বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শুনতে পেলাম চাচী বলছেন, “এই তো হয়ে গেছে। তোমরা গল্প করো। আমি ঠিক ঠাক করে নেই।”
কড়াইয়ের তেলে মাছ ভাজার শব্দ হচ্ছে, বাতাস মোঁ মোঁ করছে সেই ঘ্রাণে। আমার পেটের ক্ষিদেটা আরো চাগিয়ে উঠল।
সেটাকে ঢাকতে সাত্তার সাহেবের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম। ভদ্রলোক বেশ বাঁচাল স্বভাবের মানুষ, প্রচুর কথা বলেন।
সারাক্ষণ চেষ্টা করেন বইয়ের মত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে, তবে মাঝে মাঝে আঞ্চলিকতা এসে পরে। কথা বলে জানা গেল ভদ্রলোকের তিন মেয়ে, কোনো ছেলে নেই।
তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। দুই জন থাকে দুবাই স্বামী বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে, আরেক জন থাকে পঞ্চগড় শহরে। এই বিশাল বাড়িতে মানুষ বলতে এখন সাত্তার সাহেব,
তার স্ত্রী জয়গুণ নাহার আর কামলা মোতালেব থাকে। মোতালেব রাত কানা মানুষ। তাই সন্ধ্যা হতে না হতেই খেয়ে ঘুমিয়ে পরে। সাত্তার সাহেবের ধারণা মোতালেব আসলে রাত কানা না,
কাজ যাতে কম করতে হয় তাই রাত কানার ভান করে থাকে। কারণ এই রাত কানা মোতালেবই গত বছর রাতের বেলা একটা সিঁদেল চোরকে ধরে গামছা দিয়ে বেধে রেখেছিল!
সেই থেকেই গ্রামের লোকজন মোতালেবকে খুব তেয়াজ করে চলে। তাদের ধারণা মোতালেবের গায়েবি শক্তি আছে।
রাতে না দেখতে পেলেও দৈব শক্তি বলে সব দেখতে পায়। তবে তার নাকি একটা বদ অভ্যাস আছে, ছোট থেকেই লুকিয়ে কেরোসিন তেল চুরি করে খায়।
এ বাড়ির কোনো হারিকেনে তাই তেল থাকে না। মোতালেবকে দেখার ইচ্ছা ছিল।
কিন্তু সে এখন ঘুমাচ্ছে। সন্ধ্যার সময় তাই কোল্ড স্টোরেজের এক লোক দিয়ে বাজার করিয়ে এনেছেন সাত্তার সাহেব।
ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমে ঘামছি দর দর করে। মাথার ওপর হলুদ একটা বাতি জ্বলছে আর একটা ফ্যান ঘটর ঘটর করে ঘুরছে। বেশ জোরেই ঘুরছে- কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার গায়ে বাতাস লাগছে না!
আমি হাত পাখা দিয়ে নিজেকে বাতাস করছি।
সামনে সাত্তার সাহেব না থাকলে শার্টের দু একটা বোতাম খুলে বুকে পেটে বাতাস দেয়া যেত। কিন্তু ওনার সামনে তো আর তা করা সম্ভব না। নতুন জামাই বলে কথা।
সাত্তার সাহেবের বোধ হয় এত গরম লাগছে না। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন, “তা জামাই, শুনলাম তুমি নাকি লেখা লেখি করো? টুকটাক বই পত্রও বের হয়েছে। সত্য নাকি?”
নড়ে চড়ে বসলাম। এই তথ্যটা পুরোপুরি ঠিক না। লেখা লেখি করার অভ্যাস আছে আমার ঠিকই। তবে হাজার চেষ্টা করেও বই বের করতে পারিনি।
প্রকাশকদের কাছে পান্ডুলিপি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে জুতার শুঁকতলা ক্ষয়ে গেছে- কিন্তু লেখা প্রেসের মুখ আর দেখেনি। লেখার হাত নাকি আমার যাচ্ছে তাই। ভাষা জ্ঞান ভাল না।
তবে এক প্রকাশক গোপনে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “লেখা ছাপাইতে পারি- তয় একতা কথা,
আমার কোম্পানির রাতের কাজের জন্য কিছু চটি বই লেখে দিতে হইবো। চটি বই কি জিনিস জানো তো?” হলুদ দাঁত বের করে হেহ হেহ করে হেসেছিল।
ঢোক গিলে শুকনো মুখে চলে এসেছিলাম সেদিন। তখনই লেখা ছাপানোর চেষ্টার ইস্তিফা দিয়ে দিয়েছি। আমাকে দিয়ে লেখা লেখি সম্ভব না।
কিন্তু সাত্তার সাহেবকে তো আর এত কিছু বলা সম্ভব না। নিশ্চই আমার শ্বশুড় আব্বা বড় মুখ করে কথা গুলো বলেছেন। এখন যদি অন্য কিছু বলি তাতে শ্বশুর আব্বা কষ্ট পাবেন শুনলে।
তাই ইতস্তত গলায় বললাম, “এই টুকি টাকি আর কি। তেমন বেশি কিছু না।”
“খুব ভালো অভ্যাস। ছাড়বা না, সবাই পারে না এইসব জিনিস।” বেশ ভরাট গলায় বললেন, “এক কালে আমিও চেষ্টা করেছিলাম লেখার, পারিনি।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম কেবল, জোর করে হাসলাম।
বাড়িটার মেঝেটাই পাঁকা। দেয়াল, ছাদ- সব টিনের। খোলা জানালা দিয়ে হঠাৎ করে বেশ জোরে সোরে বাতাস আসা শুরু করেছে। উল্টো পাল্টা বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে। বাহিরে তাকালেন গা ছম ছম করে ওঠে।
কোল্ড স্টোরেজ আর এই বাড়িটা ছাড়া এই এলাকায় দেড় দুই কিলোমিটারেও কোনো বাড়ি ঘর নেই।
চারপাশে ভূট্টা আর পাটের বিছানো ক্ষেত। এগুলোর মালিক নাকি সাত্তার সাহেব।
অন্ধকারে বাড়ির সীমানার বাহিরের ক্ষেত গুলোর দিকে তাকালে কেমন অদ্ভূত লাগে,
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম দমকা ঝড়ো বাতাসে ভূট্টা আর পাট ক্ষেতের লম্বা গাছ গুলো ধীরে ধীরে দুলছে, ঢেউ বয়ে যাচ্ছে যেন। বাহিরে চাঁদ নেই, কৃষ্ণপক্ষের রাত চলছে।
সাত্তার সাহেব খোলা দরজা দিয়ে বাহিরের আকাশটা দেখলেন এক নজর, “জামাই, বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। তোমার চাচী একা একা পাক ঘরে ভয় পাবে- আসো, বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসি।” উনি একটা চেয়ার নিয়ে বাহিরে বারান্দায় এলেন। আমিও একটা চেয়ার উঠিয়ে তাঁর পিছু পিছু এলাম।
এখানে বাতাস অনেক। ঘরের ভেতরের মত গুমোট ভাবটা নেই। গরম লাগছে না। ভালই লাগছে। বাতাসের ছোটা ছুটির মাঝে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি হঠাৎ হঠাৎ হায়ে এসে পরছে।
“তুমি একটু বসো। কারেন্ট চলে যেতে পারে। হারিকেন জ্বালিয়ে আনি। মোতালেবের অত্যাচারে তো কেরোসিন লুকিয়ে রাখতে হয়।”
দেখলাম ভেতরের ঘরের আলমারি খুলে কেরোসিনের বোতল বের করলেন। দেয়ালে হারিকেন ঝোলানো ছিল- সেটা নামিয়ে আগে কেরোসিন ভরলেন।
তারপর হারিকেন জ্বালালেন। আমি চুপচাপ বসে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। উঠানের অন্য প্রান্তে রান্নাঘর। খোলা রান্না ঘর, লাকড়ির চুলাতে রান্না করছেন চাচী।
তার ওপাসে কলতলা, যদিও বাড়িতে মোটর রয়েছে।
তারপরো টিউবয়েলের ব্যবস্থা আছে।
চারপাশে নিচু জমিতে ভূট্টা আর পাট ক্ষেত।
বাড়ি আর কোল্ড স্টোরেজটা জমির লেভেলে থেকে সামান্য উঁচুতে। যত দূর চোখ যায় ভূট্টা আর পাটের বিছানো ক্ষেত। অন্ধকারের সমুদ্র যেন।
উঠানের এক পাশে কয়েকটা আমগাছ আর পেয়ারা গাছ। বাতাসের চোটে এদিক সেদিক দুলছে যেন মাতাল হয়ে। আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
সাত্তার সাহেব হারিকেন জ্বালিয়ে আমার সামনে এসে বসার সাথে সাথে কারেন্ট চলে গেল।
“বললাম না কারেন্ট যাবে! এই পল্লি বিদ্যুতের লাইন এত খারাপ!” বিরক্তি মেশানো গলায় বললেন তিনি।
ফিরে রান্না ঘরের দিকে চেঁচিয়ে বললেন, “জয়গুণ, ভয় পেলে ডাল দিও। আমরা বারান্দাতেই আছি।”
রান্না ঘরে এখন চেরাগ জ্বালিয়েছেন জয়গুণ নাহার। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, “ভয়ের কি আছে? বয়স কি কম হয়েছে নাকি!
এই বয়সে আবার কিসের ভয়?”
“ভয় না পেলেই ভাল।” চেয়ার টেনে বসলেন। হারিকেনের হলদে আলোয় তাঁর দিকে তাকালাম,
“আমি এসে আসলে আপনাদের অনেক ঝামেলায় ফেলে দিলাম। চাচীর অনেক কষ্ট হচ্ছে। সাহায্য করারও কেউ নেই দেখি।
একা ওনাকে এত সব ঝামেলায় না ফেললেই ভাল হত।” একটু অপ্রস্তুত গলায় বললাম।
হা হা করে উদার গলায় হাসলেন সাত্তার সাহেব, “আরে রাখো তো তোমার ভদ্রতা! নতুন জামাই তুমি।
শমসের আলীর জামাই মানে আমারও জামাই। তোমার জন্য আরো অনেক কিছু করা উচিত ছিল। তাহলে ভাল লাগত নিজের কাছে। এগুলো তো সামান্য।”
আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “কোল্ড স্টোরেজে জেনারেটর আছে এখানে আনলেন না কেন?”
“ছিল। কিন্তু লাইনে সমস্যা করছে কয়দিন ধরে।”
আমি কিছু বললাম না আর। একা দুজন বয়স্ক মানুষ আমার মেহেমানদারী করছেন- ভেবেই কেমন যেন খারাপ লাগছে। অন্ধকার জমি গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম এক দৃষ্টিতে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now