বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ছেলেটি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে টাকার অভাবে আর পড়াশোনা করার সুযোগ পেলোনা। চাকরির সন্ধানে অনেকের হাতে পায়ে ধরলো, হন্যে হয়ে ঘুরলো কিন্তু চাকরি হলো না। অগত্যা পাড়ার ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করলো। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম বিধায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তেমন ছিলনা।
এমন সময় ছেলেটির মাথায় ঢুকলো বিদেশ যাবার মতলব। মনে করলো বিদেশে একবার কোনোভাবে পাড়ি দিতে পারলে অভাব, অনটন আর থাকবেনা। কিন্তু বিদেশ নামের সোনার হরিণ ধরতে গেলে তো টাকার প্রয়োজন হয়। সেই টাকা কোথা থেকে আসবে? ছেলেটির বাবা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের সামান্য কিছু টাকা ছিল। ওই টাকায় বিদেশ যাওয়ার খরচের সংকুলান হবেনা। টাকার ব্যবস্থা কিভাবে হবে এ চিন্তা তাকে পেয়ে বসলো। জানাজানি হলো ছেলেটি বিদেশে যেতে চায়। এক ঘটক ছেলেটিকে যৌতূক নিয়ে বিয়ে করার পরামর্শ দিয়ে জানায় যে, তার সন্ধানে দেখতে সুন্দরী, মোটামুটি শিক্ষিত একটি মেয়ে আছে যাকে বিয়ে করলে যৌতূকের টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
মেয়েটি একসময় ছেলেটির কাছে প্রাইভেট পড়তো এবং মনেমনে একে অপরকে পছন্দ করতো। তাই ছেলেটি অনায়াসে এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু ছেলেটির বাবা যৌতূক নিয়ে বিয়েতে প্রথমে রাজি না থাকলেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আর ঘটকের নিরলস চেষ্টায় পরবর্তীতে সম্মত হন। যথারীতি তাদের বিয়ে হলো। যৌতূকের টাকায় বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থাও হয়ে যায়। এরপরের সুখের দিনগুলো তাদের দ্রুত ফুরিয়ে যায়। বিয়ের তিন মাসের মাথায় ছেলেটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
দিন যায়, রাত যায়। এভাবে মাসের পর মাস চলে গেল, তবুও ছেলেটির কাছ থেকে কোনো টেলিফোন বা চিঠিপত্র এলোনা। বৃদ্ধ বাবা আর নতুন বৌ মহাদুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লো। ঘুমহীন রাত কাটে তাদের। বাবা নিরুপায় হয়ে আদম বেপারীর শরণাপন্ন হলেন ছেলের খবর জানার জন্য। তারা জানালো, "তাদের দল ইতিমধ্যে পৌছে গেছে মালয়েশিয়া। খবর নিতে গেলে কোনো সমস্যা হতে পারে। আমরা খোজ নিচ্ছি।"
এভাবে প্রায় ছয়মাস কেটে গেল। ছেলের বাবা আর মেয়ের ভাইয়েরা আদম বেপারীর অফিসে যাওয়া-আসা করে, থানা-পুলিশ করেও কোনো ফল পেলোনা। নিরুপায় বাবা সৃষ্টিকর্তার কাছে ছেলের সুস্থতা কামনা করে চোখের পানি ফেলে।দিন থেকে মাস আর মাস ফুরিয়ে বছর গেল। দুটো বছর শেষ হলো। গ্রামে গুজব উঠলো, ও ছেলে আর বেচে নেই। বেচে থাকলে এতোদিনে ভালো-মন্দ একটা খবর নিশ্চয়ই আসতো, টাকা পাঠাক আর না পাঠাক।
কিছুদিন পর খবর এলো বাংলাদেশ থেকে পাঠানো একটি দল মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল। থাইল্যান্ড অবৈধ প্রবেশের কারনে তাদের অনতিবিলম্বে গোপনে একটি যন্ত্রচালিত নৌযানে সমুদ্রে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর নৌযানটি বিকল হওয়ার কারনে নৌযানটি মাঝ সমুদ্রে ডুবে যায়। ফলে, বেশিরভাগ লোকই মারা যায়। আর কিছু লোকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এসব শুনে বাবা পুত্রশোক আর তদুপরি বার্ধক্যের কারনে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। বধূটি একা হয়ে গেল। ভেংে যাওয়া মন নিয়ে ভাবলো তার স্বামী কি সত্যিই চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে? সবাই যা বলে তাই কি সত্যি? তবে কি আর কোনোদিনও তাকে সে দেখতে পাবেনা? বধূটি দিনরাত ব্যাকুল হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে বলে, "হে দয়াময়, তুমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমি আর কোনোদিন তোমার কাছে কোনো কিছুই চাইবো না। সবার সব ধারণা যেন মিথ্যে হয়।"
এরপর নতুন উপদ্রব শুরু হলো। গভীর রাতে কে বা কারা যেন ঘরের টিনের চালে ঢিল ছোড়াছুঁড়ি করে। বিধাতা বধূটির চোখের ঘুম অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছেন, এবার মানসম্মান হারানোর পালা। কারা এসব করছিলো আর কার নির্দেশে এসব হচ্ছিল সবাই সেটা জানতো। কিন্তু মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সাহস কারোর নেই কারন, তারা প্রভাবশালী লোক। অবশেষে ভাইয়েরা সবকিছু জানতে পেরে বোনকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল।
এদিকে ভাইদের সংসারে বধূটির উপরে আস্তে আস্তে নানা গঞ্জনা শুরু হলো। ভাইদের গলগ্রহ হয়ে থাকায় তার মনও ছোট হয়ে থাকে।ভাইদের বৌদের মুখ থেকে তাকে শুনতে হয় যে, তার জন্যেই যৌতূক দিয়ে এতোগুলো টাকা নষ্ট হলো। টাকাও গেলো বরও গেলো। তাছাড়াও অলক্ষ্মী, অপয়া, স্বামীখেকো এসব কথাতো প্রতিনিয়ত তাকে শুনতেই হয়। কিছুদিন পরে ভাইবৌয়েরা তাকে তাদের সংসার থেকে তাড়াতে উঠেপড়ে লাগলো। এবার তারা বলতে শুরু করলো, "এই অলক্ষ্মী মেয়েটা নিজের সংসারটা তো খেয়ে এসেছে, আমাদের সংসারে থাকলে অকল্যাণ ছাড়া আর কি হবে? যত দ্রুত সম্ভব একে বিদায় করতে পারলেই বাচি।"
স্থির হলো তাকে তার ভাইদের সংসার থেকে বিদায় করার। নীরবে কাদে বধূটি। নিজেকে ভীষন অসহায় মনে হয়। একবার বিয়ে হয়েছে, তাই বিয়ের বাজারে তার কদর কম। ঘরের চালে ঢিল ছোড়ার নায়ক এই সুযোগে সামনে আসে। আগ্রহ দেখায় বিয়ে করার। সে বধূটির বাবার বয়সী দোজবর ধনাঢ্য ব্যক্তি। এ প্রস্তাব শুনে বধূটি বিস্ময় আর বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লো। তাছাড়া, আর সবার মতো তার বিশ্বাস হয়না যে তার স্বামী বেচে নেই।
বধূটি ভাইদের আর ভাইয়ের বৌদের পায়ে পড়ে অনুনয়, বিনয় করে বলে, "আমি বাড়ি বাড়ি ঝি-গিরি করে খেটে খাবো, শুধু তোমাদের কাছে একটু মাথা গোজার ঠাই চাই।এ বাড়িতেই তো আমি একদিন জন্মেছিলাম। আমি আর কিছুই কোনোদিন চাইবো না, শুধু চাই একটু আশ্রয়।" কিন্তু শত অনুরোধ, অনুনয়েও কেউ বিন্দুমাত্র সহানুভূতি, সমবেদনা দেখালোনা। অতঃপর যা হবার তাই হলো। জোর জবরদস্তি করে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হলো।
অন্যদিকে, সেইদিন নৌযান ডুবিতে ছেলেটি মরে যায়নি। অর্ধমৃত অবস্থায় ইন্ডিয়ান কোস্টগার্ড তাদের কয়েকজনকে উদ্ধার করে পরবর্তীতে আন্দামান দীপপুঞ্জে কারাবদ্ধ করে রেখেছিল। একদিন আইনি জটিলতা উপেক্ষা করে ছেলেটি কিভাবে যেন পালিয়ে এলো গ্রামে। এতোগুলো দিন গ্রামে কি কি ঘটেছে, তার একান্ত আপন মানুষটা কেমন আছে এসব ভাবতে ভাবতে ছেলেটি বাড়ি ফিরছিল। ভরদুপুরে গ্রামের রাস্তায় লোক চলাচল তেমন ছিলোনা।
ছেলেটির এক গ্রামীণ চাচা সম্পর্কিত লোক তখন ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিল। ছেলেটিকে দেখে তিনি অবাক হয়ে অনেকক্ষণ ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, ছেলেটি তার চাউনিয়ে বিব্রত বোধ করলো। কিছুক্ষণ পরে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে লোকটি বললো, "আরে তুমি! এতোদিন পর ফিরে এলে? হায় কপাল! তুমি তাহলে বেচে আছো?" ছেলেটি ওনার কথা শুনে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি এভাবে বলছেন কেন? আমার বাড়ির সবাই ভালো আছে তো?" উত্তরে তিনি ছেলেটিকে তার বাবার মৃত্যুর খবর জানালেন। কিন্তু ছেলেটি স্ত্রীর প্রসংগে জানতে চাইলে লোকটি পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
বাবার মৃত্যুর কথা শুনে ছেলেটির বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো। আর লোকটির আচরণ দেখে তার মনে অজানা আশংকা জাগলো। ছেলেটি দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়ালো জনমানবহীন ঝোপঝাড় আর জংগলে ভরা বাড়িটা দেখে তার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। সময় নষ্ট না করে সে শ্বশুরবাড়ির দিকে রওনা দেয়। তার শ্বশুরবাড়ি কাছাকাছি ছিলো তাই কিছুসময় পর সে পৌছে গেল। সেখানে গিয়ে সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে সবাইকে ডাকাডাকি করলো, কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিলো না।
কিছুসময় পরে ঘরের মধ্যে থেকে কথাবার্তার ফিসফাস শব্দ তার কানে এলো। একপর্যায়ে সে শুনতে পেল তার খুব চেনা মেয়েলী কন্ঠস্বরে কেউ বলছে, "আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও। আমি তার কাছে যাবো। সে যে এতোদিন পর আমার কাছে ফিরে এসেছে।" অন্য একটি মেয়েলী কন্ঠ তাকে শাসিয়ে বললো, "না তুই কিছুতেই যেতে পারবিনা। তার সাথে তোর এখন কোনো সম্পর্কই নেই। সে তোর কাছে এখন পরপুরুষ।" কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে ছেলেটি পেছনে মুখ ঘোরাতেই দরজার ফাক দিয়ে দেখতে পেল তার স্ত্রীকে দুই মহিলা মিলে চেপে ধরে রেখেছে, তার কাছে আসতে দিচ্ছে না।
দৃশ্যটা দেখে ছেলেটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার সেই মহিলা কন্ঠের কথা ভেসে এলো। মহিলাটি বলছে,"ও এখন আর তোর স্বামী নয়, পরপুরুষ। বুঝলি পোড়াকপালি!" ছেলেটি বিমূঢ় হয়ে ভাবতে লাগলো, " কি শুনলাম আমি? স্ত্রীর কাছে আমি স্বামী হয়ে পরপুরুষ হলাম কিভাবে? ওরা কেন আমার স্ত্রীকে আমার কাছে আসতে দিচ্ছে না? তবে কি....নাহ! এটা কিছুতেই হতে পারেনা। " বারবার উচ্চারণ করলো, "আমি ওর কাছে পরপুরুষ?"
গ্রামীণ সেই চাচার অদ্ভুত আচরনের কারন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। লজ্জায়, ক্ষোভে, বিস্ময়ে ছেলেটির মাথা কাটা যাচ্ছিল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, সে মরে গেলেই হয়তো ভালো হতো। এরপর একটা অসহায়, অপরাধী মন নিয়ে সে রাস্তায় ধীরেধীরে পা বাড়ালো। বুকের ভেতরে তার মরুভূমির হাহাকার। সেখানে কোনো আশা, আকাংক্ষা অবশিষ্ট নেই।
অন্যদিকে বধূটি নিজেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে বারান্দায় ছুটে এসে দেখে তার স্বামী সেখানে নেই। থরথর কর কাঁপতে কাঁপতে সে সেখানেই জ্ঞান হারায়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে বধূটি ধীরেধীরে উঠে গিয়ে ছেলেটি যেই চেয়ারটিতে বসেছিল সেই চেয়ারটার সামনে হাটু গেড়ে বসে চেয়ারটার ওপর মুখখানা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো," সেই তো আবার ফিরে এলে, তবে আর কিছুদিন আগে এলেনা কেন? তাহলে তো আমার এতো বড় সর্বনাশ হতোনা। এখন যে আমায় জ্যন্তলাশ হয়ে বেচে থাকতে হবে।"
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now