বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রাকপুরুষের চশমা-০২

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X (দ্বিতীয় পর্ব) লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা প্রায় দশ ঘন্টা ড্রাইভ করার পর ৮০০ কিমি পাড়ি দিয়ে আরিফ আর সুজানা বাল্টিসে পৌছলো। রাস্তায় দুজনই ভাগ করে গাড়ি চালিয়েছে। পথিমধ্যে একটা বিলাস বহুল রেস্তোরাঁয় গাড়ি থামিয়ে লাঞ্চটাও সেরে নিয়েছে। ওরা যখন বাল্টিসে পৌছলো তখন গ্রীষ্মের সূর্য প্রায় অস্ত যেতে বসেছে। নিজেদের দোতালা ছিমছাম লগ কাঠের বাড়িটা খুজে নিতে ওদের খুব একটা ঘাটাঘাটি করতে হলো না। সাগরের তীর ধরে একটা সরু রাস্তা বরাবর কিছুক্ষণ গাড়ি চালিয়ে প্রথম মোড়টা পেরুলেই ওদের সদ্য কেনা লগ হাউস। বাড়ির কাছাকাছি এসে সুজানাই ড্রাইভ করছিলো। সে ই বাড়িটা প্রথম দেখলো। ওরা কেবল বাড়ির ফটোটা দেখেই কিনে ফেলেছিলো। এবারই প্রথম সামনাসামনি দেখছে। সত্যিই অসাধারণ। বাড়ির সামনের বারান্দা থেকে বাল্টিস শহরটা দেখা যায়, আর পেছনের বারান্দা থেকে গর্জন মুখর বাল্টিক সাগর।সুন্দর বাহারি ফুলের গাছে বাড়ির আঙিনাটা ছেয়ে আছে। গ্রীষ্মের উষ্মতায় ফুল গাছ গুলিতে থোকায় থোকায় রঙবেরঙের ফুল ধরেছে। প্রধান ফটকের সামনে বিশাল দুটো নারিকেল গাছ যেনো প্রাকৃতিক প্রহরী হয়ে ঠায় দাড়িয়ে আছে। প্রথম দৃষ্টিতেই বাড়িটা সুজানার ভালো লেগে গেলো। মনে মনে আরিফের পছন্দের তারিফ করতে ভুললো না ও। ভেতরে ভেতরে খুশি হলেও মুখে কপট অভিমান নিয়ে ও খেঁকিয়ে উঠে বলল, "নেম প্লেটে এটা কি লিখিয়েছিসরে হাঁদা? আরিফ & সুজানা টেন্ট কেন? পুরুষ হয়েছিস বলেই কি সবসময় তোর নাম আমার নামের আগে বসবে? একবার সুজানা & আরিফস টেন্ট লিখলে কি এমন ক্ষতি হতো? " আরিফ সেই পিত্তি জ্বালানো হাসি হেসে বলল, "কি আর করবি। যে শালা এই নেম প্লেটটা লিখেছে সেও যে একটা পুরুষ। সেজন্যেই আমার নামটা প্রথমে লেখে ও নির্যাতিত পুরুষ সমাজের প্রতি একটু দরদ দেখিয়েছে আর কি।" সুজানা বুঝে আরিফ ওকে খেপাতে চাইছে। এই বাঁদরটা ওকে খেপিয়ে একটা বিকৃত ধরণের আনন্দ পায়। আরিফের ভাষায় সুজানা যখন রেগে মেগে কাঁপতে শুরু করে তখনই নাকি ওকে সবচেয়ে সুন্দরী দেখায়। কিন্তু এই নৈসর্গিক পরিবেশ ওর রাগটাকে দমিয়ে দিতে চাইছে। কেন জানি এখন রাগারাগি করতে ইচ্ছে করছে না তার। তাই আরিফের সাথে কথা বলা থামিয়ে ও নিরবে বাড়ির তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাড়ির ভেতরটা পুরোটাই ফাঁকা। আসবাবপত্র কিছুই নেই। তবে ওয়ারশোয় থাকতেই ওরা অনলাইনে নিকটস্থ একটা ফার্নিচারের দোকান থেকে মালপত্র অর্ডার দিয়ে রেখেছে। এবার একটা ফোন দিলেই ওরা মালপত্র সব ঘরে এনে পৌছে দিয়ে যাবে। যৌবনে এ যুগল প্রচুর টাকা পয়সা কামিয়েছে যার সিংহভাগ ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার পেছনে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। বাকি ক্রিয়িদংশ জমিয়েছিলো আজকের এই দিনগুলির জন্যে। সেই জমানো টাকার অর্ধেকটা ফিক্সড ডিপোজিট রেখে বাকি অর্ধেকটা দিয়ে এই বাড়ি আর আসবাবপত্র কিনেছে তারা। উদ্দেশ্য শহুরে ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে জীবনের শেষ দিনগুলি শান্তিতে অতিবাহিত করা। আজ ওরা প্রকৃতপক্ষেই নিশ্চিন্ত। ছেলেমেয়েরা বড় করার চিন্তা নেই, নেই টাকা পয়সা কামানোর টেনশন। তবে তার সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ও চলে গেছে জীবন থেকে। যৌবন। গাড়িটায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আরিফ ভাবে, যৌবনে এতটুকু অবসর পেলেই ওরা সেটা চুটিয়ে প্রেম করে কাটাতো। কিন্তু আজ সামনে অফুরন্ত অবসর কিন্তু তাদের দুজনেরই আর প্রেম করার মানসিকতা নেই। কি অদ্ভুত এ জীবন। সর্বদাই অপূর্ণ। এটা থাকলে ওটা নেই, ওটা থাকলে এটা নেই। ঘরের ভেতর থেকে সুজানার হাঁক শুনে আরিফের চিন্তায় ছেদ পড়ে। সুজানা: "ওই হাঁদা। তুই কি ফোন করে ওদের বলবি বিছানাপত্র এনে দিতে না কি আমাকেই যেয়ে কাঁধে করে নিয়ে আসতে হবে? " আরিফ ফার্নিচারের দোকানের নাম্বারটা ডায়াল করতে করতে পাল্টা হাঁক ছাড়ে, " প্রথমে দু মাস একটা স্কুল ব্যাগ কাঁধে তুলে প্রাক্টিস কর। তারপর ফার্নিচার আনতে যাস। তবে আশা করছি এ দুমাসের ভেতরেই ওরা ফার্নিচারগুলি নিয়ে আসবে।" আরিফের পিত্তজ্বালানো কথাগুলি সুজানা আবারো এড়িয়ে যায়। ও কেবল ঘরের প্রতিটা কক্ষ একে একে চেক করে দেখে। আস্ত লগ কাঠ দিয়ে ঘরের দেয়ালগুলি বানানো। কাঠ ঊঁচু মানের অন্তরক। পোল্যান্ডের হাড় কাঁপানো শীতে এটা ওদের ভালই প্রটেকশন দিবে। কেবল বসন্তে লগের ফাঁক ফোকর দিয়ে বরফ গলা পানি না ঢুকলেই হলো। সব দেখে সুজানার মুখের হাসিটা চওড়া হয়। বাকি দিনগুলি এখানে কাটাতে আর কোন আপত্তি নেই ওর। পেছনের দোতলার বেলকনিতে যেয়ে কিছুক্ষণ বাল্টিক সাগরের দিকে তাকিয়ে রইলো সুজানা। মনে পড়ে গেলো বিয়ের পর হানিমুনে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার কথা। সেখানকার বীচটা অনেক লম্বা চওড়া ছিলো। বাল্টিসের এই পুঁচকে বীচের মতো না। আরিফের হাত ধরে সাগর পাড়ে অনেকটা পথ হেটে ছিলো সেদিন। আজ সাত সাগর আর তেরো নদী পেরিয়ে জীবনের সায়ান্নে এক ভিনদেশী সাগর তীরে সেই আরিফের হাত ধরেই দাড়িয়ে আছে ও। হঠাৎ আরিফের প্রতি খুব মায়া হলো ওর। ঠিক করলো বাল্টিসে কিছুদিন কাটিয়ে থিতু হয়ে নিলে আরিফকে নিয়ে একবার বাংলাদেশে ঘুরতে যাবে। সেই সুজলা সুফলা শস্য শামলা বাংলাদেশ। ছোটবেলা গ্রামের বাড়িতে গেলে ও এক মনে ফসলের মাঠে হাওয়ার খেলা দেখতো। পাঁকা ধানের মাঠে দখিনা হাওয়া কত বৈচিত্রময় ঢেউ তুলতো। যদি আবার বাংলাদেশে যায় তবে সে দৃশ্য ভিডিও করে নিয়ে আসবে। তারপর বাল্টিসে বসে বসে সেটা বারবার প্লে করে দেখবে। একটা শক্তিশালী ট্রাকের গর্জন সুজানাকে বাংলাদেশ থেকে বাল্টিসে ফিরিয়ে আনলো। আসবাবপত্রের গাড়িটা ইতিমধ্যেই চলে এসেছে। প্রায় দুঘণ্টা লাগলো সবকিছু গোছগাছ করে নিতে। আরিফ লোকগুলিকে বিদায় করে গাড়িতে করে সুজানাকে নিয়ে ফের বেরিয়ে পড়লো। আজ ওরা বাহিরে ডিনার করবে। ভাল কোন রেস্তোরাঁয়। ডিনার সেরে নতুন শহরে খানিকটা ঘুরাঘুরি করে একদম মাঝরাতে বাড়ি ফিরলো ওরা। বাড়ি ফিরেই সুজানা আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কন্ঠে বলল, "তোকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই সুন্দর বাড়িতে আমায় নিয়ে আসার জন্যে। জীবনে এই প্রথম তুই একটা কাজের মতো কাজ করলি রে হাঁদা।" তারপর আনন্দের আতিশয্যে আরিফের গালে একটা চুমু খেয়ে বসে সুজানা। কিন্তু চুমু খেয়েই বুঝে সাংঘাতিক ভুল হয়ে গেছে। আরিফের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ওর নরম ঠোটের চামড়ায় গিঁথে যায়। ও ব্যাথায় ককিয়ে উঠে, সুজানা: আউচ! বজ্জাত বুড়ো। কদিন হয়েছে দাঁড়ি কামাস না? মুখে যে সজারুর কাঁটা গজিয়েছে সে দিকে খেয়াল আছে তোর?" আরিফ সেই ফোকলা দাঁত বের করে খেকখেক করে হাসতে হাসতে জবাব দেয়, "আমি কি জানতাম আজ তোর দরদ একেবারে উথলে উঠবে? তবে তুই যদি এভাবে নিয়মিত চুমু দিস তো কাল থেকে প্রতিদিন শেভ করতে আমার কোন আপত্তি নেই।" সুজানা: "তোকে চুমু খেতে আমার বয়েই গেছে। মরার আগ পর্যন্ত আর একটা চুমুও পাবি না তুই।" আরিফ: "ঠিক আছে। কাল মরে যাবো। তখন দিস কিন্তু।" সুজানা: "চুপ বুইড়া। বাজে কথা বলবি না। উম্মমা। এই নে। আরেকটা চুমু দিলাম। এবার ঘুমা। রাত পেরিয়ে গেলো যে।" ব্যাস্ত একটা দিন শেষে সুজানা ও আরিফ সেরাতে ঘুমিয়ে পড়ে। আরেকটি দিন হারিয়ে যায় তাদের ক্ষুদ্র জীবন থেকে। মাঝরাতে তুমুল গোলাগুলির শব্দে সুজানার ঘুম ভেঙে যায়। সেই সাথে ফাইটার প্লেনের গর্জন, আর আহতদের মর্মস্পর্শী আর্তনাদ! "বাচাও বাচাও, আমার হাত ছুটে গেছে! " "হায় ইশ্বর, আমার বন্ধু মারা যাচ্ছে।" "বায়বীয় আক্রমণ, বায়বীয় আক্রমণ। তাড়াতাড়ি লুকাও।" ধরামমমমম, ধরামমমমম, ,,,,, "ডাক্তার, একটা স্প্লিন্টার ওর চোখে গেঁথে গেছে। ওকে সাহায্য করুন। প্লীজ।" কিছুক্ষণ অবাক হয়ে বিছানায় বসে থেকেই সুজানা বুঝে যায় প্রকৃত ব্যাপারটা। ওটা আর কিছু না। বুড়োটা নিশ্চই ঘুমানোর আগে ড্রয়িংরুমে টিভি ছেড়ে রেখেছিলো। বুড়োকে একশো একটা গাল দিতে দিতে ও চোখে ঘুম নিয়ে যায় ড্রয়িংরুমে। ও ড্রয়িংরুমে যেতেই সকল গোলাগুলির শব্দ থেমে যায়। আবার সেই সুনসান নিরবতা। ড্রয়িংরুমের দরজা খুলতেই ও অবাক হয়ে যায়। টিভিটা তো বন্ধই আছে। আরে! তাই তো। বুড়োটা তো আজ সন্ধায় ওর সাথেই ছিলো। কখনোই ড্রয়িংরুমের দিকে আসে নি। তবে কিসের এতো শব্দ হলো! ঘুমের ঘোরে এত শত ভাবতে পারে না সুজানা। কেবল টলতে টলতে নিজেদের রুমে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সুজানা নাস্তা তৈরিতে লেগে যায়। তাছাড়া নতুন ঘর গোছগাছ করা, ঝাড়ামোছা, কাপড় চোপর ক্লজিটে সাজানো এসব কি চাট্টিখানি কথা? সারাদিন ব্যাস্ততায় কাটে তার। বুড়োটাও মাঝেমাঝে এসে সাহায্য করে। কাজের চাপে ওর বৃদ্ধ মস্তিষ্ক থেকে গতরাতের ঘটনাটা সহজেই মুছে যায়। (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ প্রাকপুরুষের চশমা-০২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now