বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রাস্তার পাশেই ঝোপঝাড়ে খস খস আওয়াজ হচ্ছে ছোট গাছের পাতা গুলোর। মোবাইলের টর্চ মেরে জিজ্ঞেস করলাম কে ওখানে, কে? লোকটা দৌড়ে পালিয়ে গেল,এলোমেলো কাপড়ে মহিলাকে দেখে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। কি বলব বুঝতে পারছিনা। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বসে আছে মহিলা, কাঁদছে আর কাপছে খুব। কে আপনি? জিজ্ঞেস করলাম। মাথা তুলে তাকালো একটু,কিছু না বলেই আবার মাথা নিচু করে নিল। ভাত হবে? খুব ক্ষুদা লেগেছে। মৃদুস্বরে বললেন উনি। এখন রাত ১০ টা বাজে,রাস্তায় ভাত পাব কোথায়? ফোন দিলাম মা কে,লাউড স্পিকার দিয়ে বললাম আমার সাথে একজন মেহমান নিয়ে আসতেছি। উঠুন,চলুন আমাদের বাড়িতে। মাকে জানিয়ে দিয়েছি। উনি কিছু না বলে হাটতে লাগলেন আমার সাথে। রাস্তায় প্রশ্ন করতে চাইলাম অনেক, কিন্তু কোনো কথাই বললামনা ইচ্ছে করেই। ক্ষুদা লাগলে মেজাজ কেমন লাগে তা অল্প হলেও বুঝি আমি। এদিকে ভয় ও লাগছিল,গ্রামের মানুষ দেখলে কি না কি রটে বেড়ায়।
,
__কে উনি? (জিজ্ঞেস করলো মা)।
__চিনিনা,পথ হারিয়ে ফেলতে বসেছিল,কিছুটা সাহায্য করার চেষ্টায় আমি,ওনার নাকি ক্ষুদা লেগেছে খুব,তাড়াতাড়ি ভাত দাও তো। (মা এর সামনে ওনার এক্সাক্ট অবস্থা টা বলতে পারিনি,তবে সত্যই তো পথ হারাতে বসেছিলেন তিনি,সত্যের পথ)।
,
মা,আর আমার দুইজনের ভাত তরকারী আজ আমরা তিনজন মিলে ভাগাভাগি করে খেলাম। ওনার খাওয়ার ভাব দেখে মা ও বুঝতে পারল ওনার ক্ষুদা লেগেছিল খুবেই তাই খাওয়ার সময় কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলেননা মা। খাওয়া শেষ, রাত তখন ১১ টা...
,
উনি নিজেই বলতে শুরু করলো,আমি পারুল। হিন্দু পরিবারে জন্ম আমার। তন্বী রায় নামে আমার ছোট্ট এক মেয়ে আছে। বয়স ৪ বছর। আমি,আমার মেয়ে,শশুড় শাশুড়ী সহ একসাথেই থাকি। আমার স্বামী প্রায় ৫ বছর থেকে নিখোঁজ। জানিনা কোথায় আছে,বেচে আছে কি মরে গেছে। শশুর শাশুড়ী উভয়েই বৃদ্ধ। শশুর প্রায় ৬ মাস থেকে বিছানায় পড়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল পারুল। পারুল আপা বলি। যেহেতু উনি আমার বয়সে বড়। মা জিজ্ঞেস করলেন,"পরিবার চলে কিভাবে? চলে যায় কোন বেলা খেয়ে,কোনো বেলা না খেয়ে। অন্যের বাড়ীতে কাজ করে ৪ জনের ভাত হয়না,ভাগাভাগি করে খেতে হয় তবুও। তরকারি ভাল না হলে তন্বী মা আমার খেতে চায়না,এইলা তকারি দিয়া ভাত খাইমনা। ডিম ভাজি দিয়া ভাত খাইম। ওর কথা শুনে বুক টা মোচড় দিয়ে উঠে,উঠবেনা বলুন? ছোট্ট মেয়ে আমার,মন চাইলেও একটু ভাল কিছু খাওয়াতে পারিনা। এদিকে শশুরের ঔষধ...চোখে ছল ছল করছে পানি। অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিতে পারতেন,বলল মা। উনি আবারো বলতে শুরু করলেন,হ্যা বিয়ে করে নিতে পারতাম। কিন্তু তন্বীর দাদা দাদীর কি হবে? এই ভেবে অন্য জায়গার কথা মাথায় নিইনি। আমি ওনাদের আশির্বাদ চাই। রাত ১১টা ৩০...। আমি ঘুমাতে এলাম আমার রুমে। পারুল আপা রইল মায়ের সাথে। রাতে অনেক প্ল্যান আসছে মাথায়। দেখা যাক কি হয়।
,
সকাল ৯ টায় খেতে বসলাম আমরা। কি রে আজকের রান্না কেমন হয়েছে? জিজ্ঞেস করল মা। বেশ ভালয় তো হয়েছে,বললাম আমি। আজকে তোর পারুল আপা রান্না করেছে বলে কথা। ওরে হায়, সুন্দর তো। মা বলল,খেয়ে রেডি হ,পারুলদের বাড়ি যাব এখন। পাশের জেলাতেই ওর বাড়ি।
,
যাচ্ছি একসাথে,কিছুটা খুশি লাগছে। আপাকেও বেশ প্রফুল্ল মনে হচ্ছে। ঐ যে ঐ বাড়িটা দেখতে পাচ্ছেন ঐটায় আমাদের বাড়ী। মাকে বললাম,তুমি আপার সাথে যাও। আমি কিছুক্ষন পর আসছি,বলেই যে ভ্যানে যাচ্ছিলাম সেই ভ্যানেই আবার ঘুরে আসলাম বাজারের দিকে। ভ্যানওয়ালা ভাই এর সাথে কথায় কথায় কথা উঠলো পারুল আপাকে নিয়ে,উনি চিনেন আপাকে,একই গ্রামের। ওনার মুখেও শুনলাম আপার পরিবারের অবস্থা সম্পর্কে। ৫০কেজি ওজনের চালভর্তি ৬ টা বস্তা কিনে ভ্যানে তুললাম,সাথে নিলাম সেলাই মেশিন সেট সহ। ভ্যানওয়ালাকে বললাম,এবার চলুন পারুল আপাদের বাড়িতে। উনি বললেন,এগুলো কি দিদির জন্য? জ্বি ভাই।
,
ভ্যানওয়ালা ভাই এর সাহায্য নিয়ে দুইজনে বস্তা গুলো আপার বাড়িতে নিয়ে গেলাম,সাথে সেলাই মেশিন টাও। (এটাই ছিল গত কাল রাতের প্ল্যান আমার,আপাকে সাহায্য করা)। অই যে অইটা তোমার মিশুক মামা,তন্বীকে দেখিয়ে দিল পারুল। তন্বী দৌড়ে এলো, মাম্মা কেমন আছো? ৪ বছর বয়স ওর। এই বয়সের বাবু গুলা আসলেই কিউট হয়,ওরে সে কি কিউট করে আমায় মাম্মা ডাকছে।আসার পথে চকলেট নিতে মোটেও ভুলে যাইনি। অনেকগুলা চকলেট ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম। একটা খুলে দিয়ে বললাম,মামা এটা চককেত। ইয়াম্মি,খুব মজা,খাও। এরই মাঝে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছে পারুল আপার বাসায়। মা ওদের সাথেও কথা বলল। আমিও বললাম। বেশ ভাল লাগল। ওনাদেরকে বললাম,পারুল আপাকে যদি বাড়ীতে/খলাতে মুদিখানার দোকান ধরিয়ে দেয়া যায় (নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য গুলো বিক্রির জন্য) তাহলে কেমন হয়? ওনারা বললেন,বেশ ভালয় হবে। আশেপাশে তো তেমন দোকান ও নেই। এখানে দোকান হলে ভালয় হবে,সেলাই এর কাজের চাপ থাকলে শাশুড়ী বসবে দোকানে। ভগবান হয়ত এবার পারুলের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন,বললেন প্রতিবেশীরা। অনেক কথা হলো,মায়ের নাম্বার টা পারুল আপাকে দিয়ে বললাম যোগাযোগ রাখবেন,আর আমি দেখি কি করা যায়। ওনার শশুর শাশুড়ীর কাছ থেকে আশির্বাদ চেয়ে নিলাম। তন্বীকে বললাম,মামা এবার আসি তাহলে। ঠিক আছে মাম্মা,আবার আসিও। মা,পারুল আপাকে ডেকে নিয়ে হাতে কয়েক হাজার টাকা গুজে দিলেন। বললেন,কারো কাছ থেকে জলদি সেলাই করা টা শিখে নিও,আর চাল আছে এখানে,টাকা দিয়ে ২/৩ মাস চলে যাবে। যোগাযোগ রাখিও আচ্ছা? পারুল আপা কি বলবে? উনি প্রায় বাকরুদ্ধ,শুধু তাকিয়ে আছে। চোখে স্পষ্ট জল। যে মেয়েটা জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে গতকাল পিছলে পড়ে যেতে ধরেছিল সেই মেয়েটাকে অন্ধকার পথে পাড়ি দিতে দিলনা মিশুক এর পরিবার।
,
বাড়ী ফিরে এলাম। আমি,আদনান,সাকিব,নাহিদ,মুস্তাফিজ, সহ ফ্রেন্ড সার্কেলদের সবাইকে বললাম। গ্রুপ করলাম। যে মাদ্রাসায় পড়ি,যেটাতে পড়তাম সব মাদ্রাসার স্যারদের সাথে কথা বললাম। আশে পাশের স্কুলের স্যার ম্যাডাম সহ মসজিদের ইমামকেও পাশে পেয়েছি। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল স্যার বললেন,আমার টাকা থেকে ওনাকে যাকাত দেয়া যাবে। উনি একাই যে টাকা দিলেন তা দিয়ে পারুল আপাকে দোকান ধরিয়ে দেয়া গেল। আল্লাহর রহমতে উনি এখন স্বচ্ছল। তন্বী মামুনি এখন ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাওয়ার বায়না ধরলে বায়না পুরোন করতে পারেন তিনি। (কাল্পনিক ছিল এসব,লেখকের কল্পনা মাত্র,তবে ইচ্ছে খুব...)
,
আমাদের আশে পাশে এরকম হাজারো পারুল রয়েছে। যারা সংগ্রাম করতে করতে একসময় মনে করে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। অনেকে ভাবেন,এটাতে ইচ্ছে করেই আসে অনেকে। আমি একমত নই। কেন? কারন, একদিন এক দুলাভাই এর সাথে কথা হচ্ছিল, উনি বললেন,গতকাল দুইটা মেয়ে সহ ৬ টা ছেলের মাইর হয়েছে খুব। কেন? কিভাবে? মেয়ে ২ টাকে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছিল,রাতে ট্রেন থেকে নামে ৯ টায়। পরনে শার্ট,জিন্স,মাথায় ক্যাপ। দেখে বুঝার উপায় নেই এরা মেয়ে। ৬ টা ছেলে মোট ৬ হাজার=এক রাত। গ্রামের ধানক্ষেতে সেচ দেয়া (মটারের ঘর বলে গ্রামে) তাদের টার্গেট। কিন্তু বুঝতে পেরে বড় ভাইরা মেয়ে দুটোকে পাঠিয়ে দিল পরের ট্রেনে, ছেলে ৬ জনের বাবাদের কাছে খুলে বলল তাদের ছেলেদের কথা। গাছের ডাল দিয়ে অবশ্য প্রথমেই এই ৮ জনকেই ঝুড়েছে (মেরেছে) ভাইরা।
,
৬ জনের অসুরীয় শক্তি সমান একজন মেয়ে। আপনাদের কি মনে হয়,এটা খুশির জন্যে করবে কেউ? রিস্কি ফ্যাক্ট...
,
জ্বি,বলছিলাম পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাড়ি দেয় অন্ধকার পথে। হাতে টাকা নেই,শশুরের ট্রিটমেন্ট, তন্বীর ডিম ভাজি খাওয়ার আবদার,পানি খেয়ে রাতে ঘুমানো। পেটের কৃমি গুলো যে লেভেলের টর্চার করে,বাধ্য হয়। বাধ্য হতে হয়। পারুলের মতো মুসলিম অমুসলিম হাজারো জনের মুখে হাসি ফোটাতে পারে ইসলামের "যাকাত" নামক বিধানটি।
,
আপনাদের সাধ্য নেই,মেনে নিলাম। কিন্তু আপনি আমি আমরা মিলে যদি চেষ্টা করি তাহলে কেমন হয়? একটি গ্রুপ খুলুন/গ্রুপ করুন ক্লাস মেটদের সাথে নিন,সাথে নিন স্যার ম্যাডামদের,আরো যারা ইচ্ছুক(পরিচিত)। প্রতি মাসে টাকা কালেক্ট করুন। ধরে নিলাম,১০০ জন হলো গ্রুপের সদস্য। প্রত্যেকে প্রতিমাসে ১০০টাকা দিলেও মাস শেষে ১০ হাজার। বছরে এক লক্ষ বিশ হাজার। মিনিমাম ২৫ জন নারীকে সেলাই মেশিন দিতে পারবেন আপনারা। আপনার একটুখানি চেষ্টা,শ্রমে, আলো জ্বেলে উঠতে পারে কারো জীবনে। বিষয়টি নিয়ে ভাবুন,আলোচনা করুন ফ্রেন্ডদের সাথে,স্যার ম্যাডামদের সাথে রাখুন। আর হ্যা,গ্রুপ করলে আমাকেও সাথে নিয়েন,যতদূর পারি একসাথে এগিয়ে যাব,,,,ইন শা আল্লাহ,আগামী দিন গুলো আমাদের হবেই হবে...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now