অনিঃশেষ নিশ্চলতা-০২ শেষ পর্ব "রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)
X
২।
বেলা গড়ানোর ভালে সূর্যটা কেমন কাৎ হয়ে
পড়ছে। তাতেও কী তেজ কমে! তৃষ্ণাতুর
গলায় দু'একটা কাক-শালিক ডেকে উঠল
কবরস্থানের বাঁশঝাড়ে। মরিয়ম আবার গেছে
কাজে, ব্যাপারী বাড়ির ইতিহাসে প্রথম কাজের বুয়া
টুপুনের মা। জয়তুন চাচী প্রথমবার শুনেই মাথায়
ঘোমটা দেন, মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন, ‘‘আ মর
ছেমরি, শেষকালে ব্যাপারী বাড়ির ঝি? "
মরিয়মের শুকনো চোখের দু'কূল জুড়ে অশ্রু
আসতে চায়, সে অশ্রুর ঢলে স্বপ্নের নাও
ভাসে। স্বপ্ন বলতে ছেলেমেয়ে দু'টিকে
মানুষ করা। তার রক্ত থেকেই তো এরা
দুনিয়ায়;পূর্ণতার তীরে পৌঁছে দিতে আরেকটু
রক্ত দিতে, ঘাম ঝড়াতে কার্পণ্য কিসের?
নিশ্চিন্ত মনে ঘরে ঢুকে রাশিদা, রাজ্যের ক্ষুধা
পেটে। মাটিতে টুপুন ঘুমিয়ে আছে-এখনো
খেলার ঘোর কাটেনি রাশিদার;এক্কাদোক্কা করে
ঠিক টুপুনের মাথার কাছে এসে দাঁড়ায়। ইতস্তত
পড়ে থাকা মুড়িগুলি ঘিরে থাকা মাছির দলে হাত নাড়ায়,
‘হুশ-হুশ, যাহ, , , ,! '
এবার দু'জানু উঠিয়ে আধবসা হয়ে খুব যত্ন করে
কয়েকটা মুড়ি নেয় হাতে। মুখে দিয়ে টুপুনের
রোদরাঙা গালে টপাটপ কয়েকটা চুমু দেয়। তারপর
উঠে হাড়ি থেকে ভাত নেয় পাতে। বিপত্তি বাঁধল
তরকারি নিতে গিয়ে, অস্ফুটে আর্তনাদ করে
উঠে -‘‘ওমা, এ দিকিনি পুড়ে ছাই! "
ইচ্ছে করলে না পোড়া অংশ থেকে বেছে
ক্ষানিকটা ভাল তরকারি নিতে পারত, ছোট ভাইটার
পানে তাকায়, টুপুন বোধহয় খায়নি।
অগত্যা পানি আর লবণে ভাতগুলি নাড়া দিয়ে গপাগপ
খেয়ে ফেলে।
ক্ষিধের পেটে মাটিও অমৃত! তৃপ্তির ঢেঁকুর
তুলে উঠোনে নামে রাশিদা। মায়ের সযত্নে
লাগানো সজনে গাছটা নুয়ে আছে মাটিতে,
ছোট, সুগন্ধি বাতাবি নেবুর গাছটা যেন প্রাণহীন।
কোণে একাকী বড় হচ্ছে একটা সূর্যমুখির চারা,
সূর্যের দাপটে ওটাও কেমন মৃতপ্রায়।
কোমড়ে উড়নি বেঁধে ঝাঁটগাছটা নেয় পাঁচিল
থেকে, ঝাড়ু দিয়ে ছোট উঠোনটা একলহমায়
পরিষ্কার করে ফেলে। রোয়াকের ধারে
বেশকিছু ময়লা জমেছিল, হাতে করে ওগুলো
বাইরে ফেলে দিয়ে লোটা নিয়ে পাশের বাড়ি
চলে গেল। একটা জলা আছে ওখানে, তলার
সামান্য পানিটুকু জলার নাম রক্ষা করছে। সেখান
থেকে পানি নিয়ে যত্ন করে গাছগুলির গোড়ায়
পানি ঢালল।
সজনের পাতাগুলি ধূলোয় বালুয় সাদাটে হয়ে ছিল।
আরো একলোটা পানি এনে পাতাগুলি কচলে ধু'ল,
সামান্য পানির ছোঁয়ায় গাছগুলি কেমন সজীব হয়ে
উঠছে! কচি সবুজপত্রের দিকে তাকিয়ে রাশিদার
মুখে জীবনদায়িনী হাসি ফুটে উঠে। বিজয়িনির
ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে হেলেদুলে ঘরে ঢুকে
লোটাটা যথাস্থানে রাখে। তারপর ঘুমন্ত ভাইটারে
কয়েকটা চুমু দিয়ে আবারো বের হয়ে পড়ে
কোথাও।
৩।
রাতের চাদর এখনো পুরো বিস্তৃত হয়নি, তবু
গাঁয়ে নেমে এসেছে নিঝুম-নিস্তব্ধতা। জঙ্গলার
শিয়ালগুলি এখনো হুক্কাহুয়া ডেকে উঠেনি!
ঘরের একমাত্র চৌকিটায় সন্তানদের আগলে
রেখে মরিয়ম শুয়ে আছে। একবার পাশ ফিরতে
যাচ্ছিল অমনি বিকট ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে চৌকি তার প্রতিবাদ
জানাল।
দিনের ভ্যাপসা গরমটুকু এখনো বিদায় নেয়নি,
গুমোট আবহাওয়া চারদিকে মাকড়সার জালের মত
বিস্তার করে আছে।
বাইরে দ্বাদশির চাঁদ উঠেছে, তাও কত গরম-যেন
ও চাঁদের আলো নয়, দিনের প্রখর রোদ্দুর।
অস্বস্তিভরে দু'একবার বিছানায় গড়িয়ে মা উঠে
পড়ল। তারপর নেভানো হারিকেন হাতে দরজা
খুলে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল, আগুন ধরাবে
হারিকেনে।
সন্ধ্যারও পরে রাশিদা না ফেরায় চিন্তিত হয়ে পড়ছিল
মরিয়ম, অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল জলার পাশে-
মেয়েটা কোন বিপদে পড়ল নাকি কে জানে!
তখুনি দেখে বাড়ির পিছনদিক থেকে চোরের
মত উঁকিঝুঁকি দিয়ে তাকে খুঁজছে রাশিদা। পেছন
থেকে খপ করে তার চুলের মুঠো ধরে
ফেলল মরিয়ম, তারপর হিড়হিড় করে উঠোনের
মাঝে টেনে এনে পরক্ষণেই দুদ্দাড় করে
কয়েকটা কিল বসিয়ে দিল পিঠে, তাতেও রাগ না
কমায় সজনে গাছের একটা ডাল ভেঙ্গে রাশিদাকে
এলোপাথাড়ি পিটাতে থাকে সে।
সারাদিনের ক্লান্তি-শ্রান্তি আর দুশ্চিন্তার পরে এমন
গা-ছাড়া মেয়েকে দেখে রাগের সীমা ছাড়িয়ে
গেছিল মরিয়মের, মেয়ের আর্তস্বর কানেই
যাচ্ছিল না যেন। ওদিকে ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে
মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে ভয়ে কাঁপছিল টুপুন, শ্বাস
আটকাতে না পেরে একসময় সশব্দে কেঁদে
ফেলে। মরিয়ম চমকে ফিরে তাকায়, সুযোগ
পেয়ে একদৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে রাশিদা।
চৌকিতে উপুর হয়ে কাঁদতে থাকে।
মেয়েটা রাতে কিছু খায়নি, অবশ্য মরিয়ম নিজেও
খায়নি-মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে তার,
অতীতের টুকরো সুখ আর আনন্দের নানান
দৃশ্য অযথাই ভাসছিল চোখের সামনে।
হারিকেন ধরিয়ে ঘরে ফিরে মরিয়ম, শিকলের
ঝনঝনান শব্দ তুলে দরজার খিড়কি লাগিয়ে দেয়।
রান্নাঘর থেকে একটা বাটি, আধপোড়া মোমবাতি
আর কিছু রসুন নিয়ে এসেছে।
সাবধানে হারিকেন থেকে মোমবাতিতে আগুন
নিয়ে চৌকিতে বসে। জানালায় চাঁদের আলো সহ
তিন আলোর যূথবদ্ধ রশ্মিতে অপার্থিব দেখায়
সন্তান দু'টোর মুখ। যেন স্বর্গশিশু-ভুল করে
মর্ত্যে এসে পড়েছে!
রাশুর জামাটা আলতো টানে সরিয়ে দিতেই আঁৎকে
উঠে মরিয়ম, এ কী করেছে ও! সারা দেহে
কালশিটে পড়েছে সজনেডাঁটার আঘাতে- মা হয়ে
কিভাবে পারল এমন নিষ্ঠুর হতে? টুপুনের চোখে
এখনো অশ্রু চিকচিক করছে, ভীষণ ভয়
পেয়েছে ছেলেটা। হারিকেন নিভিয়ে বাটিতে
উপুড় করে ওটার তেল ঢেলে দেয়, রসুনের
দুয়েক কোয়া ওতে মিশিয়ে নিয়ে মোমবাতির
কাঁপা আলোয় পিঠের কালো দাগগুলিতে মালিশ
করতে থাকে। ঘুমের মাঝেই একবার উহ্ করে
উঠে মেয়েটা, কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার
কেরোসিন নিয়ে মালিশ করতে থাকে।
ধীরেধীরে রাশিদার মুখে একটা অনাবিল
প্রশান্তির ভাব ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ নিঃশব্দে কেঁদে উঠে মরিয়ম, মায়ের কথা
মনে পড়ে। শৈশবে মারা যাওয়া মায়ের চেহারার
সাথে রাশুর বড় মিল, সেই কপাল সেই টিকালো
নাক, হুবহু মুখের আদল। চোখ মুছে একটু ঝুঁকে
রাশুর এলোমেলো চুলগুলি ফুঁ দিয়ে সোজা
করে দেয়। আর টুপুনটা হয়েছে অনেকটা
বাপের মত। স্বামির কথা মনে হতে মরিয়মের মুখ
শক্ত হয়ে উঠে, চোখের বাঁধটা আবার
ভেঙ্গে যায়। ভাবে, টুপুনকে একেবারেই
ভিন্নরূপে গড়ে তুলবে। ছেলেকে মানুষের
মত মানুষ করতে যেকোনো বাঁধার জাল ছিন্ন
করে রাজি ও।
বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাকে রাত গভীরতর হয়, সজনের
শাখায় নিশাচর কোন পাখি করুণ স্বরে ডাকে,
জোর বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি-সে কি বাতাস না
ঝড়;ভেবে ভেবে মরিয়মের মন বিক্ষিপ্ত হয়না।
দূরে বাঁশবনের মাথায় মস্তবড় চাঁদ উঠেছে।
জোৎস্নার মাখন-রশ্মি বড় কোমল হয়ে
লুটোপুটি খেলছে রাশিদা টুপুনের নাকে-মুখে,
মুগ্ধতার দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে ওদের
মা। জোনাকজ্বলা রাতের সৌম্যপ্রকৃতি যেন কানে
কানে বলে যায় তার- জীবনের সব শেষ হয়ে
গেল বলে যখন ধারণা করছো তখনো কিছু বাকি
আছে। অস্তই সূর্যের শেষ পরিণতি নয়,
আবারো উদয় আছে তার!
অনাগত সম্ভাবনার রজ্জু আঁকড়ে ধরে আগামির
স্বপ্ন সাজায় মরিয়ম। নির্ঘুম চোখের তারায় সেই
স্বপ্নের চিত্র আঁকতে থাকে, , , ।
নীচে হারিকেনের কেরোসিন শেষ,
মোমবাতিটা গলছে ক্রমশ; একটুপর সেটাও নিভে
যাবে।
তবু স্বপ্ন দেখবে বলে মরিয়মের ভাঙ্গা ঘরটা
জেগে রইবে চাঁদের আলোতে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now