বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
রাত তখন গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা। কিন্তু মিমের বুকের ভেতরটা যেন ঝড়ো সমুদ্র। বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে জানালার পাশে বসে আছে সে। এক বছরের ছোট্ট প্রাণটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, মায়ের সমস্ত কষ্টের মাঝেও তার ঘুমের মুখটা নির্ভার। অথচ মিমের চোখে ঘুম নেই। মনে পড়ে যায় কত কথা, কত অপমান, কত কষ্টের টুকরো—যেন ভাঙা আয়নার মতো ছড়িয়ে আছে জীবনের পথে পথে।
মাত্র দুই মাসের সংসার। এত ছোট সময়েও কত দুঃস্বপ্ন জমে গেলো মনে! এক্স-হাসবেন্ড ছিলো ডিভোর্সি, কিন্তু সে জানত না, এই মানুষটা এখনও আগের বউয়ের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি। বিয়ের একমাস না যেতেই মিম প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে, আর তখনই শুরু হয় আসল ঝড়। স্বামী নতুন বউকে পাশে না রেখে আগের সংসারের মেয়েটার সাথেই পরকীয়া জুড়ে বসে। মিমকে দেওয়া হয়নি কোনো সম্মান, কোনো আদর। অবশেষে চার দিনের মাথায় এক বছরের সংসার ভেঙে গেলো, মিম দাঁড়িয়ে রইল দোরগোড়ায় বাচ্চা কোলে নিয়ে।
“আমাকে কেউ ভালোবাসবে না”—এক্স-হাসবেন্ডের এই কথাটা মিমের কানে এখনও বাজে। যেন একটা অভিশাপের মতো। সমাজও যেন সেই অভিশাপকে আরও বড় করে তুলছে। সবাই বলে, “ছোট বাচ্চা নিয়ে কেউ তোকে বিয়ে করবে না।” অথচ তার বুকের গভীরে এখনো একটা স্বপ্ন বেঁচে আছে—কেউ তাকে ভালোবাসবে, যত্ন করবে, সম্মান দেবে।
এই ভরসার আলোয় কিছুদিন আগে আবার এক অবিবাহিত ছেলের প্রস্তাব এলো। সে বলল, “আমি তোমাকেই বিয়ে করতে চাই। তোমার বাচ্চাকেও নিজের সন্তান ভেবে মানুষ করব।” মিম প্রথমে বিশ্বাস করেনি, ভেবেছিলো হয়তো মজা করছে। কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা। কথায় কথায় মিষ্টি মিষ্টি স্বপ্ন আঁকতে শুরু করল। মিমের বুকের ভেতরেও একটু করে আলো জ্বলল। মনে হলো, হয়তো জীবনের সব কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু আলোটা বেশিদিন টিকল না। শুক্রবার আসার কথা থাকলেও ছেলে হঠাৎ জানালো, ভাই অসুস্থ। দুদিন কোনো খোঁজখবর নেই, হঠাৎ করে রঙ নাম্বার বলে ফোন কেটে দিল। শেষে আবারও অজুহাত দেখিয়ে বলল—“আমার পরিবার রাজি নয়।” সবকিছু ভেঙে গেলো। আবারও মিম মনে করল, তাকে নিয়ে সবাই শুধু খেলা করে।
অথচ মিম ভুল করেনি। বাচ্চা ফেলার শর্ত দেওয়া হয়েছিলো তাকে, কিন্তু সে শোনেনি। বুকের ভেতর থাকা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই সন্তানই কি তার জীবনের সব বন্ধন হয়ে দাঁড়ালো?
এক রাতে, যখন এই সব দুঃখে তার বুক ভেঙে আসছিলো, তখন হঠাৎ বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। মিম তাকে কোলে তুলে নিলো। ছোট্ট দুটো হাত মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। সেই উষ্ণ স্পর্শে যেন মিমের বুকের ভেতরে জমে থাকা পাহাড় গলে গেল। মনে হলো, “না, আমি একা নই। আমি কারো মা। আমার সন্তানের চোখেই আমার সমস্ত পৃথিবী।”
দিন কেটে যায়। মিম ধীরে ধীরে নিজের ভেতর শক্ত হয়ে উঠতে থাকে। ছোট্ট বাচ্চার মুখে হাসি ফুটানোর জন্য প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করে।
একদিন পরিচিত এক আপুর বাসায় গিয়ে দেখা হলো রাফি নামে এক তরুণের সাথে। রাফি চুপচাপ, মিতভাষী, তবে তার চোখে ছিলো আন্তরিকতার দীপ্তি। কয়েকবার দেখা হওয়ার পর কথায় কথায় মিম তার জীবনের গল্প বলল। প্রথমে ভাবছিলো, রাফিও হয়তো অন্যদের মতো মুখ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু রাফি শান্ত গলায় শুধু বলল—
“আপনি তো ভীষণ সাহসী। আপনি যদি তখন বাচ্চাকে না রাখতেন, আজ আপনার জীবনটা শূন্য হয়ে যেতো। আমি ছোটবেলা থেকেই একা বড় হয়েছি। মা-বাবা নেই। জানি সংসার মানে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, সংসার মানে একটা আশ্রয়, একটা ভালোবাসা। আপনি যদি রাজি থাকেন, আমি চাই আমরা দুজনে মিলে নতুন করে একটা ঘর গড়ি।”
মিম প্রথমে অবিশ্বাস করল। এই কথা সে আগেও শুনেছে, আবার প্রতারিত হয়েছে। কিন্তু রাফির আচরণ আলাদা। সে কখনো তাড়াহুড়া করেনি, কখনো মিষ্টি কথার জালে আবদ্ধ করতে চায়নি। বরং প্রতিদিন খোঁজখবর নিয়েছে, বাচ্চার ওষুধ কিনে দিয়েছে, কখনো খেলনা এনেছে। ধীরে ধীরে মিমের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করল।
রাফি মিমের ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলত,
“এটাই আমার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য, আমি একসাথে স্ত্রী আর সন্তান দুজনকেই পাচ্ছি।”
সময় এগোতে লাগল। রাফি তার বড় ভাইয়ের সাথেও মিমকে পরিচয় করিয়ে দিল। প্রথমে কিছু দ্বিধা থাকলেও পরে ভাই-ভাবিও মেনে নিলো।
অবশেষে একদিন মিম দেখল, তার জীবনের অন্ধকার সত্যিই কেটে গেছে। নতুন সাজে আবারও ঘর বাঁধল সে। এবার সেই ঘরে ছিলো বিশ্বাস, সম্মান আর নিখাদ ভালোবাসা।
বিয়ের দিন রাফি মিমের হাত ধরে বলল—
“আজ থেকে তোমার কোনো অভাব থাকবে না। তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি আমার সাহস। তোমার বাচ্চা আমারও বাচ্চা।”
মিমের চোখ ভিজে গেল। মনে হলো, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সে সত্যিই শান্তির ঠিকানা পেলো।
হ্যাঁ, জীবন তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, অনেক প্রতারণা দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিম প্রমাণ করল—এক বাচ্চার মা হওয়া কোনো অভিশাপ নয়, বরং মাতৃত্বই তার শক্তি। আর যে মানুষ সত্যিকার ভালোবাসে, সে সব শর্ত মেনে নেয়, অতীত মেনে নেয়।
আজ মিম জানে,
“ভালোবাসা মানে কাউকে নতুন করে বাঁচতে শেখানো।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now