বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বুটের ভেতর কিছু সোনার টুকরো লুকনো ছিল রায়ানের। টাকার হিসেবে নেহাত কম নয়। একটা পুরো আউটফিট কেনা যাবে। বেলারের দল ওগুলোর কথা জানত না। জানতে পারলে নির্ঘাত কেড়ে নিত। লোকগুলো আসলে নেহাত চেঁছড়া টাইটের। অপরিচিত একজন লোক দেখে নিজেদের বীরত্ব দেখানোর জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে। মারধর করে নিজেদের দুর্ধর্ষ হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে। আর মাঝখানে ফাও হিসেবে পেয়ে গেছে ঘোড়া আর হোলস্টারসহ পিস্তলটা।
অস্ত্র নিয়ে বিশেষ কোনো পছন্দ-অপছন্দ নেই ওর। ব্যবহারের জন্যে একটা পেলেই হলো। দেখতে হবে যেন ওটা দিয়ে গুলি ছোঁড়া যায়। একটা পুরনো, বহুল ব্যবহৃত পয়েন্ট ফোর ফোর কিনে নিল ও। ওটার হোলস্টারটাও চমৎকার মানিয়ে গেল ওর কোমরে। কোল্ট পয়েন্ট ফোর ফাইভ মডেলের নতুন একটা হ্যান্ডগান কেনার আগে বেশ কিছুদিন ব্যবহার করা যাবে পয়েন্ট ফোর ফোরটা।
একটা শটগান আর গুলি কিনল সে। ঘোড়াও কিনল একটা। ঘোড়াটা কেনার ব্যবস্থা করে দিল নিগ্রো দোকানদার বায়েক। বায়েকের এখনো ধারণা, অ্যাপাচিদের কবলে পড়েছিল রায়ান। রায়ান আইরিনকে বললেও ওকে জানাতে চায়নি। বায়েকের যদি খদ্দেরদের সঙ্গে মন খুলে গল্প করার অভ্যাস থাকে, তাহলে সে-গল্প বাইসনে পৌঁছাতে একদিনও লাগবে না। কিন্তু রায়ান চায় না, বেলার-কেলাররা আগে ভাগে ওর খবর পেয়ে যাক। সে চায় ওদের সামনে যমদূতের মতো হাজির হতে। ওরা ওকে বলেছে, সে নাকি ভুল লোকদের সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। রায়ান ওদের বুঝিয়ে দেবে মস্তানি করার জন্যে ওরাও ভুল লোককে বেছে নিয়েছিল।
দোকানদারকে বিশ্বাস করতে পারেনি রায়ান। কিন্তু লোকটার প্রতি ওর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ওর দোকানেই থেকেছে সে। ওখানেই খেয়েছে। রায়ান সুস্থ হয়ে হিসেব করে দাম মিটিয়ে দিয়েছে ওকে। কিন্তু এর পরও ওর মনে হচ্ছে নিগ্রো দোকানদারের ঋণ শোধ করা ওর পে কখনো সম্ভব হবে না। লোকটা ওর মুমূর্ষু অবস্থায় ওকে মানবিকতা দেখিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে। আসলে অবিশ্বাস নয়, বরং সতর্কতার অংশ হিসেবেই সে প্রকৃত ব্যাপারটা ওকে জানায়নি।
তবে রায়ান সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আইরিন নামের ওই ইন্ডিয়ান মেয়েটার ওপর। মেয়েটা অ্যাপাচি। কিন্তু চলনে বলনে যেন এক অভিজাত স্প্যানিশ মহিলা। অসুস্থ অবস্থায় পরম মমতায় ওর সেবা-যতœ করেছে। ওকে সঙ্গ দিয়েছে। মেয়েটা চমৎকার। বুদ্ধিমান, গম্ভীর। সজীব দু’ চোখ অতলস্পর্শী।
হপ্তাখানেক পরের এক সন্ধে। বাইসনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট নদী কিংবা ঝরনাটার পাশে বসে আছে রায়ান। ওর শরীর এখনো আগের শক্তি ফিরে পায়নি। তবে সে জন্যে একদম শুয়ে বসে বিশ্রাম নেয়ার দরকার মনে করছে না সে। যেটুকু শক্তি ফিরে পেয়েছে, তাতে কাজ চলবে বলে ভাবছে।
সন্ধে হওয়ার সাথে সাথেই ছোট্ট শহরটা মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’একটা বাতি জ্বলছে মিট মিট করে। তবে আকাশ থেকে নেমে আসা কালো অন্ধকারের বিরুদ্ধে মনে হচ্ছে না লড়াই চালিয়ে খুব একটা সুবিধে করতে পারছে।
ছোট্ট পাহাড়ী ঝরনাটা কুল কুল করে বইছে। কিছুণ আগে ঠাণ্ডা পানিতে অনেকণ ধরে সারা গা রগড়ে রগড়ে গোসল করে নিয়েছে ও। ওর শরীর এখন ওই পাহাড়ী ঝরনাটার মতোই শীতল। ওটার মৃদু ঝিরঝিরে স্রোতের মতোই আরামের আবেশ তাতে। অপো করছে রায়ান। কাজে নেমে পড়ার আগে চূড়ান্ত হিসেব নিকেশ চলছে মনে মনে।
সেলুনের লোকগুলো নিজেদের পান-ভোজন আর গল্পগুজব নিয়ে ব্যস্ত। রায়ানের ঘোড়ার খুরের শব্দ তাদের কানে ঢুকল না। রাস্তায় কয়েকটি পোস্টের সঙ্গে ডজন খানেক ঘোড়া বাঁধা। ব্যাটউয়িং দরজার ফাঁক দিয়ে কোল অয়েল ল্যাম্পের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সেলুনের বাইরে একটা খুঁটির সাথে নিজের মেয়ারটাকে বাঁধল রায়ান। হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে পরখ করে নিল। তারপর চামড়ার থলে থেকে শটগানটা বের করে প্লাঙ্কওয়েতে পা রাখল। ওর হ্যাটটা কপালের দিকে নামানো। গত সাতদিন ধরে না-কামানো মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। ওর বুটগুলোয় এখনো রক্তের দাগ। ইচ্ছে করে ওগুলো ধোয়নি সে। ব্যাটউয়িং ডোরের সামনে পুরো এক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল ও।
সেলুনের ভেতরে পিয়ানোর টুংটাং। মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ, টেবিলে টেবিলে তাস পেটানোর পট পট আর গ্লাসে গ্লাসে ঠোকাঠুকির টুং টাং শব্দ। থেকে থেকে দম ফাটানো হাসি আর হৈ হুল্লোড়।
ব্যাটউয়িং ডোর ঠেলে সেলুনের দরজা জুড়ে দাঁড়াল রায়ান। ছ’ফুট লম্বা লোকটাকে দেখে আচমকা নীরবতা নেমে এল গমগমে সেলুনটায়। এমনকী কারো মুখে ফিস ফিস শব্দটা পর্যন্ত শোনা গেল না। সবাই যেন মুহূর্তের নোটিসে বোবা হয়ে গেছে।
খদ্দেরদের ওপর চোখ বুলাল রায়ান। কাদের খুঁজছে সে জানে। ওই লোকগুলোর চেহারা ওর মনে একদম খোদাই হয়ে আছে। প্রথম যাকে শনাক্ত করল, সে একদম সামনের সারিতে বসা। পর মুহূর্তে ওর চোখ পড়ল আরেকজনের ওপর। পোকার খেলছে লোকটা। ওর খেলার সঙ্গী দু’জনকে চিনতে পারল না। ওদের মারধরের সঙ্গী ছিল না এরা।
এবং এর পরই পিট কেলার নামের লোকটাকে দেখতে পেল রায়ান। হ্যাংলা পাতলা কালো চোখের বন্দুকবাজ দাঁড়িয়ে আছে বারের সাথে হেলান দিয়ে। হাতে মদের গ্লাস। ছোট ছোট চুমুকে গ্লাস শেষ করছে। ওর পাশে একটা মেয়ে। নি®প্রভ চোখের কান্ত মেয়েটি। বেশ্যা সম্ভবত।
এক ঢোক হুইস্কি মুখে নিয়ে সবার সাথে সাথে চোখ তুলল কেলারও। দেখল দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে। লোকটাকে চিনতে পারল না। তবে একদম অচেনাও মনে হচ্ছে না। কোথাও যেন দেখেছে এর আগে।
ফিস ফিস শব্দ ছাপিয়ে আচমকা গম গম করে উঠল রায়ানের গলা, ‘সাতজন লোক আমাকে মারধর করেছে। আমার ঘোড়াটা চুরি করে নিয়ে গেছে। আমাকে গরুর কাঁচা চামড়া দিয়ে হাত-পা বেঁধে মরুভূমিতে ফেলে এসেছে, যাতে আমি মরে গিয়ে শেয়াল-শকুনের খোরাক হই।’
প্রতিটি শব্দের ওপর আলাদা করে জোর দিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করল রায়ান। থামল তারপর। তীক্ষ্ম চোখে চাইল ঘরের ভেতর। সামান্যতম নড়াচড়ার আভাস পাওয়ার জন্যে অপো করছে।
‘লোকগুলো ছিল কে-বার-এর। সেরকমই বলা হয়েছে আমাকে। আমি ওই ভদ্রলোকদের ঋণ চুকিয়ে দেয়ার জন্যে এসেছি। তারা ছাড়া বাকিরা সেলুন ছেড়ে বেরিয়ে গেলে খুশি হবো।’
আচমকা যেন এক সাথে নড়ে উঠল পুরো কটি। চেয়ার সরানোর শব্দ শোনা গেল। দরজা জুড়ে দাঁড়ানো বিশাল লোকটাকে চিনতে পেরেছে সবাই। গল্পটাও ওদের জানা। সবাই এক যোগে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এরা নেহাত কাউবয়। বিভিন্ন র্যাঞ্চে কাজ করে। অবসরটা ফুর্তি করে কাটানোর জন্যে এসেছে। এখানে অন্যের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছে তাদের নেই।
রায়ানকে মারধরের সঙ্গে জড়িত তিনজনের মধ্যে একজন দরজার দিকে বেগে এগোল। রায়ান ওর দিকে তাকাল। তারপর মাথা নাড়ল। ‘উঁহুঁ, তুমি নও।’ পিস্তল উঁচাল লোকটার দিকে। ওর মনে আছে, এই লোকটা ওকে বুকে লাথি মেরে স্পারের খোঁচায় তবিত করে দিয়েছিল।
এবার কেলারের দিকে চোখ ফেরাল। যাকে বেরোতে বাধা দিয়েছিল, এটাকে একটা চমৎকার সুযোগ হিসেবে দেখল লোকটা। বিনা দ্বিধায় হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল।
ওর দিকে চাইবার কষ্টটুকুও স্বীকার করল না রায়ান। যেন মাছি তাড়াচ্ছে এভাবে হাত নাড়াতে দেখা গেল ওকে। চোখের পলক ফেলার আগেই শটগানটা উঁচিয়ে ধরল। পর মুহূর্তে বিকট শব্দে কেঁপে উঠল সেলুনের ভেতরটা। পিস্তলে হাত দিতে যাওয়া লোকটা যেন উড়ে গিয়ে পড়ল বারের ওপর। সেখান থেকে দেয়ালে আছড়ে পড়ল।
এত বড় কাণ্ড ঘটে গেল, কিন্তু কেলারের ওপর থেকে এক পলকের জন্যেও চোখ সরেনি রায়ানের। ওর পেছনে টেবিলের কাছাকাছি বসা ছেলেটার দিকে চাইল এবার রায়ান। ‘এই যে, হ্যাঁ, তোমাকে.. তোমাকেই বলছি। এদিকে উঠে এসো। আমার সামনে এসে দাঁড়াও।’
একটু ইতস্তত করল ছেলেটা। কী করবে বুঝতে পারছে না। শেষে রায়ানের হাতের উদ্যত শটগান সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করল ওকে। সঙ্গীর মৃতদেহের দিকে এক নজর তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠল সে। আস্তে আস্তে এগিয়ে এল বিশালদেহীর কাছে।
‘কাউবয়, সেদিন সকালে বার্নে তুমি আমার পাহারায় ছিলে। আমি তোমাকে কী বলেছিলাম তোমার মনে আছে?’
ছেলেটা মাথা নাড়ল, একই সাথে চোয়াল ঝুলে পড়ল ওর। রায়ান বলে চলল, ‘আমি কিছুই ভুলিনি, বাছা। আমার মনে আছে, তুমি কীভাবে আমায় মারধর করেছিলে। বলেছিলাম, আমি ছেড়ে দাও। আমি চলে যাই। তুমি তা করোনি। আমার কাকুতি মিনতি তোমার কানে ঢোকেনি। মনে আছে তোমার?’
কোনো জবাব দিচ্ছে না ছেলেটা। ভয়ে ছাইয়ের মতো শাদা হয়ে গেছে ওর মুখ।
‘আমি তোমাকে খুন করতে আসিনি। তবে তোমাকে আমি আঘাত করব। না, আঘাত নয়, প্রত্যাঘাত। তোমার ওটা পাওনা হয়েছে। এখানে কোনো আইন-কানুন নেই। সুতরাং আমি যা বলি, তা-ই এখন আইন।’
হাত থেকে শটগানটা ফেলে দিল রায়ান। মেঝেয় পড়ল ওটা ধাতব শব্দ তুলে। এটাকে বিরাট সুযোগ হিসেবে নিল ছেলেটা। হাত বাড়াল পিস্তলের দিকে। ওর হাত কেবল পিস্তলের বাঁট ছুঁয়েছে, ঠিক সময় আঘাতটা অনুভব করল। পাঁজরার হাড় ভাঙার শব্দটাও যেন শুনতে পেল সে, পর মুহূর্তে চিবুকে মুগুরের আঘাতটা টের পেল। লুটিয়ে পড়ল ও মেঝেয়। ব্যথায় চেঁচাতে চেঁচাতে এপাশ থেকে ওপাশে গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, বিশালদেহী কখন ওকে এমন মারাত্মক মারটা মারল।
দর্শকদের মধ্যে যারা নিরীহ কিংবা শান্তিপ্রিয় টাইপের, অবস্থা বেগতিক বুঝে আস্তে আস্তে সটকে পড়তে শুরু করল। যারা একটু বেশি কৌতূহলী, তারা আরো মজা দেখার আশায় দাঁড়িয়ে রইল।
এত কিছু ঘটছে, কিন্তু কেলারের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে। যেন যা ঘটছে, তার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। ওর মুখে ভয়ের কোনো চিহ্নই নেই।
ধীরে সুস্থে হুইস্কির গ্লাসটা শেষ করল সে। তারপর তাকাল রায়ানের চোখে। দীর্ঘ কয়েকটা সেকেন্ড কেটে গেল নীরবে। একে অন্যকে জরিপ করছে ওরা। তারপর মুখ খুলল কেলার, ‘তুমি কি আমাকে গুলি করতে চাও? তাহলে তোমার অবগতির জন্যে একটা কথা জানানো দরকার মনে করছি। তুমি পকেট থেকে আরেকটা গুলি বের করার আগেই শেষ হয়ে যাবে। তার আগে কম পে দু’দুটো বুলেট ঢুকিয়ে দিতে পারব তোমার শরীরে।’
‘উঁহুঁ,’ মাথা নাড়ল রায়ান। ‘তুমি একটা খালি কলসি। তাই বেশি শব্দ করছ। তুমি নিরীহ কাউকে পেলে নিজেকে কঠিন আর দুর্ধর্ষ হিসেবে দেখাতে চাও। তোমার লোকেরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল আমি নাকি ভুল লোকের গায়ে হাত তুলেছি।’ থামল রায়ান এক সেকেন্ড, তারপর আচমকা ভীষণ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি সে লোক, যাকে তোমরা পেছন থেকে বাড়ি মেরে কাবু করেছিলে এবং এরপর বাঘ সেজে বসেছিলে।’ হাতে ধরা শটগানটা একটা টেবিলের ওপর রাখল রায়ান। তারপর পিছিয়ে দাঁড়াল। ওর ডানহাত এখন কোমরে ঝোলানো পিস্তলের খাপের পাশে ঝুলছে।
‘সম্ভবত বেশ কিছু ভালো এবং নিরীহ লোককে তোমরা এর আগে খুন করেছ,’ নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল রায়ান। ‘কাউকে কাউকে হয়তো প্রাণে না-মারলেও পিটিয়ে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছ। এটা অন্যায়। সে-অন্যায় আমার ওপরও করেছ তোমরা। এখন তোমাদের যদি কেউ ব্যাপারটা বুৃঝিয়ে না-দেয়, তাহলে এটা চলতেই থাকবে। তোমরা আরো নিরীহ লোককে খুন করবে, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অপদস্ত করবে। কিন্তু এটা চলতে দেয়া যায় না।
‘তোমাদের সামনে এখন একজন কাউবয় মরে পড়ে আছে, আরেকজন মারাত্মক জখম হয়েছে। এদের এই পরিণতির জন্যে দায়ী তোমরা। তোমরা ওদের বিপথে টেনে এনেছ। কেলার, এর দাম তোমাদেরই শুধতে হবে।’
থামল রায়ান। তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। অপো করছে।
পাশে দাঁড়ানো মেয়েলোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল কেলার। তারপর বোতল থেকে আরেক গ্লাস হুইস্কি ঢালল। রায়ান তার বক্তব্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। ওকে সে খুন করবে। কিন্তু তাতে সামান্যতম বিচলিতও মনে হচ্ছে না কেলারকে। ওর আত্মবিশ্বাসে এতটুকু চিড় ধরাতে পারেনি প্রতিপরে হুমকি। সে কঠিন লোক, পিস্তলে অসম্ভব চালু হাত। সবার মুখে এরকমই শুনে এসেছে এতদিন ধরে। ওর নিজেরও তাই বিশ্বাস। রায়ানের হাতে শটগানটা দেখে প্রথমে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিল। কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। খালি শটগানটা পড়ে আছে একটা টেবিলে। ওটা ছাড়া এই বিশালদেহী বেকুবটা যদি ওর মোকাবিলা করতে চায়, তাহলে স্রেফ মারা পড়বে।
পিস্তলহাতে পিট কেলার যে কীরকম ভেলকি দেখাতে পারে, লোকটা জানে না। একটু পরেই টের পাবে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকবে না। এর আগেও, যারা এটা বুঝতে পেরেছে, তখন কেউ আর বেঁচে থাকেনি। পিস্তলহাতে পিট কেলার, কিছু না, স্রেফ ভয়ঙ্কর।
ওর সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাধাটা জানে না যে, কেলার দ্রুত পিস্তল ড্র করতে শত শত ঘণ্টা সময় কাটিয়েছে প্র্যাকটিসে। এখন কোমরে ঝোলানো পিস্তলটা ওর শরীরেরই একটা অংশ। ওর হাতদুটোর মতোই।
‘স্ট্রেঞ্জার,’ এক ঢোক হুইস্কি গলায় ঢালল কেলার। ঢোক গিলে বাম হাতের পিঠে ঠোঁট মুছল। ‘তোমাকে আমি খুন করতে যাচ্ছি। তবে কাকে খুন করলাম, তার নামটা জানা দরকার। তোমার কবরের পাশে নামফলক লাগিয়ে দেব। যদিও,’ হাসল সে। ‘সেটা দেখার সৌভাগ্য তোমার হবে না।’
পর মুহূর্তে চোখের দৃষ্টি সরু হয়ে উঠল কেলারের, রক্ত চলাচল বেড়ে গেল।
ওর চেখে চোখ রাখ রায়ানও। ‘জন রায়ানের কবরের ওপর নামফলক লেখার সৌভাগ্য তোমার হবে না, কেলার।’
‘ক্কী-ই?’
‘ঠিকই শুনেছ।’
এক মুহূর্তের জন্যে চোখ পিট পিট করল কেলার। বুকের ভেতর রক্ত ছলকে উঠেছে। তলপেটটা যেন ণিকের জন্যে শূন্য মনে হলো। ‘হোয়াইট মাউন্টিনসের জন রায়ান আর তুমি…’
‘একই লোক।’
বিষম খেল যেন কেলার। এই প্রথম ওর চোখে ছায়া ঘনাতে দেখল রায়ান। অবশ্য অমন ভয়ঙ্কর মারধরের পর গরুর কাঁচা চামড়া দিয়ে হাত-পা বেঁধে যে-লোককে ওরা মরার জন্যে মরুভূমিতে ফেলে এসেছিল, তাকে এভাবে অস্ত্রহাতে ফিরে আসতে দেখে প্রথমেই খটকা লেগেছিল ওর। তবে ভেবেছিল, কারো না কারো সহায়তায় লোকটা মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওর ধারণা ভুল। হোয়াইট মাউন্টিনসের জন রায়ানকে সামান্য গরুর চামড়ায় বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। এই লোক ভয়ঙ্কর। ধারণা করা যায় না, এমন ভয়ঙ্কর।
ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে গল্প করার মতো চরিত্র জন রায়ান। বলা হয়, এই লোককে খুন করা সম্ভব নয়। অ্যাপাচিদের সঙ্গে ওর লড়াইয়ের কাহিনী কিংবদন্তির পর্যায়ে চলে গেছে। ওর সম্পর্কে আরেকটা গল্প শুনেছে পিট নিজেও। জন রায়ান তখন একটা শহরের মার্শাল। কোনো একটা কাজে কিছুদিনের জন্যে শহরের বাইরে ছিল ও। এই ফাঁকে চার আউট ল’ এসে শহরে উৎপাত শুরু করে দেয়। রায়ান যখন কাজ সেরে শহরে এসে পৌঁছায়, তখন আউট ল’য়ের দল শহর ছেড়ে চলে গেছে। তবে যাবার আগে খুন করে যায় শহরের একজন বাসিন্দাকে। শহরের একটি মেয়েকে অসম্মান করতে গিয়ে চার আউট ল’ ওই লোকের প্রতিবাদের কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। শেষে রেগেমেগে প্রতিবাদকারীকেই গুলি করে মেরে শহর ছেড়ে চলে যায়।
সেদিন সন্ধেয় কাজ সেরে শহরে ফিরে আসে রায়ান। সেলুনে বসে খবরটা পায়। এরপর আর দেরি করেনি। ওই অবস্থায় পিছু ধাওয়া করে চার দুর্বৃত্তের। দু’দিন পর তিনজনের মৃতদেহ তাদেরই ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে শহরে ফেরে সে। নেহাত কপাল জোরে বেঁচে গিয়েছিল চতুর্থ জন। তার মুখেই গল্পটা শুনেছিল কেলার। বলেছিল, জন রায়ান মার্শাল হিসেবে আছে, এমন শহরের ১০০ মাইলের মধ্যেও থাকবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে সে।
তলপেটের শূন্যতা যেন আগের চেয়ে বেড়ে গেছে কেলারের। হতাশা চেপে বসেছে বুকের ওপর। ওই লোকের গল্প যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কেলার এখন স্রেফ মরা মানুষ। ওই লোকের নাম উইল স্টেট। কেলার চেনে ওকে। ওর বন্ধু মানুষ ধরতে গেলে। দারুণ গুলি ছুঁড়তে পারে। পিস্তলে শটগানে সমান দ। ও বলেছে, ওদের চারজনকে এক সঙ্গে পেয়ে গিয়েছিল রায়ান। একটা ঝরনার পাশে বসে সকালের নাশতার পর কফি খাচ্ছিল। লোকটা একদম আচমকা এসে পড়ে ওদের মাঝখানে। ঝোপঝাড়ের ফাঁক গলে এত চুপিসারে এসেছিল যে, টেরই পায়নি ওরা। না, সে ওদের অজান্তে গুলি করে মারেনি। আগে সবাইকে নিজেদের হোলস্টার পরে নিতে বলেছিল। তারপর ড্র করতে বলে। নিজেও ড্র করে।
ওদের মধ্যে সবচেয়ে চালু হাত জেমস হার্ডেনের। তাকেই প্রথম ঘায়েল করে রায়ান। গুলি করেই বসে পড়ে। সে-অবস্থায় গুলি করে বেন ল্যুলকে। ল্যুলের গুলি রায়ানের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। বসা থেকেই গড়ান দেয় লোকটা। তিন নম্বর দুর্বৃত্ত নিক পামের তিন চারবার চেষ্টা করেও গুলি লাগাতে পারেনি। লোকটা এত দ্রুত নড়াচড়া করছিল যে, ল্যই স্থির করা যাচ্ছিল না। নিজের তৃতীয় গুলিতে পামেরকে নিকেশ করেছিল রায়ান।
এদিকে ল্যুলকে পড়ে যেতে দেখে আর ভরসা পায়নি উইল স্টেট। ঝরনার ভেতর নেমে পালিয়ে এসেছিল। তবে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। রায়ান ওকে চিনে ফেলেছে। ভবিষ্যতে দেখামাত্র গ্রেফতার করবে।
উইলকে নিজের সমক কিংবা নিজেকে উইলের সমান দ মনে করে কেলার। তার মানে ওর সামনের এই লোকটার সঙ্গে পিস্তলবাজিতে পেরে ওঠার প্রশ্নই আসে না।
মেরুদণ্ডে শিরশিরে ভাব টের পাচ্ছে কেলার। তলপেটে শূন্যতা। এই প্রথম কোনো শত্র“র বিপে দাঁড়িয়ে নিজেকে তুচ্ছ, ুদ্রাতিুদ্র মনে হচ্ছে। ভয় পাচ্ছে ও। ভীষণ ভয় পাচ্ছে। মৃত্যুভয়। বুঝতে পারছে, সামনের এই লোকের সাথে পিস্তলের লড়াই কিংবা খালি হাতে মারামারিÑকোনোটাতেই পেরে উঠবে না সে। ওর হাত থেকে বাঁচতে হলে কৌশল খাটাতে হবে।
‘রায়ান,’ কোমল স্বরে বলল কেলার। ‘যা ঘটেছে, তার জন্যে আমি দুঃখিত। আমরা সম্ভবত একটু বেশি করে ফেলেছি। আমরা আসলে তোমাকে গরুচোর ভেবে বসেছিলাম। মানে এদিকে গরুচোরের খুব উপদ্রব কিনা…’
রায়ান সরাসরি তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তবে কেলারের মনে হলো, ওকে দেখছে না লোকটা। ওর চোখে অন্যরকম এক দৃষ্টি। ছুরির ফলার মতো সে-দৃষ্টি ওর বুকের ভেতরটা চেঁছে নিচ্ছে।
কেলারের জীবনে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। ওর মনে হচ্ছে, মৃত্যুকে এতটা কাছে ও আর কখনো দেখেনি।
‘তোমরা খারাপ লোক, কেলার।’ মৃদু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল রায়ান। ‘আমি তোমাদের চিনতে ভুল করিনি। কিন্তু তোমরা মস্তানি করার জন্যে এবার ভুল একজনকে বেছে নিয়েছিলে। তোমরা শুধু মস্তানি করেই ান্ত হওনি, একজন মানুষের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছ। তোমরা যা করেছ, এটা বর্বর রেড ইন্ডিয়ানদের মানায়, কোনো শ্বেতাঙ্গকে নয়। কোনো উপায় নেই, বাছা। প্রতিফল তোমাদের ভোগ করতেই হবে। শোনো, কোনো কোনো ভুল মানুষ একবারই করতে পারে, দু’বার করার সুযোগ সে আর পায় না।’
ওর ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না কেলার। আচমকা বড় করে একবার নিঃশ্বাস নিল। তারপর চোখ ফিরিয়ে হুইস্কির বোতলের দিকে চাইল। ওর ইচ্ছে হলো, এক নিঃশ্বাসে ঢক ঢক করে বোতল থেকে সবটুকু হুইস্কি খেয়ে নেয়। তারপর যা হয় হোক…
তবে তা না করে রায়ানের দিকে তাকাল ফের। ওর ভেতরে এতণ ধরে গেলা হুইস্কি কাজ করতে শুরু করেছে। হঠাৎ করে ওর বুক ভরে উঠল দারুণ আত্মবিশ্বাসে। লোকটার সম্পর্কে শোনা আগের সেসব গল্পের কথা মনে রইল না ওর। তার জায়গায় ভেসে উঠল লোকটাকে দল বেঁধে পেটানোর সে মজার দৃশ্যটি। পুরনো সে-দৃশ্যটি মনে আসতে মুচকি হাসল কেলার। ওর মনে হলো, দূর, শুধু চিন্তা করে মরছে ও। কদিন আগেই তো মাত্র হোয়াইট মাউন্টিনসের জন রায়ানকে কুকুরের মতো পিটিয়েছে সে।
এক মুহূর্তও দেরি না-করার সিদ্ধান্ত নিল ও। অভিজ্ঞতা থেকেই জানে, সামান্য ইতস্তত ভাব পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে। লড়াইয়ে যে আগে আক্রমণে যাবে, সেই জিতবে।
বিদ্যুদ্বেগে ড্র করতে গেল কেলার।
কিন্তু গ্রিজলির মতো বিশাল লোকটার অ্যাকশন যেন ওর চোখেই পড়ল না। বুঝতে পারল তখন, যখন পরপর দুটো গুলির শব্দ কানে ঢুকল এবং একই সাথে
বুকের একই জায়গায় হাতুড়ির ঘা খেল দু’বার। হোলস্টারে থাকা পিস্তলের বাঁট হাতে ধরা অবস্থাতেই মারা গেল নিজের আউটল’ ক্যারিয়ারে মোট বারো জন মানুষের হত্যাকারী পিট কেলার। এদের মধ্যে পাঁচজনকে সে মেরেছিল পেছন থেকে গুলি করে। প্রাণহীন শরীর বেঁকে গেল, মুখ থুবড়ে পড়ল লোকটা বারের ওপর।
চারদিকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ওপর কয়েক মুহূর্ত পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল রায়ান। তারপর বলল, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ একজন কে-বারে গিয়ে বেলারকে খবর দাও। বলো, তার বন্ধুরা এখানে মরে পড়ে আছে। দুর্গন্ধ ছোটার আগে যেন এদের কবর দেয়ার ব্যবস্থা করে। আর বোলো, আমি এখানে ওর জন্যে অপো করছি।’
ভীড়ের পেছন থেকে দু’জন বেরিয়ে গেল চট জলদি। একটু পরে বাইরে তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল।
বারের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা কেলারের দিকে তাকাল রায়ান। ‘ওদের বন্ধুরা না-আসা পর্যন্ত লাশগুলো বাইরে নিয়ে রাখলে কেমন হয়?’
প্রস্তাব নয় যেন আদেশ। সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে গেল উৎসাহী কয়েকজন।
ব্যাটউয়িং ডোর খুলে রায়ান বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ে শহর ছাড়ল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now