বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রেতাত্মার অট্টহাসি

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "প্রেতাত্মার অট্টহাসি" ------------------ অদ্রীশ বর্ধন ------------------ আপনি বিশ্বাস করেন? বললে ইন্দ্রনাথ। শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে আপনারও। ওরাই তো ছেলেটার মাথায় পাথর ফেলেছিল, দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন রামধন চক্রবর্তী। ভদ্রলোক যেমন লম্বা, তেমনি রোগা। ফর্সা। চোখে সোনার চশমা। গায়ে আদির পাঞ্জাবি আর ধুতি। শৌখিন পুরুষ। বয়স ষাটের উর্ধ্বে। গোটা মুখখানায় দাম্ভিকতা মাখানো। যেন, ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন। ছোট ছোট দুই চোখ বেশ কুটিল। জগৎটাকে সোজাভাবে দেখতে অভ্যস্ত নন। কথা হচ্ছে ইন্দ্রনাথের সুভাষ সরোবরের বাড়িতে। সকালের রোদ জানলা দিয়ে এসে পড়েছে বামধনবাবুর পিঠে। মাথা নেড়ে কথা বলার সময়ে পেছনের রোদ মাথার পাশ দিয়ে চশমার পুরু লেন্সে পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। কুটিল চোখ দুটোর ওপর যেন ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে। রৌদ্র-ঝলকিত চোখ দুটোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। বললে, জায়গাটা পাহাড়- ঘেরা? হ্যাঁ। প্রেতাত্মার অট্টহাসি পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে দূরে মিলিয়ে যায়? আকাশে উঠে যায়। কামান গর্জন শোনা যায়। ফটফট করে গাদা বন্দুক ছোড়ার আওয়াজ হয়। আপনি বলছেন, সিপাইরা মরে গিয়েও মহড়া দিচ্ছে —লড়ছে ইংরেজদের সঙ্গে? ওখানকার লোকেই বলে। সিপাই বিদ্রোহ খতম হয়ে যাওয়ার পর যারা পালিয়ে এসে লুকিয়েছিল পাহাড়ে, ইংরেজরা তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। ভূত হয়ে তারা আজও— হাসছে। শুনেছি। এই ভূতেরাই আপনার ছেলের মাথায় মস্ত পাথর ছুড়ে ফেলেছিল? আজ্ঞে। মা-মরা একমাত্র ছেলে আমার। তাই বড় জেদি। নিশুতি রাতে বেরিয়েছিল প্রেতাত্মার খোঁজে। সারারাত বাড়ি ফেরেনি। সকালে ফিরে এল ওর ঘোড়া। ঘোড়া চড়তে জানে আপনার ছেলে? ভালোরকম। আমিও জানি। পুরুষোচিত সব খেলা ওকে আমি শিখিয়েছি। রাইফেল ছোড়া, ঘোড়া ছোটানো, সাঁতার। ছেলের চেহারাও সেইরকম। আমার মতন লম্বা তবে রোগা নয়। জান শক্ত বলেই আজও বেঁচে রয়েছে—মরে থাকারই সমান। ঘোড়াই পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল আপনাকে? বড় প্রভুভক্ত ঘোড়া। পিঠে বন্দুক ঝুলছে, হ্যাভারস্যাক ঝুলছে, নেই শুধু আমার ছেলে আর দড়িদড়া। চেপে বসলাম পিঠে, টগবগিয়ে নিয়ে গেল ভীষণ ঘন জঙ্গলের মধ্যে। খোঁচা খোঁচা পাহাড় ঠেলে উঠেছে যেখানে, সেইখানে একটা পাহাড়ের তলায় পড়েছিল ছেলে। ছেলেকে ঘোড়ায় তুলে যখন ফিরে আসছেন, তখন আবার প্রেতাত্মারা ব্যঙ্গের অট্টহাসি হেসেছিল? দিনের বেলায়। গা ছমছম করে উঠেছিল আমার ! দড়িদড়া যা সঙ্গে নিয়ে গেছিল আপনার ছেলে? ওই অবস্থায় দড়ির খোঁজ করা যায়? রামধনবাবু ঝলকিত চক্ষু যেন জ্বলে উঠল, একনজরে আশেপাশেও দেখিনি। মাটি কাঁপছে তখন থরথর করে। মাটি কাঁপছে? প্রেতাত্মারা যখন হাসে, মাটি পর্যন্ত কাঁপে। আমার তো পুরোনো বাড়ি, তার নড়বড়ে দরজাজানলাও খটখট করে। জেনে-শুনে অমন বাড়ি কিনলেন কেন? সস্তায় পেলাম বলে। ইংরেজের অত্যাচারে যে- রাজা লুকিয়ে থাকবার জন্যে ওই বাড়ি বানিয়েছিলেন, তিনি হয়েছেন নির্বংশ। বন-জঙ্গলে প্রেতাত্মার অট্টহাসি শুনতে কে আর যাবে বলুন! তার ওপর যাযাবর জংলিদের অত্যাচার। ভয়ানক নৃশংস। শুনেছি, খিদে পেলে তারা মানুষের মাংসও কাচা খায়। এরকম এক আদিবাসীর কথা আমিও শুনেছি। কখনও দেখিনি। আপনি দেখেছেন? হ্যাঁ। সিধে হয়ে বসল ইন্দ্রনাথ, বলেন কী! কোথায়? আমার বাড়িতেই। আপনার মাংস খেয়ে যায়নি? কেন খাবে? ওদের দেবতা যে রয়েছে আমার বাগানে। বলুন, বলুন, খুলে বলুন। যে-রাজা এই বাড়ি বানিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন মহা খলিফা। স্থানীয় আদিবাসীদের কব্জায় রাখবার জন্যে ওদের জঙ্গলে দেবতার মতন দেখতে একটা পাথরের দেবতা বানিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাগানের মন্দিরে। ওদিককার পাঁচিলের ফটকও আলাদা। সোজা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে, পুজো দিয়ে জঙ্গলেই ফিরে যায় নরখাদকরা। আমি বারান্দায় বসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি। মন্দিরের দেবতাও দেখেছেন? সে এক আশ্চর্য দেবতা, মশায়। চোখ কপালে তুলে যখন-তখন কাঁদে! এতক্ষণে একটিপ নস্যি নিল ইন্দ্রনাথ। বললে, পাথরের, না, ধাতুর বিগ্ৰহ? পাথরের। দেখতে কি রকম? অনেকটা শিবঠাকুরের মতন, আবক্ষ মূর্তি। একটা পাথরের বেদির ওপর বসানো। মাথায় জটার মধ্যে সাপ। গলা পেঁচিয়ে রয়েছে সাপ। ড্যাবা ড্যাবা চোখ দেখলে ভয় হয়। যখন-তখন কাঁদে? প্রেতাত্মাদের অট্টহাসি শেষ হলেই কাঁদে। দরজা-জানলা যখন খটখট করে, মাটি থরথর করে, তখন সে চোখ উল্টে কাঁদে। যাকে বলে শিবনেত্র হওয়া, ঠিক সেইরকম। ফোটা ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। কেন কাঁদে, জানেন? বোকার মতন প্রশ্ন, কিছু মনে করবেন না। সিপাইদের শোকে—যাদের নৃশংসভাবে খুন করেছিল ইংরেজরা। কার কাছে শুনলেন? আদিবাসীরাই অঙ্গভঙ্গি করে বলেছে। ওরা আমাকে মানে, আমার ছেলেকেও ভালোবাসে। ছেলে আজও নাসিংহোমে? ক্যালকাটা হসপিটাল ফর নিউরো-ডিসঅ্যাবিলিটি-তে। দু’বছর? হাঁ। কোমা’ স্টেজে। জ্ঞান-ট্যান কিছু নেই, সবজির মতন বেঁচে থাকা। আঙুল নাড়ছে তো? গত মাস থেকে । চোখ খুলেছে? হ্যাঁ। কথা বলছে? না। তবে আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন? রামধনবাবুর লম্বা শিরদাঁড়ায় বোধহয় কোনো দোষ আছে। কোমরের কাছ থেকে শিরদাঁড়া সামনে ঝুঁকিয়ে বসেন। ঘরেও ঢুকেছেন সেইভাবে—সামনে কোমর ঝুঁকিয়ে। হতে পারে এটা একটা দেমাকি স্টাইল। বোধহয় তাই। ইন্দ্রনাথের সটাসট প্রশ্নটা শুনে তিনি শিরদাঁড়া সিধে করে ফেললেন। নতুন করে রোদ্দুর ঝিলিক মেরে গেল তার পুরু লেন্সে। বললেন, এক কমপিউটার টেকনিশিয়ান ওই আঙুলটার সঙ্গে একটা ‘বাজার’ লাগিয়ে দিয়েছিল। চোখের সামনে রেখেছিল হরফ সঙ্কেত। সেই দেখে আঙুল ঠুকেছে আমার ছেলে। মর্স কোড-এর মতন ? হ্যাঁ। একটা-একটা অক্ষর কমপিউটার মনিটরে ফুটে উঠেছে। কি জানিয়েছে সবশেষে? মোগল-মোহর...মোগল-মোহর। রামধনবাবু চুপ করলেন। ইন্দ্রনাথ আবার নস্যি নিল। বললে, বুঝেছি। পাথরটা প্রেতাত্মা ছোঁড়েনি এইরকম এক ধারণা আপনার মাথায় এসেছে? ঠিক তাই। মোগল আমলের মোহরের সন্ধান পেয়েছিল আপনার ছেলে, তাই কেউ তাকে পিটিয়ে মারতে চেয়েছিল? হ্যাঁ। আপনার আদিবাসী প্রতিবেশীদের জিগ্যেস করেছিলেন? আমার ছেলেকে ওরা ভালোবাসে। এ কাজ ওদের নয়। মোহরের লোভও ওদের নেই। ছেলে আর কিছু জানিয়েছে? না। ওইটুকু জানাতেই অনেক এনার্জি খরচ করে ফেলেছিল, আবার কোমা’র স্টেজে চলে গেছে। মরে আছে কি বেঁচে আছে বোঝাই মুশকিল। চলুন। কোথায়? আপনার বাড়ি? পাহাড়-বন-বাড়ি কাঁপিয়ে প্রেতাত্মার অট্টহাসির অট্ট- অট্ট রোল বিষম শোরগোল সৃষ্টি করে মিলিয়ে গেল দূর হতে দূরে। চওড়া বারান্দায় নিঃসীম অন্ধকারে বসে সেই শব্দ শুনল ইন্দ্রনাথ। একটু পরেই পুরোনো প্রাসাদের নড়বড়ে দরজা- জানলা নড়ে উঠল খটখট শব্দে। অতিকায় প্রেত যেন গোটা বাড়িটাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। শুনলেন? অন্ধকারে ধ্বনিত হল রামধন চক্রবর্তীর ভয়লেশহীন কণ্ঠস্বর। এ সবই আপনার গা-সওয়া হয়ে গেছে দেখছি। তা হয়েছে। আপনি ভয় পেয়েছেন? অন্ধকারেই শোনা গেল ইন্দ্রনাথের অস্ফুট হাসি, মজা পেয়েছি। আপনার অনুগত প্রজারা কি এখন দেবদর্শনে আসে? আদিবাসীরা? না। উঠুন। কোথায় যাবেন? বিগ্রহ দর্শনে। বাগান তো নয়, জঙ্গল। টর্চের আলোয় পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন রামধনবাবু! দেমাকি স্টাইলে তিনি এখন হাঁটছেন শিরদাঁড়া সামনে ঝুঁকিয়ে। দেউলের সামনে এসে টর্চ ঘুরিয়ে দেখালেন। বললেন, শিবমন্দির বলে মনে হচ্ছে না? ইন্দ্রনাথ বললে, ভেতরে চলুন। পাথর-বাঁধাই চত্বর পেরিয়ে, নিচু খিলেনের তলা দিয়ে, রামধনবাবুর পেছন পেছন বিগ্রহের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। আবক্ষ শিবমূর্তি। জংলিদের হাতে বিকট চেহারা নিয়েছে। যে বেদিতে বসানো, সেটা লম্বায়চওড়ায় প্রায় দশ ফুট—চতুষ্কোণ। পাথর দিয়ে তৈরি। রামধনবাবু সটান টর্চ মেরেছিলেন বিগ্রহের চোখের ওপর। বললেন, দেখেছেন? দেখছি। বিগ্রহের ড্যাবা ড্যাবা চোখের মণি একটু একটু করে ওপরে উঠে যাচ্ছে...একেবারেই উঠে গেল... চোখের সাদা অংশ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না... লাফিয়ে বেদির ওপর উঠে পড়ল ইন্দ্রনাথ, পকেট থেকে বের করল কম্পাস। ছুচলো মুখ দুটো দিয়ে চোখের সাদা অংশ মেপে বললে, প্রায় আধ ইঞ্চি । গুরুগম্ভীর গলায় পেছন থেকে রামধনবাবু বললেন, কাজটা ভালো করলেন না। পবিত্র বেদিতে পা দিয়েছেন, আদিবাসীরা যদি জানতে পারে— চোখের তারা নামছে, বললে ইন্দ্রনাথ। টর্চের জোরালো ফোকাসে দেখা গেল সেই অভাবনীয় দৃশ্য। আস্তে আস্তে কালো পাথরের মণিকা নামছে নীচে। আধ ইঞ্চিটাক সাদা অংশ মিলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। এক ফোটা করে জল উপচে পড়ল প্রতি চোখে। গড়িয়ে নেমে এল পাথরের গাল বেয়ে। আবেগহীন গলায় বললেন রামধনবাবু, নিহত সিপাইদের শোকে আজও কেঁদে চলেছে পাথরের দেবতা । সেই সঙ্গে বাতলে দিচ্ছে মোগল-মোহরের হদিস। এই পাহাড়-জঙ্গলে নদী কোথাও নেই? অন্ধকার বারান্দায় ফিরে এসে বললে ইন্দ্রনাথ, কিন্তু একটা ঝর্না আছে? পাহাড়ের গুহা থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এসে, নীচে নেমে পাতালে ঢুকে গেছে। বললেন রামধনবাবু। ফল্লু নদী হয়ে গেছে? হ্যাঁ। ঝর্নার জল পাহাড়ের গুহা থেকে বেরোচ্ছে? কোত্থেকে বেরোচ্ছে? নিশ্চয় আর একটা ফল্লু নদীর জল? নিশ্চয়। এখানকার পাহাড়-জঙ্গল এমন কিছু উঁচু নয় যে সেখানকার জমা জল গড়িয়ে এসে নদী বানাবে। ফল্লু নদী পাহাড়ের অত উঁচুতে উঠে তোড়ে গুহা দিয়ে বেরোচ্ছে কি করে, তা নিয়ে কিছু ভাবেননি? না। কেন, ইন্দ্রনাথবাবু? আপনার ছেলে ভেবেছিল। তাই মোগল- মোহরের সন্ধান পেয়েছিল। বিগ্রহের কান্না তার মনে প্রশ্ন জাগিয়েছিল। বিজ্ঞান-জানা মন নিয়ে সে-প্রশ্নের সমাধানও করেছিল। রামধনবাবু, আপনার ছেলে একটি রত্ন। অন্ধকারে শোনা গেল রামধন চক্রবর্তীর পাজর-খালি-করা নিশ্বাস। তালে তাল দিয়ে প্রেতাত্মারা অট্টহাসি হাসল ঠিক এই সময়ে। প্রাসাদের দরজা- জানলাও কাঁপল ঠকঠকিয়ে। আওয়াজ-টাওয়াজ থেমে যেতেই ইন্দ্রনাথ বললে, বরিশাল কামান নির্ঘোষের ঘটনা জানেন? সেটা আবার কী? গোটা পৃথিবী জানে। যার নাম চালভাজা, তার নাম মুড়ি। বরিশাল কামান, মিস্টপোফার্স আর বাতাস-কম্প—একই জিনিস। ব্যাখ্যা করুন। অদ্ভুত বিস্ফোরণের শব্দ পৃথিবীর নানা জায়গায় শোনা যায় আজও। ভূমিকম্প বা বাজ পড়ার সঙ্গে সে-সব আওয়াজের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। ডিনামাইট আবিষ্কারের আগে, অথবা শব্দের চেয়ে বেশি স্পিডে এরোপ্লেন উড়ে গেলে বাতাস ফেটে পড়ার অনেক আগে থেকে এ-আওয়াজ শোনা গেছে। উত্তর সমুদ্রের নাবিকরা শুনেছে ঠিক যেন গুরুগুরু গুমগুম শব্দ গড়িয়ে যাচ্ছে দূর হতে দূরে। ওরা তার নাম দিয়েছিল মিস্টপোফার্স। ১৮৯৬ সালে বিলেতের ‘নেচার’ কাগজে বেরোল অবিশ্বাস্য সেই খবর-ধুবড়ির উত্তরে দিনে অথবা রাতে শোনা যাচ্ছে কামান দাগার অথবা বন্দুক ছোড়ার আওয়াজ। এই আওয়াজের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বরিশাল কামান’। ১৯৩৪ সালে ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে বেরোলো ‘সেনকা হ্রদ কামান রহস্য’। নিৰ্ঘোষ শোনা যায় যেন সব দিক থেকেই। ইতালিতে এই শব্দকেই বলে ‘ম্যারিনা’ অথবা ‘ব্রনটিডি’, হাইতিয়ানরা বলে ‘গুফরে’। কানেকটিকাট নদীর উপত্যকায় প্রথম যারা উপনিবেশ গড়েছিল, তারাও শুনেছিল এই আওয়াজ, ইংরেজ দেবতাদের ধমকাচ্ছে যেন রেড ইন্ডিয়ান উপদেবতা। ওখানে এই আওয়াজের নামকরণ হয়েছিল 'মুড়াস’। বাড়ি কাঁপিয়ে ছাড়ত। রামধনবাবু, বুঝলেন কিছু? না। তার জন্যে লজ্জা পাবেন না। আপনার ছেলে নিশ্চয় বেলজিয়ান ভদ্রলোকের বৈজ্ঞানিক রিপোর্টটা পড়েছিল। আইসল্যান্ড থেকে বিস্কে উপসাগর পর্যন্ত যেখানে যত ভূতুড়ে আওয়াজ, সব কিছু নিয়ে ইনি গবেষণা করেন ১৮৯০-তে। যোগাযোগ করেন চার্লস ডারউইনের ছেলে স্যার জর্জ ডারউইনের সঙ্গে। ব্যাখ্যা দাঁড়িয়েছিল অনেকরকম। যথা? এই প্রথম উৎসুক মনে হল রামধন চক্রবর্তীকে। কেউ বলেছে, আবহমণ্ডলের বিদ্যুৎ সৃষ্টিছাড়া আওয়াজ ঘটাচ্ছে। কেউ বলেছিল, ভূগর্ভে গলিত লাভার সংঘাতের আওয়াজ বোমার মতন ফেটে পড়ছে বাইরে। কারও মতে, ‘সুনামি টাইডাল ওয়েভ অথবা সমুদ্রের পর্বতসমান ঢেউ সৈকতে আছড়ে পড়ায় বহুদূরে ভেসে যাচ্ছে কামান নির্ঘোষের মতন শব্দ। যেমন ঘটে ফিলিপাইনে। টাইফুন ঝড় আসবার অনেক আগে হাজার মাইল দূর থেকে শোনা যায় আকাশে বোমা ফাটার আওয়াজ। কী সর্বনাশ! আকাশে-বাতাস অট্টহাসি ভেসে আসছে পাতাল থেকে, সমুদ্র থেকে— বাতাসের স্তরে স্তরে ঘষটানি থেকেও। রামধনবাবু, আপনার এখানে হচ্ছে অন্য কারণে। এ যে ফল্লু নদীর দেশ। তাই এখানে শিবঠাকুর কাঁদে, পাহাড়ের মাথায় ঝর্না জাগে, আকাশে-বাতাসে ভূতেরা হাসে। যা বলব, তা করতে পারবেন? সাহস আছে? অন্ধকারে চেয়ার সরে যাওয়ার আওয়াজ হল। উঠে দাঁড়িয়েছেন রামধন চক্রবর্তী। প্রেতাত্মারা অট্ট- অট্ট হেসে উঠল ঠিক এই সময়ে। দরকার ছিল একটা শাবল আর একটা কোদালের। জোগাড় করে দিলেন রামধনবাবু। পাথরের খাঁজে চাড় মেরে শিবমূর্তিকে উল্টে ফেলে দিল ইন্দ্রনাথ, খুব সহজে অবশ্য নয়। ইন্দ্রনাথ বলেই পেরেছিল, কিন্তু ঘেমে নেয়ে গেছিল। মুচকি হেসে বলেছিল, কি বুঝলেন? ঢোক গিললেন রামধনবাবু, মনে হচ্ছে, বিগ্রহ আগেই উলটোনো হয়েছিল। পাথরের জোড়ে শাবল মারার স্পষ্ট দাগ দেখলাম। ঠিকই দেখেছেন। সিমেন্ট দিয়ে দাগ বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আপনার ছেলের কীর্তি। রামধনবাবু নিশ্চুপ। ইন্দ্র বললে, টর্চটা আমাকে দিন। পাশে এসে দাঁড়ান। কি দেখছেন? টর্চের ফোকাস আলোকিত করে তুলেছে ভেতরের কুয়ো। জল বেশি নীচে নেই। টর্চ ঘুরিয়ে বিগ্রহের চোখে ফোকাস করল ইন্দ্রনাথ। চোখে আঙুল দিতেই চোখ সরে গেল ওপরের দিকে। মার্বেল গুলিতে আঁকা চোখে। ফাঁপা গুলি। টর্চ এনে এবার উলটোনো বিগ্রহের তলদেশে ফোকাস করতেই চক্ষুস্থির হয়ে গেল রামধনবাবুর। ভেতরটা বিলকুল ফোপরা। শ্যাওলা ভর্তি। জল চুয়ে পড়ছে শ্যাওলা থেকে। প্রেতাত্মারা হেসে উঠল আকাশে। কুয়োর জল দমক মেরে মেরে উঠতে লাগল ওপরে। গম্ভীর নিনাদের ওপর গলা চড়িয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, ওই জল নীচ থেকে উঠে এসে ফোপরা শিবঠাকুরের মধ্যে ঢুকে ঘুরিয়ে দিত চোখের গুলি। জল গড়াত চোখে কুয়োর জল নেমে গেলেই। প্রায় আর্তকণ্ঠে বললেন রামধনবাবু, কুয়োর জল যে উঠে এল! দমাস করে শিবঠাকুরকে যথাস্থানে বসিয়ে দিল ইন্দ্রনাথ। হুউউস আওয়াজ শোনা গেল বিগ্রহের মধ্যে। উল্টে গেল চোখের তারা। নেমে এল ক্ষণপরেই। জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ফল্লু নদীর জল, বাগানে বেরিয়ে এসে বললে ইন্দ্রনাথ, এখানে যেমন কুয়ো দিয়ে উঠছে, পাহাড়ের গায়ে তেমনি গুহা দিয়ে ঝর্না হয়ে ঝরছে। আর হাসির আওয়াজ? হাসি বলে মনে করলেই হল। বুমবুম শব্দের ধ্বনি আর প্রতিধ্বনিকে প্রেতাত্মার অট্টহাসি বললে খাপ খেয়ে যায় নিহত সেপাইদের কাহিনির সঙ্গে। সমুদ্র এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সৈকতের পাহাড়ি গুহা বেয়ে ঢেউ আছড়ে ঢুকছে, বাঁকে বাঁকে ধাক্কা খেয়ে আওয়াজ সৃষ্টি করছে, ফল্লু নদীর জল বাড়ছে, শিবঠাকুরের চোখ নড়ছে, ঝর্না সৃষ্টি হচ্ছে— মোগল-মোহর? আপনার ঘোড়া পথ চিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে? কোথায়? যেখানে আপনার ছেলে পড়েছিল? পারবে! খোঁচা খোঁচা পাহাড়ের চুড়োগুলো বল্লমের মতন মাথা উঁচিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। জঙ্গল এখানে এমনই ঘন যে ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা যায় না। সবে ভোর হয়েছে। ঘোড়া চিঁহি চিঁহি ডাক ছাড়ল একটা পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে। অদ্ভুত পাহাড়। ছুরি দিয়ে মাখন কাটার মতন লম্বালম্বিভাবে কেটে আধখানা করা হয়েছে যেন। ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে পাথুরে দেওয়ালের গা ঘেঁষে। পা দিয়ে ঠুকছে একটা পাথর। চিৎকার করে উঠলেন রামধনবাবু, ওই.ওই সেই পাথর! ওই পাথর খুলি চুরমার করেছিল আমার ছেলের। হেট হয়ে পাথরটার চেহারা দেখে ইন্দ্র বললে, এ তো খসে পড়া পাথর। খসে পড়া! আকাশ থেকে নয়, এই পাহাড়ের মাথা থেকে। কি বলছেন! রামধনবাবু, আপনার হিরের টুকরো ছেলে যেকোনোভাবেই হোক জেনেছিল এই পাহাড়ের কোথাও মোগল-মোহর আছে। দড়িদড়া নিয়ে উঠেছিল পাহাড়ে। আলগা পাথরে পা রাখতেই আছড়ে পড়েছে নীচে আর পাথর পড়েছে মাথায়! ও মাই গড! এই প্রথম ইংরিজি ভাষণ ছাড়লেন রামধন চক্রবর্তী, যা তার পরিপূর্ণ বঙ্গসজ্জায় নিতান্তই বেমানান। তারপরেই অবশ্য বললেন খাটি বাংলায়, পাহাড়ে উঠেছিল? কেন? কেন? কেন? গুহার মধ্যে দড়ি ঝুলিয়ে নামবে বলে। নেমেও ছিল নিশ্চয়। দড়িদড়া নিয়ে এসেছিল ঘোড়ার পিঠে, কিন্তু মনে হয় কিছু পায়নি। পেলে ও সে কি আর আছে? ঘোড়া যা জোরে ছুটে ফিরে গিয়েছিল, হয়তো বনে- জঙ্গলেই পড়ে গেছে। বন্দুক আর হ্যাভারস্যাক তো পড়েনি। রামধনবাবু, পাহাড়ের মাথায় নিশ্চয় গুহা আছে। খাড়াই গুহা, কুয়োর মতন। যার মধ্যে দিয়ে ফল্লু নদীর জলোচ্ছাস প্রেতাত্মার অট্টহাসি হয়ে ঠিকরে বেরোয়। ইন্দ্রনাথের কথা যে কতটা সত্যি তা প্রমাণ করতেই বুঝি ঠিক সেই মুহুর্তে ভয়াল প্রেত-অট্টহাসি শোনা গেল পর্বতচূড়োয়। সঙ্গে সঙ্গে ওপরে চোখ তুলল ইন্দ্র। দেখল, জলকণা ছিটকে যাচ্ছে চুড়োয়, যেন মেঘ। বললে, আসুন, মোগল-মোহর দেখবেন আসুন। ওরা এখন দাঁড়িয়ে পাতালগর্ভে। পর্বতচূড়োয় সত্যিই পাওয়া গেছে খাড়া কুয়োর মতন গর্ত। দড়ি ঝুলছে তার মধ্যে। সেই দড়ি বেয়ে একে একে নেমে এসেছে দুইজনে। বেশিদূর নামতে হয়নি। কুয়োর গা থেকে একটা গুহা চলে গেছে নীচের দিকে। এ গর্তে জল নেই। গর্তের শেষে একটা গর্ভগৃহ। টর্চের আলোয় দেখা যাচ্ছে ঘরভর্তি সুবর্ণপেটিকা। প্রতিটা পেটিকার মধ্যে থরে থরে সাজানো মোহর। অভিশপ্ত মোহর, বলেছিল ইন্দ্রনাথ। আর কিছু বলেনি। কাউকে নয়। আমাকে ছাড়া। তাই লিখলাম এই কাহিনি। (সমাপ্ত) -------------- রেটিং দিয়েন (ভিক্ষা চাওয়ার মতো হয়ে গেল)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রেতাত্মার অট্টহাসি
→ প্রেতাত্মার অট্টহাসি
→ প্রেতাত্মার অট্টহাসি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now