বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পুরনো_ভূত
#পর্ব_চৌদ্দ
মুমূর্ষু আগুনের সামনে বসে বরফের মতো যেন জমে গেল রবিন।
আবার শোনা গেলো চিৎকার। বুনো, জোরালো, বুকের মধ্যে কাঁপন জাগায়। নেকড়ের ডাকের মতো। না, না, সিনেমায় দেখা নেকড়ে-ভূত, মায়া নেকড়ের মতো! ওয়াকি-টকিতে ডাকলো সে, কিশোর! মুসা! জলদি ওঠো!
আবার শোনা গেলো ডাক!
সত্যিই কি মায়া নেকড়ে!
গায়ে কাঁটা দিলো রবিনের। আগুনে কাঠ আর কয়লা ছুঁড়ে দিলো। ভীষণ ঠান্ডা পড়েছে। কম্বলের মধ্যে গুটিসুটি হয়ে বসেও শীত লাগছে তার। তবে গায়ের কাঁপুনিটা হয়তো বাড়িয়ে দিয়েছে ওই ডাক।
ও-ওটা কি?
বেরিয়ে এসেছে মুসা। গায়ে কম্বল জড়ানো। খাদ্য পেয়ে আবার বাড়তে শুরু করেছে আগুন। রবিনের পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে পড়লো সে।
আ-আমি.....আমি জানি না!
মিস্টার ডেভিড বেরিয়ে এলেন। গায়ে হরিণের চামড়ার চুমাশ শার্ট। হাতে রাইফেল।এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। এই ডাকই শুনেছি গত দু'রাতে। কোথা থেকে আসছে আন্দাজ করতে পারো?
যেন প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কথা কানে গেল ভূতটার। বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জনকে ছাপিয়ে আবার শোনা গেল ওটার চিৎকার। ভয়াবহ, রোমাঞ্চকর।
একসাথে দ্বীপের পশ্চিম দিকে ঘুরে গেলো তিন জোড়া চোখ। বিশাল টিলাটার ওদিক থেকে এসেছে।
ওখানেই কোথাও। রবিন বললো। আরও কিছু কাঠ আর কয়লা ফেললো আগুনে। আবার জেগে উঠলো আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো। একটা জায়গা থেকেই আসছে। সরছে না।
হ্যাঁ, একমত হলেন প্রিন্সিপ্যাল।
যেখানে ক্যাপ্টেনের ভূতটাকে দেখেছি! বিড়বিড় করলো মুসা।
তাদের পেছনে এসে দাঁড়ালো কিশোর আর ডক্টর ইংমার। ডাক্তারের পরনে সোয়ের স্যুট, হাতে রাইফেল।
জাহাজের ক্যাপ্টেন কখনো নেকড়ের মতো চিৎকার করে না, সেকেন্ড, কিশোর বললো। আর এই দ্বীপে তো দূরের কথা, সমস্ত দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াতেও কোথাও বুনো নেকড়ে নেই।
আবার শোনা গেল ভয়ংকর ডাক।
ওই যে! নিজের কানকে ও বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা।
বড় টিলাটার কাছেই মনে হচ্ছে। ডাক্তার শুনে বললেন।
মাথা ঝাঁকালো কিশোর, হ্যাঁ, ওদিক থেকেই এসেছে।
এক-আধটা নেকড়ে-টেকড়ে ওখানে আটকা পড়েনি তো? ইংমারের জিজ্ঞাসা। কোনোভাবে হয়তো এসে পড়েছিলো....
আসম্ভব! মাথা নাড়লো কিশোর। নেকড়ে এখানে আসতেই পারে না!
আসল নেকড়ে পারে না, মুসা বললো। জ্যান্তগুলো। কিন্তু ভূতেরা পারবে না কেন? তাদের কোথাও যেতে বাধা নেই। ক্যাপ্টেন কুলটারের মতো।
একটা কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, মুসা, ওগুলো যে হোক, বা যা-ই হোক ওই ভূত আর নেকড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে কোনো বিশেষ একটা উদ্দেশ্যে, ডাক্তারের দিকে তাকালো গোয়েন্দাপ্রধান। আপনার ছেলে কোথায়?
ইয়ে, থতমত খেয়ে গেছেন ডাক্তার। শেষবার দেখেছি.....
এই যে, আমি, মোটোরাম।
নামটা পিত্তি জ্বালিয়ে দেয় কিশোরের। তার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে ওই একটা সম্বোধনই যথেষ্ট। কিছুতেই মনে করতে চায় না সে এই নাম। এটা তার জীবনের একটা দু:স্বপ্ন (পাগল সংঘ দ্রষ্টব্য)। ঝট্ করে ঘুরে তাকালো সে।
আগুনের আলোয় এসে দাঁড়ালো ডন র্যাগনারসন, বাবার পেছনে। যে দুই জোড়া দম্পতি দ্বীপে রয়ে গেছে, তারাও বেরিয়ে এসেছে তাঁবু থেকে। আরেকবার নেকড়ের ডাক শুনে কেঁপে উঠলো মহিলা দু'জন।
অন্যের কথা বলতে পারবো না, একজন মহিলা বললো। তবে আমার যথেষ্ট হয়েছে। আমি আর থাকছি না এখানে। যা খুশি ঘটুকগে, আমি পালাবো।
চলো, এখুনি চলে যাই, তার স্বামী বললো।
চলো। দাঁড়াও, ব্যাগটা গুছিয়ে আনি।
আমিও থাকবো না। দ্বিতীয় মহিলা বললো।
হাত তুললো কিশোর। এতো অস্থির হবেন না। এই ডাকের স্রষ্টা কোনো নেকড়ে নয়। আপনাদের ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করছে কেউ।
এবং তাতে সফল হয়েছে সে, বললো দ্বিতীয় মহিলার স্বামী। এখানে আনন্দ করতে এসেছিলাম আমরা, ভয় পেতে নয়।
সকাল পর্যন্ত থেকেই দেখুন না, অনেকটা অনুরোধের সুরে বললো কিশোর। আমি বলছি, খারাপ কিছু ঘটবে না। কাল সকালে আমরা ওই সূত্রের উৎস খুঁজে বের করবো। ভূতগুলো আসে কি, বোঝার চেষ্টা করবো।
ডন বললো, আমি আর থাকতে রাজি না। চলেই যাবো।
তার কথায় অবাক না হয়ে পারলো না কিশোর।
কিশোরের সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন প্রিন্সিপ্যাল। এখনি গিয়ে দেখা দরকার, কিসে ওরকম শব্দ করছে। কিশোর ঠিকই বলেছে। এই দ্বীপে নেকড়ে, বাঘ নেই।
যদি কেউ এনে ছেড়ে দিয়ে না থাকে, ডন বললো।
তা-ও নয়! কিশোর বললো। ভালোমতো ভেবে দেখ। একটা জায়গা থেকেই আসছে চিৎকার। নড়ছে না, সরছে না। সত্যিকারের নেকড়ে হলে ওভাবে এক জায়গায় থাকতো না। খাবারের জন্যে ডাকাডাকি করে নেকড়ে। এই দ্বীপে খাবার কোথায়? নেকড়ের নেচারাল খাবার নেই। পেতে হলে তাকে মানুষের কাছে আসতেই হবে, তার মানে তাঁবুর কাছে।
তাহলে হয়তো আসল নেকড়ে নয়। অন্য কিছু।
হ্যাঁ, তাই। গলা মিলিয়ে বলে উঠলো এক মহিলা। ভূত! আমি বাপু আর একটা মুহূর্তও থাকছি না!
বেশ, আর কেউ না যেতে চাইলে নেই। প্রিন্সিপ্যাল বললেন। আমি ছেলেদেরকে নিয়ে যাবোই। আমরা ফিরে আসাতক অন্তত থাকো। ইংমারের কাছে রাইফেল আছে। সে তোমাদেরকে পাহারা দেবে।
ফিরে আসতে পারেন কিনা দেখেন! নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করলো ডন।
দম্পতিরা কোনো মন্তব্য করলো না। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে টর্চ হাতে রওয়ানা হয়ে গেলেন প্রিন্সিপ্যাল। চারজনে আবার এগিয়ে চললো টিলাটার দিকে। বাতাসের বেগ আরও বেড়েছে। চাঁদ ডুবে গেছে। রাত্রি এখন অন্ধকার। শাঁই শাঁই করে বাতাস বইছে, ঝাপটা মারছে টিলার গায়ে। পাথরের ওপর এসে আছড়ে ভাঙছে ঢেউ। তারার আলোয় ঝিকমিক করছে সাদা ফেনা।
আবার ডাকলো নেকড়ে। সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল ওরা। টর্চের আলোয় বার বার দু'বার ঘড়ি দেখছে কিশোর।
দুই মিনিট পরপর ডাকছে, হিসেব করে বললো সে। বেশ নিয়মিত। কোনো জানোয়ারই এরকম সময় মেপে ডাকে না।
গাছশূণ্য এলাকা ধরে হেঁটে চলেছে দলটা। সবার হাতে টর্চ। আলোকরশ্মি নাচানাচি করছে এখানে ওখানে। যেন রহস্যময় শব্দকারীকে বিদ্ধ করার জন্যে।
আবার শোনা গেলো চিৎকার।
ওদিকে! টিলার উত্তর দিকে দেখালো রবিন।
আবার চিৎকার।
খাইছে! এগিয়ে আসছে তো! হাতের টর্চ কেপে উঠলো মুসার।
রাইফেলে শক্ত হলো প্রিন্সিপ্যালের হাতের আঙুল।
আরেকবার হলো চিৎকার। একেবারে ওদের সামনেই।
থমকে দাঁড়ালো চারজনেই। সামনের অন্ধকারের দিকে নজর। টিলার উত্তর ধারে পৌঁছে গেছে। ওদের নিচে সরু একচিলতে সৈকত। দশ মাইল দূরে মূল ভূখন্ড।
সৈকত থেকেই ডাকটা এলো মনে হলো, আরেকবার। কিন্তু ঠিক কোন জায়গাটা থেকে, বোঝা গেল না।
সবাইকে ছড়িয়ে পড়ে খোঁজার নির্দেশ দিলো কিশোর।
অস্বস্তি বোধ করছে সবাই। তবে ছড়িয়ে পড়লো। অপেক্ষা করছে আরেকবার ডাক শোনার। দুই মিনিট পেরোলো। এইবার মনে হলো ওদের একেবারে কানের কাছে ডেকে উঠেছে।
ওই যে! বলে উঠলেন প্রিন্সিপ্যাল।
এই তো! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা।
টিলার নিচে, ওটার দিকে মুখ করে সৈকতের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। ঝুঁকে একটা খুদে যন্ত্র তুলে নিলো।
টেপ রেকর্ডার, দেখে বললো কিশোর। প্রতি দুই মিনিট পরপর রেকর্ড করা হয়েছে নেকড়ের ডাক। ক্যাসেটের ফিতে ঘুরছে আর শব্দ হচ্ছে। বাড়িয়ে ধরলো ওটা। এই যে, স্যার, আপনার নেকড়ে।
মাথা ঝাঁকালেন প্রিন্সিপ্যাল। ঠিক এরকম একটা টেপ রেকর্ডার দেখেছি ডনের কাছে।
অনেকের কাছেই আছে এই মডেল। ওটা ওর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নয়।
তা নয়। তবু ওকে জিজ্ঞেস করা উচিত।
তাড়াহুড়ো করে ফিরে এলো ওরা। আগুনের কাছে একা বসে রয়েছেন ডক্টর ইংমার। মুখ তুলে বললেন, সবাই চলে গেছে। কেউ থাকলো না।
একটা টেপ রেকর্ডার, ইংমার, প্রিন্সিপ্যাল বললেন। মায়া নেকড়ে তো দূরের কথা, সাধারণ নেকড়েও নয়। দ্বীপ থেকে মানুষগুলোকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর জন্যেই এই কাজ করেছে। ঠিকই সন্দেহ করেছিলো কিশোর।
কিন্তু কেনো, ডেভিড? কেনো এই দ্বীপ থেকে মানুষকে তাড়াতে চাইবে কেউ? কি দরকার তার?
সেটাই জানার চেষ্টা করবো আমরা, জবাব দিলো কিশোর। ডন কোথায়?
সবার সঙ্গে চলে গেছে।
চলে গেছে? হাঁ হয়ে গেল রবিন। তার মানে ডন আমাদের দ্বীপ থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করেনি। হয়তো....
এই, দেখ দেখ, চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। পানিতে দেখ!
সবাইই দেখলো। আগুনের আলো খাঁড়ির পানিতে গিয়ে পড়েছে।
সেখানে দেখা গেল জ্বলজ্বল করে জ্বলছে তিনটে কমলা রঙের চোখ। যেন ওদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
(চলবে.....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now