বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১.
:ওই যাবি নাহি???
:না যামুনা।
:কেন যাবিনা???চল...১০০ দিমুনে।
:কইলাম না যামুনা!!জ্বালাইস না।
:এহহ...হিজড়া মাগী।।ভাব দেহাইস না।
:ওই কুত্তার বাচ্চা।।তুই গেলি নাকি বাকিগুলারে
ডাকমু???
:যাইতাসি যাইতাসি...তেজ দেহাইসনা।।তরে মুই দেইখা
লমুনে।
:খাড়া দেহি...কতো দিবি???
:কইলামনা ১০০ দিমু...
:হুর...১০০ দিয়া কিসু হয় নাকিরে হালা!!!
:তয় কি ৫০০ দিমু নাহি???৫০০ দিতে পারলে কি আর
হিজড়া খুঁজি নাহি মুই???
:নারে...১০০ দিলে হইবনা...১৫০ দিস।।
:আইচ্ছা তাইলে চল।।ভালামতো উসুল কইরা লমু
তাইলে।
:কি দিয়া যাবি???
:কেন???মোর রিশকা আসেনা!!!
:আইচ্ছা চল...
রিকশা চলছে বেশ দ্রুতগতিতে।বিসটি বসে আছে
হুড ফেলে।আজ তার কোন কামাই হয়নি,তাই
যাচ্ছে এই রিকশাওয়ালার সাথে,নাহলে যেতনা সে।
টাকা না পেলে মাসী আজ মারবে এটা সে
ভালমতই জানে।শরীরটা বেশ খারাপ।প্রচণ্ড জ্বর
উঠেছে।তার ওপর বাতাস সাঁই সাঁই করে কান ছুঁয়ে
ছুটে যাচ্ছে,জ্বর আরও বাড়বে বোধহয়।১৫০
টাকা দিলেও মাসী একটু বকা-ঝকা করবে কিন্তু
বেশী কিছু বলবে না।কিন্তু রিকশাওয়ালা টা
যেভাবে বার বার ঘুরে ঘুরে তাকে দেখছে
আর জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করছে,তাতে মনে
হয় সে আজ তার ১৫০ টাকা খুব ভালভাবে উসুল
করতে বদ্ধপরিকর।কেন যে সে
চম্পা,বিন্তি,চামেলির মতো জোর করে টাকা
আনতে পারেনা!!!কয়েকটা দোকানে গিয়ে
গাঁয়ে হাত দিতে দিলেই মানুষ টাকা দিয়ে
দেয়,বেশী হলে একটু ধস্তা-ধস্তি করতে হয়।
এখন তো আবার অনেকে ভয়ের চোটেই টাকা
দিয়ে দেয়।কিন্তু বিসটি এগুলো পারেনা।চামেলি
তো এখন ছোট ছোট ছেলেদের গায়েও
হাত দেয়া শুরু করেছে।ওরা নাকি এত ভয় পায় যে
সাথে সাথে পকেট এ যা থাকে তাই ই দিয়ে
দেয়।মাসী কতবার বকলো তাও ও শুনেনা।কিন্তু
বিসটি কে দিয়ে এগুলো কিছুই হয়না,তাই মাঝে
মাঝে চামেলি,চম্পা তাদের ভাগ থেকে কিছু টাকা
বিসটি কে দেয়।কিন্তু আজ ওদের ও কামাই হয়নি
তেমন,তাই আসতে হল।বিসটি বুঝতে পারেনা এই
মানুষেরা সকালের আলোয় তাদের দেখলে দূর
দূর করে তাড়িয়ে দেয় কিন্তু আবার রাতে নিজের
বউ-বাচ্চা ফেলে একটু ভিন্ন স্বাদ পেতে তাদের
কাছে চলে আসে কেন??এখন তাদের ডিমান্ড ও
বেড়ে গেছে।কারণ তাদের রেট ওই
পতিতাগুলোর চেয়ে কম।তাই এখন প্রায় ই
এগুলো করতে হয়।সুরাইয়া মাসী ছাড়া অন্য কেউ
হলে তাকে কবে তাড়িয়ে দিতো,একে তো
সে সবার চেয়ে কম পয়সা পায়,তার ওপর মাঝে
মাঝে রাতে আসেও অনেক দেরি করে।সুরাইয়া
মাসীর প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ বিসটি।সে না থাকলে
হয়তো না খেয়ে কোথাও মরে পড়ে
থাকতো সে।বিসটি দেখে রাস্তায় রাস্তায় কতো
পোস্টার লাগানো,সামনে মনে হয় নির্বাচন।নির্বাচন
থাকলেও কি,না থাকলেও কি।বিসটির কিছুই যায়
আসেনা।দেশের মানুষ যাও কিছু সুযোগ-সুবিধা
পায়,কিন্তু তারা তো কিছুই পায়না।তাদের কোন
অধিকারই নেই।ছোটবেলায় পড়েছিল মৌলিক অধিকার
৫ টি।কিন্তু তার একটারও এখন কোন হদিস পায়না
সে।কারণ তারা অমানুষ???এসব ভাবতে ভাবতেই
রিকশা থেমে যায়,রিক্সাওয়ালা হিড়হিড় করে বিসটি কে
টেনে নামায়............
২
সুরাইয়া মাসীর কোঠা।খিলগাঁ ফ্লাইওভার এর
নীচে,শাহজাহানপুর এ খাজা বাবার মাজারের ঠিক
পেছনেই।৩০-৩৫ জন হিজড়া বাস করে এখানে।
সুরাইয়া মাসী বা খালা...৫৫ থেকে ৫৭ বছর হবে
বয়স।মুখে সবসময় পান থাকবেই তার।সুরাইয়া মাসী
একসাথে ২ টা পান মুখে দেয় তারপর ঘণ্টার পর
ঘণ্টা চাবাতেই থাকে।মাঝে মাঝে গিলে ফেলে
ভুল করে,তখন আবার ঢেঁকুর দিয়ে পান মুখে
এনে আবার চাবাতে থাকে।সুরাইয়া মাসী নাকি
এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় এসেছিলো।তার বাবা-মা
নাকি মাসী কে ঘর থেকে বের করে
দিয়েছিলো।১৩-১৪ বছর বয়সেই তার বাবা-মা
বুঝতে পারে যে তাদের ছেলে অন্যরকম।
পাড়া-প্রতিবেশী,আত্মীয়-স্বজন সবাই তাদের
কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো,তার ওপর
পাঁক-হানাদারদের ভয়,তাই তারা মাসী কে বের
করে দেন।সুরাইয়া মাসী ও বুঝতে পারে যে
সে একজন হিজড়া।তারপর সেই সময় মাসী কে
এখানে নিয়ে আসে এই কোঠার আগের যে
মাসী ছিল সবিতা মাসী তিনি।সুরাইয়া মাসীর আসল নাম
কেউ জানেনা,জানতেও চায়না কেউ কখনো।
মাসী পরম ভালোবাসায় আগলে রেখেছে এই
কয়জন হিজড়া কে।এদের বেশির ভাগকেই ঘর
থেক বের করে দেয়া হয়েছে।নিষ্ঠুর
পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা এদের চেয়ে কেউ বেশী
দেখেনি তা বলার অপেক্ষাই রাখেনা।তাই এখন তারা
নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে
চলছে।কেউ কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের দৈহিক
চাহিদা মিটিয়ে টাকা কামায় আর নাহলে নিজেদের
হিজড়া হওয়া কে পুঁজি করে মানুষের কাছ থেকে
তা ছিনিয়ে নেয়।আর কেউ নিজেদের কে মানুষ
বলে বাকি সবার মতো বাঁচতে চায়।কিন্তু
পৃথিবীতে মানুষরূপী অমানুষরা তাদের সেই আশা
কখনো পূরণ হতে দেয়নি,দেবেওনা।কারণ তারা
হিজড়া,তারা পশুর চেয়েও অধম,তারা অমানুষ???
....................................................................................................................................................................................................................................................................................
বিসটি আস্তে আস্তে তার চোখের পাতা
খুললো...সবকিছু অন্ধকার লাগছে।।কোন তীব্র
আলো নেই চারপাশে...শুধু নীরবতা।।তার সামনে
শুধু কিছু ছায়া,কিছু নিভু নিভু আলো।লাল
আলো,নীল আলো,হলদে আলো ও আছে।
কিছু ছায়া ওঠা নামা করছে।জোনাকি পোকার আওয়াজ
ও পাচ্ছে,কিন্তু দেখতে পারছেনা।মাতাল হাওয়া
বইছে...বিসটির মনে হচ্ছে সে যেন শূন্যে
ভাসছে।উড়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও,হয়তো
মেঘেদের দেশে।যেখানে বিসটির মূল ঠিকানা।
বিসটি উঠে বসল,তার শাড়িটা রক্তে ভিজে গেছে
পেছন দিক দিয়ে।সেই পরিচিত অনুভূতি টা আবার
হলো,ছোটবেলায় যেই অনুভূতিটা হয়েছিলো
তার।।তার নাম ছিল তখন শ্রাবণ।তারপর এখানে আসার
পর হলো বৃষ্টি,আর এখন তো বলতে বলতে
বিসটি হয়ে গেছে।পাশে পড়ে থাকা ময়লা,দলা
পাকানো ১০০ টাকার নোট টা হতাশ ভঙ্গিতে তুলে
নিয়ে হাটতে থাকে সে।ছোটবেলার কথাগুলো
আজ খুব মনে পড়ছে তার.........
৩.
১২ বছর আগে......
জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে শ্রাবণ।আকাশের
চেয়ে আজ বোধহয় শ্রাবণের চোখে
শ্রাবণধারা বেশী জোরে ঝরছে।ঝাপসা
চোখে দেখছে শ্রাবণ,মাঠে কতোগুলো
ছেলে কাদায় মাখামাখি হয়ে ফুটবল খেলছে,ওর
স্কুলের এক বড় ভাইয়া রাহাত ও খেলছে ওখানে।
শ্রাবণকে ডেকেছিল রাহাত কিন্তু শ্রাবণ নিচু হয়ে
লুকিয়ে পড়েছিল সাথে সাথে।শ্রাবণ পড়ে দনিয়া
বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে,মাত্র ক্লাস এইট এ উঠেছে।
শ্রাবণের রোল এবার ৫ হয়েছে কিন্তু তাও
কেউ খুশিনা।আব্বা ওকে ওর রুমে ২ দিন ধরে
আটকে রেখেছে কেন যেন !!! শ্রাবণ
অনেক কান্না করেছে কিন্তু আব্বা দরজা খুলেনি।
ওকে ঠিকমতো খেতেও দিচ্ছেনা।মা শুধু একটু
পর পর এসে জানালা ধরে শ্রাবণকে এক পলক
দেখে আবার দৌড়ে চলে যাচ্ছে । শ্রাবণ বুঝতে
পারছেনা ওর কি দোষ!!ও তো শুধু ওর আপুর
সালওয়ার-কামিজ পড়েছিল আর ঠোঁটে একটু
লিপস্টিক দিয়েছিলো,এর পর আব্বা দেখে
ফেললে ওকে অনেক মারধর করে,তারপর
থেকেই ওকে আটকে রেখেছে।রাহাত ভাইয়া
শ্রাবণ কে কয়েকদিন আগে বলেছিল-শ্রাবণ,তুমি
মেয়েদের ড্রেস পড়লে তোমাকে যা
লাগবেনা,আর ঠোঁটে একটু লিপস্টিক দিলে তো
পুরো রাজকন্যার মতো লাগবে।তাই শ্রাবণ একটু
দেখতে চেয়েছিল তাকে কেমন লাগে,কিন্তু
আব্বা দেখে কেন যেন খুব রাগ করেছে।
শ্রাবণ রাহাত কে খুব পছন্দ করে,রাহাত ও করে।
স্কুল এ প্রায় ই রাহাত ভাইয়া তাকে এটা সেটা কিনে
দেয়,একদিন তো রাহাত ভাইয়ার একটা ফ্রেন্ড
শ্রাবণ কে হিজলা হিজলা বলায় রাহাত ভাইয়া সেই
ছেলেটাকে যেই মার দিয়েছিলো । এরপর
থেকেই শ্রাবণ রাহাত ভাইয়াকে খুব পছন্দ করে।
শ্রাবণ কে প্রায়ই ওর বন্ধুরা,স্কুলের ছেলেরা
হিজলা,হিজলা বলে।শ্রাবণ কিছু বলেনা,ওর কিছু
বলতে ইচ্ছা করেনা।শ্রাবণ একদিন হিজলা
দেখেছিলো,ওর আব্বুর সাথে বাজারে
গিয়েছিলো তখন এক হিজলা ওর কাছে এসে
ওকে জড়িয়ে ধরে,আর বলে যে-যাবি নাকি
আমগো লগে???শ্রাবণ ওই হিজলা কে দেখে
অনেক ভয় পেয়েছিলো।হিজলাটার গা থেকে
খুব দুর্গন্ধ আসছিলো আর তার ওপর হিজলা টা তার
পান খাওয়া মুখ দিয়ে ওকে চুমু ও দিয়েছে।ওর
আব্বা এসে ওকে টান মেরে সরিয়ে নেয় কিন্তু
হিজলা টা ওর আব্বার প্যান্ট ধরে টান দেয়।শ্রাবণ
কে নিয়ে তখনই শ্রাবণের আব্বা দৌড়ে চলে
আসে।ওইদিন ও আব্বা তাকে খুব
মেরেছিল,কেন মেরেছিল তাও সে বুঝেনি,শুধু
চুপ করে কেঁদেছে।শ্রাবণের কাদতে ভালো
লাগেনা কিন্তু তাও ওর সারাদিন কাদতে হয়।শ্রাবণ
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,আপুর লিপস্টিক টা
এখন ও ওর রুমে।শ্রাবণ আবার হাতে লিপস্টিক টা
তুলে নিলো।তার কেন যেন লিপস্টিক দিতে খুব
ভালো লাগে।
শ্রাবণের মা রাহেলা বেগম জানালা দিয়ে
দেখছেন তার ছেলে আবার লিপস্টিক দিচ্ছে।তার
খুব কান্না পাচ্ছে।শ্রাবণের আব্বা যদি আবার
দেখে এটা তাহলে শ্রাবণ কে হয়তো বের ই
করে দেবেন ঘর থেকে।তার ছেলে কেন
এমন হল???কয়েকদিন আগে তার বড় মেয়েটার
বিয়ে ভেঙ্গে গেলো শ্রাবণের জন্য।বরপক্ষ
নাকি খবর পেয়েছে মেয়ের ভাই হিজড়া।রাহেলা
বেগম মানতেই চান না যে তার ছেলে অন্যরকম।
কিন্তু শ্রাবণের এইসব কাজ-কারবার দেখে তার
আর সহ্য হচ্ছেনা।হঠাৎ রাহেলা বেগম তার
পেছনে কারও দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলেন।
দেখলেন তার স্বামী রফিক সাহেব হাতে চাবি
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।নিশ্চয়ই শ্রাবণের রুমের
দরজা খুলতে এসেছিলেন,কিন্তু আবার চাবি পকেট
এ ঢুকিয়ে ফেললেন আর বললেন......
:রাহেলা,তোমাকে শক্ত হতে হবে।আর কোন
উপায় নেই এখন।
:না,তোমাকে আমি এত বড় পাপ করতে দেবনা।
:বোঝার চেষ্টা করো।আমাদের আরও ৩ টি
সন্তান আছে।শ্রাবণের জন্য তাদের জীবন আমি
নষ্ট করতে পারবোনা।
:না,প্লিস।ও ঠিক হয়ে যাবে।তুমি দেখো।আমরা
ভালো ডাক্তার দেখাবো।শহরে নিয়ে যাবো
ওকে।
:আমরা অনেক চেষ্টা করেছি,অনেক টাকা
ঢেলেছি।কিন্তু এখন লাভ হচ্ছেনা কিছুই।আমি আর
কিছু শুনতে চাইনা।আমি যা বললাম তাই হবে।আমারও
কষ্ট হবে,ও আমারও ছেলে,কিন্তু একজনের
জন্য বাকি ৩ জনের জীবন নষ্ট হতে দেবনা
আমি।কখনোই না।যাও শ্রাবণকে একটু আদর করে
আসো।
রাহেলা বেগম তার স্বামীর চোখের দিকে
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন কিন্তু রহিম সাহেব তার
চোখ নামিয়ে ফেললেন...............
শ্রাবণ তার মাকে জড়িয়ে ধরে আছে এখন।মা
কেন যেন অনেক জোরে জোরে কাঁদছে।
শ্রাবণের মনে হল হঠাৎ যে তার মা হয়তো আর
কখনো তাকে এভাবে আদর করে জড়িয়ে
ধরবেনা,আর তার কপালে চুমু খাবেনা। শ্রাবণের
চোখ ফেটেও এক ফোঁটা নোনা জল টপ
করে পড়লো তার মায়ের আঁচলে।শ্রাবণ আরও
শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার মাকে।অনেক শক্ত
করে,যাতে কেউ তার মার কাছ থেকে তাকে
আলাদা না করতে পারে............
৪.
ফালতু বৃষ্টি থামছেইনা।শ্রাবণের আর ভালো
লাগেনা এত বৃষ্টি।কতক্ষণ ধরে বসে আছে কিন্তু
আব্বা এখন ও আসছেনা।আব্বা ওকে পার্ক এর
বেঞ্চিতে বসিয়ে রেখে বলে গেছে যে-
এখানে বসে থাকো,আমি আসছি একটু পর।কিন্তু
আব্বা এখন ও আসছেনা।সন্ধ্যা হয়ে
গেছে,শ্রাবণের খুব খিদে ও লেগেছে।তার
ওপর বৃষ্টিতে ভিজে বেশ ঠাণ্ডাও লাগছে এখন।
তার ব্যাগপ্যাক তাও ভিজে গেছে।শ্রাবণ ব্যাগপ্যাক
টা খুলে দেখল ভেতরে কিছু স্যান্ডউইচ আছে
একটা বক্সে । শ্রাবণ একটানে সবগুলো খেয়ে
ফেলল।শ্রাবণ বুঝতে পারছেনা এটা কোন
জায়গা,এখানে আগে কখনো আসেনি।দুপুর বেলা
আব্বা বলল হঠাৎ যে-চল বেড়াতে যাই।তাই সে
চলে এসেছে।আসার সময় মা অনেক কান্না
করেছে।শ্রাবণ কিছুই বোঝেনি,অবশ্য মা সারাদিন
ই এখন কান্না করে।উহ...আব্বা যে কেনো
এখন ও আসছেনা?? আরে...ওই যে একজন
এদিকেই আসছে,নিশ্চয়ই আব্বা।কিন্তু সামনে
আসতেই শ্রাবণ চিনতে পারল যে ওটা রাহাত ভাইয়া।
:আরে শ্রাবণ,তুমি এখানে কি করো??এই বৃষ্টির
মধ্যে??
:কিছুনা।আব্বা আমাকে এখানে রেখে একটা কাজে
গেছে।কিন্তু এখন ও আসছেনা।আর আমি এই
জায়গা চিনিও না তাই যেতেও পারছিনা।
:ও,তাহলে চল।আমার বাসা কাছেই।একটু ফ্রেশ
হয়ে নাও তারপর নাহয় আমি ই দিয়ে আসবো
তোমাকে তোমার বাসায়।
:না...এর মধ্যে যদি আব্বা এসে পড়ে??
:আরে সমস্যা নেই।আমার বাসার জানালা দিয়েই
দেখা যায় এই জায়গা।তোমার আব্বা আসলে দেখা
যাবে।চল এখন।
:আচ্ছা,চল।
:তুমি হাটতে থাকো।আমি একটু আসছি।
:আচ্ছা।
৩০ মিনিট পর.........
শ্রাবণ রাহাত এর রুমে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে
আছে।রাহাত ভাইয়ার বাবা মা বাসায় নেই।তার একটু ভয়
হচ্ছে,আবার ভালো ও লাগছে যে রাহাত ভাইয়া সব
জায়গায় কিভাবে নায়কের মতো এসে পড়ে।হঠাৎ
শ্রাবণ কয়েকজনের গলার আওয়াজ শুনতে পায়।
সে আস্তে আস্তে রাহাতদের ড্রইং রুমের
দিকে যায়।সেখানে গিয়ে দেখে তাদের
স্কুলেরই রাহাত ভাইয়ার কয়েকটা ফ্রেন্ড
এসেছে,তাদের মধ্যে ওই ছেলেটাও আছে
যে তাকে হিজলা বলেছিল।শ্রাবণকে দেখে
ওরাও বেশ অবাক হয়েছে।ওই ছেলেটা রাহাত
কে বলল-কীরে তুই না কইলি কি মাল আসে,এইডা
দেখি হিজলা ডা।রাহাত বলল-আরে ব্যাটা মাঝে মাঝে
ডিফারেন্ট কিসু টেস্ট কইরা দেখতে হয়।এই কথা
শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
শ্রাবণ দেখল রাহাত ভাইয়ার চেহারায় কেমন যেন
নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠেছে।সবাই ধীরে ধীরে
তার দিকে এগিয়ে আসছে।শ্রাবণ কিছু বোঝার
আগেই ৪-৫ জন মিলে তাকে ধরে
ফেলল.........
শ্রাবণ আস্তে আস্তে তার চোখের পাতা
খুলল...সবকিছু অন্ধকার লাগছে।।কোন তীব্র
আলো নেই চারপাশে...শুধু নীরবতা।।তার সামনে
শুধু কিছু ছায়া,কিছু নিভু নিভু আলো।লাল
আলো,নীল আলো,হলদে আলো ও আছে।
কিছু ছায়া ওঠা নামা করছে।জোনাকি পোকার আওয়াজ
ও পাচ্ছে,কিন্তু দেখতে পারছেনা।মাতাল হাওয়া
বইছে...শ্রাবণের মনে হচ্ছে সে যেন
শূন্যে ভাসছে।উড়ে যাচ্ছে দূরে
কোথাও,হয়তো মেঘেদের দেশে।যেখানে
শ্রাবণের মূল ঠিকানা।
তারপর তীব্র আলোর ঝলকানি দেখল,দেখল
কয়কজন মানুষ তাকে ঘিরে রয়েছে,মানুষগুলো
হিজলা,শ্রাবণ দেখেই বুঝল।তার নাকে এসে
লাগলো সস্তা আতরের গন্ধ,তার সাথে মিশে
গেছে পচে যাওয়া বেলি ফুল আর পানের মিষ্টি
জর্দার গন্ধ।এই কটু গন্ধ এক ধাক্কায় শ্রাবণের
চৈতন্য ফিরিয়ে আনলো।শ্রাবণ উঠে বসতে
পারছেনা।খুব ব্যথা করছে তার শরীর।হিজলাদের
মধ্যে বুড়ো মতো একজন বলে উঠলো-
:ওই,তুই দেহি মাইগ্যা পোলা...তরে কি তর বাপ-
মায়ে বাইর কইরা দিসেনি???
:না,আমার আব্বু আমাকে বসতে বলে কোথায়
যেন চলে গেলো,আর আসলোনা।আমাকে
খুঁজছে নিশ্চয়ই এখন।
:হা হা । বুঝজী।তর বাপে আর আইবনা।তরে ফালাইয়া
গেসেগা।
:না,আমাকে ফেলে যাবে কেন??আমাকে আমার
আব্বার কাছে নিয়ে যান।
:কেমনে নিয়া যামু।তরে তো ষ্টেশন থেইকা
লইয়া আইসি।চিন্তা করিসনা।আমগো লগে থাকবি অহন
থেইক্কা।আমরা তর মতই,হিজড়া।অমানুষ।
শ্রাবণ কেঁদে দিলো,সে কিছুই বুঝতে
পারছেনা,শুধু বুঝতে পেরেছে যে তার আর
তার মা-বাবার কাছে যাওয়া হবেনা।বুড়ো মতোন
হিজড়া টা শ্রাবণ কে বুকে জড়িয়ে ধরল আর বলল-
তুই অহন থেইক্কা আমার মাইয়া।আমি ই তরে
পালমু।“মাইয়া” কথাটা শুনে শ্রাবণের বুক কেঁপে
উঠলেও সে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে
ধরে।দুজনে হু হু করে কাঁদতে থাকে আর বাকি
হিজড়া রাও তাদের আশে-পাশে বসে করুন স্বরে
বিলাপ করতে থাকে।তাদের সবার জীবনই তো
অনেকটা এরকম।তাদের বিলাপ এর শব্দে পরিবেশ
ভারী হয়ে ওঠে আর আশপাশের মানুষ
হিজড়াদের কোঠা থেকে তাদের বিলাপ শুনে
ঘরের জানালা লাগিয়ে দেয়,মনে হয় যেন
কুকুরের ডাক শোনা ও এর চেয়ে শ্রেয়...
৫.
তখন থেকে শ্রাবণ সুরাইয়া মাসীর কোঠায়,১২
বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে।শ্রাবণ,বিসটি
হয়ে গেছে,এখন সে বিভিন্ন জায়গায় নাচ-গান
করে টাকা কামায়।বিসটি,চামেলি,চম্পারা এখন কোথাও
বাচ্চা হলে সেখানে যায়,মানুষের বিয়েতে
যায়,সেখানে গিয়ে নাচ গান করে টাকার জন্য।
কেউ টাকা দেয়,কেউ দেয়না বরং গাঁয়ে হাত
দেয়,গালি-গালাজ করে।বিসটির প্রথম প্রথম অনেক
খারাপ লাগতো কিন্তু এখন সব সয়ে গেছে।এখন
তো বিসটির মতো কেউ খিস্তি-খেউর দিতেই
পারেনা।বিসটির গানের গলাও বেশ ভালো।সে যখন
কোথাও নাচ গান করে তখন কারও চোখ সরেনা।
ওই তো সেদিন এলাকার এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে
বিসটির সে কি গান আর নাচ.........
আইসো
বন্ধু বইসো পাশে......
দুখ দিওনা হৃদয়
মাঝে......
এ হৃদয় শুধু
তুমায় দিবো আর কাউকে দিবোনা...
না বন্ধু...কাউকে
দিবোনা...ও বন্ধু কাউকে দিবোনা.........
বিসটি ওদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী,তাই ওর
পিছে মাঝে মাঝেই কিছু বখাটে লাগে।এখন
যেমন মাজারের খাদেমের ছেলে জুম্মন আর
তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা ওর পিছনে লেগেছে।এর কারণ
হচ্ছে সেদিন ওই বিয়ে বাড়িতে ওই ছেলেগুলা
ছিল।ওরা বিসটি কে নিয়ে একটু বেশী ধস্তা-ধস্তি
শুরু করলে বিসটি জুম্মনের মুখে থুতু দিয়ে
পালিয়ে আসে।তখন জুম্মন বলেছিল-বিসটি
মাগী,তরে একবার পাইলে আমি দেইক্ষা লমু...।
এরপর থেকে বিসটি সবসময়ই দলের সাথে সাথে
যায় সবজায়গায়।কখনো একা হয়না......
সুরাইয়া মাসী মুখ গোমড়া করে বসে আছে।তার
খুব ভয় লাগছে বিসটির জন্য।জুম্মন রে থুতু দেয়ার
পর বিসটিকে ওভাবে মারা ঠিক হয়নি,এটাই তার মাথায়
ঘুরছে কখন থেকে। পয়সা পায়নি হয়তো আজ
তাই নিশ্চয়ই মারের ভয়ে দেরি করছে।
চম্পা,চামেলি ওরা এসে পড়েছে কিন্তু ওরা নাকি
বিসটিকে দেখেনি।তার মেজাজ আস্তে আস্তে
চড়ে যাচ্ছে।চম্পা বসে বসে তার ছেঁড়া ব্লাউস
সেলাই করছে ,তার ও এক ই চিন্তা।ভাবছে বিসটি
কে একা ফেলে তাদের ওই দোকানে যাওয়া
ঠিক হয়নি।মাসী চম্পাকে বলল-
:ওই মাগী,তরা ওই মাগীরে থুইয়া কই গেসিলি???
অরে লইয়া যাইতে পারসনাই???
:আরে খালা,আমি কি জানতাম নাহি যে অয় এরম
করবো!!!আমার তো অনেক টেনশন
হইতাসে।
:টেনশন তরে গুলাইয়া খাওয়াইয়া দিমু,বাল।চামেলি
কই???অয় দেহেনাই।
:চামেলিয়ে শেভ করতে আসে।অয়ও তো
কইল যে দেহেনাই।আর বিন্তি মাগী কান্দে খালি
ফিছফিছ কইরা।
:অহন কান্দে কেন???চল দেহি সবটি মিল্লা
খুঁজতে যাই অরে।
:চল খালা,হেইডাই ভালা অইব।
বিসটি আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে।কোন
রিকশা ও পাচ্ছেনা।ওই রিকশাওয়ালাটা তার পুরো
শরীরটা কুরে কুরে খেয়েছে,তাই হাটতে
বেশ কষ্ট হচ্ছে তার।জুম্মনের জ্বালায় কদিন
ধরে সে একা বের হয়না,কিন্তু আজ তো বাধ্য
হতে হল।বিসটি মনে মনে বলে-
শালা,খাদেম,খাদেমের পোলারও আমগো দরকার
আবার মালাউন গুলানও আয় জহন তহন,আমগো
কাসে আইলে আর তহন কোন জাত থাহেনা
এগো।তহন এগো জাত পিসে দিয়া বাইর হয়।আর
সক্কাল সক্কাল আমগো দেখলে একজন দোয়া-
দরুদ পইড়া নেকি কামায় আরেকজন গঙ্গা জল দিয়া
পবিত্র হয়,যত্তসব।এরা হইতাসে মানুষ আর আমরা
অমানুষ...এর চেয়ে তো কুত্তা হইলেও ভালা
হইত।বড় বড় বিল্ডিং এ দেহি মানুষ কুত্তা লইয়া ডলাডলি
করে,কুত্তারে খাওয়ায়,ঘুরায় আরও কতকিসু করে।
এমন অমানুষ না হইয়া কুত্তা হইয়া জন্মাইলেও ভালা
আসিলো।
এসব ভাবতে ভাবতে বিসটি কিছু বোঝার আগেই
দেখে ১০-১২ জন তাকে ঘিরে ধরেছে,আর
একজন হা হা করে হাসছে আর বলছে-জুম্মনের
মুখে থুতু দিয়া কি দোষ করসস,তা আইজ তরে
ভালোমতো বুঝাইয়া দিমু।কাছে আসতেই বিসটি
দেখে লোকটা জুম্মন।বিসটি বলে ওঠে-জুম্মন
আইজকা না।আইজ আমার অবস্থা এমনিতেই ভালা না।
আইজ ছাইড়া দে আমারে।জুম্মন কিছু না বলে বিসটি
কে ধরে সাথে সাথে ওখানেই শুইয়ে
ফেলে.........
বিসটি আস্তে আস্তে তার চোখের পাতা
খুলল...সবকিছু অন্ধকার লাগছে।।কোন তীব্র
আলো নেই চারপাশে...শুধু নীরবতা।।তার সামনে
শুধু কিছু ছায়া,কিছু নিভু নিভু আলো।লাল
আলো,নীল আলো,হলদে আলো ও আছে।
কিছু ছায়া ওঠা নামা করছে।জোনাকি পোকার আওয়াজ
ও পাচ্ছে,কিন্তু দেখতে পারছেনা।মাতাল হাওয়া
বইছে...বিসটির মনে হচ্ছে সে যেন শূন্যে
ভাসছে।উড়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও,হয়তো
মেঘেদের দেশে।যেখানে বিসটির মূল ঠিকানা।
হ্যাঁ আজ সে সত্যি ই যাচ্ছে সেখানে।সে
যাচ্ছে সেই বিধাতার কাছে,যে তাকে সবার
থেকে আলাদা করে পাঠিয়েছিলো পৃথিবীতে।
তাকে তার কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার আছে।বিসটি
আবছা ভাবে দেখছে তাকে ঘিরে মাসী-চম্পা-
বিন্তিরা তীব্র স্বরে কাঁদছে,বিসটি আর কিছু
দেখুক না দেখুক কিন্তু তাদের চোখের আগুন
ঠিক ই দেখছে।এই আগুনই হয়ত পারবে তাদের
অমানুষ হওয়ার কলঙ্ক ঘুচে দিতে।যাক তার জীবন
তাহলে বৃথা যায়নি।মৃত্যুর মাধ্যমে সে অন্তত এই
অমানুষদের মধ্যে মানুষ হওয়ার আগুন জ্বালিয়ে
দিয়ে যেতে পেরেছে।তাদের বোঝাতে
পেরেছে যে তারাও হয়তো মানুষ।আর কিছু
দেখতে পারছেনা বিসটি।চোখ খোলা সত্ত্বেও
ঘোলাটে হয়ে গেলো সব।মৃত্যুর সময় বিসটির
শেষ অনুভূতিটা ছিল-আচ্ছা,মৃত্যুর পর অমানুষরা
কোথায় যায়??স্বর্গে না নরকে???
মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।আকাশ বাতাস কাপিয়ে
বজ্রপাত হচ্ছে।আকাশ যেন তার বুক চিঁড়ে
দেখিয়ে দিতে চাচ্ছে তার বুকে আজ কতো
কষ্ট।সেই আকাশের নীচে বজ্রপাতের তীব্র
আলোয় মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে যে কয়েকটা
হিজড়া তারস্বরে বিলাপ করছে,আর তাদের মাঝে
শুয়ে আছে তাদের খুব আপন কেউ।একটা হিজড়া।
নাম বিসটি।একটা অমানুষ।তাই তো হিজড়া বলার সময়
হিজড়া “টা” বলে সবাই।কিছু মানুষ??? ওই
অমানুষটাকে তাদের বিকৃত দৈহিক চাহিদার স্বীকার
বানিয়েছে।একজন মানুষ এরকম ঝড় কয়বার সহ্য
করতে পারে তার শরীরের ওপর দিয়ে???৪বার
নাকি ৫ বার???তারা কি টানা সহ্য করতে পারে???
জানিনা ।এই অমানুষ টা আজ মাত্র ১৩ জনের টানা
অত্যাচার সহ্য করেছে,তাতেই সে মরে
গেছে।আরে এ তো অমানুষ হিসেবেও
ব্যর্থ,তাইনা???হ্যাঁ...এরা অমানুষ আর আমরা মানুষ।।।
আমরা প্রকৃত মানুষ।
মেহেদী হাসান মুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now