বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রাতে বাবা তাকে ঘরে শুইয়ে দিতে এলেন।মা এশাকে গল্প করে ঘুমপাড়াচ্ছেনতো তাই তিনি আসতে পারলেন না।
বাবা নাবিলের গলা পর্যন্ত চাদর টেনে দিলেন।কপালে চুমু দিলেন।তারপর চুলে আঙুল দিয়ে বিলি দিতে দিতে বললেন,কী কান্ড,আমার ছেলেটা এতো বড় হয়ে গেছে।একা একা নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছে।তার কী সাহস!আমি তো বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।কিন্তু কই আমার তো এখনো এতো সাহস হয়নি।একা একা আমি ঘুমোতে পারি না।আমার সঙ্গে নাবিলের মাকে ঘুমাতে হয়,এশাকে ঘুমোতে হয়।তারপরও আমার ভয়ে শরীর কাঁপে।
নাবিল মনে মনে হাসল।সে জানে তার বাবার খুবই সাহস।তার বাবা ইচ্ছা করলেই একা ঘুমাতে পারেন।কিন্তু বড়রা ছোটদের সাথে এরকম মজা করে মিথ্যা কথা বলেন।বড়রা মনে করে ছোটরা কিছু বুঝতে পারছে না।আসলে সবই বুঝতে পারে।
নাবিল বলল,'বাবা, একটা গল্প বলো তো।'
বাবা আমতা আমতা করে বললেন,কিসের গল্প রে?
'পরীর গল্প।'
'ওহ আচ্ছা,পরীর গল্প।''হু। পরী।'
'পরীর গল্প জান না বাবা?'
'জানব না কেন?আবশ্যই জানি।এক দেশে ছিল এক পরী।তারপর কী হল শোন।পরীর মনে বেজায় দুঃখ।কারণ তার কোনো ছেলেপুলে নাই। মনের তার সোনার অঙ্গ কালি হয়ে গেল।'
নাবিল বলল,'বাবা চুপ করতো।থাক তোমার গল্প বলতে হবে না।তুমি আসলে পরীর কোনো গল্পই জানো না।বলতো দেখি পরীরা কী খায়?'
'কী আবার খাবে।ভাত-মাস-ভেজিটেবল খায়।গাজর খায়।গাজরে আছে ভিটামিন এ।চোখের জন্য ভালো।পরীরা বেশি করে গাজর খায় বলে ওদের চোখ খুব ভালো থাকে।তারা আকাশ থেকে দেখতে পায়।'
'বাবা,তুমি কিছুই জান না।পরীরা ফুলের মধু খায়।আচ্ছা,বলতো পরীদের জামা কাপড় কী দিয়ে তৈরি হয়?'
'কী দিয়ে আবার,সূতা দিয়ে। ফিফটি পার্সেন্ট কটন আর ফিফটি পার্সেন্ট সিনথেটিক।শুধু সিনথেটিক কাপড় ওরা পড়তে পারে না,গা কুটকুট করে।'
'পরীদের ব্যাপারে বাবা তুমি কিছুই জান না।ওদের জামা কাপড় তৈরি হয় চাঁদের আলোর সুতা দিয়ে।'
'ও আচ্ছা।চাঁদের আলো দিয়ে সূতা তৈরি হয় তাই তো জানতাম না।'
'চাঁদের চড়কা- বুড়ি কী করে?সূতা কাটে না?'
'আরে তাই তো,চড়কা বুড়ির ব্যাপারটাই ভুল মেরে বসে বসে আছি।'
'পরীরা পৃথিবীতে কখন আসে তা কি তুমি জান বাবা?'
'জানি না।কখন আসে?'
'যখন খুব জোছনা হয় তখন আসে।নির্জন পুকুরে ওরা সাঁতার কেটে গোসল করে।'
'পরীর দেশে পুকুর নেই?'
'আছে বোধহয়।তবু পৃথিবীর পুকুর ওদের বেশি ভালো লাগে।'
'এতো কিছু তুমি জানলে কি করে?'
নাবিল জবাব দিল না।মনেমনে হাসল।বড়দের ধারণা শুধু তারাই সবকিছু জানে।কিন্তু ছোটরাও যে অনেক কিছু জানে তা তারা ভুলেই যায়।
জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। নাবিলের বাবা জানালা বন্ধ করলেন।তারপর নাবিলের চুল নিয়ে ইলিবিলি খেললেন।এক সময় নাবিল ঘুমিয়ে পড়লো।
তার ঘুম ভাঙল খুটখাট শব্দে।সে চোখ মেলে দেখে-খুবই অবাক কান্ড!একটা পরীর মেয়ে তার মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে।নাবিলের সব খেলনা সে জড়ো করেছে।খেলছে আপন মনে।পরীরা সুন্দর হয়,নাবিল জানে।তারপরও এতো সুন্দর হয়,নাবিলের ধারনা ছিল না।মনে হচ্ছে গা থেকে আলো ঠিকরে বের হচ্ছে।ছোট একটা ডুরে শাড়ি পরে আছে।শাড়িটাও কত সুন্দর!ঝমল করছে।হবে না,চাঁদের আলোর সূতার তৈরি শাড়ি।আর পরী মেয়ের সোনালী পাখা দুটিও কত সুন্দর!সে আপন মনে গান করছে আর খেলছে।কী মিষ্টি গানের গলা!মাঝে মাঝে আবার গান থামিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
নাবিল যে বিছানায় উঠে বসেছে সেটা পরীর মেয়েটি দেখেছে।কিন্তু সে তার খেলা বন্ধ করছে না
নাবিল বলল,'এই পরীর মেয়ে।এই।'
পরীর মেয়ে চোখ তুলে তাকাল।তারপর আাবার আগের মতোই খেলতে লাগল।
মনে হচ্ছে মুখ টিপে হাসছে।
নাবিল বলল,'তুমি ঘরে ঢুকেছ কীভাবে?'
সে হাত উচু করে জানালা দেখিয়ে দিল।ওমা,থাই এলুমিনিয়ামের জানালা খোলা।সে তাহলে এই খোলা জানালা দিয়েই ঢুকেছে!
বাবা জানালা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।মেয়েটা নিশ্চয়ই টেনেটুনে খুলেছে।মেয়েটাতো দুষ্টু আছে।জানাল খোলা বলেই তো নাবিলের এতো শীত লাগছে।ঠান্ডা লেগে তার জ্বর না হলেই হয়।ঠান্ডা লাগলে নাবিলের আবার টনসিল ফুলে যায়।
নাবিল বলল,'এই, তুমি যে আমার সব খেলনা ছড়িয়ে একাকার করেছ,মা দেখলে খুব রাগ করবে।ঘর নোংরা হচ্ছে তো।'
পরীর মেয়ে মিষ্টি করে বলল,'যাবার সময় আমি গুছিয়ে রেখে যাব।'
'তোমার নাম কি?'
'মেঘবতী'
'তুমি কি আমার সঙ্গে খেলবে?'
'না,আমি একা একা খেলব।'
নাবিল বিছানা থেকে নেমে এসে মেঘবতীর সামনে বসলো।সে কিছু বলল না।আশ্চর্য মেয়েতো!আপন মনে খেলেই যাচ্ছে।নাবিল মুগ্ধ হয়ে দেখছে।এত কাছ থেকে সে পরী দেখবে কোনোদিন ভাবে নি।তার খুব ইচ্ছা করছে পরীর পাখাটা একটু হাত দিয়ে ছুয়ে দেখতে।
'তোমার পাখা একটু হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখব?'
'না'
মেঘবতীর মুখটা কী সুন্দর!বড় বড় চোখ।চোখের মণিগুলো একটু মনে হয় নীলচে।মেয়েটার থুতনিতে একটা কাটা দাগ।
নাবিল বলল, 'তোমার থুতনিতে কী হয়েছে?'
'কেটে গেছে।'
'কীভাবে কেটেছে?'
'এক জোছনা রাতে আমরা রাজবাড়ির পুকুরঘাটে নাচ করছিলাম,তখন পা পিছলে পড়ে থুতনি কেটে গেছে।'
'জোছনা রাতে তোমরা নাচ করো?'
'হু,নাচ করি,গান করি,পানি ছিটা-ছিটি খেলা করি।খুব মজা করি।'
'আমাকে একদিন নিয়ে যাবে?'
'তোমাকে নেব কী করে?তুমি কি উড়তে পারো?'
'তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?'
'আমরা তো পড়ি না।আমরা শুধু নাচ করি আর গান করি।আর আকাশে উড়ে বেড়াই।'
'আমি কেজি ওয়ানে পড়ি।বাংলা পড়ি,ইংরেজি পড়ি,অংক করি।এডিশান পারি।তুমি এডিশান পার?এডিশান হলো যোগ।'
'না'
'তুমি ফুলের ইংরেজি জানো?'
'না'
'ফুলের ইংরেজি হচ্ছে ফ্লাওয়ার।আকাশের ইংরেজি হচ্ছে স্কাই।বিড়াল হল ক্যাট।'
পরী মেয়েটি নিজের মনে খেলেই যাচ্ছে।একেকটা খেলনা হাতে নেয়,কিছুক্ষণ খেলে।সেটা রেখে আরেকটা খেলনা নেয়।নাবিল বলল,'তুমি কী রোজ রাতে এসে খেলবে?আমার আরো খেলনা আছে।'
'না,আর আসবো না।'
'আর আসবে না কেন?'
মেঘবতী জবাব দিল না,খেলেই যেতে লাগলো।সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো,শোয়া মাত্রই ঘুম।
তার ঘুম ভাঙল ভোরবেলা।ঘর ভর্তি আলো।জানালা বন্ধ। প্রতিটি খেলনা আগের জায়গায় আছে।মেঘবতী যাওয়ার আগে সব খেলনা গুছিয়ে রেখে গেছে।ফেলে ছড়িয়ে যায় নি।
নাবিল,পরীর মেয়ে মেঘবতীর গল্প সবার আগে বাবার সঙ্গে করল।নাবিলের বাবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন।নাবিল বাবার কানে কানে গল্পটা বলল।বাবা বললেন,ইশ,তুমি রাতে আমাকে ডাকলে না কেন?আমরা মেয়েটাকে বলে- কয়ে রেখে দিতাম।তারপর বড় হলে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতাম।একটা পরী বৌমার আামর খুব শখ।সে ঘরময় উড়ে বেড়াতো।
নাবিলের খুব মন খারাপ হল।কারণ বাবা খুব গম্ভীর হয়ে কথা বললেও সে জানে বাবা তার গল্প মোটেই বিশ্বাস করছেন না।
নাবিলের মাও বিশ্বাস করলেন না।তিনি বললেন, নাবিল ব্যাটা,তুমি রাতে স্বপ্ন দেখেছো।সেই স্বপ্নটাকেই সত্যি মনে করছো।ভূত,প্রেত,পরী, রাক্ষস, খোক্ষস এইসব পৃথিবীতে হয় না।এইগুলি সব গল্প।তোমার যদি একা ঘরে ঘুমোতে ভয় লাগে আমাদের সঙ্গে ঘুমাও।'
নাবিল বলল,'না,আমি একাই ঘুমাবো।' নাবিলের খুব আসা ছিল পরী মেয়েটিকে সে আবার দেখবে।মেয়েটি নিশ্চয়ই খেলতে আসবে তার ঘরে।নাবিল অনেকবার জানালা খুলে অপেক্ষা করেছে তার জন্য।রাতে ঘুম ভাঙলেই সে জানালা দিয়ে তাকিয়েছে আকাশের দিকে।যদি সে আসে!কোনোদিন সে আসে নি।
তারপর অনেক অনেক দিন কেটে গেল।ছোট্ট নাবিল বড় হয়ে গেল।স্কুল পাশ করল।কলেজ পাশ করলো।ইউনিভার্সিটি পাশ করলো।একদিন সে তার বাবার মতো বড় হয়ে গেল।মা বললেন,নাবিলের বিয়ে দিয়ে ঘরে টুকটুকে একটা বউ আনলে কেমন হয়?
ওমা, কী অদ্ভুত কান্ড!একদিন তার বিয়েও হয়ে গেল।মজার ঘটনা ঘটল বিয়ের রাতে।নাবিল অবাক হয়ে দেখল তার বউটা দেখতে অবীকল সেই পরী মেয়েটার মতো।সেই রকম গোল মুখ।হালকা নীলচে চোখ।ঢেউ খেলানো মাথা ভর্তি চুল।
নাবিল অবাক হয়ে বললো,তোমার থুতনিতে এই কাটা দাগটা কিসের?
মেয়েটা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল,ছোটবেলায় পুকুরঘাটে নাচতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে কেটে গিয়েছিল।
নাবিল ইতস্তত করে বলল,আচ্ছা শোনো,তোমার ডাকনাম কী মেঘবতী?
সে হেসে বললো,'হ্যাঁ।আমার বাবা আমাকে এই নামে ডাকতেন।আমি যখন খুব ছোট,তখন বাবা মারা গেলেন।তারপর আর কেউ আমাকে এই নামে ডাকেনি।আজ প্রথম তুমি ডাকলে।আচ্ছা,তুমি এই নাম জানলে কি করে?'
নাবিল যে কি করে জানল সেটা আর বলল না।সব কথা বলার দরকারই বা কী?থাকুক কিছু না-বলা কথা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now