বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
#পুরনো_ভূত
#পর্ব_পনের
ওটা কি? কেঁদে ফেলবে যেন মুসা। এসব ভূতুড়ে কান্ডকারখানা আর সহ্য করতে পারছে না সে।
নড়ছে চোখ গুলো। হয়ে গেল কমলা রঙের দুটো লম্বা ফিতে। পিঠের মতো দেখতে লাগছে, আর দুটো হাত।
একজন মানুষ! চিৎকার করে বললেন প্রিন্সিপ্যাল।
ডাক্তার আর তিনি দু'জনেই উঠে দৌঁড় লাগালেন সৈকতের দিকে। ঝপঝপ করে নেমে পড়লেন পানিতে। ছেলেরা দেখলো, একটা মূর্তির ওপর ঝুঁকলেন দু'জনেই। তারপর সোজা হলেন। বয়ে আনতে লাগলেন পুরুষের একটা ভারি ক্যানভাসের জ্যাকেট।
ও, জ্যাকেট, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মুসা। সেফটি রিফ্লেক্টর স্ট্রিপ লাগানো। ওগুলোই জ্বলছিলো।
হ্যাঁ, জ্যাকেট, গম্ভীর হয়ে বললেন প্রিন্সিপ্যাল। কিন্তু তাকিয়ে দেখ ভালো করে।
জ্যাকেটের অনেক জায়গায় ছেঁড়া। ফুটোফাটাও রয়েছে। আর রয়েছে কালচে দাগ। জিনিসটা রবিনের হাতে দিলেন তিনি।
সর্বনাশ! একাজ কে করলো? রবিনের প্রশ্ন।
দাগ গুলো তো মনে হয় রক্তের, বললো মুসা। হাঙরের কাজ! বেশ বড় হাঙর। সাদা দানবগুলো।
তুমি বলতে চাইছো জ্যাকেটের মালিককে খেয়ে ফেলেছে হাঙরটা? রবিনের গলা কাঁপলো।
আমারও সে-রকমই লাগছে, জবাবটা দিলেন ডাক্তার।
হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলো রবিন। একটা পকেটের জিপার খুলে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলো। বের করে আনলো রূপালী একটা জিনিস। সিগারেট লাইটার। গাড়ির কোম্পানির নাম লেখা রয়েছে। জাগুয়ার।
মিস্টার ডেনমার বোরিনস, কিশোর কথা বললো এতোক্ষণে। কার ডিলার ছিলেন। গাড়ির ব্যবসা করতেন।
বোরিনস? চিনতে পারলেন না ইংমার।
যার বোটটা পেয়েছি আমরা, ঢোক গিললো মুসা। পুলিশ অনেক খুঁজেছে তাকে। পায়নি।
জ্যাকেটটা তারও হতে পারে, রবিন বললো।
মিসেস বোরিনস বলেছিলেন, মনে করলো কিশোর। তার স্বামী পকেটে সবসময় একটা টু-ওয়ে রেডিও রাখতেন। জ্যাকেটটা নিয়ে পকেট হাতড়াতে শুরু করলো সে। পেলো না। ঠিক আছে, রেখে দাও। কাল পুলিশকে দেখাবো।
আজকেই নয় কেন? কিশোর।
প্রিন্সিপ্যাল যোগ দিলেন ওদের কথায়, সবাই যার যার বোট নিয়ে চলে গেছে। রয়েছে শুধু আমারটা। ইংমারের নেই। ছোট একটা বোটে করে এতগুলো মানুষ যাওয়া ঠিক হবেনা এখন। সাগরের অবস্থা ভালো না। সকালেই যাবো না হয়।
আর ডন যখন চলে গেছে, কিশোর বললো, আজ রাতে আর কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। আপনার আর রবিনের পাহারা দেয়া হয়ে গেছে। আমার আর মুসার বাকি। তা-ই দেবো।
দাও, ডাক্তার বললেন। আমরা গিয়ে ঘুমোই। দরকার হলে ডেকো।
তাঁবুতে ফিরে এলো তিন গোয়েন্দা। কম্বল নিয়ে বেরোতে যাবে কিশোর, জিজ্ঞেস করলো রবিন, কিশোর, ডন যদি এসব না করে থাকে, কে করলো?
এই দ্বীপে আর কে আছে? মুসার প্রশ্ন। ডক্টর ইংমার, প্রিন্সিপ্যাল স্যার আর আমরা বাদে?
নেই, স্বীকার করলো কিশোর। শুধু আমরা আর দুই র্যাগনারসন বাদে।
পরস্পরের দিকে তাকালো ওরা। ওয়াকি-টকিটা বের করে নিয়ে কম্বল কাঁধে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো কিশোর। আগুনের কাছে এসে বসলো। অনেক কমে এসেছে আগুন। এদিকে শীত বেড়েছে।
ভোর পাঁচটায় উঠে এসে কাঁপতে কাঁপতে আগুনের পাশে বসলো মুসা। সকাল সাতটায় গিয়ে জাগালো কিশোর আর রবিনকে।
খিদে পেয়েছে, ঘোষণা করলো সে। নাস্তার কি খবর?
গুঙিয়ে উঠলো রবিন আর কিশোর। আবার মাথা ঢোকালো স্লীপিং ব্যাগের মধ্যে।
কথাটা মনে পড়লো রবিনের। মাথা বের করলো আবার। মুসা, রাতে আর কিছু ঘটেছে?
না, জানালো সে। ভালোই হয়েছে আমার জন্যে।
বাপরে বাপ, কি ঠান্ডা! ব্যাগের ভেতর থেকে বললো কিশোর। হাড় পর্যন্ত জমে গিয়েছিলো। এখনও গরম হয়নি। এই, যাও তো, সরো। ঘুমাতে দাও।
জ্যাকেটটা পুলিশের কাছে নিয়ে যাবে না? রবিন জিজ্ঞেস করলো। ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এসে জুতো পরতে শুরু করলো।
টেপ রেকর্ডারটা ডনের কি না তা-ও জানা দরকার, মুসা বললো।
চাপা একটা গোঙানি দিয়ে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এলো কিশোর। হাই তুললো। হাত টান টান করে আড়মোড়া ভেঙে শরীরের জড়তা দূর করার চেষ্টা করলো। ঠিক, বলে হাসলো সে। চলো, আগে খেয়েই নিই।
হ্যাঁ, এইবার মগজ চলছে তোমার ঠিকমতো, খুশি হয়ে বললো মুসা।
তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো তিনজনে। কাঠ আর কয়লা ফেলা আগুনটাকে উস্কে রেখেছে মুসা। বাতাস পড়ে গেছে। দ্বীপের ওপর এসে আবার ভিড় জমানোর চেষ্টা করছে কুয়াশা, তবে ঘন হতে পারেনি এখনও, হালকাই রয়ে গেছে। সূূর্যের মুখ দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, বৃথা চেষ্টা। সফল হয়ে পারবে না কুয়াশা। রোদের মতোই উজ্জ্বল হাসি হেসে তাদেরকে স্বাগত জানালেন প্রিন্সিপ্যাল। আগুনের পাশে বসে আছেন তিনি।
কি খাবে? মাংস ভাজা? হট ডগ? গরম কোকা? প্যানকেক?
সব খাবো, জানিয়ে দিলো মুসা।
ইচ্ছেটা তার মুখ দিয়ে বেরোলো বটে, কিন্তু খাওয়ার বেলায় দেখা গেল কেউই কম খাচ্ছে না। এমনকি প্রিন্সিপ্যালও গোগ্রাসে গিলছেন। দ্বীপের খোলা বাতাস আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা খিদে বাড়িয়ে দিয়েছে সবারই।
কাল রাতে আর কিছু ঘটেনি তো? ফ্রাইং প্যানে করে টিনের মাংস গরম করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন ডেভিড।
না, স্যার, জবাব দিলো মুসা।
ডন নেই তো দ্বীপে, বললো আরেকটা কণ্ঠ, তাই।
মোটেও খুশি মনে হলো না ডক্টর ইংমারকে। ছেলের এই বদনাম সইতে পারছেন না। গম্ভীর হয়ে আছেন। বসে পড়লেন আগুনের পাশে। হাত গরম করতে শুরু করলেন।
ওটা একটা ব্যাখ্যা বটে, কিশোর বললো। তবে শুধুই সম্ভাবনা। ঠিক না-ও হতে পারে। কাল রাতে অনেকেই আমরা দ্বীপে ছিলাম। টেপ রেকর্ডারটা পাওয়ার পরও ছিলাম। ওটা পাওয়ার পর ভয় দেখানোর বৃথা চেষ্টা আর করতে যাবে না সেই লোক। অন্তত একই রাতে তো নয়ই।
আসলে, ডন ছিলোনা বলেই আর কিছু ঘটেনি।
আপনারা শিওর?
চুপ করে ভাবতে লাগলেন দু'জনে।
অবশেষে প্রিন্সিপ্যাল বললেন, আমি শিওর। যতোবার ভূত দেখা গেছে, কিংবা নেকড়ের ডাক শোনা গেছে, ডন দ্বীপে ছিলো।
কিন্তু জিনিস যখন চুরি হয়েছে, ডাক্তার বললেন। সে তখন এখানে ছিলো না।
তাতে কিছু বোঝা যায় না, ফ্রাইংপ্যানটা আগুনের ওপর থাকে সরিয়ে আনলেন প্রিন্সিপ্যাল। কখন ওগুলো চুরি হয়েছে বলতে পারবোনা আমরা।
মাথা ঝাঁকিয়ে বোধহয় একমতই প্রকাশ করলো কিশোর। চুপ করে বসে রইলো সবাই। প্যানে ডিম ভাজতে লাগলেন ডেভিড। কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কি করবে তোমরা?
মেইন ল্যান্ডে ফিরে গিয়ে ডনের ব্যাপারে তদন্ত চালাবো, জবাব দিলো কিশোর। জ্যাকেটটা নিয়ে যাই, কি বলেন? পুলিশকে দেখাব। মিসেস বোরিন্সের সাথেও দেখা করবো। সময় বেশি নেই। যত তাড়াতাড়ি পারি ছবিগুলো আরেকবার পরীক্ষা করে দেখতে চাই।
বেশ, ডিমের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন প্রিন্সিপ্যাল। সতর্ক রয়েছেন। বেশি তাপ লাগলে পুড়ে যাবে। সাগরকে অনেক সময় কেয়ারই করতে চায় না লোকে! অবাকই লাগে আমার ভাবতে! অথচ কি বিশাল! বিপজ্জনক! বিপদের কথা বেমালুম ভুলে যায় ওরা!
কিশোরকে জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার, ডন কিসে জড়িয়েছে, বল তো?
মাথা নাড়লো কিশোর। এখনও জানিনা। তবে দ্বীপ থেকে যে সবাইকে তাড়াতে চেয়েছে এটা ঠিক।
তাহলে কাল রাতে সে নিজে চলে গেল কেন? মেনে নিতে পারছে না এখন রবিন।
সেটা আমাকেও অবাক করেছে নথি। ও চলে যাওয়ার কথা বললে রীতিমতো চমকে গিয়েছিলাম আমি। হয়তো কোনো ব্যাপারের পরিবর্তন হয়েছে।
মাংস ভাজা খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সবার প্লেটে ডিম তুলে দিলেন প্রিন্সিপ্যাল। মজা করেই খেল সবাই। একমাত্র ইংমার বাদে। ছেলের জন্যে দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। আগুনের আর দরকার নেই। নিভিয়ে ফেলা হলো। কাপ-প্লেটগুলো ধুতে সাহায্য করলো তিন গোয়েন্দা। তারপর সবাই গিয়ে উঠলো প্রিন্সিপ্যালের মোটরবোটে।
জিনিসপত্র সবই থাক, তিনি বললেন। রহস্যটার সমাধান হয়ে গেলে আবার হয়তো আসতে চাইবে লোকে। তখন প্রয়োজন পড়বে। আর যদি না আসে, তখন দেখা যাবে। এসে নিয়ে যেতে পারবো।
কুয়াশার চিহ্নও নেই। ঝলমলে রোদ উঠেছে। পরিষ্কার সুন্দর একটা দিন। বাতাস পড়ে গেলেও সাগরের ঢেউ কমেনি। এই একটা জিনিস অবাক লাগে মুসার। ঢেউয়ের সঙ্গে যে কিসের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক, জন্মের পর থেকেই সাগরের তীরে বাস করেও আজও আবিষ্কার করতে পারেনি সে। একেক সময় তার মনে হয় সাগরের রহস্য ভেদ করা বুঝি মানুষের সাধ্যের বাইরে। বড় বড় ঢেউয়ে ভীষণ দুলছে বোট। ভয় হতে লাগলো, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে না শেষে ডুবেই যায়!
ডুবলো না! ডকে পৌঁছালো নিরাপদেই। পাবলিক ডকে সারি সারি মোটরবোট বাঁধা রয়েছে। সেদিকে হাত তুলে ইংমার বললেন, ওই যে, ডনের বোট। চুরি করে আর দ্বীপে ফিরে যায়নি।
বোটটা বাঁধতে ভাইকে সাহায্য করলেন তিনি।
দু'জনকেই ধন্যবাদ জানিয়ে, সাইকেল র্যাকের দিকে এগোলো তিন গোয়েন্দা।
কি করবো এখন, কিশোর? মুসা জানতে চাইলো।
তুমি আর রবিন ডনের কটেজে চলে যাও, নির্দেশ দিলো গোয়েন্দাপ্রধান। ওর ওপর কড়া নজর রাখবে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও গেলে পিছু নেবে।
যদি ওখানে না থাকে? রবিন জিজ্ঞেস করলো।
ওর ফেরার অপেক্ষা করবে।
তুমি কি করবে? মুসা জিজ্ঞেস করলো।
মিসেস বোরিন্সের সাথে দেখা করতে যাবো। তারপর যতো তাড়াতাড়ি পারি চলে আসবো তোমাদের কাছে।
সাইকেল নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল রবিন আর মুসা। টেলিফোন বুক থেকে মিসেস বোরিন্সের ঠিকানা বের করতে চললো কিশোর। পাওয়া গেলো সহজেই। ডনের কটেজটা সৈকতে, শহরের এক প্রান্তে। আরেক প্রান্তে, তার উল্টো দিকে পাহাড়ের ওপর বোরিন্সের বাড়ি। মরেছি! আপন মনেই গুঙিয়ে উঠলো কিশোর। বহুদূর সাইকেল ঠেঙাতে হবে! তার ওপর পাহাড়ী পথ....!
কিন্তু কি আর করা! যেতে যখন হবেই.....
সরু গিরিপথ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে চলেছে সে। হাঁপাতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। পথ বেশ খাড়া। বাদামী পর্বতের পাদদেশে দেখা যাচ্ছে র্যাঞ্চের মতো বাড়িটা। অনেক পুরনো বাড়ি, নতুন করে মেরামত করা হয়েছে। বিশাল বাড়ির সামনে ছড়ানো সবুজ লন। গাছপালায় ঘিরে রেখেছে। আশেপাশে অনেক চাষের জমি। নিয়মিত চাষ করা হয়, দেখেই বোঝা যায়।
চড়াই শেষ হলো। এবার উৎরাই। এই ঢালটা পেরোলেই পৌঁছে যাবে বাড়িটাতে। ওঠার সময় গতি খুব ধীর ছিলো, নামার সময় সেটা পুষিয়ে নেয়া যাবে ভেবে খুশি হয়ে উঠলো কিশোর।
ঠিক এই সময় চোখে পড়লো বোরিন্সদের ড্রাইভওয়ের ঢাল বেয়ে যেন পিছলে নেমে আসছে একজন মোটর সাইকেল আরোহী।
ডন র্যাগনারসন!
(চলবে......)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now