বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাত্তানীর সবুজ অরন্যে
চ্যাপ্টার- ২
বাকি অংশ
আহমদ মুসা ও ড্যানিশ দেবানন্দ দুজনেই উঠে দাঁড়াল।
‘জামাই দেবানন্দ তোমার রূপকথাকে জীবন্ত দেখলে সেটা একটা ভাগ্যের ব্যাপার হবে। গুডলাক দেবানন্দ।’ উৎসাহ দিয়ে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসাদের সাথে অনেকেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। কেউ কাঁচের দেয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, আবার কেউ কেউ সিঁড়ি মুখের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসারা নেমে গেল সিঁড়ির একদম পানির কিনারায়।
তখনও কয়েক গজ দূরে নৌকাটা। কিন্তু ঠিক সিঁড়ি বরাবরই ভেসে আসছে।
নৌকাটি এসে ঠিক ষ্টিলের সিঁড়ির সাথে আটকে গেল। যেন নোঙর করল নৌকাটি।
৬ ইঞ্চির মত লম্বা নৌকাটি। ঠিকই পাতার তৈরি। কাগজের নৌকার মত ডিজাইনেই যেন তৈরি হয়েছে নৌকাটি, দুই ইঞ্চি লম্বা মাস্তুলটি ও নৌকার মাঝখানের পিরামিড আকৃতির পেটের সাথে আটকানো। পতাকাটি দেড় ইঞ্চি বর্গাকৃতির।
ড্যানিশ দেবানন্দ বলল, ‘ছোট ভাই আপনিই নৌকাটি তুলে নিন।’
‘অবশ্যই’। আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে নৌকাটি পানি থেকে তুলে নিল।
নৌকা নিয়ে আহমদ মুসারা তাদের টেবিলে ফিরে এল।
পাশের টেবিল থেকে মিসেস বিবি মাধব, বেগম আবদুল্লাহ, সাহারা বানু ও হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাদের সাথে সাথেই ছুটে এল এ টেবিলে।
সবাই গাদাগাদি করে আহমদ মুসাদের টেবিল ঘিরে বসল। সবার দৃষ্টি ৬ ইঞ্চি নৌকাটির দিকে।
‘মি. দেবানন্দ, সাকোথাই নৌকাটির পতাকায় রক্তের ছোপ দিয়ে ‘এসওএস’ সংকেত দেয়া হয়েছে বুঝলাম। এ সংকেত সাকোথাইদের কোন উত্তরসূরীদের কাছ থেকে এসেছে এটাও বুঝলাম। কিন্তু ‘এসওএস’ সংকেত কেন, কি ঘটনা, কোত্থেকে এল এই সংকেত ইত্যাদি বিষয় না জানলে এই ‘এসওএস’-এর সার্থকতা কি?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘স্যার, যে পাতা দিয়ে এই নৌকা তৈরি হয়েছে, রীতি অনুসারে তার সাথে একটা চিঠি জড়ানো থাকার কথা। তাতেই সব বিস্তারিত লেখা থাকে।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ভাই সাহেব, তাহলে খুলুন নৌকাটা। দেখা যাক চিঠি আছে কিনা, সে রকম চিঠি থাকলে সেটা একটা বড় ঘটনা হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
ড্যানিশ দেবানন্দ নৌকাটি টেনে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে পতাকাটি খুলে দিল নৌকা থেকে।
পাতা ভাঁজ করে তৈরি করা নৌকাটি খুলে ফেলল ড্যানিশ দেবানন্দ। পাতার সাথে এক সাথে ভাঁজ করা বেশ বড় একখন্ড কাগজও বেরিয়ে এল। নিজে না দেখেই কাগজটি ড্যানিশ দেবানন্দ তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
কাগজ খন্ডটি ৬ ইঞ্চি ও ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য-প্রস্থের। কাগজটি ওয়াটার প্রুফ। দুপাশেই লেখা। যে কালিতে লেখা তাও ওয়াটার প্রুফ এবং অমোচনীয়।
কাগজ ও কালি সম্পর্কে এ খবর দিল ড্যানিশ দেবানন্দ। কাগজ খন্ডটি আহমদ মুসার হাতে তুলে দেবার সময় আরও জানাল, ‘আমার মা’র কাছে এই কালি সম্পর্কে শুনেছি। রাজ পরিবারের লোকরা ছাড়া এই কালি তৈরির ফর্মুলা আর কেউ জানে না। মা জানতেন তৈরি করতে, কিন্তু কোনদিন তৈরি করেননি। রাজ পরিবারের কেউ ভিন্ন পরিবারে গেলে এবং কোন জাতি বিষয়ক ডকুমেন্ট ছাড়া এ কালির ব্যবহার নিষিদ্ধ।’
আহমদ মুসা কাগজ খন্ডটি হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে বলল, একপাশে আরবী, অন্যপাশে সাকোথাই বর্ণমালা অর্থাৎ থাইভাষায় লেখা। আমি.....।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। তার কথার মাঝখানে সাজনা সিংহাল বলে উঠল, ‘আরবী কোত্থেকে এল স্যার? নৌকাটি আসতে পারে থাই-বার্মার দিক থেকে।’
‘দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পাত্তানী অঞ্চলের লোকেরা তাদের থাই ভাষা লেখার ক্ষেত্রে থাই ও আরবী দুই বর্ণমালাই ব্যবহার করে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
একটু থামল। মুখ তুলে সবার দিকে তাকাল। বলল, ‘আমি নিশ্চিত কাগজের দুই পাশের লেখার বিষয়বস্তু একই। আরবী ভাষা আমরা দু’একজন ছাড়া কেউ বুঝব না। সুতরাং দেবানন্দ ভাই সাহেব চিঠির থাই ভাষার দিকটা পড়ুন। সে ভাষা আমরা সবাই বুঝব।’
বলে আহমদ মুসা চিঠি তুলে দিল ড্যানিশ দেবানন্দের হাতে।
‘তথাস্তু ছোট ভাই’ বলে চিঠি হাতে তুলে নিল ড্যানিশ দেবানন্দ। পড়তে শুরু করলঃ
‘‘আমি যয়নব যোবায়দা। আমার নিকটতম একজন পূর্ব পুরুষ পাত্তানীর একজন রাজা সুলতান আবদুল কাদির কামালুদ্দিন। পূর্ববর্তী একজন পূর্ব পুরুষ পাত্তানী মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা সুলতাম আহমদ শাহ ওরফে চাউসির বাংগসা। চাউসির বাংগসা ছিলেন থাইল্যান্ডের ‘সাকোথাই’ রাজবংশের যুবরাজ। ১৩৫০ সালের দিকে পাত্তানী অঞ্চলে আসেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান আহমদ শাহ নাম গ্রহণ করেন। সে অঞ্চলে ১৬০০ খৃষ্টাব্দের দিকে মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সুলতান আহমদ শাহ এর উত্তরসূরীদের দ্বারা এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বংশেরই এক সুলতান হলেন, সুলতান আবদুল কাদের কামালুদ্দিন। এই সুলতান আবদুল কাদেরের সংগ্রামী পুত্র টংকু আবদুল কাদেরের নাতনি আমি। আমার ভাই জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিন এবং আমার দাদী নিয়ে আমাদের তিনজনের পরিবার। ১৯০২ সালে পাত্তানী অঞ্চল পুরোপুরি থাই শাসনে চলে যাওয়া এবং আমাদের বংশের অন্যান্য সকল সদস্য হিজরত করে মালয়েশিয়ায় চলে যাবার পর গত শত বছরে আমাদের এই পরিবার পাত্তানী-জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। শাসন ব্যাংককের হাতে থাকলেও লাখ লাখ পাত্তানী মুসলমানদের সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এই পরিবারের উপর এসে বর্তেছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পাত্তানীরা প্রায় স্বাধনি জীবন-যাপন করছিল এবং চীন বংশোদ্ভুত আমাদের সাকোথাই পরিবারের কারণে থাইল্যঅন্ডের চিনা বংশোদ্ভুতদের (যাদের সংখ্যা তিন চতুর্থাংশে) মধ্যে ইসলামের প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। এই সময় বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল। এক রাতে আমাদের অঞ্চলের প্রধান সেনানিবাসের উপর এক নৃশংস হামলা হলো। সংঘর্ষে বেশ কিছু থাই সৈন্য নিহত ও আহত হলো। পরদিন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া আক্রমণকারীদের কিছু জিনিস কুড়িয়ে পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটি বন্দুক, টুপি, ইত্যাদি রয়েছে। বন্দুকের প্রতিটি বাঁটে খোদাই করে ‘আল্লাহ’ শব্দ লেখা। টুপিরও চারধারে এমব্রয়ডারীতে ‘আল্লাহ’ শব্দ আঁকা। গজব নাজিল হলো প্রথমই আমাদের পরিবারের উপর। আমার ভাই গ্রেফতার হলেন। পরে গ্রেফতার হলো আরো অনেক পাত্তানী যুবক। বিশেষ করে আমার ভাইয়ের গ্রেফতারে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হলো গোটা পাত্তানী অঞ্চলে। এই পরিস্থিতিতে পাত্তানীর আরও কয়েকটি থাই সেনাশিবীরে আক্রমণ হলো। পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে সেনাদের আক্রমণের শিকার হলো পাত্তানী গ্রাম। জীবন দেয়া-নেয়ার নৃশংসতায় পাত্তানীর সবুজ অরণ্য আজ রক্তাক্ত। এর ভবিষ্যৎ কি আমি জানি না। তবে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, এসব কিছুর মধ্যে একটা ভয়াবহ ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং সে ষড়যন্ত্রই জয়ী হতে যাচ্ছে। এই সংঘাত সৃষ্টির সাথে আমার ভাই, আমার পরিবার কিংবা পাত্তানীদের পরিচিত কোন সংস্থা-সংগঠন জড়িত নয়। একথা ঠিক আমার দাদা টংকু আবদুল কাদের এক সময় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু তার জীবদ্দশাতেই সর্বসম্মতিক্রমে অস্ত্র পরিত্যাগ করে শান্তিপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আন্দোলন তিনি শুরু করেন। শেষ দিকে তিনি বলতেন, ‘আমাদের দেশের আদি পরিচয় ‘সাকোথাই’ (সুখের এক সুপ্রভাত) এবং ‘মোয়াং থাই’ (‘মুক্ত মানুষের মাটি’)। থাইল্যান্ডকে যদি আমরা এই আসল পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে আমরা পাত্তানীর মুসলমানরা সেখানে সব অধিকারই পেয়ে যাব। আমাদেরকে এই প্রাপ্তির আন্দোলনটাই প্রথম করতে হবে। এজন্যে প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।’ টংকু আবদুল কাদেরের এই কথাগুলো আজ তলিয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে ঘাতকের অস্ত্র। ঘাতকের এই অস্ত্র যেমন থাই সৈন্যদের প্রতি উদ্যত, তেমনি উদ্যত পাত্তানীদের সত্য কথা, সুস্থ চিন্তার বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে এই পাত্তানীরা থাই সৈন্যদের প্রতিশোধেরও শিকার। পাত্তানীরা আজ এই দ্বিমুখী আগুনের অসহায় ইন্ধন। এই আগুনে আমরা পুড়ে শেষ হবার মুখোমুখি। প্রতিটি নতুন দিন; অবস্থার নতুন অবনতি নিয়ে আসছে। এই অবনতি রোধ করে পাত্তানী ও থাই মুসলমানদের বাঁচাবে কে? আল্লাহই পারে। তাঁর কাছেই আমার চিঠি।’’
চিঠি পড়া শেষ করল ড্যানিশ দেবানন্দ।
সবার চোখ ড্যানিশ দেবানন্দের মুখের দিকে। পিন পতন নিরবতার মধ্যে শুনছিল সবাই।
ড্যানিশ দেবানন্দ থামলেও পিনপতন নিরবতা ভাঙল না।
চিঠির কথাগুলো ভাবাচ্ছে সকলকে।
নিরবতা ভেঙে কথা বলল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘আমি দুঃখিত, আমি নৌকাটিকে খেলনা মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, একটা জনগোষ্ঠীর তরফ থেকে মর্মান্তিক এক এসওএস।’
বলে মুহূর্তকাল থেমে আবার শুরু করল, ‘থাইল্যান্ডের পাত্তানী অঞ্চলের ঘটনা জানি। কিন্তু ভেতরের এই ভয়াবহ ঘটনা আমি জানি না। আল্লাহ তাদের রক্ষা করুন।’
‘চিঠিতে চিঠির লেখিকা যয়নব যোবায়দার যে পরিচয় দেয়া হয়েছে, সে দিক থেকে আমি মনে করি চিঠিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চিঠির প্রতিটি কথা সত্য। আর সাকোথাইদের ইতিহাসে এমন চিঠি প্রেরণের দৃষ্টান্ত বেশি নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের চিঠি ব্যক্তিগত বিষয়ে হয়ে থাকে। পরের জন্যে বা জাতীয় বিষয়ে এমন চিঠির ঘটনা আমি শুনিনি। আমি শুনেছি, জাতীয় বিষয়ে লেখা এ ধরনের চিঠি কখনও ব্যর্থ হয় না।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘ড্যানিশকে ধন্যবাদ। সে যে তার বংশের ঢোল পেটাচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। থাইদের প্রাচীন সব ইতিহাসেই এসব কথা আছে। আমি থাই রূপকথাতেও এটা পড়েছি। কিন্তু আমাদের সামনে যে চিঠিটা সেটা রূপকথা নয়।’ বলল সুস্মিতা বালাজি।
‘রূপকথার মত এই চিঠিটির গন্তব্য কি আমাদের এ বাড়ি ধরে নিতে হবে?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘এ ধরনের চিঠির গন্তব্য বাড়ি বা স্থান হয় না, হয় ব্যক্তি এবং সে ব্যক্তি হয় ঈশ্বরের প্রতিনিধি।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘বাড়ির মালিক হিসাবে চিঠির মালিক তাহলে কি আমি হব?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘আমি বলেছি, প্রথা অনুসারে নৌকা প্রথম যার নজরে পড়ে এবং যিনি নৌকা তুলে নেন, তিনি নৌকার মালিক হন।’ বলল ড্যানিশ দেবানন্দ।
‘চিঠি তো ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে লেখা। মানুষ এ চিঠি নিয়ে বা এর মালিক হয়ে কি করবে?’ বলল সাজনা সিংহাল।
‘সাকোথাইদের বিশ্বাস, ঈশ্বরের নামে লেখা চিঠি ঈশ্বরই তার মনোনীত লোকের হাতে পৌছে দেন। সুতরাং মানুষ চিঠির মালিক হন ঈশ্বরের তরফ থেকেই।’ ড্যানিশ দেবানন্দ বলল।
‘ও গড! স্যার তাহলে নৌকা দেখেছেন ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই!’ সাজনা সিংহাল বলল।
‘শুধু এখানে নয়, গোটা আন্দামানে আল্লাহ আর কাকে মনোনীত করতে পারে বল?’ বলল বেগম হাজী আবদুল্লাহ।
জানালার ভেতর দিয়ে আন্দামান সাগরের দিকে তাকিয়েছিল আহমদ মুসা। শূন্য দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া তার দৃষ্টি। ভাবলেশহীন মুখ। চারপাশের কোন কথাই যেন তার কানে প্রবেশ করেনি।
ধীরে ধীরে এক সময় তার মুখ ঘুরে এল জানালা থেকে, আন্দামান সাগরের দিক থেকে।
বেগম হাজী আবদুল্লাহর কথা তখন শেষ হয়েছে। আহমদ মুসা বলে উঠল হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে, ‘জনাব, চিঠিতে উল্লেখিত নাটের গুরু তৃতীয় শক্তিটি কে কে হতে পারে?’
‘বলা মুস্কিল। তবে সেই শক্তি থাই সরকারের বন্ধু নয়, কিন্তু তারা পাত্তানী মুসলমানদের শত্রু, এ বিষয়টি চিঠি থেকে পরিষ্কার।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘কিন্তু এ শক্তির পরিচয় কি হতে পারে?’ আহমদ মুসা বলল। তার ভ্রুকুঞ্চিত।
‘সুনির্দিষ্ট করে বলা মুস্কিল। তবে থাইল্যান্ডেরই কোন মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপ এরা হতে পারে।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মোবাইল বের করল। এই সময় তার চোখ গিয়ে পড়ল হঠাৎ টিভি স্ক্রীনের উপর। টিভি’র সাউন্ড তখন খুব কম করা ছিল। লাইভ টেলিকাষ্ট হচ্ছিল একটা ফুটবল খেলা। টিভি স্ক্রীনের বটমে নিউজের হাইলাইটস দেখাচ্ছিল। তাতে ‘থাইল্যান্ডে রক্তক্ষয়ী সংঘাত’ শিরোনাম দেখল আহমদ মুসা। দেখেই ঘুরে বসল।
আহমদ মুসাকে অনুসরণ করে সবার দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো টিভি স্ক্রীনের ওপর। পড়ল সবাই, ‘পাত্তানী অঞ্চলে পাত্তানী শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে একটা থাই সেনাশিবিরের উত্তরে একটা থাই সেনাশিবিরের উপর আকস্মিক আক্রমণে ১১ জন থাই সেনা নিহত হয়েছে। থাই সৈন্যরা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং হামলাকারীদের অনুসরণ করে পাত্তানীদের একটা বড় গ্রামে পৌছে। সে গ্রামের মাদরাসায় তখন বার্ষিক ধর্মসভা চলছিল। থাই সৈন্যরা সে জমায়েতের উপর আক্রমণ চালায়। সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে ৪৩ জন গ্রামবাসী নিহত হয়। আহতের সংখ্যা কয়েক শত।’
খবরটি পড়ার সাথে সাথে সবার মুখ বিষণ্ণতায় ভরে গেল।
কিন্তু আহমদ মুসার মুখ ভাবলেশহীন, অনেকখানি অন্যমনস্ক যেন সে। এখান থেকেও অন্যকিছু সে দেখছে, ভাবনার ক্ষেত্র যেন তার অন্য কোথাও।
বিষাদ-নিরবতটা ভাঙল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘বৎস আহমদ মুসা, টিভিতে যে কাহিনী আমরা পড়লাম, তাতে যারা থাই সেনা শিবির আক্রমণ করেছিল এবং গ্রামের জনসভার দিকে পালিয়ে গিয়ে সেনা আক্রমণ সেখানে সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তারাই তোমার সেই তৃতীয় পক্ষ। বুঝা যাচ্ছে, এরা এক বিপজ্জনক পক্ষ। বিপজ্জনক এক ফাঁদে আটকেছে থাই মুসলিম ও থাই সরকার দুই পক্ষকেই।’
আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘রাইট স্যার।’ কণ্ঠ আহমদ মুসার নিস্তরঙ্গ ও নিরুত্তাপ।
বলেই আহমদ মুসা মোবাইল তুলে নিল হাতে। মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ পড়তেই দেখল ব্যাটারীর রেড সিন্যাল, ‘রিচার্জের ম্যাক্সিমাম সময় ৬ মাস পার হয়ে গেছে। আনএবল টু এ্যাক্ট।’
আহমদ মুসা হাতের মোবাইল টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, মোবাইল বিদ্রোহ করেছে। ছয় মাস রিচার্জ করা হয়নি। ল্যান্ড টেলিফোনটা দিন আপা।’
টেবিলের ওপাশে সুস্মিতা বালাজীর কাছে একটা ল্যান্ড টেলিফোন ছিল।
সুস্মিতা বালাজী দাঁড়িয়ে টেলিফোনটা আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ছোট ভাই, আমার মোবাইলটিও আইএসডি। দেব আপনাকে?’
অন্য সবাই এক সাথে বলে উঠল, ‘কোথায় টেলিফোন করবেন? মোবাইল নিন।’
‘সউদি আরবে জোসেফাইনের কাছে টেলিফোন করব। ল্যান্ড টেলিফোনটাই আরামদায়ক হবে।’ শান্ত গলায় বলল আহমদ মুসা।
জোসেফাইনের নাম শুনতেই সকলের মুখে সম্ভ্রমপূর্ণ প্রসন্ন ভাব ফুটে উঠল।
এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে সাজনা সিংহালের মুখে।
চট করে উঠে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে পড়ে টেলিফোন সেটের স্পীকার অন করে দিল।
‘এ কি করলে সাজনা? সুষমা স্পীকার অফ করে দাও।’
সুষমা ওদিকে হাত বাড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা সুষমাকে নিষেধ করে বলল, ‘সাজনা তার ম্যাডামের কথা শুনতে চায়। তাকে হতাশ করার দরকার নেই।’
সাজনা সিংহাল উঠে দাঁড়াল। বলল আহমদ মুসার উদ্দেশ্যে, ‘স্যার, নাম আমার হচ্ছে। কিন্তু সকলেই উন্মুখ হয়ে আছে তাঁর কথা শোনার জন্যে। দেখুন, এক এক করে জিজ্ঞাসা করছি। কেউ না বলবে না।’
‘না জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই। তোমার পক্ষে ভোট অনেক। তোমারই জিত হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অনেক ধন্যবাদ স্যার। আমার চেয়ে অন্যেরা আরও খুশি হয়েছেন।’ বলল সাজনা সিংহাল।
টেলিফোন সেট টেনে নিয়ে ডায়াল করল আহমদ মুসা।
সেকেন্ডের মধ্যে ওপার থেকে একটা নরম নারী কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আসসালামু আলাইকুম’ আমি জোসেফাইন।
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কেমন আছ জোসেফাইন?’ বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠ শান্ত, সম্ভ্রমপূর্ণ।
‘আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কোত্থেকে বলছ? ভাল আছ তো? তোমার মোবাইল বন্ধ কেন?’
‘জোসেফাইন, তুমি তিনটা প্রশ্ন করলে। আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি।’
‘স্যরি। তোমার মোবাইল হঠাৎ রেসপন্স না করায় আমি ওরিড ছিলাম। আমি ভাল আছি, আহমদ আবদুল্লাহ ভাল আছে। ওকে, এখন বল।’
‘আলহামদুলিল্লাহ, আহমদ আবদুল্লাহ ভাল আছে। কিন্তু তুমি ভাল নেই। একটা ক্লান্তি তুমি গোপন করছ। সকালেও কথা বলার সময় আমার এটা মনে হয়েছে।’
‘ঠিক ধরেছ। গত ২দিন আমার জ্বর গেছে। গত রাত থেকে আমি ভাল।’
‘জ্বরটা কেন, ডাক্তার কি বলেছেন?’
‘চিন্তা করো না এ নিয়ে। ডাক্তার আয়েশা ও ডাক্তার ফাতিমা দেখেছেন। সিজনাল ধরনের জ্বর বলেছেন।’
‘ওকে জোসেফাইন। আমার মোবাইলে চার্জ ছিল না সেজন্য পাওনি। আমি ভাল আছি। আমি এখনও বিয়ে বাড়িতেই আছি।’
‘ও নাইস। শাহবানু, সুষমারাও নিশ্চয় আছে। নতুন জীবনে ওদের ওয়েলকাম। আল্লাহ ওদের জীবন দীর্ঘ করুন, মঙ্গলময় করুন। আমার সালাম ওদের দিও। দুই বোনকে কিছু প্রেজেন্ট করেছ?’
‘স্যরি। আমি এ দিকটা তো ভাবিইনি।’
‘এটাই স্বাভাবিক। সব ভাবনা এক সাথে হয় না।’
‘এখন বল, তোমার পরমর্শ কি?’
‘দুবোনকে দুটি ‘ইউনিভার্স এ্যাটলাস’ উপহার দাও।’
‘ইউনিভার্স-এ্যাটলাস’। ওটা দিয়ে ওরা কি করবে?
‘কেন বৈচিত্রময় পৃথিবীর দেশ ও মানুষের ভূগোলকে দেখবে, রূপময় আকাশের বিশালতা ও অপরূপতাকে দেখবে এবং দেখবে এর বিজ্ঞানময় স্রষ্টাকে।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। ইউনিভার্স এ্যাটলাসের নতুন অর্থ দিলে তুমি আমাকে। তোমাকে ধন্যবাদ। এই এ্যাটলাস ওদের দেব।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। এখন তোমার কথা বল।’
‘কোন কথা?’
‘যা বলার জন্যে টেলিফোন করেছ?’
‘কি করে নিশ্চিত হলে?’
‘তোমাকে অন্যমনস্ক দেখছি। তোমার মন অন্য কোথাও নিশ্চয়। তুমি আববা-আম্মার কথা জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছ। তুমি নিজে কয়েকদিন আগে খোঁজ নিলে ডাক্তার ফাতিমা আমেরিকা থেকে এসেছে কিনা। কিন্তু আজ তার নাম শুনেও কিছু বললে না। নিশ্চয় তোমার মন কোথাও আটকা পড়ে গেছে।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। তুমি ঠিকই ধরেছ। নতুন একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।’
বলে আহমদ মুসা সমুদ্র ভেংগে আসা পাতার বিস্ময়কর নৌকা, যয়নব যোবায়দার চিঠি এবং চিঠির সব কথা সংক্ষেপে বলল।
থামল আহমদ মুসা।
থামার সাথেই ওপার থেকে জোসেফাইন বলে উঠল, ‘অদৃশ্য তৃতীয় পক্ষটা কে জান? ওরা বন্ধু বেশে শত্রু অতিশয়। ইসলামী বিপ্লবীর পোশাক পরে ওরা এসেছে।’
‘এত তাড়াতাড়ি ওদের তুমি চিনলে কি করে? তুমি কিন্তু আমার ভাবনাকেই প্রকাশ করেছ জোসেফাইন। ধন্যবাদ।’
‘ওয়েলকাম। ওদের চেনার জন্যে সময়ের প্রয়োজন নেই জনাব। সেই টুইন-টাওয়ারের নাইন-ইলেভেন পর বন্ধুবেশী এ ষড়যন্ত্রকারীদের সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে।’
বলে একটা দম নিয়েই জোসেফাইন বলল, ‘তুমি থাইল্যান্ডে যাত্রা করছ কখন?’
‘আমি যাচ্ছিই, এটা কেন ধরে নিলে?’ মুখে হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে জবাব এল না জোসেফাইনের কাছ থেকে। মুহূর্ত কয়েক পরে সে বলল, ‘তুমি যাচ্ছ, আমি এ কথা বলিনি। তোমার যাওয়া উচিত বলেই আমি এ কথা বলেছি। আল্লাহর কাজের কোন আবেদনের সাড়া তিনি তাঁর কোন বান্দার মাধ্যমেই দেন। বোন যয়নব যোবায়দার দরখাস্তের সাড়া আল্লাহ দেবেন তার কোন বান্দাকে পাঠিয়েই। সেই সৌভাগ্যবান মানুষ আমার স্বামী হোন এটাই তো আমি চাইব।’
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। অসংখ্য ধন্যবাদ আল্লাহকে, যিনি তোমাকে দিয়েছেন আমাকে জীবন সঙ্গিনী হিসাবে। থাইল্যান্ডে যাওয়ার ব্যাপারে আমার দ্বিধাগ্রস্ততা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। আবারো ধন্যবাদ জোসেফাইন।’
‘এত ধন্যবাদ তখন প্রয়োজন হয়, যখন পাওয়াটা আশাতীত হয়ে থাকে। তুমি কি ভেবেছিলে জোসেফাইনের পরামর্শ অন্যরকম হতে পারে?’
‘না। আমি ভাবছিলাম অন্য বিষয়। আন্দামান থেকে ফিরে আমাদের আমেরিকা যাওয়ার প্রোগ্রাম আছে। আমেরিকায় তোমার আমন্ত্রণ যে কারণে, সে অনুষ্ঠান তো এ মাসেই। এটাই আমার ভাবনার বিষয় ছিল।’
‘ঠিকই ভেবেছ। এ ব্যাপারে আমার মত হলো, আমেরিকা যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিলও নয়, আবার যাওয়ার সিদ্ধান্তও নয়। ওটা আল্লাহর হাতে থাক। এই মুহূর্তের জন্যে যেটা করণীয়, সেটাই করতে হবে।’ বলল জোসেফাইন শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে।
‘আমিন। সিদ্ধান্ত তুমি দিয়ে দিলে।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে সানন্দ হাসি।
‘এ সৌভাগ্য আমার উপর বর্তালে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু সত্য হলো, আমি তোমার সিদ্ধান্ত পূর্ণ করলাম মাত্র।’
‘এটাই স্বাভাবিক জোসেফাইন। দু’জনে মিলেই তো আমরা পূর্ণাঙ্গ।’ আবেগে ভারী কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার।
‘আলহামদুলিল্লাহ। এটাই আল্লাহর ইচ্ছা।’
একটু থেমে একটা দম নিয়েই আবার বলে উঠল জোসেফাইন, ‘আজকে তোলা আহমদ আবদুল্লাহর একটা ছবি কম্পিউটারে পাঠাচ্ছি। তুমি ওটা থাইল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারবে।’
‘তোমার ছবিও।’
‘পাঠাব না।’
‘কেন?’
‘চোখ বুজে দেখ, ছবিটা দেখতে পাবে। ওর চেয়ে ভাল ছবি কোন ক্যামেরা দিতে পারে না।’
‘ঠিক জোসেফাইন।’
‘ধন্যবাদ।’
‘আর কিছু কথা?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি। কখন তুমি যাত্রা করছ থাইল্যান্ডে?’
‘আন্দামানে থাই ভিসার ব্যবস্থা আছে। যদি আজ ভিসা পেয়ে যাই, তাহলে প্লেনের সিট পেলে আজকেই চলে যাব।’
‘না, শাহবানু, সুষমা বোনদের এইমাত্র বিয়ে হলো। ওদের আনন্দের দিনে নিরানন্দ ডেকে এনো না। একদিন ওয়েট করো। তাছাড়া সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে তো কিছু সময় লাগবে।’
থামলো জোসেফাইন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তার কণ্ঠ শোনা গেল। বলল, ‘তোমার আর কিছু কথা না থাকলে রাখি। ডাক্তার ম্যাডাম যে কোন সময় এসে পড়তে পারেন। তৈরি হতে হবে।’
‘ঠিক আছে জোসেফাইন। আন্দামান ছাড়ার আগে তোমাকে আবার কল করব।’
‘ওয়েলকাম। শাহবানু, সুষমাদের আমার স্নেহ দিও। আর হাজী আংকেল এবং বেগম আবদুল্লাহ, সাহারাবানু ও মিসেস বিবি মাধব খালাম্মাদের আমার কৃতজ্ঞতা জানিও। ওঁরা তোমাকে যে স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েছেন, আমি এখন থেকেও তার উষ্ণতা পাচ্ছি। আল্লাহ ওঁদের সবার মংগল করুন।’
‘ওকে জোসেফাইন। আহমদকে আমার স্নেহ, আম্মাদের আমার সালাম দিও। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আল্লাহ হাফেজ।’
কথা শেষ করে আহমদ মুসা চেয়ারে হেলান দিল।
ঘরে পিনপতন নিরবতা।
নির্বাক সবাই।
সবার চোখে বিমর্ষ-বেদনার ছাপ।
আহমদ মুসাও কি দিয়ে কথা শুরু করবে তা ভেবে পেল না।
পল পল করে সময় বয়ে যাচ্ছে।
মুখ তুলল সাজনা সিংহাল। তার চোখ অশ্রুতে টল টল করছে বলল, ‘স্যার আপনি আজকেই যান। একদিন আরও থাকা মানে স্মৃতির আরও বেড়ে যাওয়া। মানুষের কষ্ট তাতে বাড়বে। আপনার মনে কিছুরই দাগ পড়ে না। কিন্তু সবার মন এমন পাথর নয়।’ থামল সাজনা সিংহাল।
তার দুগন্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
সবার চোখই সিক্ত। মাথা নিচু।
চোখ মুছল সুষমা রাও। সে মুখ তুলল। বলল, ‘ভাইয়া সাজনা একদমই ছেলে মানুষ। ওর মন একেবারে সাদা। দুঃখের কোন কাল দাগ সেখানে নেই। কিন্তু ভাইয়া আমরা সবাই মনে করেছিলাম, আপনাকে কিছুদিন আমরা পাব। কিছু জানব, শিখব আমরা। এতদিন সংঘাত-সংকটের মধ্যে দিন গেছে। আপনি জানেন না ভাইয়া, আমার আম্মা আজ বাদ ফজর সুস্মিতা বালাজী আপাকে সাথে নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আপনাকে সারপ্রাইজ দেবেন বলে কিছু বলেননি।’
এক ঝলক আনন্দে আহমদ মুসার মুখ ভরে গেল। সংগে সংগেই উঠে দাঁড়িয়ে মিসেস বিবি মাধবকে উদ্দেশ্য করে আহমদ মুসা বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ওয়েলকাম, খোশ আমদেদ খালাম্মা।’
‘আলহামদুলিস্নাহ। ধন্যবাদ বেটা। কিন্তু বেটা যে আলো তুমি এখানে জ্বেলেছ, তা একদমই ক্ষুদ্র। ভয় করছি, তুমি চলে গেলে অন্ধকারে না সব ছেয়ে যায় আবার।’ বলল সুষমার মা মিসেস বিবি মাধব।
‘ভয় নেই খালাম্মা। এ আলোর মালিক আল্লাহ। তিনিই একে আরও প্রজ্জলিত করবেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এই তো শুনলাম, আল্লাহ তার ইচ্ছা তার বান্দাকে দিয়ে্ই বাস্তবায়ন করেন। তুমি এমন এক দেবদূত বেটা। তুমি এভাবে চলে যেয়ো না। সাজনা একটু বেশি বলে ফেলেছে। আকস্মিক আঘাতটা তাকে বেশি আহত করেছে বলেই হয়ত। কিন্তু আমরা সবাই তো তার মত করেই ভাবছি।’ মিসেস বিবি মাধব বলল।
সুস্মিতা বালাজী এবং ড্যানিশ দেবানন্দ পাথরের মত বসে আছে।
বিবি মাধব থামলে মুখ খুলে ধীরে ধীরে বলল, ‘নৌকাটাকে আমি মজা হিসেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু মজা যে ছোট ভাই আহমদ মুসার জন্যে ‘সমর’ হয়ে দাঁড়াবে, কল্পনাও করতে পারিনি। যাক ছোট ভাই, বিষয়টা কিন্তু ঐ রকম ইমারজেন্সী নয় যে আপনাকে আজ কিংবা কালই চলে যেতে হবে!’
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘ভাইসাহেব, মেয়েটা লিখেছে প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। টেলিভিশন নিউজেই দেখলেন এবং ১১ জন সৈনিক ও ৪৩ জন গ্রামবাসীর নিহত হবার খবর পড়লেন। এই ঘটনা নিশ্চয় আরও ঘটনার জন্ম দেবে। এটা নিশ্চয়ই ইমারজেন্সী।’ আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ শাহ আলমগীর। তাকে থামিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘শাহ সাহেব শোন। তুমি ও দেবানন্দ ভাই সাহেব জনাব হাজী আংকলের পরামর্শ নিয়ে গভর্নর কিংবা সিবিআই যাকে বলে পার কাল ১২ টার মধ্যে আমি থাইল্যান্ডের ভিসা চাই। আজই বা কাল বিকালের জন্যে পোর্ট ব্লেয়ার এবং কোলকাতা ব্যাংকক প্লেনের টিকিট করে রাখ।’
আহমদ শাহ আলমগীর আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল।
আবার আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিল।
আহমদ শাহ আলমগীরের চোখে নতুন অশ্রুর বেগ দেখা দিল।
ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সুষমা রাও। সে মুখ তুলল কিছু বলার জন্যে।
আহমদ মুসা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘না, সুষমা তুমি যা বলবে তা আমি জানি।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই সাজনা সিংহাল বলে উঠল, ‘স্যার, গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমি আপনাকে পরম গণতন্ত্রী ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখছি আপনি নির্দয়ভাবে মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারেন।’
আহমদ মুসা মিষ্টি হাসল। বলল, ‘মানুষের নয় ভাই-বোনদের মুখ বন্ধ করতে পারি। শাসন করার জন্যে ভাই-বোন তো পাইনি। তাই এমন সুযোগ পেলে ছাড়ি না।’
‘আমি বুঝি তাহলে মানুষ?’ ম্লান কণ্ঠে বলল সাজনা সিংহাল।
শব্দ করে হেসে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমাকে মুখ বন্ধ করতে বললে করতে না। এমন ভাই-বোনও আছে যারা বড়দের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়।’
‘এ বেয়াদবদের আপনি খারাপ চোখে দেখেন তাহলে।’ সাজনা সিংহাল বলল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘উল্টো। ওরা বেশি অধিকার দাবী করে এবং পায়ও।’
‘ও গড’ বলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল সাজনা সিংহাল।
পাশ থেকে সুস্মিতা বালাজী সাজনা সিংহালের পিঠে একটা কিল দিয়ে বলল, ‘এবার খুশি তো!’
মুখ ঢেকে রাখা আঙুলের ফাঁক দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে সাজনা সিংহালের। সেদিকে নজর পড়তেই ভ্রুকুচকালো সুস্মিতা বালাজী। কিন্তু মুখ খুলল না।
আহমদ মুসার দৃষ্টি আবার ফিরে গেল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘জনাব আমি ভেবেছিলাম আন্দামানের কাজ শেষ হলে আপনাদের সবাইকে নিয়ে ওমরা করতে সউদি আরবে নিয়ে যাব। কিন্তু আমি পারছি না। আপনি দয়া করে এ দায়িত্ব নিন। আমি সউদি সরকারকে এবং দিল্লীস্থ সউদি রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলেছি। দুচারদিনের মধ্যে সরকারি আমন্ত্রণ এসে যাবে। আপনারা মক্কা, মদিনা ও তায়েফ সফর করবেন।’
ঘর জুড়ে আনন্দের একটা গুঞ্জন উঠল।
গুঞ্জন ছাপিয়ে মিসেস বিবি মাধবের কণ্ঠ শ্রুত হলো। বলল, ‘এই দাওয়াত কারা পাবে?’
একটা দ্বিধায় পড়ল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে কথা বলতে হলো না। হাজী আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘এখানে হাজির যারা তারা সবাই দাওয়াত পাবে, আহমদ মুসার কথার ধরনে এটাই আমি বুঝেছি।’
‘তাহলে তো এখানের সবাই দাওয়াত পাচ্ছে।’ হাসি মুখে বলল মিসেস বিবি মাধব।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। তাকাল এবার সুরূপা সিংহালের দিকে। পরে দৃষ্টি ফিরিয়ে বিবি মাধবের দিকে চেয়ে বলল, ‘সুরূপা বোনরাও কি..........।’
কথা শেষ করতে হলো না আহমদ মুসার। তার কথার মাঝখানেই বিবি মাধব বলল, ‘হ্যাঁ বেটা সুরূপা, সাজনারা আমার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ সুস্মিতা আমাকে এদিকে এগিয়ে দিয়েছিল। পরে সুরূপাদের দেখেই আমি ফাইনালী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।’
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। উঠে দাঁড়াল সে। বলল, ‘ওয়েলকাম সুরূপা বোন, দুলাভাই এবং সাজনা।’
বসল আহমদ মুসা। বসতে বসতে বলল, ‘সাজনা এত বড় কথা তুমি আমার কাছ থেকে লুকাতে পারলে?’
চোখ মুছে ফেলেছে সাজনা সিংহাল। বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছা এ রকমই ছিল। আপনার কাছেই শুনেছিলাম, যেদিন যা ঘটবে, সেটা আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট।’
‘ঠিকই বলেছ। ধন্যবাদ সাজনা।’ বলল আহমদ মুসা।
মুখ খুলেছিল সাজনা কিছু বলার জন্যে। কিন্তু তার আগেই সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘ছোট ভাই, মধুরতম একটা স্বপ্ন আপনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। মক্কায় যাওয়া, আল্লাহর ঘর কাবা দর্শন খুব বড় একটা স্বপ্ন। সেখানে যাবার পরই শুধু উপলব্ধি করতে পারব এ স্বপ্নের স্বরূপ। কিন্তু মদীনায় যাব, ভাবী জোসেফাইনকে দেখতে পাব, এই আনন্দ এখনই পাগল করে তুলছে মনকে।’
সাজনা সিংহাল, সুষমা ও শাহবানু একই সাথে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ঠিকই বলেছেন আপা। মনে হচ্ছে এখনই যদি যাবার ব্যবস্থা হতো!’
‘দেখ এমনভাবে বলে তোমরা ওমরার পূণ্য নষ্ট করো না। আল্লাহ নিয়ত অনুসারে ফল দেন। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে যদি ওমরা পালন কর তাহলে এর পূণ্য পাবে। আর যদি সৌদি আরব সফর হয় জোসেফাইনকে দেখার জন্য তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে সেই পূণ্য মিলবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা বলে উঠল মিসেস বিবি মাধব। বলল, ‘ওদের কথা আমি বলি বেটা। আসলে নিয়ত ওদের ঠিক আছে। বৌমা জোসেফাইনকে দেখার বিষয়টা বাড়তি নিয়ত। বলতে পার এটা বোনাস আনন্দ।’
‘ধন্যবাদ খালাম্মা।’ বলে বিবি মাধবের দিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘আমি এখন উঠতে চাই চাচাজান। বেশ কিছু কাজ আছে।’
সংগে সংগেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল আহমদ শাহ আলমগীরকে লক্ষ্য করে, ‘শাহ ভাইটি এ বিশেষ দিনে তোমার আর বেরিয়ে কাজ নেই। আমি তো বেরুচ্ছিই। আমি থাই ইমিগ্রেশন হয়েই তাহলে যাই।’
তড়াক করে উঠে দাঁড়াল আহমদ শাহ আলমগীর। বলল, ‘ভাইয়া বিশেষ দিন কোন বাধা নয় এটা আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমি কারও কোনই কাজে আসিনি ভাইয়া। আপনার এ নির্দেশটুকু পালনের সুযোগ আমাকে দিন। আপনি চলে যাবেন, নির্দেশ পালনের সুযোগ তো আর পাব না।’ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল আহমদ শাহ আলমগীরের কণ্ঠ।
আহমদ মুসা কয়েকধাপ এগিয়ে আহমদ শাহ আলমগীরের কাঁধে হাত রেখে হাসি মুখে বলল, ‘ঠিক আছে তুমিই যাবে ভাই।’
ড্যানিশ দেবানন্দ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘অরিজিন্যাল নির্দেশনামায় ওর সাথে আমার নামও ছিল ছোট ভাই।’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমার কথা সংশোধন করছি। ঠিক আছে আপনারা যাবেন।’
তারিক মুসা মোপলা বিষন্ন মুখে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার আমি বাদ পড়েছি।’
আহমদ মুসা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলল, ‘তুমি আমার শিষ্য। আমার সাথে তুমি বেরুবে। আমি গাড়ির কাছে যাচ্ছি। তুমি তৈরি হয়ে এসো।’
আহমদ মুসা সবাইকে সালাম দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
হাজী আবদুল্লাহও উঠে দাঁড়াল। বলল, দেবানন্দ, শাহ আলমগীর তোমরা এসো। কাগজপত্র দেখি। তোমাদের এখনই বেরুনো উচিত। প্রয়োজন হলে গভর্নরকে বলে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। ভিসা আজ চাই-ই। ভিসা না হলেও আহমদ মুসা কিন্তু কালকেই চলে যাবে। সে সময়সূচী ঠিক রাখে। অবস্থা অনুকূল না হলে প্রতিকূলতার মধ্যেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’
হাজী আবদুল্লাহর সাথে ড্যানিশ দেবানন্দ ও আহমদ শাহ আলমগীর বেরিয়ে গেল।
ঘরে তখন শুধু মেয়েরাই।
কেউ কথা বলছে না।
পাশের আন্দামান সাগরের মৌনতা যেন ঘরটাকেও এসে গ্রাস করেছে।
কারও মুখ নিচু। কারও শূন্য দৃষ্টি আন্দামান সাগরের দিকে।
সুস্মিতা বালাজী এক সময় সাগরের দিক থেকে শূন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল। চোখ বুজে ধীরে ধীরে বলল, ‘আহমদ মুসার আন্দামান জীবনের পাতা উল্টে যাচ্ছে। কেউ একে রোধ করতে পারবে না।’
‘তারপর আন্দামান কি ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাবে? এ হয় না। এটা নিষ্ঠুরতা।’ বলল সাজনা সিংহাল। তার কথা চিৎকারের মত শুনাল।
সুস্মিতা বালাজী তার একটা হাত সাজনা সিংহালের কাঁধে রাখল সান্তনার পরশ হিসাবে। বলল আবার ধীরে ধীরে, এটাই হয় সাজনা। এটাই ওঁর জীবন। মায়ার শৃংখলে বাঁধা পড়লে তিনি তো এগোতে পারতেন না। দেখ না জোসেফাইন ভাবী তাঁকে শৃংখলে বেঁধেছেন, কিন্তু ধরে রাখেননি।’
সাজনা সিংহাল কোন উত্তর দিল না। তার একটি হাত গিয়ে জড়িয়ে ধরল সুস্মিতা বালাজীর হাতকে।
অন্যকারও মুখে কোন কথা নেই।
দেয়ালের ঘড়িতে সময়ের কাঁটা এগিয়ে চলেছে টিক টিক করে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now