বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৩ য় এবং শেষ পর্ব **************************************************** .....তানজিয়া'কে কবর দেওয়ার দিন অন্যান্য সকলের সঙ্গে আমিও গোরস্থানে উপস্থিত ছিলাম। কারোর চোখই সেদিন শুকনো ছিল না। কিন্তু কবর দেওয়ার পরের দিন ওই গোরস্থানে যা ঘটল, তা মনে পড়লে এখনও গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায় আমার। ওইদিন বিকেলে গোধূলি বেলায় আমি পায়ে পায়ে আবার এসে উপস্থিত হয়েছিলাম গোরস্থানে। নুরুলের কবরের কাছে। ওর পরিবারের লোক ওর কবরের ওপর দামী শ্বেতপাথরের স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে দিয়েছিল। সেই স্মৃতিস্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে আমি তানজিয়ার কথা ভাবছিলাম। চোখে জল আসছিল আমার। টুকরো টুকরো স্মৃতি ভিড় করছিল আমার মনের ভেতর। আর ঠিক তখনিই.... ওদিকের ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে একটা কিছুর ছুটে আসার শব্দ আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। চাঁদহীন রাতের সুযোগ নিয়ে স্খলিত চরণে ওটা আসছিল না, সেই গোধূলি বেলার বিকেলের আলোয় প্রবল আক্রোশে দুরন্ত গতিতে ওটা এগিয়ে আসছিল তানজিয়ার সমাধির দিকেই। আমি প্রাণভয়ে চট করে অন্য একটা বড়সড় সমাধস্তম্ভের পেছনে গা ঢাকা দিলাম। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা দেহ-খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চাইছিল প্রায়। ভয়ার্ত, স্তম্ভিত চোখে আমি দেখেছিলাম, দুরন্ত আক্রোশে ওটা এগিয়ে আসছে তানজিয়ার সমাধির দিকে আর সেইসঙ্গে ফিসফিসানির মতো সেইরকম শব্দ। আমি সমাধিস্তম্ভের পেছনে দাঁড়িয়ে এক মহা আতঙ্কে ধুম জ্বরের রুগীর মতো কাঁপতে লাগলাম। গলা আর জিভ শুকিয়ে কাঠ, দেহ অসাড়, নিজের পা-দুটোর ওপরও জোর পাচ্ছি না। শুধু মাথাটা তখনও কোনোরকমে কাজ করে যাচ্ছে, যার জন্য তখন জিনিসটাকে দেখতে পেয়েছিলাম আমি। .....বুলেট গতিতে ওটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তানজিয়ার সমাধির ওপর। মহা আক্রোশে সমাধির পাথরগুলো টেনে টেনে ওঠাতে লাগল। ওটা যে কি, তা আমি চোখে দেখেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। যাই যাই বিকেলের আলোয় এক ঘন কালো ছায়া ছায়া মতো কিছু একটা যেন প্রবল আক্রোশে সমাধির ওপর আছড়ে আছড়ে পড়ছে। তছনছ করে দিতে চাইছে অত সুন্দর নতুন গড়া সমাধিটাকে। আর অনবরত ফিসফিস করছিল ওটা, যদিও সেই ফিসফিসানির এক বর্ণও আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার ভয়ার্ত, আতঙ্কিত, স্তম্ভিত চোখের সামনেই ওটা সমাধির শিলাস্তম্ভটাকে উপড়ে টেনে নিয়ে ফেলে দিল। তারপর উন্মাদের মতো নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে চলল। অত:পর মাটির তলা থেকে বের করে আনল ওর কফিনটা। এক ডালে ডালাটা খুলে তুলে নিল ওর প্রাণহীন দেহটা। তারপর.... তারপর... কি হয়েছিল আমি জানি না। শুধু এটুকু মনে আছে, আমার চোখের সামনে অন্ধকারের একটা কালো পর্দা নেমে এসেছিল। ......কিভাবে বাড়ি এসে পৌঁছেছিলাম, আমার মনে নেই। বাড়ি এসেই আমি শুধু 'আম্মু' বলে আর্তনাদ করে উঠে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলাম আম্মুর কোলে। তারপর প্রলাপ বকতে বকতে আমি চারপাশের বিভীষিকার হাত থেকে মুক্তি চাইছিলাম। আমার অবস্থা দেখে বাড়ির সকলে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরে শুনেছিলাম, তিনদিন ধরে আমি ব্রেন ফিভারে আচ্ছন্ন ছিলাম। শুধু প্রলাপ বকে গিয়েছি - জঙ্গলের মধ্যে সেই ভাঙা বাড়িটা, তানজিয়ার, আর...আর সেদিন বিকেলে গোরস্থানে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি স্বচক্ষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেছি, প্রলাপের মধ্য দিয়ে শুধু এসবই বলে গিয়েছি। আমার কথা শুনে আব্বু পরদিন সকালে গোরস্থানে গিয়ে দেখেন, তানজিয়ার সমাধিটার একেবারে শোচনীয় অবস্থা। কেউ বা কিছু যেন প্রবল আক্রোশে নতুন সমাধির শিলা ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। আর সবচেয়ে যে ভয়াবহ ব্যাপারটা আব্বু দেখেছিলেন, তা হলো কফিনের মধ্যে পড়ে আছে শুধু ওর কঙ্কালটা...! ওর দেহ থেকে মাংস, চামড়া, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কোনো বন্য পশু যেন মহা আক্রোশে উপড়ে নিয়েছে বা খেয়ে ফেলেছে। এরপর আব্বু আর দেরী করেন'নি। তিনি আমার কথায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তানজিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের সব ঘটনাটা জানিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ওই ভাঙা বাড়িটায় অভিযান চালালেন। কিন্তু ফিরে এসে তিনি আমায় শুধু জানালেন, গোটা ব্যাপারটাই আমারই মনের ভুল। ওই চোরাকুঠুরির মধ্যে একটা মড়া কুকুর ছাড়া তাঁরা আর কিছুই দেখেন'নি। কিন্তু লক্ষ্য করেছিলাম, আব্বুর চোখেমুখে এক অপরিসীম ক্লান্তি আর ভয় মাখানো একটা গভীর বিস্ময়ের ছাপ। ......এরপর অনেক বছর পরে যখন আমার আব্বু আর বেঁচে নেই, তখন তাঁর পড়ার ঘরে পাওয়া তাঁর ডায়েরী থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম, সেদিন তাঁরা জঙ্গলের ভেতর ওই বাড়িটায় অভিযান চালিয়ে কি দেখেছিলেন। এখানে হুবহু তাঁরই জবানীতে পুরো ঘটনাটা তুলে ধরছি.... '...ওটা হয়তো কোনোসময় মানুষ ছিল কিন্তু আমার ঘোর সন্দেহ আছে। আবদুল জ্বরের ঘোরে অনবরত যে প্রলাপ বকে গেছে, সেই অনুযায়ী আমি, তানজিয়ার আব্বু আর চাচা এবং বেশ কয়েকজন শক্তসমর্থ গ্রামের লোক লাঠিসোটা, গাঁইতি আর বেলচা নিয়ে ওই ভাঙা বাড়িটায় অভিযান চালাই। প্রত্যেকের হাতে একটা করে জ্বলন্ত লন্ঠন। সুড়ঙ্গপথ ধরে নেমে একটা ছোট ঘরের মতো জায়গায় আসামাত্র যে জিনিসটা আমাদের চোখে পড়ল, আমাদের থেকে কয়েক ফুট দূরেই মাটির ওপর বসে রয়েছে একটা বীভৎস কঙ্কাল। উবু হয়ে মাটির ওপর বসে রয়েছে সেটা, যেন সোজা হয়ে চলতে ওর কষ্ট হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, কঙ্কালটার পাঁজরের ভেতর নতুন হৃদপিন্ড, নতুন গজানো অস্থি, মজ্জা আর মাংস স্তরে স্তরে সাজানো। যেন অন্য কারোর দেহ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করে আনা হয়েছে। ...আমাদের দেখেই কঙ্কালটা আক্রমণের চেষ্টা করল। ফিসফিস করে উঠল ওটা। কিন্তু তার আগেই তারিক আর তানজিয়ার চাচা গাঁইতি দিয়ে ওটাকে আঘাত করতেই যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল ওটা। এরপর আমরা চারদিক থেকে ওটা'কে ঘিরে ফেললাম। গাঁইতি আর বেলচার আঘাতে আঘাতে ওটা'কে অনেকটা পর্যুদস্ত করে ফেললাম। একবার ওটা আমাদের নজর এড়িয়ে পাতালকুঠরি থেকে পালিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আমরা তা হতে দিই নি। ওটা'র ভেতর রয়েছে একটা চুরি করা প্রাণ, ওর দেহের হৃদপিন্ড, মাংস-অস্থি-মজ্জা সবকিছুই চুরি করা। ওটা'কে পালাতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। সারাক্ষণ লন্ঠনের আলোয় ধরে রেখে রেখে আমরা ওটা'র ওপর আক্রমণ চালাতে লাগলাম আর গাঁইতি দিয়ে দিয়ে ওটা'র শরীর থেকে হাড়মাস'গুলো আলাদা করছিলাম। শেষমেশ তানজিয়ার আব্বু গাঁইতি দিয়ে ওটা'র হাতে এক কোপ মারতেই হাত'টা শরীর থেকে খসে পড়ল মাটিতে। খসে পড়তেই কাটা হাতটা মাটিতে পড়ে কিলবিল করে উঠল। ভয়ঙ্কর দৃশ্য। অত:পর এক গ্রামবাসী ওটা'র গর্দানের জায়গায় আঘাত করতেই ওটা'র ধড়মুন্ড আলাদা হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হলো যাবতীয় ফিসফিসানি। আমরা সেইসমস্ত ভয়াবহ জিনিস এবং পাতালকুঠরিতে যা যা ছিল, সব আগুনে পুড়িয়ে দিলাম। তারপর সুড়ঙ্গমুখ ভালো করে বন্ধ করে ফিরে এলাম। ' আব্বুর ডায়েরি এখানেই শেষ। ডায়েরিটা পড়ে সামান্য হলেও মনের শান্তি হয়তো পেয়েছিলাম কিন্তু আজও ভেবে পাই না, ওই জিনিস'টা কি ছিল! মাঝেমাঝে মনে হয়, সত্যি করেই আমি যা দেখেছিলাম তা কি ঠিক দেখেছিলাম? না কি আমার পুরোটাই আমার আতঙ্কগ্রস্ত মনের বিকার? কিন্তু তা যে নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আব্বুর এই ডায়েরি'টা। এই ডায়েরিই প্রমাণ যে ঘটনাটা আমার চোখের বা মনের ভুল ছিল না। ....কিন্তু সেদিন গোধূলি বেলায় গোরস্থানে সমাধিস্তম্ভের আড়ালে দাঁড়িয়ে যে দৃশ্য দেখে ভয়ে আমার প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল, সেটা আমি ভুলি কেমন করে! সেই মড়া বিকেলের আলোয় গভীর কালো ছায়া ছায়া মতো একটা কিছু প্রবল আক্রোশে মেয়েটার সমাধির ওপর আছড়ে আছড়ে পড়ছিল আর অনবরত ফিসফিস করছিল ওটা....! ( সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now