বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অঙ্কিত চিত্র' (১ম পর্ব)
শারাফাত শরীফ
'....দো-হাড়া গড়ন। চিকন কটিদেশ। তাতে ঘন কালো দীর্ঘ চুলের আস্তরণ। রোদে পোড়া গায়ের রঙ। বাদামি। চওড়া কপাল, টিকলো নাক আর সহজ সরল দুটো চোখ। বড় বড়। ব্যতিক্রম শুধু চোখের মণিগুলো। নিকষ কালো আঁধারে ঢাকা। তাতে এক সাগর শীতল মায়া। সৃষ্টিকর্তা নিপুণ হাতে সৌন্দর্য্যের রঙ তুলি দিয়ে যাকে অনন্য করে তুলেছেন। নাম...'
(এক)
ধীর ধীরে চোখ মেলে তাকালাম আমি। ইচ্ছা করেই বন্ধ করেছিলাম। মনের গহীনে অঙ্কিত চিত্রটা আবারো দেখে নিলাম। সবার মনেই একটা অঙ্কিত চিত্র থাকে। হোক ছেলে কিংবা মেয়ে। সামনের মেয়েটার সাথে চিত্রটার মিল খুঁজছিলাম আমি। মনের গহীনে চিত্রটার অস্তিত্ব অনুভবের পর থেকে এমনটা প্রায়ই করি। অপরিচিত যে কোন মেয়ের সাথে। অন্তত একবার তো বটেই। কিন্তু সামনের মেয়েটার সাথে চিত্রটা ক'বার যে মিলেয়েছি মনে নেই। তবে, প্রতিবার আশ্চর্য্য জনক ভাবে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।
ও এখন আমার সামনে বসা। মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার দূরে। আমরা বসে আছি জিয়া উদ্যানে। একটু পশ্চিম দিক ঘেঁষে। একটা গাছের নিচে। ঘাসের উপর। আমাদের চতুর্পাশে এমন অনেকেই বসা। প্রেমিক জুটি সবাই। কিন্তু ওসবে নজর নেই আমার। আমি তাকিয়ে আছি ওর চোখের দিকে। যেন শান্ত-শীতল দুটো নিকষ কালো টলটলে সমুদ্র। তবে ঝড় উঠতে পারে যখন তখন। যেমন ওদিন সন্ধায়...।
'কি দেখ?'
আকস্মিক প্রশ্ন করল সে। আমি সরল গলায় উত্তর দিলাম,
'তোমাকে।'
অবান্তর প্রশ্ন-উত্তর। কিন্তু লজ্জা পেল সে। সব প্রেমিকারা স্বভাবতই প্রশ্নটা করে এবং লজ্জা পায়। স্বাভাবিক। এটাই নারীর ভূষণ।
দ্রুত লজ্জাভাব কাটিয়ে আবারো বলল সে,
'আমার মাঝে এমন কি দেখ?'
আমি ঘোরের মাঝে থেকেই বলি, 'বর্ণনা দেখি, চিত্র আঁকি।'
'তুমি ছবি আঁকতে পার নাকি!' চোখ মুখ নাচিয়ে আগ্রহভরে জানতে চাইল ও।
'নাহ।' আমি ওর আগ্রহে পানি ঢেলে দেই।
'তাহল কি কবিতা লেখ?'
আগ্রহ ধরে রাখার চেষ্টা করল ও। 'নাহ।' আমি আবারো ওর আগ্রহে পানি ঢালি। মন খারাপ করে ফেলল ও। প্রাকৃতিকভাবে মেয়েরা এ দুটোর প্রতি বেশ দূর্বল থাকে। এবার সে বিরস গলায় বলল,
'তাহলে?' আমি মুচকি হেসে বলি,
'গল্প লেখি, কল্পনা করি।'
কিছুক্ষণ ঘাস ছিড়ল সে। এরপর গম্ভীর গলায় বলল, 'তুমি কি এভাবেই তাকিয়ে থাকবে?' আমি চোখ না নামিয়ে মাথা নেড়ে বললাম,
'হুমমম।'
এবার চোখ রাঙিয়ে ধমকের সুরে বলল সে, 'চোখ সরাও, আমার অস্বস্তি হচ্ছে।'
বিরক্ত হয়েছে নিশ্চই। মৃদুস্বরে 'পাগল একটা' বলে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। প্রেম করতে এসে কেউ চুপ করে বসে থাকে না। বরং তোতাপাখির মত বকবক করে যায়। কিন্তু এত কি বলব আমি? শব্দ ফুরিয়ে যায়, তাই এই চুপ করে তাকিয়ে থাকা। মোবাইলে কথা হলে না হয় চুপ করে ওর প্রতিটি শ্বাস শুনে যেতাম। এখন তো দেখা। মন ভরে দেখা। না দেখা প্রতিটা মূহুর্তের কাযা-কাফ্ফারা আদায় করা।
আশপাশের সবুজ শ্যামল গাছ-পালা, তরু-লতা আর নানা রঙের মানুষ দেখছে সে, কিন্তু আমি দেখছি ওকে। খালি পা। পায়ে নূপুর থাকলে ভালো হত কিংবা মেহেদি। না থাকুক, আবরণ এগুলো। সৌন্দর্য্যকে ঢেকে রাখে। সজীব ঘাসের উপর একের পর এক পা ফেলে আর কোমর অবধি চুলের ঢেউ তুলে ছন্দে ছন্দে ধীর পায়ে হাঁটে সে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখি। কবি হলে না হয় এই ছন্দে ছন্দে কবিতা সমগ্র রচনা করা যেত। তাতে কি? গল্প লিখব। দীর্ঘ বর্ণনা দিব এই রূপ সৌন্দর্য্যের। যে সৌন্দর্য্যের প্রথম দেখা পেয়েছি আমি প্রায় এক মাস আগে। দু'চোখ বন্ধ করে ফেলি আমি। চোখে ভেসে উঠে সে দিনের চিত্র...।
(দুই)
এক মাস আগে,
চোখ দুটো খোলার পর মূহুর্তে আবারো বন্ধ করে নিলাম। এইমাত্র জ্ঞান ফিরেছে আমার। জ্ঞান হারানোর কারণটা কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতরে খুঁজে নিলাম এবং আবারো চোখ খুললাম। আমার চোখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকা দুটো চোখের দেখা পেলাম। পরক্ষণে শীতল একটা শক খেলাম। এমন মায়াবী চোখের অস্তিত্ব সত্যই কি আছে? উত্তর না খুঁজে আমিও এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাদুকরি শক্তি মায়া। এই মায়ার জালে এখন বন্দি আমি। হঠাত্ ওই চোখের মণিতে এক খণ্ড উল্কাপিণ্ডের আবির্ভাব হল। কারারুদ্ধ আমি। মুক্তি নেই। কিন্তু ভস্ম হবার আগেই ওই চোখের মালকিন মুক্তি দিল আমাকে। আমি অবাক হয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। লজ্জা পেল সে। টিকলো নাকটা ফুলে উঠল সামান্য। মৃদু ঘাম জমল তাতে। গালটা সামান্য গোলাপী হয়ে উঠল। চোখে বিনম্র লজ্জা-রাগ। হঠাত্ কি যেন হল, দ্রুত পায়ে চলে গেল সে। আমি ওর গমন পথে তাকিয়ে রইলাম। মুখ ফুটে কেবল বেরিয়ে এলো, 'তিতি? নেফারতিতি!'
শব্দ করে রুমে ঢুকলো মুবিব। আমার বন্ধু। শুভ্রতায় ঢাকা নিস্তব্ধ ফ্লোরে কেবল ওর জুতোর খটাশ খটাশ শব্দ। চোখ বন্ধ করে মনে মনে খিঁচ ঝাড়লাম আমি। ওর এই বিদঘুঁটে শব্দের কারণেই মেয়েটি চলে গেছে! শোরগোলহীন প্রাইভেট হাসপাতালে সামান্য শব্দেই যেন বাজ পড়ে।
'কিরে বেটা?' নিকটে এসেই শব্দ করে বলে উঠল মুবিব,
'রাস্তায় নামলেই নিজেকে হিরো ভাবিস নাকি?'
'নারে দোস্ত,' হতাশ গলায় বলি আমি, 'আসলে বিকালে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। জাহাজ বাড়ীর কাছে আসতেই একটা প্রাইভেট কার কোত্থোকে এসে খোঁচা মেরে দিল।' দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠে আমার, 'বুঝতেই পারিনি।'
'বুঝতে পারবিই বা কিভাবে?' টিটকারির সুরে বলে মুবিব, 'তখন কি নিয়ে মগ্ন ছিলি কে জানে!'
একটা চেয়ার টেনে এনে আমার পাশে বসে বলল, 'তুই তো সব সময় আবার কল্পনার জগতে হাট বসাছ।' দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মুবিব। আমি চুপ করে থাকি। জানি, এখন কথা বললে নির্ঘাত মার খেতে হবে। তবুও আমি ওকে থামাতে বলি, 'থাক দোস্ত...'
কিন্তু মুবিব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,'সারাদিন এত্ত কি ভাবিস বলতো দেখি?' আবারো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'টুকটাক লেখালেখি আমরাও তো করি তাইনা?'
আমি ওর কথা নিয়ে না ভেবে বরং ওর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভাবি। ওর বাবার দীর্ঘশ্বাসের কোন ফ্যক্টরী আছে কিনা আমার ঘোর সন্দেহ আছে। নচেত্ সারাদিন ওয় এত দীর্ঘশ্বাস পায় কই! এরপর ও চুপ করে থাকে। আমার ভাবনা শেষ হয় কিন্তু ও মন খারাপ করে বসে থাকে। আমি সান্ত্বনার সুরে বলি, 'চিন্তা করিস না, আল্লায় যা করে ভালোর জন্যই করে।'
'হ...' রেগে যায় মুবিব,
'আমি চিন্তা করুম নাতো তোর বাপে করবে!' কথাটা বলেই ও বুঝতে পারে রাগের বশে কি বলে ফেলেছে ও। কিন্তু 'গুলি আর বুলি' বেরিয়ে গেলে আর ফেরত আসে না। তাই আমি বিষয়টা এড়িয়ে যাবার জন্য বলি,
'দোস্ত, তোর ভাবীরে দেখে আয় যা।'
'আমার ভাবী!'
হতভম্ব দেখায় ওকে। আমি একটু ভেবে ওকে বলি,'নাহ,তোর ভাবী না! আমার বউ'রে ভাবী বললে তুই খারাপ নজর দিবি! এরচে' বরং ও তোর বোন আর তুই আমার একমাত্র শ্যালক।' কথাটা বলেই হা হা হা করে হেসে উঠি আমি। হাসির চোটে মাথা ব্যাথাটা বেড়ে যায় আমার।
'বালামার...' খেঁকিয়ে উঠে মুবিব। 'ফালতু প্যাঁচাল বন্ধ কর।'
আমি বলি,'বিশ্বাস না হলে রিসিপশনে গিয়ে 'তিতি' নামটা বলে খোঁজ নে।'
এবার সিরিয়াস হয় মুবিব। চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাস করে, 'কাহিনী কীরে?'
আমি মুচকি হেসে বললাম,'যা না আগে দেখে তো আয়।'
চলে গেল মুবিব। আর আমি ভাবতে থাকি শীতল সেই দু'চোখের কথা। মায়াবী সেই রূপের কথা। দু'চোখ বন্ধ করে মনের গহীনে লুকায়িত দীর্ঘদিনের অঙ্কিত চিত্রের সাথে মিলাতে থাকি। '...দো-হাড়া গড়ন। চিকন কটিদেশ। তাতে ঘন কালো দীর্ঘ চুল...'
(তিন)
আমার গা ঘেষে বসল নেফারতিতি। আমি ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলাম। এতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফিরে এসেছে ও। ওর নাম তিতি। নেফারতিতি নামটা আমার দেওয়া। তিতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রশ্ন করল,
'তুমি কি ওই বিষয়টা নিয়ে ভেবছ?'
'কোন বিষয়?'
'এরই মাঝে ভুল মেরে দিলে!'
প্রশ্ন নয় যেন বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে তিতি। আমি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাই না বরং ভেবে যাই গতরাতের কথা।
এমনিতেই আমি ঘুমকাতুড়ে মানুষ। ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে। ঘুমন্ত স্বপ্ন। এই স্বপ্নরা গল্প লেখায় আমাকে ভীষণ সাহায্য করে। কিন্তু গতরাতটা নির্ঘুম কাটিয়েছি আমি। জেগে থাকার কারণ ছিল 'তফাত্'। তিতির সাথে আমার তফাত্। এসব নিয়ে আমি কখনোই ভাবতাম না। যদি তিতি আমাকে বাধ্য না করত। তফাত্গুলো নিয়ে ভাবলাম, তিতি হলো সফল শিক্ষিত আমি হলাম ব্যর্থ্য শিক্ষিত। তিতি চাকুরীজীবী আমি ভবঘুরে। তিতি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আর আমার কোন বিত্ত নাই। তিতি পেটের দায়ে চাকুরী করে আমি ঘুরি-ফিরি। আরেকটা ডিফারেন্স আছে, ওর ভাষায় যেটা ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্ট- বয়স। তিতি নাকি আমার চেয়ে বড়। সংখ্যাটা অনেক। মেয়েদের বয়স নাকি বলতে নেই! ওর এই ভাবনা দেখে আমার 'কুড়িতেই..' প্রবাদ বাক্যটা মনে পড়ে। কিন্তু ওর মন খারাপ হবে ভেবে আমি বলি, 'ভালবাসি তোমার সত্বাকে।'
মনে পড়ছে?' আমাকে ভাবতে দেখে প্রশ্ন করে ও।
'হুমমম।' মাথা নাড়ি আমি।
'কি সিদ্ধান্ত নিলে?'
ওর গলাটা কেমন যেন শুনালো। কিছুটা উত্কণ্ঠা মিশানো। এতটা আশা করিনি আমি। অনেকক্ষণ ভেবে আমি বললাম,'আমার কোন সমস্যা নাই।' দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।
(চার)
উভয়ে বসে আছি। পাশাপাশি। নিশ্চুপ। কে কি ভাবছে কে জানে। একটা পিচ্চি ছেলে এগিয়ে এলো। ছন্নছাড়া। বাদাম বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করে। আমাকে চিনে। কাছে এসে বলল,
'ভাই, বাদাম খাইবেন?' আমি মুচকি হেসে বলি,
'তোর আপারে জিজ্ঞাস কর।'
চোখ দুটো পিংপং বলের মত নাচায় ও। ওর নামটা জানা হয়নি। দাঁত কেলিয়ে হাসি দেয়। মেকি হাসি। নেফারতিতির হাসিটা নির্ঝর। প্রাঞ্জল। দশ টাকার বাদাম নেই আমি। দ্রুত প্রস্থান করে পিচ্চিটা। কিছুদূর গিয়ে ভীরু চোখে পিছনে ফিরে তাকায়। এখানকার হকাররা প্রেমিকের চেয়ে প্রেমিকাকে বেশি ভয় পায়। হয়ত আরো দুটো টাকা চাইত। কিন্তু আমার পকেট ফাঁকা। তিতি আমার হাত থেকে বাদামের প্যাকটা নিয়ে গেল। নিজে খাবেনা বরং আমাকে খোসা ছাড়িয়ে দিবে। তিতি বাহিরের কিছু খায় না। ওর হাত থেকে দুটো বাদাম নিয়ে চিবুতে লাগলাম আমি। এটাকে নাকি প্রেমের ট্যাবলেট বলে। প্রেম করতে এসে বাদাম না খেলে নাকি প্রেমটাই অপূর্ণ থেকে যায়! ফালতু বচন।
মন দিয়ে বাদাম চিবুচ্ছিলাম আমি। ও এক মনে খোসা ছড়াচ্ছিল। মনটা ভাল। টেনশন মুক্ত। কিন্তু তখনি বোমা ফাটলো তিতি।
'আমি বিবাহিত...!'
মৃদু আওয়াজের ছোট্ট শব্দটা শুনে আমি বিষম খাই। দাঁতের ফাঁকে আর তালুতে আটকে যাওয়া বাদামের লাল আবরণের কথাও ভুলে যাই। চিত্কার করে বলতে ইচ্ছে করছিল,'ধরণী দ্বিধা হও, আমি তোমার চরণে আত্মবলি দেই। কিছুক্ষণ পর আবারো ছোট্ট আওয়াজে তিতি বলল, '...ছিলাম।'
আমি থমকে যাওয়া নিশ্বাস ধীরে ধীরে ছেড়ে দেই। চুপ করে বসে থাকি। কিছু বলা উচিত। তিতি চোখ নামিয়ে রেখেছে। ঘাস ছিঁড়ছে নিঃশব্দে।
'আর কিছু?'
প্রতিটি অক্ষর ধীর ধীরে উচ্চারণ করি আমি। বোধহয় এজন্যই 'তফাত্' এর উপর জোর দিয়েছিল তিতি।
'না, তবে...।'
'বলে ফেলো।' আশ্বাস দেই আমি।
'আমরা আগে বিয়ে করব এবং সেটা কালই।'
যেন ঘোষণা দেয় ও। কিন্তু আঁতকে উঠি আমি। উদ্বেগমাখা কণ্ঠে বলি, 'বিয়ে! তাও কাল!'
কিছু বলেনা তিতি। ওকে এতটা সেকেলে ভাবিনি আমি। এখনকার ছেলে-মেয়ে কেউই তিন চার বছর প্রেম না করে বিয়ে করে না। মা-বাবা পছন্দের কাউকে এক নজর দেখে বিয়ে করা এখন ইতিহাস। যাক ওসব না ভেবে আমি ওকে জিজ্ঞাস করলাম,
'এটাও কি আমার সাথে প্রেম করার পূর্বশর্তের একটা?'
কিছু না বলে মাথা নাড়ে তিতি। চিন্তায় পড়ে যাই আমি। যার রাত-দিন কাটে যাযাবরের বেশে, যেখানে রাত সেখানেই কাত এই যার নীতি- সে করবে বিয়ে! তাছাড়া প্রেম করা যতটা সোজা ; বিয়ে করা ঠিক ততটাই প্যাঁরা। বোধহয় এইজন্যই জনৈক মহামানব বলেছিলেন, 'পুরুষ দুই প্রকার- জীবিত ও বিবাহিত।' তবুও আমি ওকে বুঝানোর জন্য বলি,
'আমাকে কিছু সময় দাও। আগে কিছু ব্যবস্থা করে নেই।'
সাথে সাথেই উত্তর দেয় তিতি।
'উহুঁ, তোমাকে ব্যবস্থা করতে হবে না।'
'তাহলে...,'মেজাজ গরম হয়ে যায় আমার। চিত্কার করে খেঁকিয়ে উঠি, 'তোমাকে বিয়ে করে কি আমি মাথায় নিয়ে ঘুরব?'
'উহুঁ...।' দ্রুত উত্তর দেয় তিতি,'কিছুই করতে হবে না তোমাকে। প্রেম করলে আমরা যেমন থাকতাম তেমনিই থাকব।' 'মানে কী?' মেজাজ চড়তে থাকে আমার, 'বিয়ে করব আবার প্রেম করার মত করে থাকব!'
'বুঝ নাই?' ব্যাখ্যা দেয় তিতি,'মানে আমরা বিয়ে করব এটা কেউ জানবে না।' এবার চুড়ান্ত রাগটা ঝেড়ে দেই আমি, 'প্রেম করার মাঝে এসব বিষয় আসছে কেন তিতি?' কিন্তু কিছু বলে না ও। চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর একটা নির্ভেজাল উত্তর দেয়, 'জানি না!'
আমি হতভম্ব হয়ে যাই। কি বলব ভেবে কূল পাই না। বোধহয় একেই বলে 'ভালবাসার অত্যাচার!'
আমি উঠে দাঁড়াই। আর ভালো লাগছিল না। আমাদের সম্পর্কগুলো বড় বেশি অদ্ভুত। মাঝে মাঝে এরা এমন স্থানে এসে দাঁড়ায় ; যেটা কাম্য ছিলো না কারোরই। তখন আমরা সম্পর্ক'কে অনেক কিছু বলতে চাই। কিন্তু বলার ভাষা খুঁজে পাই না। মনেপ্রাণে কামনা করি এই মূহুর্তের কথা ভুলে গিয়ে ভালো কোন মূহুর্তে ফিরে যাই। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় না। সময় বয়ে যায় আর অব্যক্ত দুই 'কিন্তু'র কষাঘাতে সম্পর্ক'রা ভেঙে যায়।
তিতি নেই। আমাকে ভাবতে দেখে চলে গেছে। উঠে যাওয়ার আগে ওকে বলেছিলাম, 'আমি রাতে একটু ভেবে দেখি।' এরপর কিছু না বলে তিতি চলে গেছে। আমি হাঁটতে থাকি ধীর পায়ে। গাছ-পালা দেখি। অন্ধকার ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। শীতল বাতাস। বিষণ্ণ আকাশ। আমার মনটাও বিষণ্ণ। পশ্চিম আকাশটা টকটকে লাল হয়ে আছে। আকাশ হতে ফোটায় ফোটায় রক্ত ঝরছে যেন। আমার মনের গহীনের আঙ্কিত চিত্র হতেও কি রক্ত ঝরছে? জানি না! কিচ্ছু জানি না আমি!
(পাঁচ)
বাসায় ফিরে এলাম। মুবিব নেই। বাড়ী গেছে। ওদিন হাসপাতালে এসে খরচটা দিয়ে গেছিল। টাকা কার কাছ থেকে ব্যবস্থা করেছে কে জানে! এর পর আর দেখা হয়নি। নিঃসঙ্গতা আমাকে দুশ্চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। ছন্নছাড়া মানুষ আমি। উল্লেখ যোগ্য কোন পিছুটান নেই। এজন্য তিতিকে বিয়ে করতে আমার তেমন কোন সমস্যা নেই। যদিও আমাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে কেবল সমাজ। কারণ, আমাদের সমাজে পূর্বে একবার বিবাহিতদের এখনো আপয়া, অশুভ আর কুলক্ষণা মনে করা হয়। সমাজের সবাই তাদের খারাপ চোখে দেখে। অনেককে তো আবার ব্যবহৃত পন্যের মত ছুঁড়ে ফেলা হয়! ওদের জীবনে প্রেম ভালবাসার নতুন জোয়ার আসতে নেই। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে কিংবা স্ত্রী মারা গেলে স্বামীকে পূর্বেকার স্মৃতি নিয়েই জীবন পার করতে হয়। বিবাহিত পুরুষকে অবিবাহিত কোন নারী কিংবা বিবাহিত নারীকে অবিবাহিত কোন পুরুষ কখনোই বিয়ে করতে চায় না। মনে বড় ভয় থাকে 'সমাজ কি বলবে!' অথচ ভারত উপমহাদেশ ছাড়া এমন উদ্ভট চিন্তাধারা না আরবে- না ইউরোপে কোথাও নেই।
হঠাত্ একটা প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিল আমার, তিতি প্রেম শুরু না করতেই বিয়ের বিষয়টা আনলো কেন?
যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন। প্রশ্নটা তিতির সামনে থাকতে মনে পড়েনি বলে উত্তর পাচ্ছি না। এজন্যই মাঝে মাঝে নিজের পশ্চাতে নিজেরই লথি কষাতে ইচ্ছে করে আমার। কিন্তু সেটাও সম্ভবপর নয়! তিতিকে একবার ফোন করব ভাবছিলাম। কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না করে অসময়ে করে বোকারা। আমি বোকাদের দলে নই। তাই আমার ভাবনার জগতকে বিস্তৃত করলাম। আমার ভাবনা'রা কখনোই বিরক্ত হয়না বরং আমাকে যে কোন বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করে। মনে মনে কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলাম।
'অবিশ্বাসের কারণে?'
মনে মনে তিতিকে সামনে দাঁড় করিয়ে প্রথম প্রশ্নটা করলাম আমি। কারণ, পৃথিবীর সবচে দামি বস্তু বিশ্বাস। বস্তুতঃ এর কোন মূল্যই হয় না! কিন্তু ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার মত উল্লেখ যোগ্য কোন কারণ খুঁজে পেলাম না আমি। তাই এটা বাদ।
'তাহলে..পারিবারিক কারণে?'
দ্বিতীয় প্রশ্নটার ক্ষেত্রেও তিতিকে সামনে দাঁড় করালাম। দেখলাম তিতি মাথা নেড়ে না করছে। ওর পরিবারের ব্যাপারে যতটুকু জানা আছে তা হল, পরিবারের সামান্য সচ্ছলতার জন্যই ওর চাকুরীতে আসা। এজন্য পারিবারিক ভাবে বাঁধা না আসাটাই স্বাভাবিক।
'তাহলে... সামাজিক কারণে?'
আমার সামনে দাঁড়ানো তিতি মন খারাপ করে ফেলে। আমাদের সমাজে একটা ছেলে ও মেয়ের বিবাহপূর্ব সম্পর্ককে কখনোই ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু এই মেয়েতো সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে। তাই এটাও মূল কারণ হতে পারে না।
'তাহলে...?' কিছুক্ষণ ভেবেও আর কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি। হঠাত্ মনে হল, বিষয়টা কি ধর্মীয় কোন বাধ্যবাধকতার কারণে হতে পারে? হয়ত পারিবারিক ভাবেই ধর্মীয় চাপ আসছে। আমরা বাঙালীরা আবার বেশ ধর্মপ্রাণ। হোক না সেটা যে কোন ধর্ম। প্রত্যেকেই বেশ নিষ্ঠার সাথেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করে থাকে। আর পৃথিবীর সাড়ে চার হাজার ধর্মের অধিকাংশ ধর্মই বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্কের বৈধতা দেয়নি। আর প্রধান প্রধান কয়েকটা ধর্মে বিবাহপূর্ব নারী-পুরুষের কোন সম্পর্ককেই বৈধতা দেয়নি। বিশেষত ইসলাম ধর্মেতো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে! তাছাড়া ধর্মীয় বিষয়গুলো আমার কাছে সিম্পল একটা বিষয়। রাতদিনে আমি যেমন পাঁচবার খাওয়া-দাওয়া করি তেমনি পাঁচবার সৃষ্টিকর্তার সামনে মাথাও ঝুকাই। যিনি আমাকে সৃষ্টি করে দৈনিক চব্বিশটা ঘন্টা দিয়েছেন আমি কি তাঁর জন্য পাঁচ পনেরো পঁচাত্তর মিনিট দিতে পারব না? তিতি অনেকটা আমার মতই। তাহলে ওকে বিয়ে করতে আমার এত ভাবনা কিসের? বালামার!
শেষ পর্ব কাল
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now