বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রতিপক্ষ

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X মাহালু নদীর তীরে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে যেতে কিছুক্ষণ পর মুস্তফা টের পেল পেছনে আর কেউ আসছে। নৌরাবাদের কেউ পিছু নিল নাকি? ঝট করে পিছনে তাকিয়ে একঝলক আগন্তুককে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে আবার টেনে ঘোড়া ছোটাল সে। ইদ্রিস। ইদ্রিস আসছে পেছন পেছন। যাক, ভালো হল তবে। সে ছাড়া আরও অন্তত একজন দেখেছে সাদতকে চম্পট দিতে। বালক সর্দার সাদত এইদিক দিয়ে একা গেছে মুস্তফা নিশ্চিত, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের হাউকাউয়ের ভিতর বেশি লোক দেখতে পায়নি একা সাদতের পলায়ন। লোকজন ডেকে সময় নষ্ট করার বদলে মুস্তফা ধনুক শক্ত এক হাতে ধরে আর হাতে ঘোড়া ছুটিয়ে ধাওয়া করেছে। সাদতকে ধরা চাইই। সে পালিয়ে গেলে আবার কোন দল খাড়া করিয়ে ফেলবে পলকের ভিতর, এদিককার আফগান গোত্রগুলোর মধ্যে সাদতের প্রয়াত পিতা আজও জনপ্রিয়। সাদত মুঠোছাড়া হলে মুশকিল বটে। মুস্তফা ঘোড়ায় চড়া শিখেছে হাঁটতে শেখার আগে। ঘোড়া কোন পথে কতক্ষণ আগে গেছে তা সে রাস্তার ছড়ানো পাতা, ভাঙা ডাল, মাটিতে পায়ের ছাপ দেখেই বুঝতে পারে। সাদত এদিক দিয়েই ঘোড়া ছুটিয়েছে। এই এলাকা মুস্তফার অতি পরিচিত। মাহালু নদীর ঐপারে সে আর তার বড় ভাই মুরাদ ছোটবেলায় খেলতে আসত মাঝে মাঝে। মুরাদ তির ঠিকমত ধরতে পারত না, হয় বুড়ো আঙুল দিয়ে চিমটি দিয়ে ধরত নইলে তিন আঙুল দিয়ে তির টানত। বেকুব। আব্বাজান তির ঠিকমত না ধরার জন্য মুরাদকে চড় দিয়ে দাঁত নড়িয়ে দিতেন প্রতিদিন কিন্তু বুড়ো আঙুল বাঁকা করে সে তির টানতেই পারত না। আব্বাজানের চড় থেকে বাঁচার জন্য মুরাদ তার ছোটভাই মুস্তফাকে নিয়ে মাঝে মাঝে দূর মাহালু নদীর তীর পর্যন্ত যেত, তির ছোঁড়ায় হাত মকশো করার জন্য। পরে অবশ্য আরেকটু বড় হলে সবাই বুঝতে পারে মুরাদের বুড়ো আঙুল দুর্বল, সে ধনুকের ছিলা তো দূরের কথা রশিটাও ঐ আঙুল দিয়ে জোরে টানতে পারেনা। তলোয়ার ও মুরাদ ধরত অদ্ভুতভাবে। হেলে যেত একটু লম্বা তলোয়ার ধরলে। আরেকটু সামনে গেলে নদী ডাইনে বাঁক নেবে। দ্রুত পথ দেখে মুস্তফা বুঝল সাদত ডানদিকেই গেছে, কিন্তু বাঁ দিক থেকে আরেকটা ঘোড়া এসে যোগ দিয়েছে তার সাথে। মাথায় টংটং ঘন্টা বেজে উঠল মুস্তফার। সাদতের সাথে যোগ দিল কে? আমাদের কেউ অবশ্যই নয়, তাহলে দুটার যেকোন একটা ঘোড়া মরত। নৌরাবাদের কেউ। মুশকিল হল। পেছনে ইদ্রিস প্রায় কাছিয়ে এসেছিল, কিন্তু আবার কোন কারণে পিছিয়ে পড়েছে। ঘোড়া চালাতে চালাতে ইদ্রিসকে একটা খিস্তি করে আরও জোরে ঘোড়া ছোটাল মুস্তফা। এত কাছে এসে সাদতকে ছেড়ে দেয়া উচিৎ হবে না। সব ঠিকঠাক থাকলে সাদতের কল্লা আজকেই নিতে পারবে সে, ভাবল মুস্তফা। সামনে বুড়ো একটা গাছ ডাল এলিয়ে নুয়ে আছে। এই গাছটা তাদের বাল্যকালেও ছিল। এই ডাল বেয়ে উপরে উঠে সে আর মুরাদ প্রায়ই পানিতে ঝাঁপ দিত। ঘোড়া চালাতে চালাতে ডানদিকে পানির দিকে তাকাল সে। শান্ত পানি, অল্প কিছু পাতা ভাসছে। মুরাদ কঠিন ডুবুরি ছিল। মাঝে মাঝে এত দীর্ঘ সময় সে পানির নিচে থাকত যে ভয় পেয়ে যেত মুস্তফা আর তার বন্ধুরা। শেষ মুহুর্তে হুউউস করে মাথা পানি থেকে উঠিয়ে মুরাদ খলখল করে হাসত। তাই দেখে ভয়ে আর রাগে মাঝে মাঝে মুস্তফা ঝটাৎ করে মারতে যেত বড় ভাইকে। বহুদিন পরে সেই বালকবেলার মাহালু নদী। মুস্তফার ইচ্ছে করল থেমে একটু ভালো করে সব দেখে যেতে। সে আর ইদ্রিস ছোটবেলার বন্ধু। একসাথে বড় হয়েছে, একইসাথে ঘোড়ায় চড়ে তিরন্দাজি করে বেড়াত তারা। তার মনে আছে আব্বাজান মাঠে দশহাত পর পর এক সারিতে মাটির ভাঁড় রেখে দিতেন, তারপর মুরাদ, ইদ্রিস, ইদ্রিসের ছোটভাই ইসমাইল, গুরদাস তারা সবাই মিলে ঘোড়ায় চড়ে চলন্ত অবস্থায় সেই সারির পাশ দিয়ে তির ছুঁড়ে প্রতিটা ভাঁড় গুঁড়িয়ে দিতে হত। মুরাদ কখনোই একটা ভাঁড়েও তির লাগাতে পারেনি। মুস্তফা আর ইদ্রিস পটাপট নিশানা ভেদ করে দিত প্রতিবার। কিন্তু স্মৃতিকাতরতার সময় নয় এখন। এখন মূল লক্ষ্য সাদতকে জীবিত অথবা মৃত বন্দী করা। মুস্তফা খেয়াল করে দেখল নদী থেকে সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী টিলার দিকে ঘোড়ার খুর সরে যাচ্ছে। আচ্ছা, এই কথা। টিলার ওপারে যাচ্ছে তাহলে সাদত আর তার সঙ্গী। মুচকি হাসল মুস্তফা। সাদত, তুমি তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করলে ওদিকে গিয়ে। ওদিকটা মুস্তফার হাতের তালুর মত পরিচিত। কতবার যে সে এই টিলার দিকে গিয়েছে তার হিসেব নাই। এই টিলার রাস্তা তার মুখস্ত। মনে আছে একবার এই টিলার পথেই ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে মুস্তফার পা মচকে যায় আর ঘোড়া ছুটে পালায়। তিন কোশের উপর লম্বা রাস্তা মুরাদ ছোট ভাই মুস্তফাকে ঘাড়ে করে নিয়ে গিয়েছিল সেইদিন। তিন কোশ গিয়ে পরে এক সরাই পাওয়া যায় জিরানোর জন্য। টিলার কাছে গিয়ে আস্তে করে ঘোড়া থামিয়ে দেয় মুস্তফা। ইদ্রিস হারামজাদা এখনো আসে না কেন। দুই জনকে শুইয়ে দেবার জন্য মুস্তফা একাই যথেষ্ট বটে, তবে সাথে একজন থাকলে বুকে বল বাড়ে। ঘোড়াটাকে সন্তর্পনে বেঁধে মুস্তফা নিঃশব্দে টিলার একপাশ বেয়ে ওঠা শুরু করে। এই টিলার ওপারে ঘন জঙ্গল, ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়া মোটামুটি অসম্ভব। ডানদিক দিয়ে পালানো যায় অবশ্য, কিন্তু আগে দেখে নেয়া যাক সাদত থেমেছে কিনা। ঝিরি আছে এখানে একটা, হয়ত পানি খেতে থেমেছে। ঝিরির কাছাকাছি থাকলে তির মেরে সাদতকে শুইয়ে দিতে মুস্তফার এক মুহুর্তও লাগবে না। টিলা বেয়ে ওঠার আগে তিরন্দাজের বুড়ো আঙুলে পরার যিহগির আংটি ভালো করে লাগিয়ে নিল মুস্তফা। এই পান্না পাথর খচিত যিহগির আংটি আব্বাজান মরার আগে মুস্তফাকে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই নিয়ে মুরাদের সে কি রাগ। বড় ছেলে ডিঙিয়ে ছোট ছেলে কেন বাপের আংটি পাবে সেইজন্য রাগ। কিন্তু সে রাগ যে তার নিজের উপরেই আসলে ছিল, মুস্তফা তা জানে। তিরন্দাজের বুড়ো আঙুলের যিহগির আংটি অলঙ্কার নয়, সামরিক সজ্জার অংশ। বুড়ো আঙুল দিয়ে টানটান ছিলা আংটি ব্যতীত টানতে গেলে মাংস কেটে বসে যাবে। মুরাদ তো তিরন্দাজ নয়, সে বুড়ো আঙুলে জোরে টান দিতে অক্ষম ছিল। তাই মুরাদ যখন যিহগিরের জন্য হাউকাউ করে তিনদিনের জন্য ঘর ছাড়ল, মুস্তফা জানত সে অভিমান কাটিয়ে ঠিকই ঘরে ফিরে আসবে। টিলার এইদিকটা খাড়াই। উঠতে হাল্কা কষ্ট হচ্ছিল মুস্তফার। পনেরো/ষোল বছর আগে আব্বা মারা যাবার পর দক্ষিণে চান্দেরিতে খুরশিদ শা’র সিপাইদলে ভেড়ে সে আর ইদ্রিস। খুরশিদ শা’র বাপ জামশেদ শা তখন সদ্য মারা গিয়েছেন, আর তরুণ খুরশিদ শা ছিলেন রাজত্ব বাড়ানোর তালে। সা'দি নামে এক ফিরিঙ্গী ছিল খুরশিদ শা’র জং এর নেতৃত্বে, ইদ্রিস আর মুস্তফার ঘোড়ার পিঠে থেকে দুর্ধর্ষ তিরন্দাজি দেখে সা’দি তাদের ঝপাঝপ বাহিনীতে ঢুকিয়ে নেয়। সেই থেকে খুরশিদ শা’র হয়ে লড়ে চলেছে মুস্তফা। চান্দেরি পানির পাশে, নিচু জায়গা। পাহাড়-পর্বত তেমন নেই। তাই এতদিন পরে এই মাহালু নদীর পারের টিলা বাইতে গিয়ে অনভ্যস্ততায় মুস্তফার গা একটু টানতে থাকল। মুরাদ হলে এতক্ষণে পাঁই পাঁই করে উঠে যেত নিশ্চয়ই। কিম্বা কেজানে, হয়তো তারও সময় লাগত উঠতে। বেঁচে থাকলে এখন মুরাদের বয়েস পঁয়ত্রিশ টয়ত্রিশ হত। এই বয়েসে টিলা বেয়ে ওঠা কি সোজা কথা। মুরাদের বউটারও ছিল পাকানো দড়ির মত শরীর, সেও স্বামীর মত গাছপাহাড় বাইতে পারত। তার নাম ছিল জমিলা। কেমন আছে জমিলা কে জানে। মুরাদ মারা যাবার পর কার সাথে যেন পরিবার নিয়ে জমিলা ভেগে গেছল, মুস্তফা ভাসা ভাসা খবর পেয়েছিল। টিলার উপরে উঠে নিঃশব্দে কনুই দিয়ে এগুলো মুস্তফা শব্দ না করে। একটু সামনে গিয়ে মাথা উঁচিয়ে ঝিরির দিকে চেয়ে সে একটু হাসল। যা ভেবেছে তাই। সাদত আঁজলা করে পানি খাচ্ছে ঝিরি থেকে, এখান থেকে তির মেরে তাকে শুইয়ে দিতে মুস্তফার কোন সময়ই লাগবে না। আস্তে করে সে ধনুকে তির লাগিয়ে তাক করে ধরল, আর নাড়ানোর সময় ডান হাতের কনুই লেগে একটা ছোট পাথর গড়িয়ে শব্দ হল হঠাৎ। ঝুপ! পাশে ঘোড়ার ঐপাশে একটি দশ/এগারো বছরের বালক বসে ছিল, পাথরের আওয়াজে সে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে সর্দার সাদতকে ধাক্কা দিয়ে গাছের আড়ালে নিয়ে গিয়ে ঝট করে উপরে তাকাল। বালকের দিকে এবার ধনুক তাক করে তার চোখে চোখ পড়তেই মুস্তফার বুকটা ধড়াক করে উঠল। মুরাদ! এ তো মুরাদ! দশ বছরের মুরাদ তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুরাদ! মাথায় লাল ছিটের পাগড়ি পরা মুরাদ! এই ছিটের পাগড়ি তারও একটা আছে, হলদে। আম্মাজান তাদের দুই ভাইকে এই পাগড়ি বেঁধে দিতেন সকালবেলা।লালটা মুরাদের হলদেটা মুস্তফার। সেই লাল ছিটের পাগড়ি পরে তাকিয়ে আছে বড়ভাই মুরাদ। দশ বছর বয়েসে তার কী চেহারা ছিল তা কি মুস্তফার অজানা! এক মুহুর্তের জন্য মুস্তফা থেমে গিয়েছিল, আর সেই ফাঁকে বালক মুরাদ সাদতকে ঘোড়ায় শুইয়ে ঘোড়া ডানদিকে ছেড়ে দিল। সামলে উঠে তির ছুঁড়ে মারল মুস্তফা, কিন্তু তা যেন ফসকে লাগল মুরাদের মাথার পাগড়িতে, আর পাগড়ি গিয়ে বিঁধল এক গাছে। দ্রুত লাফিয়ে লাফিয়ে টিলা থেকে নেমে মুস্তফা সেই পাগড়ি নিরীক্ষণ করতে লাগল। কোন ভুল নেই, এ তার ভাই মুরাদের পুরানো পাগড়িই। হঠাৎ একটু শব্দে চমকে উঠে পিছনে তাকাল মুস্তফা, হাত চলে গেল কোমরে গোঁজা ছোরায়। দেখল ইদ্রিস আসছে। ঢোঁক গিলে একটু দম নিল মুস্তফা। ইদ্রিস কাছে এসে মুস্তফার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, আমি সব দেখছি। সব। ভয় খাইস না, কাকপক্ষীও জানব না তুই সাদতরে পায়াও ছাইড়া দিছস। কেউ জানব না। মুস্তফা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। ইদ্রিস ঝুঁকে আবার বলল, মুরাদ ভাইর পুলা ছিল তো। দেখছি আমি। তুই যে ইচ্ছা কইরা পিঠের বদলে পাগড়ি তাক করছস আমি জানি। মুরাদ ভাইর পুলার পিঠে তির মারলে তুই আল্লার কাছে কি জওয়াব দিতি? মুরাদ ভাইরেই বা কি জওয়াব দিতি? মুস্তফা টের পেল আস্তে আস্তে তার চোখ ভরে জল আসছে। সে কত খোঁজ করেছে জমিলা আর তার পরিবারের, কেউ বলতে পারেনি তারা কোথায়। আর আজ সে তার নিজের ভাতিজাকে প্রায় এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে যাচ্ছিল! ... ... ... বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে আসে মাহালু নদীর তীরে। ধীরে। নদীর উপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে কোন কোন পাখি অবাক হয়ে লক্ষ্য করে টিলার ওপাশে এক মধ্যবয়েসী পুরুষ আরেকজনের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রতিপক্ষ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now