বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অন্ধকারের গ্রহ পার্ট---6

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Takiyan (০ পয়েন্ট)

X By জাফর ইকবাল ঠিক এ রকম সময় রুহা মহাকাশযানের এক পাশে আলো হাতে কয়েকজনকে ভেসে যেতে দেখে। অত্যন্ত ব্যস্তভাবে দ্রুতগতিতে তারা ছুটে যাচ্ছে। য়ুহা তাদেরকে ডাকতে গিয়ে থেমে গেল, মানুষগুলো খুব ব্যস্ত, এখন হয়তো তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না। য়ুহা মহাকাশযানের ভেতরে অসহায়ভাবে ঝুলে আছে, সামনে-পিছে যেতে পারছে না। একজন ক্রুয়ের দেহ ভেসে ভেসে আসছে, সেটাকে টেনে ধরে সে ছেড়ে দিতেই সামনের দিকে এগিয়ে গেল। দেয়ালের কাছে পৌঁছাতেই সে শক্ত করে দেয়ালটা খামচে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। বাম হাতটা ব্যথায় টনটন করছে, মাথার ভেতরেও যন্ত্রণার এক ধরনের অনুভূতি দপ দপ করছে। য়ুহা সেই অবস্থায় দেয়ালটা ধরে নিচে নামতে থাকে। ঠিক এ রকম সময়ে য়ুহা দেখল তার সামনে দিয়ে হিসান দ্রুত ভেসে যাচ্ছে–ভঙ্গিটা এত সাবলীল যে দেখে মনে হয় পানির ভেতর দিয়ে কোনো একটি জলচর প্রাণী ভেসে যাচ্ছে। য়ুহা গলা উঁচু করে ডাকল, হিসান। এই যে হিসান। হিসান য়ুহার গলার আওয়াজ শুনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই এক পাক ঘুরে গেল, হাত দুটো পেছনের দিকে ধাক্কা দিয়ে সে অত্যন্ত দক্ষ ভঙ্গিতে য়ুহার কাছে হাজির হলো, য়ুহা? হ্যাঁ। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার দেখেছ? পুরো মহাকাশযানটা একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। হিসান শুকনো গলায় বলল, হ্যাঁ। তুমি বিশ্বাস করবে না। আমি দেখেছি একঙন মনে হয় মারা গেছে। উপরে ভাসছে। একজন নয়, বেশ কয়েকজন। সর্বনাশ। কিছু আসে-যায় না। কেউ একটু আগে আর কেউ একটু পরে। য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, তার মানে? আমরা এই মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি। য়ুহা অবাক হয়ে বলল, কী করছ? মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি। কী বলছ তুমি? য়ুহা চিৎকার করে বলল, কী বলছ? হ্যাঁ। আমরা মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি। কেন? ক্যাপ্টেন ক্ৰবের আদেশ। এই মহাকাশযানটা হচ্ছে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি। এটা যেন কিছুতেই অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর হাতে না পড়ে। য়ুহা চিৎকার করে বলল, কিন্তু এটা রক্ষা করার জন্যে তোমরা চেষ্টা করবে না? আগেই মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলবে? সবাইকে মেরে ফেলবে? হিসান শান্ত গলায় বলল, আমার এখন সেটা নিয়ে কথা বলার সময় নেই য়ুহা। আমরা সবাই সামরিক কমান্ডের ক্রু। আমরা মরতে ভয় পাই না। য়ুহা চিৎকার করে বলল, কিন্তু আমি সামরিক কমান্ডের ক্রু না! আমি মরতে ভয় পাই। আমি তোমাদের সাথে মরতে চাই না। আমি বেঁচে থাকতে চাই। হিসান য়ুহার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মেঝেতে পা দিয়ে ভেসে যেতে যেতে বলল, বিদায় য়ুহা। আশা করছি তোমার জীবনটা সুন্দর ছিল। য়ুহা হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সত্যিই এই মহাকাশযানটাকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে? সে মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকালো। মহাকাশযানের মাঝে আবছা এক ধরনের অন্ধকার, একটা ঘোলাটে লাল আলো জ্বলছে আর নিভছে। বিশাল মহাকাশযানে অসংখ্য জঞ্জাল ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর মাঝে কয়েকজন ক্রুয়ের দেহও আছে। মানুষগুলো মারা গেছে—হিসান বলেছে তাতে কিছু আসে-যায় না। একটু পরে অন্য সবাইও মারা যাবে। কেউ আগে, কেউ পরে। য়ুহার ভেতরে হঠাৎ প্রচণ্ড ক্রোধ ফুসে উঠতে থাকে। সে চিৎকার করে ডাকল, ক্যাপ্টেন ক্ৰব! তুমি কোথায় ক্যাপ্টেন ক্ৰব? য়ুহা শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ক্রবকে কন্ট্রোলঘরে খুঁজে পেল। ঘরের মাঝখানে একটা অসম্পূর্ণ হলোগ্রাফিক স্ক্রিন মাঝে মাঝে এসে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন ক্রব অন্যমনস্কভাবে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হয় সে বুঝি মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভাল করে তাকালে বোঝা যায় সে আসলে মেঝে থেকে বেশ খানিকটা উপরে সোজা হয়ে ভাসছে! ক্যাপ্টেন ত্রুবকে দেখে য়ুহী চিৎকার করে বলল, ক্যাপ্টেন ক্ৰব। ক্যাপ্টেন ক্রুব শান্ত ভঙ্গিতে বলল, বল য়ুহা। এটা কি সত্যি যে তুমি এই মহাকাশযানটাকে উড়িয়ে দিচ্ছ? হ্যাঁ, এটা সত্যি। তুমি এই মহাকাশযানের সবাইকে মেরে ফেলবে? আমরা সামরিক কমান্ডের ক্রু। আমাদেরকে প্রয়োজনে মত শেখানো হয়েছে। তোমাদের শেখানো হয়েছে—আমাকে তো শেখানো হয়নি। সেটা তোমার দুর্ভাগ্য— না। হা চিৎকার করে বলল, তুমি এটা করতে পার না। তোমাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। ক্যাপ্টেন ক্রুব শান্ত গলায় বলল, চেষ্টা করার বিশেষ কিছু নেই। আমি সবার সাথে কথা বলেছি, সবার সাথে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই মুহূর্তে আমরা একটা গ্রহের আকর্ষণে আটকা পড়ে আছি–কালো অন্ধকার একটা গ্রহ। এই গ্রহে কোনো একটা মহাজাগতিক প্রাণী থাকে তারা আমাদের ধরে এনেছে। আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের বিশেষ কিছু করার নেই। আমি সব কিছু ভেবে দেখেছি। য়ুহা বলল, হয়তো দেখনি। হয়তো তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছ। আমি যখন বলেছিলাম মহাকাশযানটা গতিপথ পরিবর্তন করছে তখন তুমি আমার কথাও বিশ্বাস করনি। মনে আছে? তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস করতে তাহলে হয়তো অবস্থা অন্য রকম হতো! সেটা সম্ভবত সত্যি। কিন্তু আমাকে তো যুক্তির ভেতরে থেকে কাজ করতে হবে। আমি তো অযৌক্তিক কাজ করতে পারি না। য়ুহা হিংস্র গলায় বলল, হয়তো খুব জটিল অবস্থায় একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় ক্যাপ্টেন ক্রুব একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো প্রক্রিয়া আমার জানা নেই য়ুহা। তবে তুমি নিশ্চিত থাক আমি সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি আমার সাথে কথা বলনি? তুমি আমার কমান্ডের কেউ নও! তোমার সাথে কথা বলার কথা। নয়। কিন্তু হতে পারে আমি তোমাকে খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারতাম। ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভুরু কুঁচকে বলল, দিতে পারতে? হ্যাঁ। ঠিক আছে দাও দেখি। এই মহাকাশযানে এগারোজন বিদ্রোহীকে শীতলঘরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। তাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে তাদের সাথে পরামর্শ কর। তাদের নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নাও। ক্যাপ্টেন ক্ৰব আনন্দহীন এক ধরনের হাসি হেসে বলল, তোমার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে—তা না হলে কেউ এ রকম কথা বলে? তারা বিদ্রোহী গেরিলা দল, তাদের হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে দেবার জন্যে এই অভিযান–আর আমি তাদের ছেড়ে দেব? হ্যাঁ। ছেড়ে দেবে। অবশ্যই ছেড়ে দেবে— কোন যুক্তিতে? য়ুহা জ্বলজ্বলে চোখে বলল, কারণ আমরাও মানুষ, তারাও মানুষ। একটা মহাজাগতিক প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমরা মানুষেরা এক সাথে থাকব! আমাদের পার্থক্যের কথা আমরা ভুলে যাব- ক্যাপ্টেন ক্ৰব শব্দ করে হেসে বলল, এটা একটা অত্যন্ত আজগুবি প্রস্তাব। এ ধরনের কিছু করা হলে সামরিক কমান্ডে আমাকে বিচার করা হবে। না, করা হবে না। এতগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তোমাকে পদক দেয়া হবে। না। হবে না। আমি সামরিক কমান্ডের মানুষ—আমি জানি। আমাদের নিয়ম মেনে চলতে হয়। য়ুহা চিৎকার করে বলল, তোমার নিয়মের আমি নিকুচি করি! আগে মানুষের জীবন তারপর জীবন। ক্যাপ্টেন ত্রুব কঠিন মুখে বলল, না। সবার আগে নিয়ম। য়ুহা কাতর গলায় বলল, দোহাই লাগে তোমায় ক্যাপ্টেন ক্ৰব, এগারোজন যোদ্ধাকে তুমি শীতলঘরে শীতল করে রেখেছ! তাদের ব্যবহার কর। না। ক্যাপ্টেন ত্রুব মাথা নেড়ে বলল, য়ুহা। আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আর কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছি। আমার ক্রুরা এই মুহূর্তে মহাকাশযানের নির্দিষ্ট জায়গায় বিস্ফোরক লাগাচ্ছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব হাতে ধরে রাখা একটা সুইচ দেখিয়ে বলল, কিছুক্ষণের মাঝে আমি এই সুইচ টিপে পুরো মহাকাশযানটি উড়িয়ে দেব। আমি আমার জীবনের শেষ মুহূর্তটি একটু একা থাকতে চাই। নিজের সাথে শেষ বোঝাঁপড়া করতে চাই। য়ুহা স্থির দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে তাকিয়ে ছিল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভরশূন্য পরিবেশে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, য়ুহা একেবারেই পারে না, তাকে এক জায়গায় থাকার জন্যে এটা-সেটা ধরতে হয়—একটু আগে একটা ভাসমান ধাতবদণ্ড ধরেছে, সেটা এখনো তার হাতে আছে। য়ুহা একবার ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে তাকালো তারপর তার হাতের দণ্ডটির দিকে তাকালো। তার মুখের মাংসপেশি হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায়। সে দুই হাতে শক্ত করে ধাতবদণ্ডটি ধরে রেখে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়ায়। তার এ জীবনে কখনোই কোনো মানুষের গায়ে হাত তোলেনি—একজন মানুষকে কেমন করে আঘাত করতে হয় সে জানে না। বহুদিন আগে কোথায় শুনেছিল মাথার পেছনে ঘাড়ের কাছাকাছি আগত করলে মানুষ নাকি অচেতন হয়ে যায়। য়ুহা তা-ই চেষ্টা করল, পুরো ঘটনাটি ঘটল চোখের পলাকে এবং অত্যন্ত স্থূল ভাবে, এ ধরনের ব্যাপারে একেবারেই অভ্যস্ত নয় বলে আঘাত করার ধাক্কা সামলাতে গিয়ে সে নিজে শূন্যে হুঁটোপুটি খেতে থাকে। অনেক কষ্টে নিজেকে যখন সামলে নেয় তখন সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে ক্যাপ্টেন ক্রলের অচেতন দেহ ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে আবার উপরে উঠে যাচ্ছে। তার হাতে এখনো শক্ত করে একটা সুইচ ধরে রাখা আছে, এই সুইচে কিছু গোপন সংখ্যা প্রবেশ করিয়ে একটু পরে পুরো মহাকাশযানটিকে উড়িয়ে দেয়ার কথা ছিল। য়ুহা মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের কাছে পৌঁছে তার হাতের মুঠি থেকে সুইচটা খুলে নেয়। সুইচটা পকেটে রেখে সে তার গলায় ঝোলানো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটিও খুলে নিল। তারপর ক্যাপ্টেন ক্ৰকের দেহটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়, মহাকাশযানের অসংখ্য জঞ্জালের ভেতর সেটিও ঘুরপাক খেতে খেতে ভাসতে থাকে। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। এখন তাকে শীতলঘরে গিয়ে এগারোজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আগে সে কখনো এটা করেনি কিন্তু সেটা নিয়ে তার খুব একটা দুশ্চিন্তা নেই। আগে সে অনেক কিছুই করেনি। একটা ধাতবদণ্ড দিয়ে আঘাত করে সে আগে কখনো কোনো মানুষকে অচেতন করেনি। ভরশূন্য পরিবেশে চলাচল করার অভ্যাস না থাকার কারণে শীতল ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে য়ুহার বেশ অনেকক্ষণ সময় লেগে গেল। পাশাপাশি এগারোটা ক্যাপসুল সাজানো আছে, ভেতরে আবছা অন্ধকার, যন্ত্রপাতির মৃদুগুঞ্জন ছাড়া সেখানে কোনো শব্দ নেই। য়ুহা ক্যাপসুলগুলো পরীক্ষা করে, কেমন করে এর ভেতরে শীতল হয়ে থাকা মানুষগুলোকে জাগিয়ে তোলা যাবে সে জানে না। তাকে বলা হয়েছে ক্যাপসুলগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ কাজেই বাইরের সাথে যোগাযোগ কেটে দিলে ক্যাপসুল গুলো কোনো উপায় না দেখে নিশ্চয়ই ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে দেবে। বিষয়টা হয়তো বিপজ্জনক কিন্তু নিশ্চয়ই কার্যকর। য়ুহা হাতের অস্ত্রটি নিয়ে একটা একটা করে ক্যাপসুল পরীক্ষা করে রায়ীনার ক্যাপসুলের পাশে এসে দাঁড়াল। স্বচ্ছ ঢাকনার ভেতর দিয়ে রায়ীর শীতল দেহটি দেখা যাচ্ছে, দেখে মনে হয় না এটি একটি জীবন্ত মানুষ, মনে হয় পাথরের ভাস্কর্য। য়ুহা ক্যাপসুলের পাশে সুইচগুলো পরীক্ষা করে, কোনো একটি লিভার টেনে কোনো একটা সুইচ টিপে দিলেই ভেতরের মানুষটি জেগে উঠবে সে রকম কিছু খুঁজে পেল না। তাই সে ক্যাপসুলের ভেতর থেকে বের হয়ে যাওয়া নানা ধরনের টিউব, বৈদ্যুতিক তার, অপটিক্যাল ক্যাবলগুলো খুঁজে বের করল। যদি সে এগুলো কেটে দেয় তাহলে নিশ্চয়ই ক্যাপসুলটি পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে রায়ীনাকে জাগিয়ে তুলবে। বিষয়টি নিশ্চয়ই খুব বিপজ্জনক কিন্তু য়ুহার কিছু করার নেই। এই মহাকাশযানের প্রতিটি মুহূর্ত এখন প্রতিটি মানুষের জন্যে বিপজ্জনক। য়ুহা হাতের অস্ত্রটি ক্যাবলগুলোর দিকে তাক করে ট্রিগার টেনে ধরলঘরের ভেতর একটা বিস্ফোরণের শব্দ হয়, কালো ধোঁয়া এবং আঁঝালো গন্ধে সারা ঘর ভরে ওঠে। য়ুহা কাশতে কাশতে একটু পেছনে সরে এলো। চেষ্টা করেছে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটাতে কিন্তু তারপরও সেটি পুরো ঘরটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে কৌতূহলী হয়ে ক্রুরা এখানে চলে এলে একটা ঝামেলা হয়ে যাবে। য়ুহা একটা ক্যাপসুলের পেছনে লুকিয়ে থেকে নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সে কাউকে দ্রুত ভেসে আসতে দেখল না দেখে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করে। রায়ীনার ক্যাপসুলের ওপর একটা লাল বাতি নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে জ্বলতে এবং নিভতে শুরু করেছে। সাথে সাথে একটা কর্কশ এলার্ম বাজতে থাকে। য়ুহা ক্যাপসুলটির ভেতরে তাকালো, হালকা একটা সাদা ধোয়া ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে সে এখনো জানে না। রায়ীনার দেহটি সত্যি সত্যি জেগে উঠবে না কী প্রক্রিয়াটি শেষ করতে না পারার কারণে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় ছটফট করে মেয়েটির মৃত্যু ঘটে যাবে সেটি সে এখনো জানে না। ক্যাপসুলে হেলান দিয়ে য়ুহা নিঃশব্দে বসে থাকে। একজন মানুষের দেহ চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা থেকে জীবনের উতায় ফিরিয়ে আনতে নিশ্চয়ই একটু সময়ের দরকার। য়ুহা দেখতে পেল খুব ধীরে রায়ীনার মুখের রং ফিরে আসছে। এক সময় সে দেখতে পায় তার হৃৎস্পন্দন শুরু হয়েছে এবং খুব ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসের সাথে সাথে তার বুক উপরে উঠতে এবং নিচে নামতে শুরু করেছে। য়ুহা ঠিক বুঝতে পারল না, সে কী ক্যাপসুলের উপরের ঢাকনাটি খুলবে না কি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে। রায়ীনা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। জ্ঞান ফিরে পাবার পর সে তার হাতের আঙুলগুলো চোখের সামনে নিয়ে এসে সেদিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক অচেতন হবার আগে সে যে জিনিসটি নিয়ে ভাবছিল দেখে মনে হয় সে ঠিক সেই জিনিসটি নিয়েই ভাবতে শুরু করেছে। এর মাঝখানে যে একটি বড় সময় পার হয়ে গেছে মনে হচ্ছে সে সেই বিষয়টিই বুঝতেই পারছে না। য়ুহা ক্যাপসুলের ঢাকনার ওপর ঝুঁকে পড়ে হাত দিয়ে শব্দ করল, রাহীনা তখন খানিকটা হতচকিতের মতো মাথা ঘুরিয়ে তাকালো, তারপর উঠে বসার চেষ্টা করল। য়ুহা উপরের ঢাকনাটি খুলে দিতেই ভেতর থেকে এক ব্যালক ঠান্ডা বাতাস বের হয়ে আসে। রায়ীনা য়ুহার দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে, তাকে দেখে মনে হয় সে ঠিক কিছুই বুঝতে পারছে না। য়ুহা নিচু গলায় ডাকল, রায়ীনা– রায়ীনা চোখের কাছে হাত নিয়ে য়ুহাকে দেখার চেষ্টা করতে করতে বলল, তুমি কে? আমি য়ুহা। আমার কী হয়েছে? আমি ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন? তুমি এই মাত্র শীতলঘর থেকে জেগে উঠেছ তাই। য়ুহা সাহস দিয়ে বলল, কিছুক্ষণের মাঝেই তুমি পুরোপুরি জেগে উঠবে। রায়ীনা তরল গলায় বলল, আমার নিজেকে খুব হালকা লাগছে–মনে হচ্ছে আমি ভাসছি। য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, আমরা এখন ভরশূন্য পরিবেশে আছি তাই তোমার নিজেকে হালকা লাগছে। রায়ীনা খানিকটা অপ্রকৃতস্থের মতো হাসার শব্দ করে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও-আমি ভেসে বেড়াব! ভরশূন্য পরিবেশে ভেসে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। মেয়েটা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কথাবার্তায় এখনো খানিকটা অসংলগ্ন। য়ুহা রিয়ানার হাত ধরে তাকে খুব সাবধানে ক্যাপসুলের ভেতর থেকে বের করে আনে। রায়ীনা দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ভারশূন্য পরিবেশে শুয়ে পড়ার ভঙ্গি করতে করতে আদুরে গলায় বলল, আমি কত দিন ঘুমাইনি আমাকে একটু ঘুমাতে দাও! য়ুহা রিয়ানার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, রিয়ানা, আসলে তুমি অনেক দিন থেকে ঘুমাচ্ছ। সত্যি কথা বলতে কি তোমার এখন ঘুম থেকে ওঠার সময়। খুবই জরুরি, তুমি জেগে ওঠার চেষ্টা করো। জেগে উঠব? হ্যাঁ। কেন জেগে উঠব? এই মহাকাশযানটির এমন খুব বড় বিপদ। তুমি তাড়াতাড়ি জেগে উঠো, আমি তোমার সাথে এটা নিয়ে কথা বলতে চাই রায়ীনা। রায়ীনা ভুরু কুঁচকে য়ুহার দিকে তাকিয়ে মনে হয় পুরো বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে। ঠিক এ রকম সময় য়ুহা দরজার কাছে মৃদু একটা শব্দ শুনতে পায়। সে মুখ তুলে তাকাতেই চমকে ওঠে। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের সাথে কমান্ডের বেশ কয়েকজন ক্রু বাতাসে ভেসে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সবাই একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে তার দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। য়ুহা কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না, শুনতে পেল, কমান্ডের একজন হিংস্র গলায় বলছে, হাতের অস্ত্রটা ছেড়ে দিয়ে দুই হাত শূন্যে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াও য়ুহা। য়ুহা এক মুহূর্তের জন্যে চিন্তা করল। সে কী একবার শেষ চেষ্টা করবে? চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, এতজন সশস্ত্র অভিজ্ঞ সামরিক কমান্ডের ক্রুয়ের বিরুদ্ধে সে একা কিছুই করতে পারবে না। তাই সে অস্ত্রটা ছেড়ে দিল, সাথে সাথে সেটা ভাসতে ভাসতে উপরে উঠে গেল। য়ুহা হাত দুটো উপরে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। কমান্ডের মানুষটি এবারে রায়ীনাকে লক্ষ করে বলল, তুমিও দুই হাত শূন্যে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াও, তা না হলে আমি তোমাকেও হত্যা করতে বাধ্য হব। রায়ীনা মানুষটির দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল, তুমি আমার সাথে এ রকম রাগ হয়ে কথা বলছ কেন? য়ুহা অনেকটা কৈফিয়ত দেয়ার মতো করে বলল, আসরোয়ানা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি—এখনো খানিকটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে আছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব শীতল গলায় বলল, য়ুহা। তুমি কী জান, তোমাকে যেন আমি কঠিন একটা শাস্তি দিতে পারি শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্যে আমি মহাকাশযানটাকে আরো কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখব? য়ুহা কোনো কথা বলল না, শুধু রায়ীনা একটা বাচ্চা মেয়ের মতো খিল খিল করে হেসে উঠল। যেন ক্যাপ্টেন ত্রুব খুব মজার কথা বলেছে। য়ুহা শেষ পর্যন্ত আর অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে না, কারণ তাকে মহাকাশযানের দেয়ালে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার পাশেই রায়ীলা, তাকেও একইভাবে বাঁধা হয়েছে। কমান্ডের ছয়জন ক্রু তাদের দিকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তাক করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব কাছাকাছি একটা টেবিলের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন ক্রর দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে শেষ পর্যন্ত একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি আমার দীর্ঘ জীবনে কখনোই এ রকম একটি ঘটনা ঘটতে দেখিনি। য়ুহা, তুমি আমার নির্দেশ পুরোপুরি উপেক্ষা করে আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে একজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলেছ? য়ুহা বলল, তুমি যদি আমার কথা শুনতে তাহলে আমার তোমাকে অচেতন করার প্রয়োজন হতো না। আর একটা বিদ্রোহীকে বিপজ্জনকভাবে জাগিয়ে তুলতে হতো না। তোমাকে আঘাত করার জন্যে আমি দুঃখিত। একজন মানুষকে অচেতন করার জন্যে তাকে কত জোরে আঘাত করতে হয় আমার জানা নেই তাই সম্ভবত, আঘাতটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক জোরে হয়ে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন ত্রুব দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, তোমার দুঃসাহস দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি য়ুহা। তোমাকে সে জন্যে শাস্তি পেতে হবে। অত্যন্ত কঠিন একটা শাস্তি।। মহাকাশযানটিকে ধ্বংস করে সবাইকে মেরে ফেলবে, তুমি এর মাঝে আমাকে আলাদা করে কী শাস্তি দেবে? এর মাঝেও তোমাকে আলাদা করে শাস্তি দেয়া সম্ভব। সময় হলেই তুমি সেটা দেখবে। য়ুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এ রকম চরম বিপদের মাঝেও তুমি একেবারে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার উপরে উঠতে পারছ না দেখে আমি খুব অবাক হয়েছি। ক্যাপ্টেন ক্ৰব, আমি তোমার জন্যে করুণা অনুভব করছি, তুমি নিশ্চয়ই খুব অসুখী একজন মানুষ। আমি আমার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ নিয়ে কথা বলতে আসিনি। য়ুহা ক্যাপ্টেন ত্রুবকে বাধা দিয়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করি আমার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি সঠিক। এগারোজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলে তাদের সাথে পরামর্শ করে তোমার একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। তোমার নিজের নেয়া সিদ্ধান্তটি ভুল। পুরোপুরি ভুল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অন্ধকারের গ্রহ পার্ট---6

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now