বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"" প্রিয়ন্তি ""
.
.
চোখে গাঢ় কাজল, পরনে সাদা-কালো রঙয়ের একটা শাড়ি আর খোলা চুল...
ঠোটের কোণে ওর সেই চিরায়ত হাসি,
যার একমাত্র তুলনা চলে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের সাথে।
মনে হচ্ছে এখনি বলে উঠবে "এই ছেলে, এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেন? দৃষ্টিশক্তি কিন্তু কমে যাবে.. "
কথাটা ভাবতেই আনমনে হেসে ফেললাম।
হুমায়ূন আহমেদ-এর বই আমার বরাবরই খুব পছন্দের। কর্মব্যস্ততার কারনে এখন আর বই পড়ার সময় পাই না তেমন একটা। আজকে ছুটির দিন তাই ভাবলাম বই পড়ার সুযোগটা কাজে লাগাই। এক কাপ চা বানিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর "হোটেল গ্রেভার ইন" বইটা নিয়ে বসলাম পড়ার জন্য। বইয়ের পাতা খুলতেই টুপ করে প্রিয়ন্তির ছবিটা নিচে পড়ল। ছবিটা এত জীবন্ত লাগছে যে মনে হচ্ছে এখনি সব নিরবতার অবসান ঘটিয়ে প্রিয়ন্তি খিলখিল করে হেসে উঠবে। ছবিটা হাতে নিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম অতীতের সেই দিনগুলোতে
প্রিয়ন্তিকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ভার্সিটির একটা ফাংশনে। প্রিয়ন্তি সেদিন গান গেয়েছিল। ওর সেই সুমিষ্ট কন্ঠস্বর আমার এখনো কানে বাজে।
প্রিয়ন্তিকে দেখলেই আমার মনে হত এ যেন ছুটে চলা পাহাড়ি ঝরনা। সবসময় হাসি লেগেই থাকত মুখে, কোনো দুঃখ যেন ওকে স্পর্শ করতেই পারত না। আমি তখন ছোট ছোট গল্প লিখতাম আর এর সুবাধেই আমার আর প্রিয়ন্তির মধ্য একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আস্তে আস্তে জানতে পারি প্রিয়ন্তির ব্যাপারে, ওর পরিবারের ব্যাপারে।
প্রিয়ন্তির আর কোনো ভাই বোন ছিল না। প্রিয়ন্তির বাবা ছিল পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আর প্রিয়ন্তির মা ছিল গৃহিনী। প্রিয়ন্তির বাবা ছিল একজন সৎ পুলিশ অফিসার আর এজন্যই হয়তো অন্য পুলিশ অফিসারদের মত ওদের আর্থিক অবস্থা অতটা ভালো ছিল না।
প্রিয়ন্তি আর আমার মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল ছিল বেশী। তবুও এই কিশোরীর মত উচ্ছল মেয়েটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। পরে জানতে পারি প্রিয়ন্তিও আমাকে ভালোবাসে। এরপর শুরু হয় আমাদের একসাথে স্বপ্ন বোনা।
বই পড়তে খুব ভালোবাসত ও। কতদিন যে আমরা দুজন একসাথে বৃষ্টিতে ভিজেছি তার হিসেব নেই। প্রিয়ন্তি সবসময় বলত ওর যমজ বাচ্চা চাই। আমি শুনে হাসতাম আর বলতাম "তোমার তো খুব কষ্ট হবে ২টা বাচ্চা সামলাতে। " ও এটা শুনে বলত "মা হতে হলে কষ্ট তো করতেই হবে।" আমি তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম ওকে। ওই সময়টাতে প্রিয়ন্তিকে মনে হত অনেক পরিণত।
প্রিয়ন্তি যেদিন চোখে গাঢ় কাজল দিত আর শাড়ি পরত সেদিন আমি আবার নতুন করে ওর প্রেমে পড়তাম। আমার তাকানো দেখে ও লজ্জা পেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে চোখ রাঙিয়ে বলত " এই যে এভাবে তাকিয়ে থাকলে কিন্তু দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। " ও যখন আমাকে শাসন করত, আমি তাকিয়ে থাকতাম ওর ঠোটের নিচের তিলটার দিকে আর প্রিয়ন্তি তখন এটা বুঝতে পেরে খুব রেগে যেত। রেগে গেলে প্রিয়ন্তি একদম চুপ হয়ে যেত। কিছুক্ষন পর অবশ্য ওর রাগ আর থাকত না। ফুচকা ছিল প্রিয়ন্তির খুব প্রিয়। খুব ঝাল খেত ও। মাঝেই মাঝেই ও আমাকে গান গেয়ে শোনাত। আহহ সত্যিই খুব সুখী ছিলাম আমরা।
তখন আমাদের রিলেশনের প্রায় ৩ বছর কেটে গেছে। ততদিনে আমাদের দু পরিবারের মধ্যেও একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হঠাৎ একদিন প্রিয়ন্তি জানালো ওর বাবাকে একটা পাহাড়ি অঞ্চলে বদলি করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই ওরা ওখানে চলে যাবে। ওই সময়ই আমি প্রথমবারের মতো প্রিয়ন্তিকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম। প্রিয়ন্তি সেটা বুঝতে পেরেই হয়তো তখন আমাকে প্রথমবার জড়িয়ে ধরেছিল আর বলেছিল " আমারও খুব কষ্ট হবে তোমাকে না দেখে থাকতে। " জানিনা সেদিন কিভাবে বুকে পাথর চেপে হাসি মুখে প্রিয়ন্তিকে বিদায় জানিয়েছিলাম।
এরপর থেকে প্রিয়ন্তির আর আমার দেখা না হলেও, ফোনে যোগাযোগ ছিল।
সেদিনও ছিল ছুটির দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা গম্ভীর হয়ে বসে আছে আর মায়ের চোখমুখ ফোলা। মা যে অনেকক্ষন কেঁদেছে সেটা মায়ের চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে কিন্তু মা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বলল তৈরি হয়ে নিতে, আমাকে নিয়ে নাকি কোথায় যাবে। আমি তখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
তারপর বাবা আর মা আমাকে নিয়ে গেল সেই জায়গায়। সেখানে যাওয়ার পথেই আমার কিছুটা খটকা লেগেছিল। কারন আমি যতদূর জানি ওই জায়গায় আমাদের কোনো আত্মীয় থাকে না। বাবা সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর আমি দেখলাম সাদা কাপরে ঢাকা পাশাপাশি দুইটা লাশ! লাশগুলোর মুখ দেখে আমি ভয়ানক চমকে উঠি। কারন লাশ দুইটা ছিল প্রিয়ন্তির বাবা আর মায়ের।
পরে বাবার কাছে জানতে পারি সবটা। একটা উপজাতি মেয়েকে ধর্ষনের অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিল প্রিয়ন্তির বাবা। ওই মামলার প্রধান আসামী ছিল এক এমপির ছেলে। প্রভাবশালী মহলের হুমকিকে অমান্য করে প্রিয়ন্তির বাবা সঠিক তথ্য উপস্থাপন করে আদালতে। আর এর ফলে এমপি পুত্রের জেল হয়ে যায়। অবশ্য পরে ওই ছেলে জামিন নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল জেল থেকে। এর কিছুদিন পরেই প্রিয়ন্তির বাবা মা নিজ বাসায় খুন হয় আর আমার প্রিয়ন্তি হয় ধর্ষিত।
পুরো ৫ দিন পর প্রিয়ন্তির জ্ঞান ফিরেছিল। চোখ খুলেই ও ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল। প্রথমে কাউকেই চিনতে পারছিল না। তারপর আস্তে আস্তে সবাইকে চিনতে পারলেও মানসিকভাবে খুব ভেঙে পরেছিল। প্রিয়ন্তি শারীরিকভাবে একটু সুস্থ হওয়ার পরই আমি ওকে বিয়ে করেছিলাম। আমি যখন প্রিয়ন্তিকে বিয়ে করব এটা বাবাকে জানিয়েছিলাম, বাবা খুশি হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল।
বিয়ে নিয়ে আমার আর প্রিয়ন্তির অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির জন্য আমাদের স্বপ্নগুলো পূর্ণ করা সম্ভব হয় নি তখন।
বাবা আর মায়ের সহযোগিতায় আমি প্রিয়ন্তিকে একটু একটু করে মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলেছিলাম। কিন্তু সুখ তবু অধরাই থেকে গেল।
আমাদের সমাজ একজন অপরাধী ধর্ষককে গলায় মালা পরিয়ে বরন করে নিতে পারলেও কোনো নিরপরাধ ধর্ষিতাকে মেনে নিতে পারে না!! একজন ধর্ষিতা হওয়ায় সদ্য বাবা মা হারানো আমার প্রিয়ন্তিও এ সমাজের সভ্য মানুষদের কানাঘুসা, টিটকারি এসব থেকে রেহাই পায় নি। এমনকি আমার আর প্রিয়ন্তির অনাগত সন্তানকে নিয়েও সবাই সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছিল! যে প্রিয়ন্তির মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকত, সে আর তখন হাসত না একদম। মাঝে মাঝেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত আর বলত " বিশ্বাস কর আমার গর্ভের সন্তানটা তোমারই " আমি তখন ওকে বুকের মধ্য জড়িয়ে ধরে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতাম।
আস্তে আস্তে প্রিয়ন্তির শরীর ভেঙে পরছিল। এরপর এল সেই দিন, যেদিন আমার উচ্ছল প্রিয়ন্তি একদম শান্ত হয়ে গেল.....
সেদিন বিকালে হঠাৎ করেই প্রিয়ন্তির রক্তক্ষরন শুরু হয়। এর ৩ ঘন্টা পরেই আমার প্রিয়ন্তি আমাকে ছেড়ে সারা জীবনের জন্য চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে আমাকে কিছু একটা বলার খুব চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বলে যেতে পারেনি।
.
প্রিয়ন্তির সব স্মৃতি আমি মুছে ফেলেছিলাম ও চলে যাওয়ার পর। কিন্তু এখন প্রিয়ন্তির এই ছবিটা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে প্রিয়ন্তি এখনো বেঁচে আছে আমার মনের কোণে। আর কখনো প্রিয়ন্তির সেই হাস্যজ্জ্বল অপূর্ব মুখটা দেখব না ভাবতেই বুকের ভিতর একটা হাহাকার জন্মাচ্ছে। তোমায় এখনো বড্ড ভালোবাসি প্রিয়ন্তি......
.
লেখা :-- ছদ্মবেশী লেখিকা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now