বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"পিশাচের রাত"
লেখক : অনীশ দেব
-------------------
২ য় পর্ব
চিকু দেখল, একটা মানুষের ছিন্নভিন্ন লাশ পড়ে রয়েছে বৃষ্টিভেজা মাটিতে। মাথাটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে হাঁ হয়ে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। হাত পা গুলো এলোমেলো ভাবে এদিক ওদিক ছড়ানো। চাঁদের আলোয় রক্তের রঙ বোঝা যাচ্ছিল না। ফলে মনে হচ্ছিল বৃষ্টির জমে থাকা কালো জলের ওপর ছিন্নভিন্ন মানুষটা পড়ে আছে।
চিকুর মাথা কাজ করছিল না। কিন্তু অন্ধভয় ওকে দিয়ে যান্ত্রিকভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছিল। ও ছুটে গিয়ে সাইকেলটা তুলল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কানে এল সেই ভয়ঙ্কর চাপা গর্জন। এবার গর্জনটা এল জলাপুকুরের দিক থেকে।
এটা কি বাঘের গর্জন? কোথাও থেকে একটা বাঘ কি এসে ঢুকে পড়েছে আমবাগানে?
প্রাণপনে সাইকেল চালাতে শুরু করল চিকু। আর তখনিই শুনতে পেল জলাপুকুরে কি যেন ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চিকুর মাথার ভেতর সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল।
এই শীতের রাতে বাঘ হঠাৎ জলে ঝাঁপ দেবে কেন?
এবড়োখেবড়ো পথ ধরে যেতে যেতে ও জলাপুকুরের দিকে তাকাল। জলে কি একটা নড়ছে যেন। কেউ যেন প্রবল উল্লাসে জলে দাপাদাপি করে স্নান করছে।
কৌতূহল বড় আশ্চর্য জিনিস। কখনো সখনো তা ভয়কেও ছাপিয়ে যায়। চিকুর বেলায়ও তাই হল। জলাপুকুরের পাড়ে ও সাইকেল দাঁড় করিয়ে দিল। তবে প্যাডেলে পা চেপে রেখে রেডি থাকল। ওর হাত পা থরথর করে কাঁপছিল।
কিছুক্ষণ পরেই জলের শব্দ থামল। কিছু একটা উঠে আসতে লাগল জল থেকে।
প্রাণীটাকে জ্যোৎস্নার আলোয় দেখা যাচ্ছিল। তবে ওটার মাথায় শ্যাওলা আর কচুরিপানা বোঝাই হয়ে থাকায় মুখটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। হাত দিয়ে সেগুলো সরাতে চেষ্টা করছিল। হাতটা মানুষের মতো হলেও আঙুলের ডগার কাছে লম্বা, সাদা বাঁকান নখ। সামনে ঝুঁকে পড়ে কুঁজো হয়ে প্রাণীটা জল থেকে উঠে আসছিল। হাঁটুদুটো সামান্য ভাঁজ করে জলের ওপর পা ফেলছে। যেন কোনও চারপেয়ে জন্তু সোজা হয়ে হাঁটার চেষ্টা করছে।
একটা হিংস্র গর্জন বেরিয়ে এল প্রাণীটার মুখ দিয়ে।
চিকুর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে এতক্ষণ গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে থাকা চিৎকারটা ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল।
একটানা চিৎকার করতে করতে পাগলের মতো সাইকেল ছুটিয়ে দিল চিকু।
ও যখন বাড়ি এসে পৌঁছল তখনও ওর চিৎকার থামে নি।
মা-বাবা ছুটে বেরিয়ে এলেন দরজায়। দেখলেন চিকুর জামাকাপড় রক্ত আর কাদায় মাখামাখি।
মা ছুটে গিয়ে আকুলভাবে জিজ্ঞেস করলেন, " কি হয়েছে রে, কি হয়েছে?"
চিৎকার করতে করতেই চিকু আচমকা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
পরদিন সকাল দশটার মধ্যেই গত রাতের পাশবিক খুনের ঘটনার খবরটা জাঙ্গিকুলের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে গেল। খুব ভোরে কেউ একজন পথের ওপর পড়ে থাকা বীভৎস মৃতদেহটা আবিষ্কার করে। তারপরই খবরটা এই ছোট এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
বেশ কয়েক বছর ধরে এই আধা টাউনে খুনের মতো কোনও রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে নি। তাই এই খুনটাকে কেন্দ্র করে গোটা অঞ্চল একেবারে তেতে উঠল। পুলিশও নিয়মমাফিক তদন্ত শুরু করে দিল।
যে লোকটি খুন হয়েছে সে একজন ভবঘুরে ভিখারি। এইরকম একজন লোককে খুন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাটাই বেশ মুশকিলের। তাছাড়া খুনটা কোনও মানুষের কাজ নাকি কোনও হিংস্র জন্তুর, তাই নিয়েও দোকানে, সেলুনে, বাজারে জোর তর্ক বেধে গেল। কেউ কেউ খোঁজ করতে লাগলেন, এই এলাকার দু চার মাইলের মধ্যে কোনও সার্কাস পার্টি এসে ঘাঁটি গেড়েছে কিনা। আর তাদের দলে বাঘ কিংবা সিংহের মতো কোনও হিংস্র জন্তু জানোয়ার আছে কিনা। তবে বেশীরভাগ মানুষেরই মত হলো, মৃতদেহটার যে বীভৎস ছিন্নভিন্ন অবস্থা দেখা গেছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে এ কাজ কোনও মানুষের হতে পারে না।
তাহলে এর পরের প্রশ্ন হল, এটা যদি কোনও হিংস্র পশুরই কাজ হয়ে থাকে, তাহলে সেই পশুটা কি? বাঘ? সিংহ? নেকড়ে? হায়েনা? না অন্য কিছু?
পরদিন চিকু আর বাড়ি থেকে বেরোয় নি। মা-বাবা দুজনেই ওকে স্কুলে যেতে দেয়নি।
কাল রাত থেকে চিকুর বাড়াবাড়ি রকমের অবস্থা চলেছে। বারবার ও কেঁপে উঠেছে ভয়ে। মা ওর পাশটিতে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন ; কিন্তু তা স্বত্তেও ওর ঘুম আসেনি। কখনো কখনো ওর তন্দ্রামতো এসেছে কিন্তু তারই মধ্যে আবার গোঙানির মতো শব্দ করে চমকে জেগে উঠেছে। তখন ওর মা আধখানা ঘুমের ট্যাবলেট চিকুকে খাইয়ে দিয়েছেন।
বাবা ডাক্তার ডাকার কথা বলেছিলেন কিন্তু ওর মা রাজি হননি। বলেছেন, " ওর তো জ্বর টর কিছু হয়নি। মনে হয় প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। আজকের রাতটা বিশ্রাম নিক, কাল সকালে যা হয় করা যাবে।"
চিকুর শেষ পর্যন্ত ঘুম এসেছিল অনেক রাতে। তাই পরদিন ওর ঘুম ভাঙল বেলা সাড়ে নয়টা নাগাদ। তারপর থেকে শুধুই বিশ্রাম, আর জানলা দিয়ে মেঘলা আকাশ, রাস্তাঘাট আর গাছপালা দেখা।
আজও বেশ শীত। তবে বৃষ্টি থেমে গেছে।
একা একা বিছানা লাগোয়া জানলার কাছে বসে চিকু ভাবছিল, গত রাতে ও যা দেখেছে তা সত্যি কিনা। এখনো পর্যন্ত ও মা বাবাকে একটি কথাও বলেনি। বললে হয়ত ওঁরা বিশ্বাস করবেন না।।আচ্ছা, গত রাতের দেখা ব্যাপারটা একটা বাজে দুঃস্বপ্ন নয় তো?
চিকুর শরীরটা ভাল নয় দেখে ওর বাবা আজ আর অফিসে বেরোন নি। তাই হাতে সময় পেয়ে বাজার দোকান সেরে নিচ্ছিলেন। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাইরে থেকে ফিরে বাবা সোজা কিচেনের দিকে চলে গেলেন। মায়ের সঙ্গে চাপা গলায় কি যেন আলোচনা করতে লাগলেন।
চিকু বুঝতে পারল, ওকে আড়াল করে মা-বাবা কোনও আলোচনা করছেন। ওর হঠাৎ করেই মনে হল, আলোচনার বিষয়বস্তুটা বোধহয় ওর জানা।
একটু পরে মা চিকুর স্নান করার জন্য জল গরম করে দিলেন। গোসল করার পর ভাল করে তোয়ালে দিয়ে চিকুর গা হাত-পা মুছিয়ে দিলেন। তারপর খেতে দিলেন।
মায়ের ভাবভঙ্গিগুলো এমন যেন চিকু এখনো সেই চার পাঁচ বছরের ছোট খোকাটিই রয়ে গেছে।
খেয়েদেয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেই ঘুম এসে ওর দু চোখ জড়িয়ে ধরল। চিকু একেবারে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল।
ঘুম ভাঙল একেবারে বিকেল চারটের পর। মেঘ ফিকে হয়ে আকাশটা এখন বেশ আলো আলো লাগছে। তবে রাস্তা এখনো ভিজে। দুপুরে বোধহয় আর এক দফা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গেছে।
মা চা তৈরি করে বাবাকে দিলেন, নিজে খেলেন। তারপর চিকুকেও একটু সাধলেন...." দুটো বিস্কুট খেয়ে একটু চা খেয়ে নে। শরীরটা তাজা লাগবে।"
বাবা আড়চোখে কেমন খুঁটিয়ে চিকুকে লক্ষ্য করছিলেন। চিকু চুপচাপ বসে চা বিস্কুট খেতে লাগল।
চিকুর চা খাওয়া শেষ হতে না হতেই টেলিফোন বেজে উঠল। বাবা তাড়াতাড়ি উঠে ফোন রিসিভ করলেন। " হ্যালো" বলেই ফোনটা এগিয়ে দিলেন চিকুর দিকে। বললেন, " তোর ফোন। কথা বলতে পারবি?"
চিকু ঘাড় নেড়ে নেমে এল বিছানা থেকে। বাবার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বলল, " হ্যালো।"
প্রিয়াঙ্কার ফোন।
ওপাশ থেকে প্রিয়াঙ্কা বলল, " আজ স্কুলে যাওনি? আমরা স্কুলে যাওয়ার সময় জনতা কেবিনের সামনে তোমাদের দেখলাম না। তাই ভাবলাম, হয়ত শরীর টরীর খারাপ হয়েছে......."
রোজ স্কুল যাওয়ার সময় চিকু একটা বাঁকের মুখে এসে ওর আরও দু বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করে। সেখানে 'জনতা কেবিন ' নামে একটা ভাতের হোটেল আছে। হোটেলের সামনে তিন বন্ধু জড়ো হওয়ার পর ওরা স্কুলে যায়। মোটামুটি সেই সময়টায় প্রিয়াঙ্কাও তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে একজোট হয়ে স্কুলে যায়। বেশীরভাগ দিনই ওদের দেখা হয়।
চিকু বলল, " না, আজ স্কুলে যাইনি....শরীরটা ভাল নেই....ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।"
" 'মোহাব্বতের' ক্যাসেটটা শুনেছ?"
" না, এখনো শোনা হয়নি। এই সন্ধ্যেবেলা শুনব।"
" কাল তোমার ফেরার সময় কোনও প্রবলেম হয়নি তো?"
একটু ভেবে নিয়ে চিকু ছোট্ট করে বলল, " না।"
" আসলে কাল জলাপুকুরের কাছে একটা মার্ডার হয়েছে। ব্রুটাল মার্ডার। সবাই বলছে, কোনও ডেঞ্জারাস এনিমেলের কাজ। সেইজন্যেই চিন্তা হচ্ছিল। ভাবছিলাম, তুমি কাল ঠিকমতো বাড়ি ফিরেছ কিনা। আমি স্কুল থেকে ফিরেই তোমায় ফোন করছি।"
চিকু সারাদিনে বাবা কিংবা মায়ের মুখে খুনের কোনও খবর শোনেনি। যদিও ও জানে, এই আধা টাউন এলাকায় খবরটা এরই মধ্যে সবাই জেনে গেছে। বাবা-মা হয়ত ওর ভালোর জন্য খবরটা ওকে জানান নি। তাঁরা তো আর জানেন না, চিকুর খবর জানার প্রয়োজন নেই, কারণ ' খবর'টা ও গত রাতে নিজের চোখে দেখেছে।
গত রাতের দৃশ্যটার কথা মনে পড়তেই চিকু একবার শিউরে উঠল। এখনো পর্যন্ত ও মা-বাবাকে কিছু জানায়নি। কাল রাতে ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বহুবার ওর মা তাকে জিজ্ঞেস করেছেন, " কি রে, ভয় পেয়েছিস? কি হয়েছে? আমায় বল!"
কিন্তু চিকু কোনও কথা বলেনি। ওর মনটা কেমন অসার হয়ে গিয়েছিল।
অবশ্য এখন ওর অনেকটা ভাল লাগছে। শরীর-মন দুটোই মোটামুটি ফ্রেশ লাগছে। কিন্তু ওর জানতে ইচ্ছে করছে, গতরাতে খুন হওয়া মানুষটা কে?
সে কথাই ও এখন প্রিয়াঙ্কাকে জিজ্ঞেস করল, " কাল রাতে কে মার্ডার হয়েছে জানো? "
" সবাই বলছে একজন ভ্যাগাবন্ড। ভিখারি গোছের লোক...."
"ও"।
" নেক্সট উইকে বাংলা পড়তে যাচ্ছ তো?"
" হ্যাঁ....বাবা।"
" প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে একমাত্র বাংলা কোচিংটাই ওর কমন। অন্যান্য সাবজেক্টের টিচাররা প্রিয়াঙ্কাকে বাড়িতে এসে পড়ান। হরিহরবাবু কারোর বাড়িতে গিয়ে পড়ান না। তাই বাংলা পড়বার জন্য প্রিয়াঙ্কাকে হরিহরবাবুর কোচিংয়ে এসে পড়তে হয়।
কথা শেষ করে চিকু রিসিভার নামিয়ে রাখল।
চিকু ঘাড় ঘোরাতে দেখল, বাবা আর মা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, " তুই মার্ডারের ব্যাপারটা জানিস? খবর পেলি কি করে?"
চিকু আঙুলের নখ খুঁটল কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নিচু করে বলল, " আমি সব জানি। সব আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেজন্যই গত রাতে অত ভয় পেয়েছিলাম।"
ঘরে যেন বাজ পড়ল।
মা প্রায় ছুটে এলেন চিকুর কাছে। " কি দেখেছিস বল আমায়?"
চিকু একটু সময় নিল। তারপর ধীরেধীরে সব ঘটনা বলে গেল। আর ওর মা-বাবা চুপ করে ফ্যাকাসে মুখে সব শুনে গেলেন।
চিকুর কথা শেষ হলে মা-বাবা ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন। চিকুও ধীরেধীরে সেগুলোর উত্তর দিতে চেষ্টা করল। এরপর ওঁরা দুজনে কেমন গুম হয়ে গেলেন। স্থির চোখে চিকুকে লক্ষ্য করতে লাগলেন। ওঁরা মনে মনে কি ভাবছেন সেটা চিকু কিছুটা আঁচ করতে পারছিল। এরপর বাবা একটা প্রশ্ন করতেই চিকুর কাছে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়ে গেল।
" তু...তুই ভুল দেখিস নি তো?"
চিকু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, " না, ভুল দেখিনি। বানিয়ে বানিয়ে এরকম গল্প তৈরি করে আমার কি লাভ!"
একটু চিন্তা করে বাবা বললেন, " যাকগে, তুই এসব কথা আর কাউকে বলিস না। শেষটায় কথাটা পাঁচকান হতে হতে পুলিশের কানে গেলেই মুশকিল। "
মা-ও চিন্তার গলায় বললেন, " হ্যাঁ। তখন আবার টানাহ্যাঁচড়া করবে, হাজারটা প্রশ্ন করবে। না, না, এসব কথা তুই কাউকে বলিস না।"
" ঠিক আছে, বলব না।"
চিকু কথাটা বলল বটে কিন্তু ওর বাইরের সবাইকে নিজের দেখা ঘটনাটার কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল একবার দিনের আলোয় জলাপুকুরের কাছে গিয়ে খুনের জায়গাটা দেখে। ওর ভেতরে একটা গোয়েন্দাভাব জেগে উঠতে চাইছে। ওখানে গেলে কি প্রাণীটার পায়ের ছাপ পাওয়া যাবে? অথবা গায়ের লোম?
ও এবার সটান নিজের ঘরে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসে পড়তে শুরু করল। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পড়ায় মন বসাতে পারল না। বারবারই গতরাতের দেখা ঘটনাটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। হঠাৎই ওর চোখে পড়ল টেবিলের এক প্রান্তে পড়ে থাকা 'মোহাব্বতে'র ক্যাসেটটার দিকে। কি ভেবে চিকু চেয়ার ছেড়ে উঠল। বিছানার কাছে গিয়ে বালিশের পাশ থেকে ওয়াকম্যানটা তুলে নিয়ে এল।
তারপর হেডফোন কানে লাগিয়ে 'মোহাব্বতে'র ক্যাসেটটা শুনতে শুরু করল।
জানলার বাইরে তখন অন্ধকার পা টিপে টিপে নেমে আসছে।
শেষপর্যন্ত চিকুর এই ব্যাপারটা আর গোপন রইল না। এইরকম একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ও নিজের চোখে দেখেছে, এইটা সবাইকে না বলা পর্যন্ত ও যেন কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিল না। সবাই এটা জানতে পারলে ওকে ঘিরে কত হৈ চৈ হত, ওর সাহসকে কত লোক প্রশংসা করত, একই গল্প ওকে কতবার না শোনাতে হত।
ভেতরের এই সাঙ্ঘাতিক টেনশন চিকু অতিকষ্টে তিনদিন সামলে রাখতে পেরেছিল। তারপর ও খবরটা প্রথম ভাঙল প্রিয়াঙ্কার কাছে। সেদিন ও ' মোহাব্বতে' র ক্যাসেটটা ফেরত দিতে প্রিয়াঙ্কাদের বাড়ি গিয়েছিল।
খবরটা শুনে প্রিয়াঙ্কা তো একেবারে বোবা হয়ে গেল। অবাক হয়ে ও চিকুকে দেখতে লাগল।
" মাই গুডনেস! কি ডেঞ্জারাস! এত বড় একটা ব্যাপার তুমি আমায় আগে বলোনি!"
চিকু বলল, " কাউকে বোল না। আমার মা-বাবা এসব কথা কাউকে বলতে বারণ করেছে।"
প্রিয়াঙ্কা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চিকুকে অনেক প্রশ্ন করল। সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চিকু বারবার সেদিনের পূর্ণিমার সেই ভভয়ঙ্কর রাতটায় ফিরে যাচ্ছিল।
সন্ধ্যে সাতটা বাজতে না বাজতেই প্রিয়াঙ্কা এক প্রকার জোর করে চিকুকে বাড়ি রওনা করে দিল।
প্রিয়াঙ্কার পর স্কুলের বন্ধু সোহনের কাছে চিকু গোপনে সব খুলে বলল। স্কুল থেকে ফেরার পথে সোহনের কাছে চিকু গোপনে জলাপুকুরের গল্পটা শোনাল।
এরপর কানকানি জানাজানির ব্যাপারটা নিউক্লিয় শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মতো বাড়তে শুরু করল। দশ বারোদিনের মধ্যে জাঙ্গিকুলের প্রায় সকলেই জেনে গেল, পূর্ণিমার রাতে জলাপুকুরের ধারে চিকু কি দেখেছে।
একদিন সন্ধ্যেবেলা দেশপ্রিয় সুইটস থেকে মিষ্টি কিনে ফিরছিল চিকু। হঠাৎই শুনল কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে।
সাইকেল থামিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই চিকু রোহনদাকে দেখতে পেল। বিশুদার চায়ের দোকানে বসে আছে।
শিবতলার উল্টোদিকেই রাস্তার একপাশে বিশুদার চায়ের দোকান। বাঁশের খুঁটি আর দরমার বেড়া দিয়ে তৈরি দোকান। দোকানের ছাদটা টালির তৈরি।
বিশুদা একা মানুষ। দোকানের পেছনেই সামান্য একটুখানি থাকার জায়গা করে নিয়েছে। আর দোকানের সামনেটায় আধ-ফালা বাঁশ পেরেক দিয়ে ঠুকে বেঞ্চি বানিয়ে খদ্দেরদের বসার জায়গা করে দিয়েছে।
বিশুদার দোকানটা নামে চায়ের দোকান হলেও বিস্কুট, কেক, ডিম-পাঁউরুটি, হজমি গুলি, সিগারেট এমনকি বাচ্চাদের খেলনা প্লাস্টিক বলও পাওয়া যায়।
দোকানের সামনের বেঞ্চিতে রোহণ আর ছোটকু বসে ছিল। ছোটকু রোহণের সর্বক্ষনের সঙ্গী। কালো, রোগা পাতলা চেহারা, বড় বড় চোখ, মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়ানো চুল।
সাইকেল থেকে নেমে পড়েছিল চিকু। সাইকেলটা পাশে পাশে হাঁটিয়ে ও চলে এল রোহনের দোকানে।
রোহণদা বলল, " বোস কথা আছে। বিশুদা, তিনটে ছোট চা বানাও তো।"
চায়ের কথায় আপত্তি করল না চিকু। সাইকেলটা স্ট্যাণ্ডে দাঁড় করিয়ে ও রোহণের পাশে বসে পড়ল।
"এই তুই নাকি জলাপুকুরের মার্ডারটা হতে দেখেছিস! জাঙ্গিকুলে পুরো চাউর হয়ে গেছে......." রোহণ বলল।
চিকু আবার বলতে শুরু করল। এই কদিনে গল্পটা বলে বলে ও বেশ রপ্ত করে ফেলেছে। তাই গল্পটা খুঁটিনাটি সমেত বলতে ওর কোনও অসুবিধে হল না। একবারের জন্যও হোঁচট খেল না।
গল্প শেষ হতে ছোটকু চোখ বড় বড় করে বলল, " আরিব্বাস! কি ডেঞ্জারাস কেস বস!"
বিশুদা হাঁ করে চিকুর গল্প শুনছিল। গরম চা উথলে পাতা উনুনে পড়তেই ' ছ্যাঁক ' শব্দ হল। বিশুদা চমকে উঠে উনুনের কাছে গেল। তিনটে কাপে চা ঢালতে লাগল।
রোহণদা চোখ ছোট করে ভ্রু কুঁচকে কি যেন ভাবছিল। অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, " মার্ডারারের গায়ে লোম ছিল? না ওভারকোট পরে ছিল?"
বিশুদা ওদেরকে চা এগিয়ে দিল।
চায়ে চুমুক দিয়ে চিকু বলল, " না, কোট বলে মনে হয় নি। তাছাড়া কোট পরে ঐ রাতে কেউ জলে ঝাঁপ দেয়?"
চায়ে চুমুক দিয়ে 'হুম' করে একটা ছোট্ট শব্দ করল রোহণ। তারপর জিজ্ঞেস করল, " তুই লোকটার মুখ দেখতে পেয়েছিলি?"
চিকু বলল, " না। শ্যাওলা আর কচুরিপানায় ওর মুখটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তবে ওর হাতের আঙুলে লম্বা লম্বা সাদা বাঁকান নখ ছিল।"
" পুরো ব্যাপারটা ছদ্মবেশ হতে পারে বুঝলি ", রোহণ বলতে লাগল, " কাল ফাঁড়ির বড়বাবুকেও আমি সেকথা বলেছি। কিন্তু প্রবলেমটা কোথায় জানিস? মার্ডারারের মোটিভটাই কেউ বুঝতে পারছে না। একটা ভিখিরির কাছে কি-ই বা টাকাপয়সা থাকবে?"
'সুড়ুৎ' শব্দ করে চা পান শেষ করল ছোটকু। তারপর হাত পা নেড়ে বলল, " বস, এমন কেস নয়তো যে লোকটা রাত্তিরবেলা খুন করা প্রাকটিস করছিল?"
রোহণ বিরক্ত হয়ে ছোটকুকে হাত নেড়ে থামতে ঈশারা করল। তারপর যেন আপনমনেই বিড়বিড় করল, " আমার এলাকায় মার্ডার করে সরে পড়বে......এত বড় বুকের পাটা কার?"
চিকু রোহণকে দেখছিল।
লম্বা চওড়া ব্যায়াম করা চেহারা। গায়ের রঙ মাজা। মাথায় ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল। চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। চোয়াল শক্ত। জামার নীচে বুকের মাসল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
চায়ের কাপটা ' ঠকাস' করে নামিয়ে রেখে রোহণ বলল, " তুই এ ব্যাপারে আর কিছু খবর পেলে বা কিছু শুনলে আমায় জানাবি। "
চিকু ঘাড় কাত করে ' হ্যাঁ' বলল। চা শেষ করে চিকু চায়ের কাপটা বিশুদার হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সত্যিই তো, রোহণদা তো ঠিকই বলেছে। খুনের উদ্দেশ্যটাই তো কেউ বুঝতে পারছে না। তাহলে কি এ কোনও পাগল খুনীর কাজ? অনেক সিনেমায় যেমন দেখায়।
এইসব ভাবতে ভাবতে চিকু বাড়ি ফিরে এল।
( ক্রমশ)
------------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now