বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১.
“ভাইয়া- ফুল নিবেন? নেন না! একটা গোলাপ দশ
ট্যাকা, দুইটা পনর- আরো বেশি নিলে কনছেন
আসে!”
ডিপার্টমেন্টের উঠোনে আড্ডা দিচ্ছিলাম ছয়-
সাত জন; হঠাৎ এই ডাক। তাকিয়ে দেখি, সাত- আট
বছরের একটা ছেলে দুই হাত ভর্তি ফুল নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে সামনে। মুখে যথেষ্ট সিরিয়াস ভাব-
ফুল না নিলে কী করে বসবে, বলা মুশকিল!
হেসে ফেললাম আমি।
“ ফুল বেচবি, বুঝলাম- কিন্তু এই ‘কনছেন’ জিনিসটা
কী, বল দেখি!”
“আরে- কনছেন বুঝেন না! কনছেন,
কনছেন! দুইটার বেশি ফুল নিলে দাম কমায় রাখুম
অনেক!”- বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলল
পিচ্চি। এতক্ষণে বুঝলাম আমি- ‘কনছেন’ আসলে
হলো কনসেশন!
“আমার কাছে ফুল বেচতে চাস- আমার তো ফুল
দেওয়ার মতন কেউ নাই।”
“কেডা কইছে? ওই আপু আসে না- উনারে কিন্না
দ্যান গোলাপ ফুল, খুশি হইব! ওই দূর থেইকা
দেখতেছি, সেই কখন থেইকা উনার দিকেই চায়া
রইছেন!”
হঠাৎ করেই লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি! খেয়াল
করে দেখি- আড্ডা থেমে গেছে! সবাই
তাকিয়ে আছে আমাদের দুজনের দিকে। কোন্
আপুর কথা বলল পিচ্চি- দেখার জন্য ঘাড় ঘুরাতেই
দেখি, মিথিলা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে
তাকিয়ে আছে! মুহূর্তের
জন্য মনে হল- পৃথিবীর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
দাঁড়িয়ে আমি! সত্যিই তো এখন ২০১২!
২.
মিথিলা- ক্লাসে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
কোন্ মহাপুরুষ যেন বলে গেসলেন, “একটা
ছেলে আর একটা মেয়ে কখনো কেবল বন্ধু
হতে পারে না”- এই কথা মিথ্যে প্রমাণ করার
জন্যই যেন জন্ম ওর! অল্পদিনের মধ্যেই
কেমন আপন করে নিয়েছে আমাদেরকে-
অথচ কখনোই কাউকে বন্ধুত্বের সীমানা পার
করতে দেয় না। ভীষণ প্রাণোচ্ছল, সবাইকে
মাতিয়ে রাখে। কার কোন জিনিসটা লাগবে, কার
কীসে অসুবিধা- সবকিছুর দিকে নজর ওর
সর্বক্ষণ! অথচ নিজের অসুবিধা কিংবা কষ্টের কথা
ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেবে না কাউকে!
সলিড একটা মেয়ে- আর এজন্যই আমার ওকে
ভীষণ ভালো লাগে। হ্যাঁ, মিথ্যে বলবো না-
মিথিলাকে পছন্দ করি আমি, হয়ত বন্ধুত্বের
চেয়ে বেশিই!
মিথিলার সাথে আমার খাতির একটা গ্রুপ প্রজেক্ট
করতে গিয়ে। তারপর থেকেই প্রয়োজনে-
অপ্রয়োজনে টুকটাক কথা, প্রজেক্ট ডিসকাস
করা- অল্প দিনেই বেশ কাছের বন্ধু হয়ে গেছি
আমরা। মিথিলাকে চিনি এমনিতে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার
থেকে। একই স্যারের বাসায় কোচিং করতাম আমরা।
সবেমাত্র কলেজে উঠেছি, রোমান্টিকতার ভুত
ঘাড়ে চাপলো বলে। এমনই সময় একদিন স্যারের
বাসায় একটামেয়েকে দেখে আর চোখ
ফেরাতে পারি না! ‘আগুনসুন্দরী’ হয়ত নয়, কিন্তু
মেয়েটার চেহারার মধ্যে কিছু একটা ছিল- কেবল
সৌন্দর্য নয়, মায়া- আর আমার মনে হল, আমি সেই
মায়ার বাঁধনে আটকা পড়ে গেছি- সেই আমার
প্রথম ক্রাশ খাওয়ার গল্প! এরপর থেকে আগে
গিয়ে পছন্দসই বেঞ্চে বসতাম, শুধু
মেয়েটাকে ভালোমতন দেখার জন্য! কিন্তু
সিন্দাবাদের ভুত ঘাড়ে ভর করতে পারেনি বেশি
দিন- কিছুদিনের মধ্যেই জেনে যাই, অ্যাফেয়ার
আছে মেয়েটার। সুতরাং, দূর থেকে শুভ কামনা
জানানো ছাড়া কিছুই করার ছিল না আমার। মেয়েটা
অবশ্য এসবের কিছুই জানে না- ও হ্যাঁ, মেয়েটার
নাম তো বলাই হয়নি, এই মেয়েটাই মিথিলা!
“কী, ভাইয়া- নিবেন না ফুল?” পিচ্চিটার কথায় চিন্তার
ঘোর কাটলো আমার। নতুন করে তাকালাম পিচ্চিটার
দিকে। আধময়লা একটা শার্ট, আর হাফ প্যান্ট
পরনে। খুব বেশি হলে সাত- আট বছর হবে
বয়েস। এই বয়সেই কী চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে!
সবার সামনে কেমন ইজ্জত ধ্বসিয়ে দিলো
আমার! মিথিলার দিকে তাকাতে সাহস হচ্ছে না- তবুও
কী মনে করে চোখ ফেরালাম ওর দিকে।
আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
চোখে চোখ পড়তেই বললো, “কীরে
নিসর্গ, তুই নাকি আমাকে ফুল দিবি? হঠাৎ এত্ত
ভালোবাসা উথলে উঠলো!”
“না... মানে... আসলে...” কথা আটকে যাচ্ছে
আমার। মিথিলা এভাবে আক্রমণ করে বসলো-
কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না! খুব ইচ্ছে
করছে- একছুটে পালিয়ে যাই! রামায়ণের সীতার
মতন বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- “হে ধরণী, দ্বিধা
হও- আমি তোমার মধ্যে লুকাই!”
“বলেই ফ্যাল, নিসর্গ! আর কত রাতের পর রাত
চ্যাট হিস্টোরি পড়েই কাটাবি! কী আর আসে
জীবনে? ভাজি, বুন্দিয়া আর সিঙ্গাড়া!” পাশ
থেকে ফোড়ন দিল মুহূর্ত- ল্যাবরেটরি স্কুল
থেকেই একসাথে পড়ছি আমরা, এখনও পিছু
ছাড়েনি হনুমানটা আমার! ইচ্ছে করছে, শয়তানটার
কান দুটো টেনে হনুমানের কানের মতনই লম্বা
করে দেই!
“কী রে, কথা বলিস না ক্যান? পুরুষ মানুষ এমন
ম্যান্দা মেরে থাকে নাকি?
ক্রাশ খাইসিশ? আমার বয়ফ্রেন্ডের মার খাইলে
কিন্তু টিকতে পারবি না!”
কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা- কী করবো, বুঝতে পারছি
না। এক টান দিয়ে পিচ্চির হাত থেকে ফুলের
গোছাটা নিয়ে নিলাম। হুহ, এত্ত বড় কথা! আমার
পুরুষত্বের অপমান! এসপার- ওসপার দেখেই
ছাড়বো আজকে! গলা খাঁখারি দিয়ে নিলাম। বহু
দিনের জমানো কথাগুলো বলতেই হবে
আজকে- পরে যা হবার হবে, কেয়ার করি না!
কোথায় জানি পড়েছিলাম, সম্ভবত হূমায়ুন
আহমেদের একটা কলামে-
“নারী ও পুরুষ কখনোই কেবল বন্ধু থাকতে
পারে না। প্রেমে তারা পড়বেই- হয়ত খুবই অল্প
সময়ের জন্য, হয়ত অবচেতনভাবে কিংবা ভুল
সময়ে, হয়ত সারা জীবনের জন্য- কিন্তু
প্রেমে তারা পড়বেই।”
ভাবছি, মিথিলাকে বলব এই লাইনগুলো। বলবো,
সেই ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার থেকে কেমন করে ওর
আশাতেই বসে আছি, কত মেয়ের হৃদয় ভাঙল-
অথচ ফিরে তাকানোর সময় ছিলো না আমার!
আমার অস্তিত্বে তো কেবলই মিথিলা, অন্য
কাউকে তার ভাগ কীভাবে দেই আমি! না হোক
সে আমার, ক্ষতি নেই- দুজনের ভালোবাসা একাই
বেসে নেব আমি! নাহ- এই কথাগুলো বলতেই
হবে আজকে। কিন্তু একী! গলা দিয়ে আওয়াজ
বেরোয় না কেন আমার! “নাহ... মানে,
ইয়ে...” মিথিলার দিকে তাকাতেই গলাটা শুকিয়ে
গেল।
“হইসে, আমার বীরপুরুষ- তোর দৌড় কদ্দূর, জানা
আসে আমার।” মিথিলা ফোড়ন কাটল। “তোর
জায়গায় অন্য কেউ হলে স্রেফ মানা করে দিতাম
আমি, কিন্তু ভেবে দেখলাম, তুই ছেলেটা গাধা
প্রকৃতির, কিছুটা কিউটও আসিশ- তোকে
বয়ফ্রেন্ড বানালে জমবে ভালো। তুমি যে
আমাকে ইহজনমেও প্রোপোজ করতে পারবা
না, পারবা শুধু দূর থেকে সারাটা দিন চেয়ে
থাকতে- সেইটা আমার বুঝা হয়ে গেসে
ভালোভাবে। সবার সামনে হাঁটু গেঁড়ে যদি
ফুলগুলাও দিতে না পারিস- তাইলে কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বলবো
না আমি!”
“কিন্তু, তোর বয়ফ্রেন্ড...” আমতা আমতা করছি
আমি, নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছে না।
“আমার কোন বয়ফ্রেন্ড নাই রে বুদ্ধু, কখনো
ছিল না। ওইটা একটা কাভার- তোর মতন
রোমিওগুলাকে দূরে সরায় রাখার জন্য!” নিজের
ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছি না! মিথিলা এত্তগুলো
কড়া কথা বলল, অপমান করল- নিশ্চয়ই রাগ করা উচিত
আমার! কিন্তু, আমার যে হাসি থামছেই না!
পাশে তাকিয়ে দেখি- এত কাহিনীর মূলে যে
পিচ্চি, সেও হাসছে দাঁত বের করে!
৩.
“বাবা, আমার কী বিয়ে হবে না!”
হতবাক হয়ে গেলাম! বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে
বাসায় ফিরছিলাম- রিমঝিম বৃষ্টি হচ্ছে, তাই
বাসস্ট্যান্ডে বাস থেকে নেমে রিকশা নেইনি
আর। এমনিতেই বৃষ্টিপাগল- আর এমন সুন্দর বৃষ্টি
হলে তো কথাই নেই, ভিজতে হবেই! এমন
সময় শুনতে পেলাম পিচ্চিকন্ঠের এই হেঁড়ে
গলার গান!
তাকিয়ে দেখি, আট- দশ বছরের একটা ছেলে
যথেষ্ট আবেগ নিয়ে এই গান গাইতে গাইতে
ভিজছে! স্যাটেলাইটের কল্যাণে জানি, ওপারের
দাদাদের বানানো একটা কমার্শিয়াল মুভির গান এইটা।
এই মুভির আরেকটা গান আমার বেশ প্রিয়, গিটারে
তুলেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে- তাই খেয়াল
আছে। পিচ্চিটার ব্যাপারে কৌতূহল হল- তাই ওকে
ডাক দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না আমি!
“এই ছেলে- শোন্ তো!”
পিচ্চিটা একটু অবাক হল মনে হয়। কী সুন্দর করে
গান গাইছিল- আমার মতন একটা বেরসিক বাগড়া দিল
এমন সময়! তারপরও এগিয়ে আসলো আমার
দিকে- হাতে সুতায় ঝুলানো অনেকগুলো জিনিস,
হরেক রকমের খেলনা বোধ হয়। নাম জিজ্ঞেস
করলাম আমি।
উত্তর এল, “কুকন!” বেশ অবাক হলাম- এইটা
আবার কেমনতর নাম! হঠাৎ মনে পড়ল জাফর
ইকবাল স্যারের ‘বাচ্চা ভয়ঙ্কর কাচ্চা ভয়ঙ্কর’
গল্পের কথা। একটা পিচ্চি দারুণ ভেন্ট্রিলোকুইজম
করতে পারত ওই গল্পে, সেও তার নাম বলেছিল,
কুকন!
হেসে ফেললাম আমি। “তোর নাম খোকন?”
“হ।”
“কী করিস তুই?”
“দ্যাখেন না- এই খেলনা বেচি।”
এইবার ওর হাতের দিকে ভালোমতন তাকালাম আমি।
নানান রকমের পাতা, খড়, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি
অদ্ভুত সুন্দর কিছু খেলনা খুলছে ওর হাতে।
“এইগুলো তুই বানিয়েছিস?” অবাক হবার পালা
আমার!
“হ, আমিই তো বানাইসি! কে আবার বানায় দিবো!”
“বাহ! তুই তো ভীষণ সুন্দর খেলনা বানাস! দাম
কত এইগুলার?”
“বিশটিতে ভিজ্যা গ্যাছে তো, হের লাইগা দশ
ট্যাকা। বেশি নিলে কমায় রাখমু।”
এই একটা কথায় হঠাৎ সেদিনের সেই পিচ্চির কথা
মনে পড়ে গেল আমার। ওহ, ওর নামটাই তো বলা
হয়নি! পিচ্চির নাম ছিল সাকিব, সেইদিন থেকে আমি
আদর করে ডাকি ‘সাকিব আল হাসান’! না বুঝেই এত্ত
বড় একটা উপকার করলো আমার, এইটুকু সম্মান
তো ওকে দেওয়াই যায়!
সেদিন থেকেই সাকিবের প্রতিদিনের কাস্টোমার
আমি! ক্যাম্পাসে ফুল বেচতে এলে সে
আমাকে খুঁজে বের করবেই! আর তারপর হাতে
দুটো গোলাপ গুঁজে দেয়ে বলবে,
“ভাইয়া, আপুর লাইগা আনসি। বেশি লমু না, দশ ট্যাকা
দিলেই চলবো!”
ওর এই চঞ্চলতায় রাগ করি না আমি- মজা লাগে বরং।
এমনিতেই এই সব পথশিশুদের জন্য একটা টান
অনুভব করি আমি- মনে গভীরে সুপ্ত একটা বাসনা
আছে, সুযোগ হলে কিছু একটা করব ওদের
জন্য। যে বয়েসটা পড়ালেখা করার, ওই বয়সে
সংসারের বোঝা মাথায় তুলে নিয়েছে এরা! কেউ
ফুল বেচে, কেউ খেলনা বেচে, আবার কেউ
চলন্ত গাড়িতে পেপার বিক্রি করে খাওয়ার তাগিদে!
“কী, ভাই? লইবেন একটা খেলনা?” সামনের
পিচ্চিটার ডাক বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনলো আমাকে।
এত্ত সুন্দর খেলনা বানিয়েছে ছেলেটা, ওকে
নিরাশ করতে ইচ্ছে হলো না আমার। বললাম,
“খোকন, তোর হাতে সব মিলিয়ে খেলনা
আছে কয়টা?”
অবাক হল পিচ্চি, এই কথা জিজ্ঞেস করছি কেন!
“আটটা। আইজকা বেচা-বিক্রি হয় নাই বেশি।”
“এক কাজ কর- তোর হাতের সবগুলো খেলনা
বেচে দে আমাকে।”
সদ্য পাওয়া একশ টাকার একটা নোট হাতে রাস্তার
মোড়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খোকন। ওর
সবগুলো খেলনা আমার হাতে শোভা পাচ্ছে!
ওকে বিরক্ত করলাম না আমি-
খোকনকে ওই অবস্থায় রেখেই পা চালালাম আমি
সামনের দিকে। মিথ্যে বলবো না, দশ বছরের
একটা বালককে অবাক করে দিতে পেরে যে
আনন্দ আমি পেয়েছি, একশ টাকার একটা নোট তার
কাছে কিছুই না! কেএফসি’তে বন্ধু বান্দব নিয়ে
তো কত টাকাই নষ্ট করি- আজ মাত্র একশ টাকায়
যে আনন্দ কিনলাম, তা তো অমূল্য!
৪.
সোহরাওয়ার্দি হলের এক তলায় আমার রুমে বসে
‘কাউন্টার স্ট্রাইক’ খেলছিলাম মনের সুখে। এমন
সময় মুঠোফোনের সুরেলা আওয়াজ ব্যাঘাত
ঘটালো খেলায়! হাতে নিয়ে দেখি,
মুঠোফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে
মিথিলার মুঠোবার্তা-
“এক্ষুণি বেরোও হল থেকে- আমি বাইরে
অপেক্ষা করছি। ঘুরতে যাবো দুজন মিলে।”
অবাক হলাম না- মিথিলাটা এমনই। ওর সাথে সম্পর্ক না
হলে আমি জানতেও পারতাম না, কত চঞ্চলতা
থাকতে পারে একটা মেয়ের মাঝে! গায়ে একটা
গেঞ্জি চাপিয়ে ছুটে বেরোলাম হল থেকে-
দেরি হলে আবার মহারানী ভিক্টোরিয়া ঠোঁট
ফুলিয়ে বসে থাকবেন!
হলের গেইট থেকে বেরিয়ে দেখি, মিথিলা হাসি
মুখে বসে আছে রিকশায়! আমাকে দেখে হাসিটা
বর্ধিত হলো ওর। “অনেক জ্বালাই তোমাকে,
না?”
কিছু বললাম না আমি- হাসির প্রত্যুত্তরে হাসি ফিরিয়ে
দিয়ে রিকশায় চড়ে বসলাম।
মিথিলাকে নিয়ে দেড় ঘন্টা ধরে ঘুরছি রিকশায়।
এখন ফেরার পালা। টিএসসি-তে রিকশা থামিয়ে
নেমে পড়লাম দু’জন- মিথিলার প্রিয় ফুচকা খাবো।
সবে ফুচকার দোকানের দিকে পা বাড়িয়েছি- এমন
সময় আমার মুঠোফোন জানান দিলো, কেউ
ফোন করেছে। এই সময়ে ফোন, তাও
অচেনা একটা নাম্বার থেকে- সামান্য বিরক্ত বোধ
করলাম আমি। তবুও ধরলাম ফোনটা, “হ্যালো,
স্লামালেকুম...”
“হ্যালো, নিসর্গ মামা! আমি আসাদ”
একটু অবাক হলাম আমি! আসাদ নামের কোন মামা
কিংবা ভাগ্নের কথা মাথায় আসছে না! “কোন্
আসাদ?”
“আরে, মামা চিনলেন না! নুডুলস আসাদ!”
এতক্ষণে চিনলাম- আসাদ মামা, পলাশীর মোড়ে
নুডুলস বেচে- প্রতি সন্ধ্যায় ওনার দোকানের
বাঁধা কাস্টোমার আমি আর মিথিলা। কিন্তু উনি আমার
ফোন নাম্বার পেল কোত্থেকে! রহস্য সমাধান
করে দিলো আসাদ মামাই। “আপ্নের
ডিপাটমেন্টের দারোয়ান থেইক্কা ফোন নাম্বার
নিসি, মামা! বিরাট বিপদ হইয়া গ্যাসে!”
এরপর কাঁদতে কাঁদতে উনি যা জানালেন, তাতে
আমার চোখেও পানি চলে এল! আমার ‘সাকিব আল
হাসান’ ফুল বিক্রি করছিল পলাশীর মোড়ে, এমন
সময় একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে ওকে! আসাদ মামা
সহ আরো কয়েক জন ধরাধরি করে ঢাকা
মেডিকেলে নিয়ে গেছে ওকে- অবস্থা খুবই
সংশয়জনক। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে, প্রচুর
রক্ত লাগবে। মামার সবার প্রথমেই মনে
পড়েছে আমার কথা- কেননা সাকিবকে অনেক
আদর করতাম আমি, এইটা পলাশীর মোটামুটি সবাই
জানে।
মামার থেকে শুনলাম, সাকিবের রক্তের গ্রুপ এ-
নেগেটিভ। মনে পড়লো, মুহূর্ত ‘বাঁধন’এ কাজ
করে- ওকে ফোন দিলে রক্তের ব্যবস্থা
হতে পারে। দেরি করলাম না আমি। ফোনে সব
কথা খুলে বললাম ওকে। “দোস্ত, ঘাবড়াইস না।
আমি দেখি, কী করা যায়। আমাদের সাকিব আল
হাসানের কিচ্ছু হতে দিবো নাকি! রক্ত ম্যানেজ
করার ট্রাই করতেসি আমি- কিন্তু তুই মনে হয় হঠাৎ
আক্সিডেন্টের কথা শুনে তাড়াহুড়ায় ভুলে গেসিশ,
তোর নিজের রক্তের গ্রুপও এ-নেগেটিভ!”
পরিশিষ্ট-
ছুটছি আমি ঢাকা মেডিকেলের দিকে- রিকশা
নেওয়ার সময় নেই। পিছু পিছু আসছে মিথিলা- কিন্তু
আমার কাছে এখন বেশি ইম্পরট্যান্ট আমার ‘সাকিব
আল হাসান’- তাই অপেক্ষা করলাম না আমি। পরে
কখনো সুযোগ হবে কিনা জানি না, পথশিশুদের
নিয়ে কখনো কাজ করতে পারবো কিনা, তাও
পরের কথা- আমার হাতে প্রতিদিন ফুল গুঁজে দিয়ে
যার মুখে হাসি ফোটে, সেই ফুলের হাসি তো
এভাবে নষ্ট হতে পারে না! এই ফুলের হাসি
ফেরানোর সুযোগ এখন আমার- আমাকে যে
পারতেই হবে!
-মেহেদী হাসান নিলয়
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now