অনিঃশেষ নিশ্চলতা—০১ "ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)
X
অনিঃশেষ নিশ্চলতা
মুহিববুল্লাহ খান
১।
দুপুরের আগুনে রোদে বড় জঙ্গলার দিগন্ত
ঝলসে যাচ্ছে। আকাশে পাখির পাখনা পোড়ে,
মাটিতে খন্দ-খামার পুড়ে খাক। গনগনে তাপ ছড়িয়ে
সূর্যটা সেই সকাল থেকেই তেড়েফুঁড়ে
উঠছে, ক্ষণিক বাদেই মাঝ আকাশে উঠে
আসবে। চৈত্র শেষ হল সেই কবে, ভরা
জোয়ারের স্রোতের মত ভেসে যাচ্ছে
বোশেখের শেষ দিনগুলি, ওদিকে এক-
দু'ফোটা পানির জন্য হা-পিত্যেশ করছে পুরো
প্রকৃতি।
জঙ্গলার পাশে ছবির মত একটি গাঁ ফুলদুয়ার, মাটির
মানুষ আহাজারি করে;‘‘খোদা! ই বছরট্য ইতু রাগ
করিস কেনে তু? ক'টি বিষ্টি দেনা! "
গাঁয়ের মানুষদের নিয়ে পাঞ্জেগানার বুড়ো ইমাম
সালাতুল ইস্তিসকা পড়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসান,
খোদা যদি একটুখানী চোখ তুলে তাকায়! ঢং ঢং
ঢংঢং, , ,! ভরদুপুরে গাঁয়ের স্কুলে ছুটি পড়েছে।
বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হৈ হল্লা শুকনো খাল-
পুকুর পেড়িয়ে হাটের খোয়াবিছানো পথ কামড়ে
ধানক্ষেতের পানে ধায়।
নির্জীব সাপের মত পড়ে থাকা পথের দুপাশের
প্রকৃতি ধুকে ধুকে ধূসর সবুজ বিলায়।
মেম্বরবাড়ি থেকে কাজ সেরে দ্রুত ফিরছিল
মরিয়ম, পথে দেখা পাশের বাড়ির জৈতুন চাচির সাথে।
কুঁজোবুড়ি সবসময় লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটে আর
পান চিবুয়, বয়সদোষে বকবক করাকে শিল্পের
পর্যায়ে নিয়ে গেছে প্রায়।
মরিয়মকে দেখে বিড়বিড় করে একবার, ‘'আল্লার
গযব পইড়ছে সবখানি, বেবাকটিন মইরবে গো!
'' অন্যমনস্ক মরিয়ম কান ফেরায় এদিকে, '‘কী
কইলে চাচি- বুজিনেই তো! ''
খেপে উঠে বুড়ি, '‘কিতা বুইজবে? হুন মাইয়া-এই
রোইদ রোইদ ন্য, খুদার গযব! ভালা মানু না থাকলি
খুদা কারে ছায় দিবো কউ দিকিনি? "
বুড়ির গমনপথের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতটা খুব
সহজেই বোধগম্য হয় মরিয়মের, দু'সাপ্তাহ হল-
তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে নিরুদ্দেশ
হয়েছে।
ঘরে ফিরে মরিয়ম রান্নাঘরে ঢুকে, চুলায় ভাত
বসিয়ে বাইরে একবার উঁকি দিল। নাহ, রাশিদা আর টুপুন
এখনো আসেনি। ছোট্ট উঠোনের সীমানা
ছাড়িয়ে দূরজঙ্গলার মাথা উঁচু গাছগাছালি চোখে
পড়ে, একদম নিশ্চুপ, নিথর। পাতাগুলি কেমন ঝরা
ঝরা, নকশাবিহীন।
‘‘আল্লারে, ইটে কি চইত্তির সংক্রান্তি না
বোশেক মাস, খাসা বোশেক মাসে এমুন
রোইদ্দুর আসলেই খুদার গযব! "বিড়বিড় করে
নিজেকে বুঝ দিয়ে উঠোনে দৃষ্টি বুলায়,
শুকনো পাতায় ছেয়ে আছে ওটা।
মনে মনে ভাবে-‘‘ইশ, ইকটে ঝড় অইত,
কালবোশেকির ঝড়! " পরক্ষণেই ছন আর খড়ি
দিয়ে তিলেতিলে গড়ে তোলা ঘরটার কথা মনে
পড়ে, ঝড়ে স্রেফ উড়ে যাবে সেটা। আচমকা
উঠোনে দুটো পদধ্বনি সচকিত করল তাকে।
রাশিদার ভাঙ্গা গলা ভেসে আসে-‘‘মা রে, , , , ভাত
হইছে? ' সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে
ছেলের দিকে তাকায় মরিয়ম, সারা দেহে ঘাম
উপচে পড়ছে
এতটুকুন বাচ্চার! ‘‘ও রাশু, টুপুনরে নি ঘরে যা, ভাত
নি আসিছি আমি! "
কারো অপেক্ষা না করে টুপুন নিজেই ঘরে
ঢুকে পড়ল। রাশিদা পায়ে পায়ে রান্নাঘরের সামনে
এসে দাঁড়ায়, খুঁটি ধরে কতক্ষণ অযথা মুচড়ামুচড়ি
করে। মরিয়ম আড়চোখে তাকিয়ে শুধায়-‘‘কুছু
ক'বি রে রাশু? "
নখ কামড়াতে কামড়াতে উত্তর দেয় রাশিদা, ‘‘মা,
পণ্ডিতে কয়েছে বেতন দিতি হবি! ''
মরিয়মের ব্যস্ত হাতখানা কিছুক্ষণের জন্য স্থির
হয়ে যায়, দু'জনের দু'মাসের বেতন, প্রায়
অনেক টাকা, কোত্থেকে দিবে এত টাকা?
কপালে জমে যাওয়া ঘাম মুছে মুখে শুধু
বল্ল-‘সে দিবোক্ষণ, তু একন ঘরে যা! ''
রাশিদা স্থান ছেড়ে নড়েনা, মরিয়ম আবার ভাত
নাড়ে, তরকারির ঝোল চাখে, একটু লবণ ছিটায়।
এ ভিটেমাটি তার বাবার দেয়া, টুপুনের বাপ বিয়ের
পর থেকেই ঘরজামাই হিসেবে থাকতো। ছাড়াছাড়ি
হবার পর সে যে গেল আর এমুখো হলনা পাষাণ
লোকটা।
‘‘মা! '' মরিয়ম সাড়া দেয়না, আবার কী বলে
ফেলে মুখছোটা মেয়েটা।
’'এ মা! তু বাপেরে ছাড়ি দিলি কেন রে? ''
মায়ের ঘামঝড়া পরিশ্রম রাশিদার আধফোটা ফুলসম
কোমল মনে বেশ পীড়া দেয়। ওর আট
বছরের জীবনকালে বাবামায়ের অনেক ঝগড়া
দেখেছে-কতদিন দেখেছে মার খেয়ে মা
অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, ছোট ভাইটা হামাগুড়ি
দিয়ে কাঁদছে, ক্ষিধে লেগেছে অথচ দুধ
খেতে পারছেনা বলে। বাবাকে তখন রূপকথার
দৈত্যের মত লাগতো।
রাশিদার প্রশ্ন শুনে স্বভাবতই ক্ষেপে উঠে
সে, বলে-''ছাড়ি কি আমি দিয়েছিলিম? '
''ওরে পোড়াকপালি! তুর বাপে আমাকে মারতে,
পিটাতে-চোখের মাথা খেয়েছিলি বুঝি? "
একশ্বাসে কথাগুলি বলে মরিয়ম হাঁপাতে থাকে।
ইচ্ছে করলেই স্পষ্ট করে বলে দিতে পারত-
সে নয় বরং ওদের বাপই তাকে ছেড়ে
দিয়েছে।
ধর্মে স্বামি-স্ত্রী দু'জনেরই ছাড়াছাড়ির অধিকার
থাকলেও এটা বঙ্গদেশ, ধর্মজ্ঞানে অপটু
ব্যক্তির ছড়াছড়ি শহর-নগরেই, আর এতো
অজপাড়াগাঁ-নিতান্ত কিছু মুখ্যুসুখ্য লেখাপড়া না জানা
লোকের বসবাস। ছাড়াছাড়িটা তাই একপক্ষীয় হয়ে
থাকে এখানে। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলতে
গেলে শুধু স্বামিদের পক্ষ থেকেই, যখন ইচ্ছা
তখন।
বাংলার পল্লিবধূদের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল পতিপরায়ণা
হিসেবে। মরিয়মও গাঁয়ের মেয়ে, শত নির্যাতন,
অত্যাচারেও বাচ্চাদু'টির মুখ চেয়ে স্বামির পা
আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছিল, তা আর হল কই?
এদের নিয়ে বড় বিপদে পড়ে গেছে ও,
অবশ্য স্বামী থাকতেও যে খুব আরামে ছিল তা
নয়, বিয়ের সময় বাবার কাছ থেকে পাওয়া যৌতুকলদ্ধ
টাকাতো সেই কবে উড়িয়েছে, মাসশেষে
কাজকাম করে যাই পেত জুয়া খেলে মদ খেয়ে
সেটা উড়াতে সিদ্ধহস্ত ছিল লোকটা।
’'এই দ্যাখো দিকি কাণ্ড, গেল কোথা মেয়েটা!
' চোখ মুছে বাইরে তাকিয়ে এদিকওদিক খুঁজে
মরিয়ম, কোথাও নেই রাশিদা। ওঠোনের কথা
ভুলেই গেছিল, ঝাঁট দিতে হবে, গলা উঁচু করে
মেয়েকে ডাকল, 'রাশু, এই রাশু! উঠোনটা একট
ঝাড়ু দি' দে! ''
ওদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ধমক খেয়ে রাশিদার মন খারাপ
হয়ে গেছিল, কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই ঘর থেকে
বের হতে যাচ্ছিল।
এমনসময় মায়ের ডাক ভেসে এল, একটু দাঁড়িয়ে
ঘরের পিছন থেকে সমান চিল্লিয়ে জবাব দেয়,
'এবেলা ও পারবোনা মা, পরে দি' দিবোনে! '
বলেই দে ছুট।
'দস্যিমেয়ের জওয়াব শুনো! লাকড়ি নাড়িয়ে
চুলোর মধ্যে ফুঁক দেয় মরিয়ম, ফুলকি ছড়িয়ে
চচ্চড় করে আগুন বাড়ে।
'এই নবাবজাদি! কই গেলি? ভালয় ভালয় কচ্ছি ঝাড়ু দি'
দে, নইলে ও ঝাড়ু তুর পিটে ভাঙ্গবো! জাদী
ততক্ষণে পাখনা পেয়েছে, উড়ে চলে
গেছে কলমিপুঁথির পুকুরপাড়ে, এক্কাদোক্কা
খেলতে পাগল রাশিদা। দিনমান ওখানেই পড়ে থাকে
তাই।
মরিয়ম রাশিদাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে আছে
পড়ালেখায় মোটেও মন বসছেনা মেয়েটার,
ক্লাস থ্রিতে প্রতিটা পরীক্ষায় লাড্ডু মেরেছে।
এখন তো বাপ নেই আরো উচ্ছন্নে গেছে-
নিশ্চিত ফেল করবে শেষ পরিক্ষায়। আরো
দুয়েকবার ডেকে ক্ষান্ত দিল মরিয়ম, মনেমনে
ভেবে রেখেছে-ইবার যদি ফোরে না উটতি
পারে তাইলেই শেষ, মাইয়াকে ইসকুল তন ছাড়ি
আনতি হবি। বইসে বইসে অন্ন ধ্বংস করার কুন
মানে অয়!
লোকটার একটা কথা মনে পড়ে, মাঝেমধ্যেই
বলত-গরিবের জন্যি পড়ালিকা অইলে বিলাসিতা!
তাই মরিয়ম শুধু টুপুনকে পড়াবে, মনে মনে
ভাবে-''পড়ালিখা করি টুপুন এ্যাকদিন মেলা বড় হবি,
রাজপুত্তুরের মত পোশাক পড়ি আমাকে নি' যাবে
শহরে। সব দুঃখ ভুলায়ে মেলা সুখ দিবো মোর
টুপুন। মোর সোনা মোর সাতরাজার ধন! "
কান্নার শব্দে মা সচকিত হয়, তার সোনাই
কাঁদছে-''আহারে, ভুক লাগিছে বুজি বাপ! " তড়িঘড়ি
করে ভাত নাড়িয়ে ঘরে ঢুকে, টুপুন মাটিতে
গড়িয়ে কাঁদছে। বাবুকে বসিয়ে শূন্য ভাঁড়ারের চিপা
থেকে একটা পুরোনো মুড়ির ডিব্বা বের করল।
ঝাঁকি দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল আছে কিনা! কিছু
আছে এখনো, একমুঠ মুড়ি বাবুর সামনে ছড়িয়ে
দিতেই চেঁচিয়ে উঠে টুপুন-''মুড়ি খাবানে মা,
বড্ড ক্ষিদে লাগিছে! " আঁচল দিয়ে ওর
চোখের পানি মুছে দিল মরিয়ম, হাসতে হাসতে
বলল -''আব্বা, ভাত হচ্ছি তো, একনই দিবো;তু
মুড়ি খা! '' কয়েকটা মুড়ি টুপুনের মুখে দিয়ে দ্রুত
রান্নাঘরে ফিরে মরিয়ম, তরকারি থেকে পোড়া
গন্ধ ভেসে আসছে!
মেজাজটা আবার চড়ে যায় তার-‘'দস্যি মেয়েটা
থাকলি ও পুড়ত? "
পাশের বাড়ী থেকে জৈতুন চাচি গলা তুলেন, ‘‘ও
টুপুর মা! তরকারি পুইড়ে যাচ্ছি নি? "
তড়িঘড়ি জবাব দেয় ও-‘‘না গো চাচী! " বাহিরের
ধূলাবালি থেকে বাঁচবার জন্য দাওয়া খানিকটা উঁচু করে
বাঁশের বাখারি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল টুপুনের
বাপ। উপরে অসংখ্য ফুটোতে সূর্যের আলো
যথেচ্ছা অধিকার চর্চা করে, তারই একটা ফুটো
দিয়ে ভয়ে ভয়ে ওপাশে তাকায়, দেখে
কুজোবুড়ি বসে বসে পান চিবুচ্ছে একমনে।
'নাহ, ও বুড়ি আসবিনে বোধহয়! 'স্বস্তির শ্বাস
ফেলল মরিয়ম। বুড়ি এসে পোড়া তরকারি দেখে
ফেললে সমস্যা। একে তো বকা দিবেই উপরন্তু
সেই বাড়ী থেকে তরকারিও দিতে চাইবে।
অন্যের করুণা আর নাক ঢুকিয়ে পোদ্দারি
দু'টোকেই চরম অপছন্দ করে মরিয়ম। বসে
আবার রান্নায় মন দেয়, রাশিদার উপর রাগটা আবার
চাগিয়ে উঠে। একসময় টুপুন ঘুমিয়ে পড়ে, মা
যতটুকু খাইয়েছে অতটুকুই;আর একটুও খায়নি।
ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা মুড়িগুলি এখন মাছির খোরাকে
পরিণত হয়েছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now