বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পরিবর্তনের আয়না

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। রিয়াজুল হক ইনস্টিটিউট—দেশের অন্যতম একটি খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর নয়টি শাখা শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি শাখার আলাদা আলাদা প্রশাসন, শিক্ষকমণ্ডলী, ও পরিচালনা কমিটি। তবে সবকিছুর মূল কেন্দ্র ছিল প্রধান শাখা, যেখানে বসেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। শুভের কক্ষটি ছিল ঠিক প্রধান শাখার প্রধান সালাউদ্দিন সাহেবের কক্ষের পাশেই। কাচের দেয়ালের ওপারে থেকে দেখা যেত শুভকে—সাধারণ পোশাকে, হাসিমুখে, সবার সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ জানত না, এই মানুষটিই আসলে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিকদের একজন। তিনি কখনও সেই পরিচয় সামনে আনেননি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল—মালিকানা নয়, মানুষিকতা ও দায়িত্ববোধই আসল পরিচয়। শুভ সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন। অফিসের কর্মচারী, শিক্ষক, এমনকি গার্ড—সবাই তাঁকে সম্মান করত। কেউ কখনও তাঁকে “স্যার” বলে ডাকলে তিনি হেসে বলতেন, —“স্যার নয়, শুভ ভাই বললেই তো হয়।” এই সরলতাই তাঁকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। একদিন বোর্ড সভা ডাকা হলো। বড় টেবিল ঘিরে বসেছেন নয় শাখার পরিচালকরা, চেয়ারম্যান সাহেবসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো—কিছু পরিচালক পরিবর্তন করা হবে, কারণ নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা দরকার। সিদ্ধান্তটি ছিল যৌক্তিক। শুভও সমর্থন করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পরিবর্তন মানেই উন্নয়ন। কিন্তু কে জানত, সেই পরিবর্তনই একদিন হবে ইনস্টিটিউটের অন্তর্দাহের কারণ। প্রথমদিকে সবাই উৎসাহে ভরপুর ছিল। নতুন মুখ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই যেন প্রাণচঞ্চল করে তুলেছিল ইনস্টিটিউটকে। কিন্তু দিন যত গড়াতে লাগল, শুভর মনে সন্দেহের মেঘ জমতে শুরু করল। একদিন অফিসে এসে শুনলেন, সালাউদ্দিন সাহেব স্টাফ মিটিংয়ে বলছেন— —“আমি এই শাখার প্রধান, মানে আমিই আসলে এখানে মালিকের প্রতিনিধি। তাই কোনো সিদ্ধান্তের আগে আমার অনুমতি লাগবে।” শুভ কক্ষে বসে শুনে থমকে গেলেন। ভেতরে এক ধরনের কষ্ট উঁকি দিল। তিনি জানেন, সালাউদ্দিন সাহেব একসময় খুব সম্মান করতেন তাঁকে। এখন আচরণে পরিবর্তন এসেছে। হয়তো ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু শুভ কিছু বললেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, সময়ই সবচেয়ে ভালো শিক্ষক। দিন কয়েক পর নারায়ণ শাখার প্রধান আছমা আক্তারের ফোন এল। শুভ স্বাভাবিক ভাবেই কথা বললেন, জানতে চাইলেন শিক্ষকদের উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের ফলাফল কেমন চলছে। কিন্তু আশ্চর্য! ওপাশ থেকে আছমা তিক্ত কণ্ঠে বললেন— —“আপনি এখন এসব জিজ্ঞেস করার কে? আমাদের তো নতুন নির্দেশনা এসেছে। আপনি এখন আগের মতো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, তাই না?” শুভ বিস্মিত হয়ে বললেন, —“আপনি কি ভুল বুঝছেন না আছমা? আমি এখনো মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে আছি।” আছমা হেসে উত্তর দিলেন, —“দায়িত্বে থাকা মানেই প্রভাব থাকা নয়, শুভ সাহেব!” ফোন কেটে গেল। শুভ কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভাবলেন—এমন পরিবর্তন কেন? মানুষ তো পরিবর্তিত হয় উন্নতির জন্য, কিন্তু এই পরিবর্তন যেন মানুষকে উল্টো করে দিচ্ছে! এরপর বাইডেন শাখার প্রশান্ত কুমারও একরকম আচরণ করতে শুরু করলেন। মিটিং ডাকলেও কেউ সময়মতো আসছে না, রিপোর্ট জমা দিচ্ছে না। ইনস্টিটিউটের শৃঙ্খলা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এক বিকেলে চেয়ারম্যান সাহেব শুভকে ডেকে বললেন, —“শুভ, কিছু একটা করতে হবে। আমি তো ভাবছিলাম নতুন নেতৃত্বে ইনস্টিটিউট ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হবে, কিন্তু এখন দেখি আগাছায় ভরে গেছে।” শুভ হালকা হাসলেন, বললেন, —“স্যার, পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু চেতনায় হয়নি। মানুষ পদে উঠেছে, কিন্তু মনে নম্রতা হারিয়েছে।” চেয়ারম্যান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। —“তাহলে কী করা যায়?” শুভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, —“আমাদের পরিবর্তন ফিরিয়ে দিতে হবে না, বরং পরিবর্তনটাকেই ইতিবাচক দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, পদ মানে কর্তৃত্ব নয়—দায়িত্ব।” তারা দুজনেই গোপনে পরিকল্পনা করলেন। এরপর জরুরি সভার আয়োজন করা হলো। সকল শাখা প্রধান, সমন্বয়ক ও অফিসারদের ডাকা হলো। সেদিন সকাল থেকে প্রধান শাখার অডিটরিয়ামে একধরনের উত্তেজনা। সবাই গুঞ্জন করছে—কী ঘোষণা আসছে, কে বাদ পড়বে, কে পদোন্নতি পাবে। মঞ্চে উঠে শুভ শান্ত কণ্ঠে বললেন, —“আমি আজ কাউকে দোষারোপ করতে আসিনি। আমি এসেছি আয়না দেখাতে—যাতে আমরা নিজের মুখটা দেখতে পারি।” সবাই চুপ। শুভ স্লাইড চালু করলেন। পর্দায় দেখা গেল ইনস্টিটিউটের পুরনো দিনের ছবি—যখন সবাই একসঙ্গে কাজ করত, মুখে ছিল হাসি, চোখে ছিল লক্ষ্যপানে দৃষ্টি। এরপর দেখানো হলো বর্তমান চিত্র—অভিযোগ, হীনমন্যতা, অবিশ্বাস। শুভ বললেন, —“দেখুন, আমরা কত বড় একটা পরিবার। কিন্তু এখন পরিবারের সদস্যরা যেন অপরিচিত হয়ে গেছে। পরিবর্তন আমাদের শত্রু নয়, কিন্তু যদি পরিবর্তন আমাদের মানবিকতা কেড়ে নেয়, তাহলে সেটা বিষ হয়ে যায়।” সালাউদ্দিন সাহেব মাথা নিচু করে বসে রইলেন। আছমা আক্তারের মুখের হাসি হারিয়ে গেছে। প্রশান্ত কুমার যেন অনুতপ্ত। শুভ বললেন, —“আমি জানি, আমরা সবাই ভালো মানুষ। শুধু সময় আমাদের কিছুটা বদলে দিয়েছে। কিন্তু এখনই সময়, আমরা যেন নতুন করে শুরু করি। পরিবর্তন মানে ধ্বংস নয়—সংশোধন। আসুন, আমরা আবার এক হই, আমাদের ইনস্টিটিউটের গৌরব ফিরিয়ে আনি।” হলরুমে তখন নিস্তব্ধতা। হঠাৎ এক কোণ থেকে হাততালি শুরু হলো। তারপর আরেকজন, তারপর পুরো হলরুম করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল। সেদিন সভা শেষে সবাই শুভর কক্ষে এসে বলল, —“স্যার, আমরা ভুল করেছি। আপনার মতো মানুষ পাশে থাকলে আবারও ইনস্টিটিউটকে বদলে ফেলতে পারব।” শুভ মুচকি হেসে বললেন, —“ভুল মানা মানেই প্রথম সঠিক পদক্ষেপ।” সেদিন সন্ধ্যায় অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে শুভ দেখলেন, আকাশে লাল সূর্য অস্ত যাচ্ছে। বাতাসে হালকা শীতলতা। তিনি মনে মনে বললেন, —“মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু নীতির আলো যদি জ্বলে থাকে, তাহলে অন্ধকার কখনও স্থায়ী হয় না।” রিয়াজুল হক ইনস্টিটিউট আবার তার পথ খুঁজে পেল—একটি পরিবারের মতো, যেখানে পরিবর্তন আসে উন্নতির জন্য, অহংকারের জন্য নয়। এবং শুভ তখনও আগের মতোই, এক বিনয়ী মানুষ—যিনি মালিক হয়েও সবার বন্ধু, নেতা হয়েও কখনও আদেশ দেন না—শুধু অনুপ্রেরণা দেন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ পরিবর্তনের আয়না

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now