বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রাপ্তি
~ জয়া পোদ্দার
কান্না পাচ্ছে, ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ঠিক যতটা কান্না পেলে প্রায় একহাত দূরে থাকা কোন সুস্বাস্থ্য, কুস্বাস্থ্য কিংবা শুধু স্বাস্থ্যের অধিকারী সাড়ে ৪ ফুট থেকে পৌনে ৬ ফুটের মাঝামাঝি বা এর চেয়ে লম্বা মানুষগুলো হেঁটে গেলেও আর স্পষ্ট দেখা যায় না, ঠিক ততটা। প্রায় সাড়ে তেইশ মিনিট যাবত সেই অবস্থাটাকেই উতরে যাওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছি, তবুও ফল নিখাদ শূণ্য। আগেই বলেছিলাম, কান্না পাচ্ছে, তাই এই গোধূলী লগ্নে রাস্তার দুধার ঘেষে যাওয়া যানবাহনের চাকার চাপায় মিশে যাওয়া সমতল হতে সামান্য উঁচুতে থাকা পাড়ে বসে ব্যাপারটা যে খুব একটা আগ্রহ নিয়ে করছি, তাও নয়। ঋণাত্মক পাঁচ মাত্রার অবতল লেন্সের মধ্য দিয়ে কান্না আটকে রাখার এই নিরলস চেষ্টাটুকুই যে আরো কতটা প্রকৃতি আর বিজ্ঞানের অনর্থক উপহাসের সৃষ্টি করে, তা হয়তো এর অবাঞ্চিত শিকার ব্যতীত আর কেউ কখনো বুঝতে পারবে না। হাতঘড়িবিহীন বিজ্ঞানের যুগে তবুও ভরসা ঐ স্মার্টফোন নামক যন্ত্রটা, যা খুব খারাপ সময়েও তার ডান পাশের ছোট বোতামটাকে চেপে ধরতেই এই মোটা কাঁচটুকরোর নিচ দিয়েই তার গতিশীলতাটাকে স্ক্রীনের উপর অকুন্ঠভাবে বাতি জ্বালিয়ে জানান দিয়ে দেয়।
সন্ধ্যা ৭টা ৪ মিনিট। হতে পারতো এই সময়টাতে আমি কোন পাঁচ তারার বিলাসবহুল হোটেলের বলরুমের ঝারবাতিটার ঠিক নিচে বসে আমার কৃতিত্বের অধিকারটুকু পাওয়ার সময়টাই এই স্মার্টফোনের স্ক্রীনে খুঁজে যাচ্ছি, হতেই পারতো- যদি না ঐ কোম্পানিতেই আমি মধ্যম আয়ের এই দিনমজুর টাইপ চাকরিটা দুইবছর যাবত করে যেতাম, কিংবা কিবরিয়া নামের ঐ লোকটাকেই আমি চিনতাম বা ঐ লোকটাই আমার ইমেডিয়েট বস হতেন, বা ঠিক ঐ লোকটাই আমার এতদিনের পরিশ্রমটাকে নিজের বলে নির্দ্বিধায় চালিয়ে দিতেন। তবুও সেটাই হয়ে গেল- পরপর দ্বিতীয়বারের মত। অন্য কারো কাছে হয়তো ব্যাপারটা স্বাভাবিকও লাগতে পারে কিংবা কেউ
কেউ হয়তো ঠিক এই অবস্থাটার সাথে অনেক আগেই সয়ে গেছে, কিন্তু এতকিছু ভেবেও আমার কান্না থামছে না। তাই রাস্তার ফুটপাতে বসে কান্না থামানোর চেষ্টাটাও নেহাত্ দায়ে পড়ে, কারন চোখের উপরের মোটা কাঁচটায় আর কুলোচ্ছে না- আর বিধায় উঠতে গিয়ে এই পরিচ্ছন্ন নগরীর অপরিচ্ছন্ন ঢাকনাবিহীন খোলা গুহায় নাকানিচুবানি খেয়ে যাই, তাই এই যাবতীয় চেষ্টা।
মোবাইলটা বাজছে। তৃতীয়বারের মত। কিন্তু ধরতে ইচ্ছে করছে না। এই ব্যাপারটাও স্বাভাবিক- হিউম্যান সাইকোলজি কাজ করছে! মনে হচ্ছে ঐ একটা কারনে মুহূর্তেই আজ সবার উপহাস হয়ে গেলাম। যারা ফোন করবে তারা হয়তো সব জেনেও না জানার ভান করে জানা কথাটাই লেভেলটাকেই আরেকটু এগিয়ে নিবে। তবে ষোল কোটি মানুষ কিংবা আমার মোবাইল কন্টাক্টের সবাই যে ঠিক কিছুক্ষণ আগে আমার সাথে ঘটে যাওয়া কষ্টের ব্যাপারটা জানার কথা নয়, সেটা আমার চিন্তার বিষয় বহির্ভূত।
মোবাইলটা এই নিয়ে সপ্তমবারের মত বেজে থেমে গেছে। স্ক্রীনে খুব চেনা একটা নাম।
চেনা এই কারনে যে আমার মোবাইল কললিস্টের সবার উপরের নামটা সাধারনত এটাই থাকে। তবে কল অপারেটরদের মহানুভবতায় মেসেজলিস্টেও ঠিক একই ব্যাপারটা খাটে না। আমার ভোর-দুপুরের যাবতীয় আহ্লাদ আর দিনশেষের শেষ না হওয়া সকল রাগ-অভিযোগ ঐ নামে মিশে থাকা মানুষটাকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্ধীতে গিলে যেতে হয় প্রতিদিনই। তবুও তাতে তার মুখে সামান্য বিরক্তির ছাপটুকুও পড়ে না। রাগ-বিরক্তি তার মাঝে নেই- সেটা বললে খুব বেশি বেশি বলা হবে হয়তো, কিন্তু একইভাবে আমার বিরক্তিকর কথাগুলো মুখে কোন বিরক্তির ছাপ না নিয়েই তার সহ্য করার ক্ষমতাটা আমার বলার তুলনায় খুব বেশি কম মনে হয়। জানি আজও তাই হবে। তবুও মাঝে মাঝে হাপিয়ে উঠি। অন্য কারো ভালো দিকটাকে নিজের জন্য আর কতটা সইয়ে নেয়া যায়, সেটা ভাবলেও নিজের উপর রাগ আরো খানিকটা বেড়ে যায়। অতঃপর বলা বাহুল্য, এইমুহূর্তে রাগ আর কষ্ট দুটোই সমান তালে সমান্তরালে বেড়ে যাচ্ছে আর কান্নার গতিও সমানুপাতিক ধ্রুবকের গুণনহারে গুণোত্তর অনুপাতে বেড়ে চলেছে।
কিন্তু যাকে দুদিন আগেও খুব গর্ব করে বললাম, এবার তো প্রমোশনটা না হয়ে যায়ই না, সাথে সবার সামনে স্টেজ থেকে নামিয়ে আনা মাঝখানে নাম লেখানো ঐ কাচের ফলক- কি হবে ঐসবের! একই ঘটনা একইরকমভাবে দুইবার! আজ হয়তো আরেকটা মানুষ বেশি উপহাস করবে। তাই তো, তাই না!?-আমি জানি না। কিচ্ছু জানি না আমি!
বারো নম্বর কল। ভাবছি ঠিক যেখানটায় বসে আছি, সেটা হঠাত্ করেই দুভাগ হয়ে গেলে মন্দ হত না। আর কিছু না হোক, অন্তত এই মধ্যবিত্ত আয়ের উন্নয়নশীল দেশ তার জনসংখ্যা কমার উছিলায় আরেকটু উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাক, আর আমিও বেঁচে যাই। তবে এই মুহূর্তে এই কলটা ধরাও ইম্প্লাইড কোড অব বিয়িং আ হিউম্যান ন্যাচারের প্রথম শর্ত বলেই মনে হচ্ছে। তাই চোখের আর নাকের জলের মিলিত গঙ্গা হাতে খানিকটা মুছে নিয়ে আর খানিকটা নাক টেনে থামাবার চেষ্টা করে কলটা ধরে অনেকটা শূণ্য মাধ্যমে শব্দের গতির কাছাকাছি গলা নামিয়ে বললাম-
- হ্যালো!
ওপাশটা চুপচাপই ছিল। তবুও আমার আওয়াজে ওপাশের নীরবতাটা যেন আরেকটু গাঢ় হল। আমি এখন এমন অবস্থায় আছি যে আরেকটু সময় এই নীরবতাটাকে সহ্য করতে হলে হয়তো নীরবতাটাকেও কল্পনায় একটা মানুষের অবয়ব দিয়ে তাকে আমার উপহাসকারী বলে দিতে আমার একটুও বাঁধতো না। তবে তা বাস্তবে প্রতিপন্ন করার আগেই নীরবতাটাকে বাঁচিয়ে দিয়ে ওপাশের কন্ঠটা শোনা গেল-
- কোথায় আছো?
বুঝলাম- যে মানুষটার কাছে আমার কথাগুলোও মিশ্র পদার্থের তৈরি বাতাসের একটা উপাদানের মত, তার কাছে সবকিছু বুঝে নেয়ার জন্য আমার ঐ একটা শব্দই যথেষ্ট।
- গুলশান লেকে।
-- ওখানেই থাকো। আমি আসছি।
কথা শেষ। কলটাও কেটে গেছে অনেক আগেই। তবু ফোনস্ক্রিনে তাকিয়ে আছি। তার উপর ভেসে থাকা ওয়ালপেপারে এইমাত্র কথাবলা মানুষটার হাসিমুখটা দেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রকৃতি আর বিজ্ঞানের সেই উপহাসের কাছে বরাবরই হেরে যাচ্ছি।
এরইমধ্যে কেউ একজন আমার পাশে এসে বসে পড়েছে। তার হাত আমার কাঁধে রাখার ঠিক আগমুহুর্তে খানিকটা আঁতকে ওঠার আগেই একটা চেনা পারফিউমের গন্ধ বাতাসে একটা স্বস্তি মিশিয়ে দিয়ে যায়।
- খেয়েছ?
না বলতে গিয়ে মনে হল গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। ডান-বামে খানিকটা মাথা নাড়ালাম।
- বাসায় যাই চলো।
এবারও শুধু মাথাটা একদিকে হেলে সায় দিলাম। শুনেছিলাম কাঁদলে নাকি মনের জোর চলে যায়।
তবে মনের জোরের চেয়ে গায়ের জোরের জোর আরো কম বলে মনে হয় সেটার কথা আর কেউ বলে যায়নি। অথবা কেউ বললেও অন্যরা তা রিপিট করার কথা আর ভাবেনি। তবে এখন উঠতে গিয়ে মনে হল, কোনটার জোরই কম যায় না। তাও পাশের মানুষটা ছিল বলে উঠতে গিয়ে আর
কষ্টের কথা মনে হয়নি।
এখনো সেই রাস্তারই দুধার ঘেষে যাওয়া যানবাহনের চাকার চাপায় মিশে যাওয়া সমতল হতে সামান্য উঁচুতে থাকা পাড় ধরে মাথা নিচু করে হাঁটছি। পার্থক্য একটাই- আগে বসে ছিলাম, আর এখন আমার পাশেই হাঁটতে থাকা মানুষটার হাত ধরে হাঁটছি। যদিও এখনো সেই সকল রকম স্বাস্থ্যের কাউকেই স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে চিন্তা নেই- হাত ধরে রাখা মানুষটা আমায় পড়তে দিবে না।
- ফুচকা খাবে?
মন খারাপ থাকলে তা ভাল করার সবচেয়ে সহজ উপায় বোধহয় এটাই- খাওয়াদাওয়া। অন্যসময় হলে হয়তো আমিও সেটাই করতাম। তবে আজ হয়তো মন খারাপের লেভেলটা আরো কয়েকধাপ এগিয়ে ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকেছে জানিনা। আর মাথা উঁচিয়ে কিছু দেখার জো যেহেতু এখনো হয়নি, তাই মাথা নিচু করেই আগের মতোই মাথা নাড়িয়ে হাঁটতে থাকলাম।
- আইসক্রিমও খাবে না!?
মানুষটার কন্ঠে খানিকটা উচ্ছলতার সুর। শীত আসতে বেশিদিন বাকি নেই। এখনি তার আমেজ অনেকটা টের পাওয়া যায়। অন্যসময় হলে এই প্রস্তাবটা সে কখনোই দিত না। আর আমিও পেলে ছাড়তাম না। কিন্তু আজ ওর কথাটাই আমি বলে দিলাম-
- যদি ঠান্ডা লাগে!?
-- লাগবে না।
কথা শুনে খানিকটা অবাকই হলাম। তার উপর মানুষটার কথার জোর শুনে মনে হল, ঠান্ডা যেন
শুধুমাত্র ওর কথাতেই লাগতে জানে। কথাটা বুঝতে পেরে একটু পর সামান্য শুধরে বললো-
- লাগতেও পারে! তবে আমি তো আছি! – তোমার ওষুধ খাওয়ার গরম জল এনে দিতে!!
বলেই হেসে দিল। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। প্রকৃতি আর বিজ্ঞানের উপহাস এতক্ষণে প্রায় অনেকটা কেটে গেছে। তাই এখন আর ঐ হাসিমুখটা দেখতে খুব বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে না। কী সুন্দর মানুষটার হাসি! আর তার চেয়েও সুন্দর ঐ মানুষটা!
রাত ৯টা ৫১মিনিট। খোলা রাস্তায় এই সময়ই প্রায় অনেকটা শীত নেমে আসে। আর বাকিটা ঐ শেষরাতে। মানুষটা এখন তার একহাত দিয়ে আমায় জড়িয়ে রেখে শীত আটকানোরই চেষ্টা করছে বোধহয়। একাই একটা আস্ত আইসক্রিম খাওয়ার সাহস হয়নি বলে দুজনে মিলেই একটা খাচ্ছি। গত প্রায় তিন ঘন্টা আগেও যেখানে কোন এক অপ্রাপ্তি নিয়ে বিষাদভরা চোখে বসে ছিলাম, এখন আর তেমন কিছু মনে পড়ছে না। সৃষ্টিকর্তা হয়তো সবসময় প্রাপ্তিগুলোকে অপূর্ণতার করিডরে বাঁধা পড়ার নিয়ম করে দেননি। তাই কখনো কখনো প্রাপ্তিগুলো হয়তো অপূর্ণতাগুলোকে ঢেকে দিতে অনেক আগেই ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যায়। ঠিক যেমনভাবে আমিও এখন এক বিশাল প্রাপ্তির বাহুডোরে বাঁধা পড়ে হেঁটে যাচ্ছি অনেকটা পথ।
আশেপাশে কোত্থেকে যেন গানের কয়েকটা লাইন ভেসে আসছে –
'ভালবেসে সখি নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো-
তোমার মনের মন্দিরে,
আমার পরানে যে গান....'
গানটা শুনলেই কেন যেন কারো একরাশ অপূর্ণতাকে প্রাপ্তির পূর্ণতায় মিশে যাওয়ার কথা মনে আসে। জানি না কেন, তবে মনে হয়। তবুও হোক....
পৃথিবীর সকল অপূর্ণতাগুলো নাহয় আজ অন্তত একবার তাদের প্রাপ্তির দিশা খুঁজে পাক!
↪সমাপ্ত↩
✔ ভাল লাগলে ১ হলও রেটিং দিন এতে করে অন্যরাও গল্পটা পরতে উৎসাহীত হবে ✔
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now