন কেন? - টিউশনি করাই তো। নিজ ক্যাম্পাসের সীমানায় ঢুকে নীলবসনা বিড়ালবেশ ছেড়ে বাঘিনীবেশ ধরলেন। আদেশের সুরে হলের দিক নির্দেশনা দিতে লাগলেন। এসে পড়লাম হলের সামনে। নীলবসনা নেমে ধন্যবাদ জ্ঞাপনপূর্বক প্রস্থান করার আগেই প্রশ্ন করলাম- - আপনি কোন ডিপার্টমেন্টে পড়েন ? - চারুকলা, প্রথম বর্ষ। - ও, আপনার নামটা ? -অন্তু। আচ্ছা আপনি কোথায় পড়েন ? - আমি...আমি ইন্টার দিলাম। নীলবসনা গম্ভীর মূর্তি ছেড়ে হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল। হাসি শুরু হলো, শেষ হলো না। “কি ভয়টাই না পেয়েছিলেন তিনি” এই মর্মে বক্তৃতা দিতে থাকলেন। হাসির উজ্জ্বলতা বাড়তে থাকে। একসময় আমাকে হতভম্ব রেখে নীলবসনা প্রস্থান করে। চারপাশে রেখে যায় অদ্ভূত নীল এক উজ্জ্বলতা। সালোক-সংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় সেই নীল আলো আস্বাদন করতে গিয়ে নীলবসনাকে অদ্ভূত একটা তথ্য দেয়া হলো না। আমার নামও অন্তু। ২। কাহিনীর এ পর্যায়ে এসে আমার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ন কিছু তথ্য দেয়া দরকার। বলা হয়ে থাকে এ দেশে মন্ত্রী-এমপি কিংবা রাজনীতিবিদদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি তাদের ভাতিজা-ভাগিনা কিংবা শ্যালক। সেদিক দিয়ে ভাবলে আমি রাজশাহী নগরীর বেশ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন মেয়রের একমাত্র ভাগ্নে। মামা ঝানু রাজনীতিবিদ। বড় শহরগুলোকে রাজনৈতিক মুখ খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হয়, নতুন মুখ আসে। আমার মামার তৎপরতার কারনে তার বিপুল জনপ্রিয়তা ডিঙ্গিয়ে রাজশাহী কখনো নতুন নেতার মুখ দেখে না। মামার হাতের দৈর্ঘ্য জানলেন পাঠক। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক ফেল করতে করতে বেঁচে যাওয়া এই আমি কিভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে গেলাম সেটা বিজ্ঞ পাঠককে আশা করি বলে না দিলেও চলবে। যে বিষয়ে ভর্তি হলাম সেটা হলো চারুকলা। আমাদের ব্যাচ অর্থ্যাৎ চারুকলা ’৯৮ এর ছেলেমেয়েগুলো একেকজন একেক কিসিমের ছিল। সবার বিশেষ বিশেষ অদ্ভূত চারিত্রিক গুনাবলী রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে যে চরিত্রটা আমাকে সবসময় টানত সেটা হলো অন্তু। অন্তু মেয়েটা প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হয়ে আমাদের সাথে পড়ে। আমাদের বিভাগে অকৃতকার্য হওয়া বেশ কঠিন। জানিনা কিভাবে মেয়েটা এই সুকঠিন কার্য সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু এই কাজ সম্পাদনের লজ্জায় সে সারাদিন কুঁকড়ে থাকত। চারুকলা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রানোচ্ছ্বল বিভাগগুলোর একটা। অথচ এই বিভাগে পড়ে মেয়েটা সারাদিন মনমরা হয়ে থাকত। প্রচন্ড দৃষ্টিকটু লাগত ব্যাপারটা। আমার রাগ লাগত ক্লাসের ভদ্রজনতার উপর। আমি সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত, পারতপক্ষে সবাই আমাকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু “নোংরা” রাজনীতি এড়িয়ে চলাদের চোখে কি বিষন্ন মেয়েটাকে পড়ে না? তাদের কি বিবেক বলে না মেয়েটাকে নিজেদের সাথে মিশিয়ে নিতে? কেউ সাহায্য করল না, আমিও না। মেয়েটা নিজের দেয়াল নিজেই একদিন ভাংলো। চৈত্রের শেষ বিকালে ডিপার্টমেন্টের সামনে আলপনা আঁকছিলাম। কোন এক মুহূর্তে জায়গাটা নির্জন হয়ে গিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে শুধু আমরা দু’জন আছি। আমি আড়চোখে বারবার অন্তুকে দেখছি। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে চোখ নামিয়ে নিচ্ছি। অপরাধবোধ কাটতে আমার দু সেকেন্ড লাগে। আবার দেখছি। মেয়েটা গভীর মনযোগ দিয়ে আল্পনা আঁকছে। ওর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আমার এটা প্রথম। চৈত্রতাপে ওর মুখমন্ডল ঘেমে ঘাম নাকের ডগায় এসে জমা হচ্ছে। নিয়মিত বিরতিতে ঝরে পড়ে আল্পনার রঙ বারবার লঘু করে দিচ্ছে। মেয়েটা বিরক্ত হচ্ছে না। বারবার নতুন করে করছে। প্রতিবারই আগের থেকে বেশি যত্ন নিয়ে। একটা অস্বস্তিকর নিরবতা কাজ করছিল। সেটা ও ভাঙল আমি চোরা দৃষ্টি দিতে গিয়ে নবমবার ধরা খাবার পর। -এই ছেলে, তুমি এরকম লুইস প্রজাতির কেন? অসভ্যের মত তাকিয়ে আছো। তুমি জানো না আমি তোমার থেকে বড়? - লুইস প্রজাতিটা কি? - লুইস বুঝো না? সোজা বাংলায় “লুইচ্চা”। আল্লাহর ওয়াস্তে তো টং এর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কোন মেয়েকে রেহাই দাও না দেখি। তোমরা যারা পলিটিক্স করো তারা এমন বখাটে হয়ে যাও কেন? - শুনো, সবকিছুর ভিতর পলিটিক্স আনবা না। আমি ছোটবেলা থেকেই এরকম। -হ্যাঁ, সেটা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। -আমার চেহারা নিয়ে কিছু বললা নাকি? মেয়েটা কিছুক্ষন বিরক্তির সহিত তাকিয়ে থেকে “ এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই” টাইপ একটা দৃষ্টিক্ষেপন করে নিজের কাজে মন দিল। আমি একবার অন্তুর আল্পনার দিকে তাকালাম, একবার নিজেরটা দেখলাম। ওর আল্পনা দেখার পর আমারটা দেখলে মনে হচ্ছে তেলাপোকার পায়ে রঙ মাখিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বৃথা কষ্ট না করে তুলি রেখে চুপচাপ বসে ছিলাম। এতে সে ভাবল আমি মন খারাপ করেছি। - শোন, তাকাবা ভাল কথা, ছেলে হয়ে নিশ্চয় ছেলের দিকে তাকাবা না। কিন্তু ইভটিজিং কেন করো? যখন করো তখন মেয়েটার মনের অবস্থা কি হয় জানা আছে? ইভটিজিং করার আগে মেয়েটাকে একবার নিজের বোন ভাবা যায় না? - নাহ। ; আমি ভেবেচিন্তে জবাব দিলাম। মুহূর্তে তরুনীর করুনার ঝুলি ছিদ্র হয়ে গেল। সশব্দে “হ্যাঠ” জাতীয় একটা ধ্বনি ছুটিয়ে দৃশ্যপট থেকে প্রস্থান করলেন। ৩। কঠিন বজ্জাত লোকেরাও মাঝে মাঝে কিছু কাজ করে অনুতাপে জিহবা কামড়ায়। অন্তুর সাথে আমার পরেরবার যেদিন কনফ্রন্টেশন হলো সেবার সেরকম একটা পরিস্থিতি তৈরী হলো। অন্তু সেদিন নতুন একটা ড্রেস পরে আমার আড্ডাখানা টং এর পাশ দিয়ে হলে ফিরছিল। নতুন কাপড়ের কারনে পিছন থেকে চিনতে না পেরে নবাগতা ভেবে ইভটিজিং করে দিলাম। বিদ্রোহী রমনী আমার কন্ঠ চিনতে পেরেই কিনা কে জানে, তড়াক করে উলটো ঘুরে সাঁই সাঁই করে আমার সামনে চলে এল। আমার আত্মার পানি শুকিয়ে সাহারা-কালাহারি মরুভূমি হয়ে গেল। ভেবেছিলাম মেয়েটা থাপ্পড় দিবে। দিল না। কিন্তু যে ঘৃনার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গেল তা থাপ্পড়ের থেকেও অপমানের। পরবর্তী দু’ঘন্টা মেয়ের পিছু ঘুরঘুর করলাম। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। দুইঘন্টা পর তাকে একা পেলাম। চেহারায় মাছ খেতে গিয়ে ধরা পড়া বিড়ালের দৃষ্টি এনে এগিয়ে গিয়ে মিনমিন করে বললাম -আসলে আমি বুঝি নাই এটা তুমি। সাথে সাথে বিদ্রোহিনী বাঁজখাই কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, - “তুমি” কি? ঐ ছ্যামড়া, সেদিনকার ছোকরা। “তুমি” কি? আমি ক্যাম্পাসে তোর কতদিন আগে থেকে আছি জানিস? সেদিনকার ছোকরা...... - ইয়ে মানে, শোন... - চোপ ! এখন থেকে আপনি করে ডাকবি। বলবি “বড় আপু”। বল কি বলবি? - জ্বী, বড় আপু। - মনে থাকে যেন। আর ভবিষ্যতে কাউকে ইভটিজিং করতে দেখলে এক থাপ্পড়ে বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিব। বেয়াদব কোথাকার! আরো কি কি তিরস্কার করে যেন বিদ্রোহিনী বিদায় নিলেন। আমি পরের কথাগুলো ঠিক ধরতে পারলাম না। এক থাপ্পড়ে বত্রিশ দাঁত ফেলে দেয়া শীর্ষক বক্তব্যে আটকে গিয়ে আপনমনে জিহবা দিয়ে দাঁত গুনতে লাগলাম। সর্বসাকুল্যে আটাশটা দাঁত আবিষ্কার করে বাকি চারটা দাঁতের শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লাম। যা হোক, এরপর মেয়েটার সাথে বহুদিন আর কোন কথা হয়নি। এমন না যে আমি ইভটিজিং ছেড়ে দিয়েছিলাম। বরং একবার ইভটিজিং করে মামলায় ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম হই। অভিভাবকদের হস্তক্ষেপে রেহাই পাই সেবার। এই ঘটনার পর থেকে অন্তুর চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগত। আর এই পুরো ব্যাপারটায় সে ভীষন মজা পেত। আমাকে দেখলেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিত। আর আমারও এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময়ের সংকট হতে লাগল। জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছিল। দলকে সময় দেয়া লাগত। দ্বিতীয় বর্ষে হলের গুরুত্বপূর্ন একটা রাজনৈতিক পদেও ছিলাম। সব মিলিয়ে সময় অল্প। মেয়েটার সাথে আমার দীর্ঘ কথাবিরতির ছেদ যেদিন হলো সেদিন মহাকালের হিসাবে বিশেষ একটা দিন ছিল। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিন। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৯। ঘটনাটা বেশ নাটকীয়। কক্সবাজার শিক্ষাসফর শেষে আমাদের চারুকলা’৯৮ ব্যাচ সকলে রাজশাহী ফিরে যাবার সময় ভুল করে অন্তুকে ফেলে রেখে যায়। আমি একদিন আগেই ফিরে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুর হলে অবস্থান করছিলাম। বন্ধু গুরুস্থানীয় লোক। কথা দিয়েছে বার্মিজ এলকোহল এর স্বাদ এবং অনুভূতির সাথে পার্থিব কোঙ্কিছুর তুলনা নাই। যা হোক, আমার ভার্সিটি বন্ধু আসাদ টেলিফোন মারফত জানাল অন্তু নামক মেয়েটা অসহায়ের মত চিটাগাং শহরের এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর কান্নাকাটি করছে। অন্তু এবং ভাগ্য উভয়কে কঠিন কিছু গালাগালি করে মস্তিষ্কের ভিতর বার্মিজ পানীয়ের আগুনে ছাইচাপা দিয়ে রওনা হলাম। চিটাগাং স্টেশনে যখন অন্তুকে আবিষ্কার করলাম, তাকে দেখে মনে হলো একবেলায় সে শুকিয়ে অর্ধেক হয়েছে। আমাকে দেখে অন্তু মেয়েটা যে চাহনি দিল সেটা ভোলার নয়। দিকহারা নাবিক দিগন্তে চরের রেখা দেখলে হয়ত এরকম চাহনি দেয়। চিটাগং টু ঢাকা জার্নিটা খুব গম্ভীরভাবে কাটল। বার্মিজ এলকোহল পান না করতে পারার আগুন নিভছে না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা বললাম না। টুকটাক ফরমায়েশ খাটা লেগেছে অবশ্য। মেয়েটা শারিরীকভাবে কাব্যিক মানের দূর্বল। নতুন বোতলের মুখ খোলা, চিপস বা চকোলেট প্যাকেটের মুখ খোলা ইত্যাদি নিরীহদর্শন কাজ করতে তার ছুরি কাঁচি-নেইলকাটার বিভিন্ন মারনাস্ত্রের দরকার পড়ে। আপাতত যেহেতু সেগুলা নাই, আমিই পার্টটাইম মারনাস্ত্র হিসাবে কাজ করছিলাম। ইচ্ছা ছিল ঢাকা পৌছেই মেয়েটাকে কোনমতে বাড়ি পৌছে দিয়ে হালকা হবো। ফুসফুসটা অনেক্ষন নিকোটিন পায়নি। অদ্ভূত ব্যাপার হলো মেয়েটা বাড়ি গেল না। সরাসরি আমার সাথে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে উঠে পড়ল। ট্রেনে পাশাপাশি বসাও এক জ্বালা। যে মেয়েটার জন্য বিগত আটঘন্টা ফুসফুস নিকোটিনের ছোয়া পায়নি সে যখন বলে, “ তোমার পাশে বসব না, তোমার গায়ে রিকশাওয়ালাদের মত সিগারেটের গন্ধ” তখন ইচ্ছা করে তেনজিং শেরপার সাহায্য নিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে উপর থেকে লাফিয়ে পড়তে। যা হোক, আমি মেয়েটাকে পরামর্শ দিলাম দাঁড়িয়ে থাকতে। এতে করে সুন্দর একটা ব্যাপার হলো। মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে জানালার পানে মুখ ফিরিয়ে বসে রইল। সারাটাদিন প্রচন্ড ধকল গিয়েছিল। মান অভিমানের এই ক্লান্ত মুহূর্তে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । ঘুম ভাঙল কাঁধে স্পর্শ পেয়ে। চোখ খুলে দেখি অন্তু মেয়েটা কাঁধে মাথা রেখেছে। ঘুমিয়ে আছে হয়ত। তখন মধ্যরাত। মধ্যরাতে অদ্ভূত সব ঘটনা ঘটে। মানুষের মন মানুষকে অদ্ভূত সব স্বপ্ন দেখায়। ভেবে পেলাম না মেয়েটার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি আমার। শেষ যে মুহূর্ত মনে করতে পারি তখন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ চলছিল। বিস্ময়জনিত ঘোর কাটার পর বুঝলাম মেয়েটা আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁপছে। কিছুক্ষন ইতস্তত করে অন্তুর কপালে হাত রাখলাম। যা ভেবেছি তাই। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা চেতনা- অবচেতনার মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। বহুকাল পর হঠাৎ সেই গভীর রাতে ডিসেম্বরের সর্পিল শীতল বাতাস কেটে ছুটে চলা রাতের ট্রেনে আমি হঠাৎ প্রচন্ড অসহায় বোধ করলাম। ব্যাকপ্যাক থেকে একটা ব্ল্যাঙ্কেট বের করে অন্তুকে জড়িয়ে দিলাম। জানালা দিয়ে বাইরের আবছা আলো আঁধারির আকাশ দেখা যায়। পাশের কোন বগিতে একদল তরুন সশব্দে তৃতীয় সহস্রাব্দকে বরন করে নিচ্ছে। মহাকালের বিশেষ এই ক্ষনে ট্রেনের ভিতর জ্বলতে থাকা আবছা আলোয় ধবধবে সাদা কম্বল মোড়ানো আমার কাঁধে মাথা রাখা তরুনীকে আমার গ্রীক দেবী বলে ভ্রম হয়। (চলবে) - নাজমুস সাকিব অনিক


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ২য় পর
→ পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ১ম পর্ব
→ পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ- শেষ পর্ব (সম্পূর্ণ)
→ পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ২য় পর্ব
→ পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারঃ ১ম পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now