বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
২ য় পর্ব ........এরপর থেকে তানজিয়া কেমন যেন বদলে যেতে লাগল। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করা ছেড়ে দিল, কতদিন এমনও হয়েছে স্কুল পালিয়ে কোথায় যেন চলে যেত। এমনকি আমি যে ওর এত প্রিয় বন্ধু ছিলাম, সেই আমাকে-ও কেন যেন এড়িয়ে চলতে লাগল। সবসময় গম্ভীর হয়ে চুপচাপ বসে থাকত, কারোর সাথে কথা বলত না। কিছু জিজ্ঞেস করলে তিরিক্ষি মেজাজে উত্তর দিয়ে সরে যেত। যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে একেবারেই ভালো লাগছে না ওর। তানজিয়াদের বাড়ীটা যৌথ পরিবার। ওরা চার ভাই বোন তানজিয়া সবর বড়। একদিন ওর ছোট ভাই তারিকের কাছে শুনলাম, ও নাকি বাড়িতেও বেশীক্ষণ থাকে না। কোথায় কোথায় যেন চলে যায়। ....দিন'কে দিন মেয়েটা কেমন যেন রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে যেতে লাগল। ওর স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ির সবাই তো বটেই, স্কুলের মাস্টারমশাইরা এমনকি পাড়া প্রতিবেশীরাও চিন্তিত হয়ে পড়ল। একদিন আমি ঠিক করলাম, ও কোথায় যায় আমাকে দেখতেই হবে। যদিও ভালো করেই জানি, ও কোথায় যায়। ও যায় সেই-ই জঙ্গলের ভেতর ওই বাড়িটার পাতালকুঠরিটায়। ওখানেই একা একা বসে দীর্ঘসময় কাটায় ও। একদিন ওকে আমি জঙ্গলের ভেতর অনুসরণ করতে গিয়ে দেখলাম, আমার সন্দেহই ঠিক। সে যায় ওই জঙ্গলের ভেতর ভাঙা বাড়িটার রহস্যময় ওই পাতাল কুঠরিতে। কিন্তু ওর ওই রক্তশূন্যতার কি কারণ হতে পারে তা ঠিক বুঝতে পারলাম না। হয়তো দিনের পর দিন বেশীরভাগ সময় ওই পাতালকুঠরিতে থাকার জন্যই ওর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে বলে তখন মনে হয়েছিল আমার। .....একদিন এই নিয়ে ওকে চেপে ধরায়, অনেক চার্জ করার পর ও আমায় জানাল যে ওই পাতালকুঠরিতে একটা রুগ্ন কুকুর পা ভেঙে পড়ে রয়েছে। তানজিয়া রোজ ওটার কাছেই যায়। সেবাশুশ্রূষা করে। কুকুরটা নাকি ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। তানজিয়া ওর নাম দিয়েছে - ভুলো। আমায় এ'ও বলেছিল, 'ভুলো' নাকি তাকে অনেক গল্পও শোনায়। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে চেপে ধরলাম, "কুকুর আবার গল্প বলে নাকি?" শেষ পর্যন্ত ওকে স্বীকার করতে হলো, পাতালকুঠরিতে যে রয়েছে, সে কুকুর নয় - মানুষ। তবে খুব বুড়ো। হাঁটাচলা করতে পারে না। চোখে নাকি ওর কিসব ঘা হয়েছে তাই দিনের আলো সহ্য করতে পারে না। তানজিয়া আমায় বলল, সেই মানুষটা নাকি আমার সঙ্গেও মিশতে চায়। তারপরই সে অতি উৎসাহ মিশিয়ে আমায় বলল, "তুই-ও একদিন চল না, গল্প করবি ওর সাথে। দেখবি, তোরও ভালো লাগবে"। ......সেদিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সেদিনটার কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠি। কি ঝোঁকের বশে আমি সেদিন ওর সঙ্গ নিয়েছিলাম আর ওর ওই 'অজানা বন্ধু'র সান্নিধ্যে এসেছিলাম, তা ভাবলে আজও আতঙ্কে আমার শরীর অবশ হয়ে আসে। সেই জঙ্গলের রাস্তা...আবার সেই ভাঙা বাড়ি...সেই ভয়াবহ অন্ধকারে ঢাকা সুড়ঙ্গপথ....। সেদিন তানজিয়ার সাথে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার মনে হয়েছিল পাতালকক্ষের প্রতিটি ইঁট, কাঠ, পাথর যেন আমারই জন্য অপেক্ষা করছে। সেই গুহার মতো জায়গাটায় পা দিতেই ভাঙা ভাঙা অস্ফুট স্বরে একটাই মাত্র শব্দ শুনতে পেলাম - "আবদুল!..." ব্যস, আমি আর দাঁড়াই নি। পড়িমরি করে ছুটে সিঁড়ির তিন-চারটে করে ধাপ একসাথে পেরিয়ে উঠে এসেছিলাম ওপরে। কারণ আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম, যে জিভটা আমার নাম উচ্চারণ করল, সেটা কোনো মানুষের নয়। .....এরপর থেকে তানজিয়া আমার সঙ্গে মেলামেশা একেবারেই ছেড়ে দিল। শুধু আমি নয়, অন্য সকলের সাথে মেলামেশা এমনকি কথাবার্তা বলা একেবারেই বন্ধ করে দিল। রোজ আমি ওকে ওই জঙ্গলের পাতালকুঠরির দিকে একা একা যেতে দেখতাম আর ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে যেত। কি যে এক মহাভয় আমাকে পেয়ে বসত, তা একমাত্র আমিই জানি। কিন্তু তখনো আমি কাউকে কিছু বলতে পারিনি। ......এইভাবে চলতে চলতে একদিন দেখলাম, তার বাড়িতে ঘন ঘন ডাক্তার আসছে আর যাচ্ছে। বাড়ির প্রত্যেকটা লোক গভীর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সে গুরুতর অসুস্থ। ওর শরীরে ভয়াবহ অ্যানিমিয়া। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন শরীরের সব রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। পাতলা সাদা কাগজের মতো গায়ের রঙ হয়ে গেছে, দেহটা যেন একটা ছিবড়ে করা দড়ি, বিছানার সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। অচৈতন্য, বুকের স্পন্দন ক্ষীণ আর অনিয়মিত, ঠোঁটদুটো ভেতরে ঢুকে গিয়ে হাঁসফাঁস করছে নিশ্বাস নেবার জন্য। ওকে বাঁচানোর ব্যাপারে ডাক্তাররা খুবই চিন্তিত। কি করে যে হঠাৎ ওর এই অবস্থা হলো, তা কেউই বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু একমাত্র আমি তো জানতাম, ওর এই অবস্থার কারণ কি। দিনের পর দিন পাতালের ওই অন্ধকার পরিবেশই যে ওর এই অবস্থার কারণ, তা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ কারণটা যে কি, তা পরে বুঝতে পেরেছিলাম....বুঝেছিলাম সেই রাত্রেই। .....ওইদিন রাত্রে আমি একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। আমার আব্বু-আম্মু আর অন্য ভাইবোনেরা যে যার নিজের ঘরে গিয়ে শুয়েছে। আমার ঘরের জানলাটা মাঠের দিকে। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না। ভাঙা ভাঙা সাদা তুলোর মতো মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছিল আকাশের কালো বুকের ওপর দিয়ে, দিগন্ত থেকে দিগন্তের দিকে। কেমন একটা গুমোট গরম দিচ্ছিল, তাই মাথার দিকের জানলাটা অনেকটা ফাঁক করে শুয়েছিলাম। বেশ একটা ঠাণ্ডা আরামদায়ক হাওয়া আসছিল। কিন্তু তবু আমার চোখে ঘুম আসছিল না। খালি মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঘটবেই আর সেটা মোটেও ভালো নয়। চুপচাপ জেগে শুয়ে ছিলাম সে রাতে। ভাগ্যে ঘুমিয়ে পড়িনি, না-হলে যে কি হতো! জেগে ছিলাম বলেই হয়তো ওটা'র আসার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। স্খলিত চরণে কিরকম একটা পা টেনে টেনে চলার শব্দ কানে আসতেই আমি সজাগ হয়ে গিয়েছিলাম। মূহুর্তে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, যে ভারী পায়ের শব্দটা ক্রমশ আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল, তা ওটা'রই পায়ের আওয়াজ, তা ছাড়া আর অন্য কারোর হতে পারে না। কথাটা মনে হওয়ামাত্র আমার মেরুদণ্ড বেয়ে যেন হিমস্রোত নেমে গেল। বেশ বুঝতে পারলাম, শিয়রে সমন এসে দাঁড়িয়েছে। চিৎকার করে বাড়ির কাউকে ডাকব, সেই শক্তিটুকু পর্যন্ত রইল না। বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমি কাঁপতে শুরু করলাম। দৃষ্টি স্থির জানলার দিকে। .....ঘষটে ঘষটে পা টেনে টেনে চলার শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল আমার মাথার দিকের জানলাটার কাছে। আমি বুঝলাম, আমার বিপদ আসন্ন। নিজেকে বাঁচানোর সহজাত তাগিদ থেকে বা কোনো রহস্যময় শক্তির অনুপ্রেরণায় আমি যেন হারানো শক্তি কিছুটা ফিরে পেলাম। দেহের সব শক্তি একত্র করে আমি 'ঝড়াক' করে লাফিয়ে উঠে জানলার খোলা পাল্লাদুটো বন্ধ করে দিলাম সশব্দে। আর তখনই দেখতে পেলাম ওটা'কে। জানলার বাইরে অন্ধকারের বুকে দাঁড়িয়ে একটা ততোধিক কালো মূর্তি। দুটো বরফের মতো নিশ্চল চোখ আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আর অনবরত ফিসফিস করছে ওটা। যেন জানলাটা খুলে দেবার জন্য আমায় অনুনয় করছে। আমি আর বিছানায় স্থির থাকতে পারলাম না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি বিছানা থেকে নেমে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। আব্বু-আম্মু'র ঘরের দরজায় পাগলের মতো ঘা দিতে লাগলাম আর চিৎকার করে করে ওদের ডাকতে লাগলাম। আর তখনিই আমার ঘরের জানলাটার কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম আর 'ফিসফিস' শব্দটা সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। বরাত ভালো, ওই সময়েই আব্বু-আম্মু জেগে উঠে দরজা খুলে দিলেন। আমি অসহায়ের মতো আম্মু'র বুকে মাথা গুঁজে কাঁদতে লাগলাম। ততক্ষণে চাচা-চাচী আর অন্য ভাইবোনেরাও তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে অসংলগ্নভাবে তাদের যা যা বললাম, সব শুনে আব্বু আর চাচা আমার ঘরে ঢুকে এদিকওদিক অনেক খুঁজল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। কিন্তু জানলার কাঁচ কেন ভাঙা - সেটা নিয়ে ওঁদের কপালে দুশ্চিন্তার স্পষ্ট রেখা দেখা দিল। চাচা ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলেও আব্বু বললেন, হয়তো জানলার কাঁচটা ফ্রেমের মধ্যে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল, তা-ই ওইভাবে ভেঙে পড়েছে.... আর আমার কথাগুলোকে 'দুঃস্বপ্ন মাত্র' বলে ব্যাপারটাকে হালকা করে দিতে চাইলেন। তবে আমাকে আর সে রাত্রে একলা শুতে দিলেন না আমার আব্বু। নিজেদের ঘরেই নিয়ে গিয়ে শোয়ালেন। ........আর ঠিক সেই রাত্রেই তানজিয়া মারা গেল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now