বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
♦প্রায়শ্চিত্ত♦
"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মফিজুল (০ পয়েন্ট)
X
#অতিপ্রাকৃত_
রাত ১২ টা।
বাঁশের সাঁকো দিয়ে ধীরেসুস্থে গাঙ পাড় হচ্ছে লোকটি।হঠাৎ বাতাস ও গাঙের পানির স্রোতে বাঁশের সাঁকোটি ক্যাচ ক্যাচ শব্দে লড়তে থাকে। লোকটির কাঁধে ঝুলানো ব্যাগের মধ্যে চক, খাতা কলম, পেন্সিল থাকায়, ব্যাগটি যেন বাতাসে নিচে না পড়ে যায় তাই শক্ত করে ধরে রাখে ।
তখনি লক্ষ্য করল বাঁশের সাঁকো ধরে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
যতই এগিয়ে আসছে ততোই চেনা চেনা লাগছে মেয়েটি কে।
কাছে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটিকে সে চিনতে পারে...
.
রাত ১২:৩০ মিনিট ।
খিলখিল হাসির শব্দে হুট করে ঘুম ভাঙে শম্ভুনাথের। কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে তার। শ্মশানে এই অপঘাতে মৃত্যুর লাশ গুলো যখন আসে, তখন নানা কারণে ঘুমের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় তাকে।
কয়েক দিন আগে যে মেয়েটির লাশ পুড়ানো হয়, জালাল পাগলের মাধ্যমে জানতে পারে, মালতী দেবী নামের সেই মেয়েটি নাকি গলায় ফাঁস নিয়ে মারা যায়!
খবর নিয়ে জানতে পারে মেয়েটি কি কারণে, কোন অভিমানে ঘরের ভিতর ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে, কেউ কোন কূলকিনারা পায়নি। সেটা এখনো রহস্য রয়ে গেছে।
শম্ভুনাথ সেদিন গুরুতর অসুস্থ থাকায় মন্দির থেকে বের হতে না পারলেও মন্ত্রতন্ত্র পড়ে দূর থেকেই ফু দিতে হয় । চিতার বাকি কাজ মেয়ের দাদারাই তাড়াহুড়ো করে দাহ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে।
পঞ্চশ ছুঁইছুঁই বয়স শম্ভুনাথের। ভিন গাঁও থেকে এসে শ্মশান রক্ষিতার কাজ টা পায় সে। এতেই তার এক পেট ভাল ভাবে চলে যায়। শ্মশানঘাটের পাশেই মন্দির। মন্দিরের ভিতরই ছোট্ট একটু জায়গা করে নিয়েছে থাকার জন্য। শ্মশানঘাটের মন্দিরে একা একা থাকা যদিও সহজ নয়, তবু এই কাজটি তার বাধ্যহয়েই করতে হয়।
শম্ভুনাথ কিছুক্ষণ কান পেতে শুনার চেষ্টা করল অদ্ভুত হাসির শব্দটা এখনো আসছে কিনা!
চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকা,ব্যাঙ, নানা রকম পোকামাকড়ের শব্দে পরিবেশ টা কেমন জানি ভুতুড়ে লাগছে তার কাছে। বেশ কিছুক্ষণ কান পেতে শুনতে থাকায় হঠাৎ তা গা ঝিমঝিম করে উঠে। কাঁথাটা শরীরে ভালো ভাবে গায়ে দিয়ে আবার সে ঘুমিয়ে পড়লো।
'শম্ভুদা দরজা ডা খোলেন ভয় লাগতাছে। '
দরজায় কড়া আঘাত ও ডাকে আবার জেগে উঠে শম্ভুনাথ।
'কে জানি ঘুরঘুর করতেছে। দরজা ডা একটু খোলেন।'
গলার আওয়াজ শুনে শম্ভুনাথ বুঝতে পারল এটা জালাল পাগলা।
জালাল পাগল মাঝেমধ্যে রাতের বেলা শ্মশানঘাটের বিশাল বটগাছ তলায় এসে ঘুমায়।
'শীগগির বের হন নাইলে বিপদ। কি হইলো কথা কন'না ক্যান?' এই বলে জালাল পাগল দরজায় জোরেশোরে ধাক্কা দিতে শুরু করে।
শম্ভুনাথ ভিতর থেকে মিনমিন গলায় জিজ্ঞেস করল,
-'জালাল কি হইছে! কি বিপদ?'
শম্ভুনাথের গলার আওয়াজে যেন প্রাণ ফিরে পায় জালাল।তড়িঘড়ি করে করুণ গলায় বললো,
-'একটা মাইয়া আপনারে ডাকে। কি জানি কইতে চায় !'
জালালের কথা শুনে গলা শুকিয়ে গেল শম্ভুনাথের।
শুকনো গলায় বললো,
-এত রাতে এইখানে কি সকালে আসতে কউ।'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জালাল আবার বললো,
-'মাইয়া বটগাছে তলায় বইসা আছে, বলতাছে সকালে তার টাইম নাই।যা বলার এখনি নাকি তার বলতে হইবো।'
চিন্তায় পড়ে যায় শম্ভুনাথ। ভাবতে লাগলো, অতৃপ্ত পাপিষ্ঠ আত্মারা কখনো মানুষের রুপ ধরতে পারে না।এরা শিয়াল,কুকুর,বিলাই,সাপ আরো বিভৎষ রুপে পৃথিবী তে ঘুরে বেড়ায়।
কিন্তু এই মেয়েটি কে? তার সাথে কেন দেখা করতে চায়, তাও আবার এত রাতে!
-'জালাল মেয়ে টা রে কি তুমি নিজের চোক্ষে দেখছ?'
-হ, এই তো আমার দিকে চাইয়া হাসতাছে!'
-'দেখতো শইল্যের ছায়া পড়ে কিনা?'
-'আন্ধাইর রাইতে ছায়া দেখমু কেমনে?'
মোম জ্বালিয়ে খট করে দরজা খুলে শম্ভুনাথ। তখনি ঘি দিয়ে পুড়ানো মরা গন্ধ তার নাকে এসে ঢুকলো।
সেদিন ফাঁস নিয়ে মরা মেয়েটির লাশ তার দাদা'রা ঘি দিয়ে পুড়িয়েছিল। যাতে দূর্গন্ধ না ছড়ায়। যদিও এসব বড়লোকি হিন্দুদের কাজ কারবার।ওরা অনেকেই খাটি ঘি দিয়ে চিতায় আগুন জ্বালায়।
তখনি ঘি রাখার বড় বড় ২টা টিনের কৌটা চোখে পড়ল। ভাবল, গন্ধ টা ওইখান থেকেই আসছে। অসুস্থ থাকার জন্য সেগুলো এখনো বাইরে ফেলে রেখে আসতে পারেনি।
'ওই যে ওইখানে বইসা আছে।' জালাল পাগল হাত ইশারা করে দেখাতেই সে দিকে তাকায় শম্ভুনাথ। তখনি ঝটকা বাতাস এসে হাতের মোমবাতি টি নিভে যায়।
ঘনঘন নিশ্বাস নিতে থাকে শম্ভুনাথ। নীরবতায় খাঁ খাঁ করছে চারদিক।
হঠাৎ বুঝতে পারলো ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো আর ডাকছেনা।
পিছনেই জালাল পাগল দাঁড়িয়ে আছে।তার নিশ্বাস প্রশ্বাসের গরম বাতাশ ঘাড়ে এসে পড়ছে।
তখনি শম্ভুনাথ দেখতে পেল একটি মেয়ে হেঁটে হেঁটে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
মেয়েটি কাছে এসেই বলতে শুরু করল, 'ভয় পাবেন না গুরুজি। আমি বিধুবা মেয়ে তাই দিনের বেলা ঘর থেকে বের হতে পারিনা।আপনার কাছে আমার পেটের বাচ্চাটার জন্য অাশীর্বাদ নিতে এসেছি। ওর জীবাত্মা যেন ভাল মনের মানুষ হয়ে জন্ম নিতে পারে। '
মেয়েটির কথা ঠিক ভাল ভাবে বুঝতে পারে না শম্ভুনাথ। সে হাত উঁচিয়ে চোখ বন্ধ করে অনাগত বাচ্চা ও মেয়েটার জন্য মন্ত্রজপে আশির্বাদ করতে থাকে।
তখন জালাল পাগল পিছন থেকে আফসোস করে বলতে থাকে,
'আহারে বাপ টা সন্তানের মুখ টা দেইখা যেতে পারল না। শুনেন,বাচ্চা একটু বড় হইলে হিরণ মাস্টরের কাছে আপনার বাচ্চা রে পড়াইতে দিবেন।দেখবেন মানুষের মত মানুষ বানায় দিব।'
শম্ভুনাথ দেখতে পেল, জালালের কথা শুনে মেয়েটি রাগে ফোঁসফোঁস করছে।
ওর কথায় রাগের কোন কারণ দেখে না, হিরণ মাস্টার এলাকার খুব ভাল মানুষ। এলাকার অনেক গরীব বাচ্চাকাচ্চাদের সে বাড়ির উঠানে বিনে পয়সায় পড়ায়।
গ্রামের বিত্তশালীরাও ওরে ডেকে নেয়,তাদের সন্তান কে পড়ানোর জন্য।
হঠাৎ মেয়েটি জালালের দিকে তাকিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করল।
জালাল পাগল দিকবেদিক কিছু বুঝতে না পেরে ভয়ে অন্ধকারে দৌড় দিল।
শম্ভুনাথের গা কাটা দিয়ে উঠলো মনে পড়ল, এই হাসির শব্দেই কিছুক্ষণ আগে তার ঘুম ভেঙে ছিল।
মেয়েটি হাত দিয়ে প্রণাম করে শ্মশান থেকে বের হওয়ার রাস্তা দিয়া হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
কিছুক্ষণের বাদেই শম্ভুনাথ অসুস্থতা বোধ করতে থাকে ।
..
সকালে নীমের ডাল দিয়ে দাঁত মাঝতে থাকে শম্ভুনাথ। কাল রাতের ঘোর তার এখনো কাটেনি। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে।
এক আগন্তুকের দিকে চোখ পড়লো শম্ভুনাথের। তার সামনে এসেই নমস্কার দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-'কি দাদা চিনতে পেরেছেন আমায়?
হ্যা সুচক মাথা নাড়ে শম্ভুনাথ। বলে,
-'কি যে বলেন বিষ্ণু দেব বাবু, আপনাকে চিনবো না কেন!
-'আমার বোন মালতী দেবীর আত্মার শান্তির জন্য শ্রাদ্ধ যজ্ঞ আয়োজন করতে হয়। বেচারি ফাঁস নিয়ে মরল আজ ১০ দিন তো হয়ে গেল। আপনি চলুন আমার সাথে। দুপুড়ের মধ্যে বাড়িতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শুরু করে দিতে হবে।'
-'আচ্চা বাবু ঠিক আছে।চলেন।
.
দুপর একটায় সকল কিছু সম্পূর্ণ করে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শুরু করে শম্ভুনাথ।
মন্ত্রজপা শুরু করতেই তার সামনে মালা দেয়া ছবিটা দেখে থমকে যায় সে।
বাড়ির বাইরে থেকে ভিতরে এসে কে জানি চিৎকার করে বলেই যাচ্ছে,
"গাঙের পাড়ে কিরণ মাস্টারে লাশ পাওয়া গেছে।' গাঙের পাড়ে কিরণ মাস্টারে লাশ পাওয়া গেছে।"
বিষ্ণু দেব আতঙ্কিত হয়ে লোকটি কে জিজ্ঞেস করল, 'কি কউ এসব?'
-'হ দাদা নিজ চোখে দেইখা আইছি, তার চোখ আর জিহ্বা উপড়ানো।শইল্যের অর্ধেক পানিরর মইধ্যে আর প্যাকের মধ্যে পুতা আছিলো"
তখনি বাড়ির মধ্যে একটা হইচই শুরু হয়ে যায়।
বিষ্ণু দেবের মেয়ে তাকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলছে, 'বাবা মাস্টারমশাই কি পিসিমার মতই আকাশে চলে গেছে। সে কি আর আসবেনা আমাকে পড়াতে?
শম্ভুনাথ ছবিটার দিকে আবার ভালোভাবে তাকায়। তার শরীর হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে।রাতের মেয়ে টাই সেই মালতী দেবী।
কাল রাতের হিসাব তার মিলতে শুরু করেছে...
'বিধুবা মালতী আর কিরণ মাস্টারের মাঝে অবৈধ সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল।যখন তাদের অবৈধ পাপ মালতীর পেটে আসে।মালতী সমাজ লোকচক্ষুর ভয়ে অসহায়ের মত আত্মহত্যা করে। '
'এজন্যই হয়তো মালতী দেবী তার পেটের নিষ্পাপ সন্তানের আত্মার মুক্তির জন্য অাশীর্বাদ নিতে এসেছিল!'
'পৈশাচিক প্রতিশোধ নিতে পেরেছে বলেই কি গত রাতে জালাল পাগলের মুখে কিরণ মাস্টারের নাম শুনে এমন অদ্ভুত ভাবে হেসেছিল?'
.
তিন মাস পর।
মন্দিরের আশেপাশেই একটি কালো কুকুরছানা সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে।
জালাল পাগলা কুকুরছানাটি কে দেখলেই বলে উঠে, কি খবর মাস্টারদা?'
জালালের একথা শুনে গ্রামের সবাই হাসাহাসি করে।
কিন্তু,শম্ভুনাথ ঠিকি বুঝতে পারে জালাল পাগলের কথার মানে !
গল্প: প্রায়শ্চিত্ত।
লেখা: Meyad Rahman
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now