বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রাকপুরুষের চশমা
(চতুর্থ পর্ব)
লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
সেদিন আরিফের মনে হলো সুজানা যেন এক
দুর্ভেদ্য রহস্য। এ রহস্যের পেছনে সে সারাটি
জীবন ব্যায় করেও এখনো এর সমাধান করতে
পারেনি। সুজানা কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ বিমর্ষ হয়ে
উঠে আবার হঠাৎ প্রফুল্লতায় ভরিয়ে দেয়।
অনেকটা সিলেটের বহুরূপী আকাশের মতো।
এই সূর্যের হাসি তো পরমুহুর্তেই মেঘের
ঘনঘটা। সুজানাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিছানায়
শুইয়ে রাখলো ও। আরিফ: "আজ তোর শরীর
ভাল না। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাক। খবরদার, উঠবি না।"
সুজানা: "আমি শুয়ে থাকলে তোর ডিনার কে
রাঁধবে রে হাঁদা? আজ রাতে উপোস করবি না কি?"
সেটা নিয়ে তোকে ভাবিতে হবে না। তুই
কেবল শুয়ে রেস্ট নে। সুজানাকে শুইয়ে
রেখে আরিফ গেল কিচেনে। বীচে কুড়িয়ে
পাওয়া বিশাল চিংড়িটা আজ চমৎকার এক ডিনার হতে
চলেছে। আরিফই আজ ডিনার রাঁধলো। ফ্রাইংপ্যানে
তেল ঢেলে আস্ত চিংড়িটা ওতে ছেড়ে দিয়েই
ওর কাজ শেষ। দশ মিনিট পরেই নামিয়ে নিলো।
তারপর থালায় সাজিয়ে বেডরুমে নিয়ে গেলো
সুজানার কাছে। এক কেজি ওজনের চিংড়িটা দিয়ে
দুজনের পেট পুরে খাওয়া হলো। তারপর বিছানায়
বসে খানিক খোশগল্প করা। বেশীর ভাগই
রুকনকে নিয়ে। তাছাড়াও গল্পের ফাঁকেফাঁকে
ঝগড়াও চলল সমানে। দেখতে দেখতে রাত
অনেকটা গভীর হয়ে এসেছে। শেষমেশ ওরা
দুজন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লো। আজ রাতে
সুজানা এক অজানা শংকায় ভীত হয়ে আরিফের
কোল ঘেষে ঘুমালো। আজ রাতেও যদি সেই
যদ্ধের দামামা ফের বেজে উঠে তো ও
আরিফকে জাগিয়ে দেবে। কিন্তু খানিক পরেই
ঘুমন্ত আরিফের অসংলগ্ন কথা বার্তায় ও জেগে
যায়। আরিফ বলছে "আমি কিছুতেই এই আহত
ছেলেদের ফের যুদ্ধে পাঠাতে পারি না
ক্যাপ্টেননন,,,,,,, "অন্তত এদের দিকে একবার
তো চেয়ে দেখুন। কারো হাত নেই, কারো
পা নেই, কারো বা দুচোখই অন্ধ,,,,,," "এদের
যুদ্ধে পাঠানো আর জবাই করে খুন করা একই
কথা। আমি বেঁচে থাকতে ওরা যাবে না।" সুজানা
অবাক হয়ে ভাবে এসব কি বলছে আরিফ! কিসের
যদ্ধ! কোথায় যুদ্ধ! পোল্যান্ডে তো এখন
শান্তি বিরাজ করছে! তাছাড়া আরিফ জীবনেও
কোন যুদ্ধে লড়েনি। ৭১ স্বাধিনতা যুদ্ধের সময়
ও খুব ছোট ছিলো। সেই যুদ্ধের কথা এখন
বিড়বিড় করার তো কথা না। সুজানা আরিফকে ঝাঁকি
দেয়! ও বিড়বিড় করে গালি দিয়ে ওঠে, আরিফ:
"কি রে ভিতুর ডিম কুটনি বুড়ি, ছাগলের দাড়ি। এতো
রাতে তোর কি হলো?" সুজানা গালিটা গাঁয়েই মাখে
না। পাল্টা প্রশ্ন করে, সুজানা: "তুই কিসের যুদ্ধের
কথা বলছিলি একটু আগে? " আরিফ: "কিসের যুদ্ধ
আবার, তোর আর আমার যুদ্ধের কথা আর কি। আমি
ঘুমিয়ে পড়লেই তুই ট্যাংক নিয়ে হামলে পড়ে ঘুমটা
ভাঙ্গিয়ে দিস!" সুজানা: "মার দেবো এবার। একটু
আগে তুই যুদ্ধ, আহত, ক্যাপ্টেন আরো কিসব
যেন বলছিলি।" আরিফ: "কি জানি। অতশত মনে
নেই। এদিকে রাত পেরিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ঘুমা,
আর আমাকেও ঘুমাতে দে।" একথা বলেই আরিফ
সুজেনার দিকে পেছন ফিরে শুয়ে পড়লো।
সুজানা ভেতরে ভেতরে রাগে ফুসলেও
আরিফকে আর কিছু বলল না। কেবল বিছানায় গুটিশুটি
মেরে পড়ে থাকলো বাকিটা রাত, ভোরের
প্রতিক্ষায়। পরদিন সকালে একটা ফোর্ড ১২০০
গাড়ির শক্তিশালী ইঞ্জিনের শব্দে ওদের ঘুম
ভাঙলো। সুজানা বুঝলো রুকন আর দৃপ্তি চলে
এসেছে! ও হৈহৈ করে দরজা খুলতে ছুটলো।
দরজা খুলতেই ও দেখলো রুকনটা সেই হাসিহাসি
মুখ নিয়ে গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে
আছে। সুজানার পেছন পেছন আরিফও চলে
এসেছে। এত বছর পর তিন বন্ধুর মিলনে
বিষ্ময়ের ধাক্কায় সবাই যেন পাথর হয়ে গেলো।
আরিফই প্রথম বিষ্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে এগিয়ে
গিয়ে রুকনের সাথে কোলাকোলি করলো।
সুজানাও ওর পেছন পেছন এসে রুকনের কানটা
একটু মলে দিলো। প্রত্যুত্তরে রুকন জিব বের
করে ভেংচি কাটলো। তা দেখে তিন বন্ধুর মাঝে
হাসির রোল উঠলো। পুনর্মিলনের প্রথম ধাপটা
শেষ হতেই সুজানার খেয়াল হলো গাড়িতে দৃপ্তি
নেই। কি ব্যাপার? মেয়েটা কি তবে আসে নি!
সুজানা: "কিরে পাজি তোর বউটা কোথায়? ওকে
আনলি না কেনো? না কি তোর মতো
বুড়োকে ফেলে ও কোন যুবকের সাথে
তেপান্তরে পাড়ি জমিয়েছে?" রুকনের হাসিখুশি
মুখটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেলো। ও কেবল বলল,
"সবে তো এলাম। আগে ঘরে তা ঢুকতে দিবি না
কি? " ওরা তিনজন ঘরের ভেতরে ফিরে আসে।
আরিফ আর রুকনকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে
সুজানা কিচেনে চলে যায় ওদের জন্যে সকালের
নাস্তা তৈরী করতে। নাস্তা বানাতে বানাতেই ও
বুড়ো দুটোর হুহুহুহুহু হাসির আওয়াজ শুনতে পায়।
রুকন ভালই জমিয়ে ফেলেছে তবে। ও হাসির মূল
অংশটা মিস করতে চায় না। তাই তাড়াহুড়া করে নাস্তা
বানিয়ে ট্রেতে করে নিয়ে চলে ড্রয়িংরুমের
দিকে। সেখানে যেয়ে দেখে রুকন গল্প
করছে, রুকন: "আমাদের কলেজের ফারিহা কে
চিনতি তুই? ওই যে শুকনা চিকনা ফর্সা একটা মেয়ে
ছিলো না বি গ্রুপে? বছর পাঁচেক আগে
ইংল্যান্ডে ওর সাথে দেখা। সেই শুটকি টাইপের
মেয়েটা যা ভুরি বানিয়েছে না, যদি দেখতিস। আমি
প্রথমে ভেবেছিলাম ও বুঝি প্রেগন্যান্ট। পরে
কথা বলে জানলাম ওর স্বামি দু বছর আগেই অক্কা
পেয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা, কিছু না। ওর পেটের ওই
ঝুলন্ত অংশটা শতভাগ পিওর মেদ দিয়ে বানানো।
হুহুহুহুহু, ,,,,,,,,।" আরিফ ও যোগ দেয় রুকনের
সাথে। আরিফ: "আরে শালা ওর স্বামী মরবে না
তো কি করবে? এত বড় ভুরি ভরতে বেচারাকে
সারাদিন রাত কতই না খাটুনি খাটতে হতো। আমি নিশ্চিত
অতিরিক্ত খাটা খুটি করতে যেয়েই বেচারা অকালে
পটল তুলেছে।" মৃত কাউকে নিয়ে এমন সমাচার
সুজানার মোটেও ভাল লাগে না। ও কথার প্রসঙ্গ
পাল্টাতে যেয়ে বলে, সুজানা: "এবার থাম রুকন।
এসব নিয়ে অনেক হয়েছে। এবার বল দৃপ্তি
কেমন আছে? কতদিন হল ওকে দেখি না। সাথে
করে আনলেই তো পারতি। শালা কিপটে। টাকা
বাঁচাতে এই বয়সেও বউ ছাড়া একাএকা ঘুরতে
বেরিয়েছে।" রুকনের মুখটা আবারো মলিন
হয়ে যায়। ওকে দেখে সুজানার সন্দেহটা
আরো ঘনিভুত হয়। দৃপ্তির কি খারাপ কিছু হয়েছে?
ও বেঁচে আছে তো? সুজানা উৎসুক নয়নে
চোখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে রুকনের দিকে
তাকিয়ে থাকে। এক অজানা বেদনায় রুকনের
চোখের কোনটা ভিজে ওটে। কিছুক্ষণ
থেমে দম নিয়ে ও আবার কথা বলতে শুরু করে।
রুকন: "আসলে ব্যাপারটা তোদের জানানো হয় নি।
৮ বছর আগে আমাদের ডিভোর্স হয়ে
গেছে! তারপর থেকেই আমি বাংলাদেশ ছেড়ে
সুইডেনে পাড়ি জমিয়েছি।" সুজানা আটকে রাখা
শ্বাসটা ফুস করে ছেড়ে দেয়। ও
ভেবেছিলো দৃপ্তি সম্ভবত মারা গেছে তাই ও
রুকনের সাথে আসে নি। যাক এইটুকু সান্তনা যে ও
এখনো বেঁচে আছে! আরিফ এগিয়ে যেয়ে
রুকনের কাঁধে হাত রাখে। আরিফ: "কি হয়েছিলো
রে দোস্ত। তোর জীবনটা হঠাৎ এমন
এলোমেলো হয়ে গেলো কেন?" রুকন
সুজানার চোখের দিকে তাকিয়ে আরিফকে পাল্টা
প্রশ্ন ছোড়ে রুকন: "আমার জীবনটা কবে
গোছালো ছিল বলতো?"
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now