বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অসহায় মেয়ের গল্প (প্ররোচণা)

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X সাল টা ১৯৯১ ... প্রতিমার সাথে যখন তমালের প্রথম দেখা হয়েছিল.... প্রতিমার তখন ক্লাস টেন ... ১৭ বছরের মিষ্টি মুখের একটা মেয়ে... কৈশর থেকে যৌবনে যাবার এক ধাপ আগে ছিল ও .... এর মধ্যে স্কুলে যাওয়া আসার পথে ছ সাত টা প্রেম পত্র পাওয়া , পড়ার ব্যাচ এ সমবয়সী ছেলেদের কাছ থেকে 'তোমায় খুব ভালো লাগে', 'তোমাকে খুব ভালবাসি' এই সব চেনা পরিচিত লাইন শোনা ওর অভ্যেস এ দাঁড়িয়েছে .... কিন্তু কাউকেই কখনো আলাদা ভাবে চোখে লাগেনি ওর !... কিন্তু হঠাত দমকা হাওয়ার মতন তমাল যেদিন ওদের বাড়িতে এলো , পেইং গেস্ট হিসেবে... জলপাইগুড়ির ছেলে , কলকাতায় আসা চাকরিসুত্রে...... সেইদিন যেন ওর মধ্যে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল ... তমালকে দেখতে যে সিনেমার হিরোদের মতন তা ঠিক না !, চশমা পরা , উস্ক খুস্ক চুল , শ্যামবর্ণ চেহারা , তবে এর মাঝে মুখটা বেশ সরল .. বয়স ২৫ হলেও , মুখটার মধ্যে এখনো বাচ্চা বাচ্চা ভাব ... একটা অদ্ভুত ভালো লাগা ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিমার মনে ... ওর ঘরে চা দিতে যাওয়া, জলখাবার পৌঁছে দেয়া , জলের জক ভরে দিয়ে যাওয়া এই সব কাজগুলো করতে বেশ ভালো লাগত ওর ... আসলে এই কাজের সুত্র ধরেই তো তমালের সাথে টুকরো কথা, টুকরো আলাপ জমিয়ে নিত প্রতিমা .... কিন্তু ও খেয়াল করেছে, ভালো লাগা টা যে একতরফা তা না !... তমাল যখন ওর সাথে কথা বলে , সব সময় ওর চোখে যেন একটা মুগ্ধ দৃষ্টি থাকে ... সেদিন যখন ও পটলের দোর্মা রান্না করেছিল , তমাল তো চেয়ে চেয়ে খেয়েছিল ... আকারে ইঙ্গিতে ও অনেকবার প্রতিমাকে বোঝায় যে প্রতিমা ওর চোখে আলাদা ........ সেইদিন যখন পড়ার ব্যাচ থেকে আসতে দেরী হয়ে গিয়েছিল, ফাঁকা রাস্তা দিয়ে প্রতিমা একা একা হেঁটে যাচ্ছিল, তমাল হঠাত মাঝ রাস্তায় বাইক নিয়ে হাজির ... খুব রাগারাগি করেছিল .. একা একা এই ভাবে ফিরলে যদি কোনো বিপদ হত ! এমনকি কথায় কথায় বলেই ফেলল সেদিন , "তোমাকে নিয়ে আমার চিন্তা হয় সেটা বোঝো না !...''...তারপর দ্বায়িত্ব নিয়ে বাড়ি পৌছে দিয়েছিল... সেইদিন থেকেই প্রতিমার মনেও প্রেমের ছোঁয়া লেগেছিল...ভালো লাগা টা ভালবাসা হতে বেশি দিন লাগলো না !... প্রেম পত্র দেয়া নেয়া, স্কুল পালিয়ে পার্ক এ ,গঙ্গার ধারে সময় কাটানো সব ই চলছিল ওদের ... কিন্তু সেই সন্ধ্যে গঙ্গার ধারে তমাল একটা ভয়ন্কর কথা বলল ওকে , তমালের কুষ্টি তে আছে না কি ২৫ বছরের পর বিয়ে করলে ওর মৃত্যুযোগ নিশ্চিত .... তাই যদি ওদের বিয়ে করতে হয় এই বছরই করতে হবে !.. প্রতিমার হঠাত কথাটা শুনে যেন একটা ধাক্কা লাগলো ! এই বছর কি করে বিয়ে করবে ! ওর তো ১৭ বছর বয়স, মাধ্যমিক ও হয়নি.. আর এই প্রেমটার ব্যাপারে যদি ভুল করেও বাবা মা জেনে ফেলে তাহলে তমাল কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেবে ... সারাটা রাত ওর ঘুম হলো না !... তমালের মৃত্যুযোগ এর কথা ভাবলেই ওর যেন সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছিল ... তমাল কে ছাড়া এই জীবনে ও কিছুতেই বাঁচতে পারবে না !.. সেই রাত টা না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল ও , তারপরের দিন ভোর পাঁচটায় তমালের দরজার সামনে না এসে পারল না !.. এই সমষ্যার কি সমাধান হতে পারে সেটা একমাত্র তমালই বলতে পারে .... তমাল একটা সমাধান দিল ঠিকই , "চল পালিয়ে যাই , এখান থেকে সোজা জলপাইগুরি যাব, ওখানে আমার বাড়ির লোকেরা কখনই আপত্তি করবে না.... মন্দিরে বিয়ে করে নেব, তারপর আমার ফ্যামিলি কে নিয়ে কলকাতা আসবো,... একবার বিয়ে হয়ে গেলে তোমার মা বাবা কিছুতেই আর না বলতে পারবে না আমাদের সম্পর্কে !" প্রতিমা কথাটা শুনে দু মিনিট চুপ ছিল , কি উত্তর দেবে কিছুই বুঝতে পারছিল না !, তারপর কিছু কথা সাজিয়ে জিগেশ করলো, "কিন্তু আমার পড়াশোনা ? আমার তো এই বছর মাধ্যমিক !.." "তাতে কি হয়েছে ? তোমার পরীক্ষা তো তিন মাসে বাদে ... আর আমাদের বিয়ের পর ও তুমি পড়াশোনা করবে, কোনো অসুবিধা হবে না, আর আমি তো কলকাতায়ই চাকরি করি ... আমরা এখানেই থাকব ..."............ প্রতিমা আর না বলতে পারল না ... সত্যি একবার বিয়ে হলে মা বাবা কিছুতেই আর না করতে পারবে না.. প্রথমে হয়ত রেগে যাবে, তারপর সব আগের মতন হয়ে যাবে ... আর তমাল তো ভালো ছেলে ... মা বাবার মন গলাতে ওর বেশি দিন সময় লাগবে না .... তমালকে এই কটা দিনেই ও এত ভালোবেসে ফেলেছে যে ওকে ছাড়া একটা জীবন প্রতিমা কল্পনাও করতে পারে না !... এই সব ভেবেই পরের দিন ভোর চারটের সময় তমালের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ..... টাক্সি নিয়ে হাওড়া স্টেসন, তারপর ট্রেন এ উঠে একটা অজানা পথে পারি.... কিন্তু প্রতিমার একটুও ভয় লাগছিল না সেই মুহুর্তে ... তমাল আছে তো ওর সাথে ... ওর হাত ধরেই তো কাটবে সারাটা জীবন .. এই সব ভাবতে ভাবতেই চোখে ঘুম এসেছিল... চলন্ত ট্রেন এর মধ্যে নিজের সব থেকে কাছের মানুষটার কোলে মাথা রেখে একটা শান্তির ঘুম .... সপ্নে দেখছিল ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান, তমাল ওকে সিঁদুরদান করছে... গা ভর্তি গয়না , আর লাল বেনারসিতে সেজেছে প্রতিমা ... মা বাবার মুখে আনন্দের হাসি .... কিন্তু হঠাত একটা ধাক্কায় সপ্নটা ভেঙ্গে গেল ... ট্রেনটা থেমেছে একটা স্টেসন এ.. তমাল ওকে বলে উঠলো, "ওঠো, নামতে হবে এখানে .. তারাতারি ..".... এত তারাতারি কি করে জলপাইগুরি পৌঁছে গেল ! ১৪ ঘন্টা লাগে তো ! তারপর স্টেসন এ নেমে ও অবাক, স্টেসনটার নাম 'বনগা'..... এখানে কেন এলো ওরা ! কিছুই বুঝতে পারছিল না প্রতিমা , তমালের দিকে অবাক চোখে তাকাতেই ও চমকে গেল, হঠাত তমালের চোখ দুটো কেমন যেন অচেনা লাগলো, নোংরা লোভী দুটো চোখ ... কিছু বলার আগেই পাঁচ জন গুন্ডা মতন লোক ওদের কে ঘিরে ফেলল, তমাল হেসে তাদের কে বলল, "নে , ময়না নিয়ে এসেছি .. অনেকদিন অনেক নেকামি করতে হয়েছে ভাই একে তুলতে ... টাকাটা যেন ঠিক মতন পাই এবার .."....ওই গুন্ডাগুলোর মধ্যে তখন একজন বলে উঠলো, "টাকা ঠিক সময় পৌঁছে যাবে তোমার কাছে ..কোনো চিন্তা নেই ভাই .."...... কথাটা শুনে প্রতিমা বুঝলো যে ওর সাথে কি হয়েছে !, তমাল ওকে বিক্রি করার জন্য এখানে নিয়ে এসেছে !.. স্টেসন এ তো ভির, ও যদি চেঁচায় তাহলে এখান থেকে বাঁচতে পারবে , এই ভেবে চিত্কার করতে যাবে তখনি ওর পিঠে যেন কিছু একটা ঠেকলো, ওই লোকগুলোর মধ্যে একজন ওর কানের কাছে এসে বলল, "চিত্কার করার একবারও চেষ্টা করলে একটা গুলিতে এখুনি শেষ হয়ে যাবি, তোর পিঠে ঠেকানো বন্দুকটা চালাতে এক সেকেন্ড ও লাগবে না ..."............ হার হিম হয়ে এলো প্রতিমার .. তমাল যদিও ততক্ষণ এ বেপাত্তা ... এরপর প্রতিমাকে একটা এম্বাসেটার এ বসিয়ে একটা বাড়িতে নিয়ে আসা হলো... অনেক মেয়েরা ছিল ওই বাড়িতে, সুন্দর সেজে , ঠোটে লাল রঙের লিপস্টিক , মাথায় ফুলের মালা .... প্রতিমাকে ওই বাড়ির একটা ঘরে কিছুক্ষণ আটকে রাখা হলো........ গলা ফাটিয়ে কান্না আসছিল প্রতিমার , অনেক চেচিয়েছিল ওই বন্ধ ঘরের দরজার ভেতরে ...... কিন্তু কেউ শোনেনি , কেউ আসেনি .... তারপর মাঝরাতে সেই দরজা খুলল, কিছু লোক এসে ওকে নিয়ে গেল সাজঘরে... ঘাগরা পরানো হলো, চুলে মালা লাগিয়ে দেয়া হলো, গন্ধ অলা সেন্ট মাখিয়ে দেয়া হলো... তারপর একটা কোঠাবাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হলো বাবুদের সামনে, একটা বাবু বলল ৫০ হাজার, একটা বাবু বলল ৭০ হাজার , অবশেষে যেই বাবু এক লাখ দাম দিল , প্রতিমা তার হাতের পুতুল হয়ে গেল ... সেই রাতটা কাটল সেই বাবুর বিছানায় ... আঁচরে কামড়ে রক্তারক্তি তে রাত শেষ হলো, ভোরের আলো চোখে লাগতে প্রতিমা ভালো করে ওই ঘুমন্ত বাবুর দিকে তাকালো, ওর জেঠুমনির বয়সের লোকটা ! .... প্রতিমা ওর মেয়ের বয়সী ! তা ও রেহাই দিল না !............ যাই হোক, সেই রাত গুলো ওর জীবনে বার বার ফিরে এলো, এখন বর্তমান ঠিকানা বাংলাদেশ ... সেই বাবু ২ লাখ টাকায় প্রতিমাকে নতুন মালিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে ......... এখন মাঝে মাঝে মনে পরে মা বাবার ভাসা ভাসা দুটো মুখ .... স্কুলের মাঠটা !, পড়ার ব্যাচ এ যাওয়ার রাস্তাটা !.... প্রতিমা একটা সময় সাজতে চেয়েছিল সিঁদুর , বেনারসী শাড়িতে, আর সময় ওকে সাজিয়ে দিল লাল লিপস্টিক, চড়া সেন্ট এর গন্ধ্য , আর জুই ফুলের মালাতে !.... রোজ বাবুরা আসে, সিগনালের ধারে, কোঠাবাড়িতে ... রোজ ওর দর ঠিক করে... " দু ঘন্টায় ৬০০০ দেব , যাবি তো তো চল .."... "পাঁচ ঘন্টায় ১০ হাজার এর বেশি দেয়া সম্ভব না ,বুঝলি ..."............ দু বার পেটে বাচ্চাও এসেছিল ... কোঠাবাড়ির মালকিন দ্বায়িত্ব নিয়ে সেই বাচ্চা নষ্ট করে দিয়েছে .... এখন আর প্রতিমার চোখে জলও আসে না...... কিছু যন্ত্রণা মানুষকে পাথর বানিয়ে দেয় ... ২৫ বছর কেটে গেছে ... প্রতিমার বয়স এখন ৪২ ... চামড়ায় ভাঁজ দেখা দিয়েছে.. চোখের নিচে কালী জমেছে... সারা শরীরে ২৫ বছরের যন্ত্রণা আর ক্লান্তির ছাপ... তার মধ্যে এইডস নামের রোগটাও শরীরে চেপে বসেছে ... কোনো বাবু আর ওকে ছুঁয়েও দেখে না ... কোঠাবাড়ি থেকে বলে দিয়েছে " এই মাল এর আর কোনো দাম নেই .. বেকার বেকার এই রোগ নিয়ে এখানে পরে থাকলে যদি বাকিদের মাগী এই রোগ দিয়ে দেয় !.. তার থেকে বাবা এই মাগীকে ভালোয় ভালোয় বিদায় কর .......".......কথামতনই কাজ সঙ্গে সঙ্গে .. প্রতিমার কাছে যত টুকু টাকা ছিল সব নিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় বার করে দিয়েছে কোঠাবাড়ির মালকিন ... এখন বর্তমান ঠিকানা বরিশাল স্টেসন এর প্ল্যাটফর্ম এর একটা কণা... যদি কেউ দেখে, তাহলে দু চার পয়সা ছুড়ে দেয় ওর দিকে ... কখনো কারোর খুব দয়া হলে শালপাতায় মোরা ভাত ডাল দিয়ে যায় ..... এই ভাবে আর কতদিন কাটবে ও জানে না ! জানতে ইচ্ছেও করে না !.. শ্বাস নেয়া টা ই ওর এখন কাজ ... যত দিন নিতে হয় , নেবে !... এর মধ্যেই একদিন খেয়াল হলো শরৎ কাল নেমে এসেছে, স্টেশনের ধারের দূর্গাপুজোতে ঢাকের কাঠি পরেছে.. প্ল্যাটফর্মের কোনায় শুয়ে শুয়ে প্রতিমার কানে আসে ঢাকের আওয়াজ, মন্ত্রোচ্চারণ "ইয়া দেভি সর্বভুতেসু সক্তিরুপেনো সংস্তিতা , নমঃতস্বয়ী , নমঃতস্ব্য়ী , নমঃতস্বয়ী, নমঃ নমঃহ ...."......ওর মুখে আজ মলিন হাসি , মাটির প্রতিমাকে সবাই ফুল, ধুপ, ধূনো , আলতা ,সিঁদুর দিয়ে প্রতিষ্টান করে, আর রক্ত মাংসের প্রতিমা আজ ধুলুন্ঠিত, প্ল্যাটফর্মের একটা কোনায় ধুলোয় মোরা চাদর এই প্রতিমাকে আগলে রাখে ......... .......


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অসহায় মেয়ের গল্প (প্ররোচণা)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now